স্বপ্ননগরী ও এক মুসাফির

তাপস মাইতি




পরিচিতিঃ বেশ কিছু বছর আগে সুপার স্টার রাজেশ খান্না রবীন্দ্রসংগীতের একটি এলবামে ভাষ্যপাঠ করেছিলেন, এবং ঐ একই এলবামে তাঁর সঙ্গেই যে তরুণ-যুবকটি বাংলা ভাষ্যে কন্ঠস্বর দিয়েছিলেন তিনিই আজকের মুম্বাইয়ের প্রখ্যাত বাচিক শিল্পী শ্রী তাপস মাইতি। ইতিমধ্যে একশোরও বেশি তথ্যচিত্রে গ্রন্থনা করে ফেলেছেন একসময়ের কলকাতার বেতার ও দূরদর্শনে নিয়মিত কন্ঠশিল্পী হিসাবে কাজ করা তাপস। বছর তিনেক আগে মহাশ্বেতা দেবীর কাহিনী অবলম্বনে প্রস্তুত চলচ্চিত্র 'স্বভূমি'তেও তার জলদগম্ভীর কন্ঠস্বরের আবৃত্তি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে দেশের ব্যস্ততম মহানগরে তার এই সফল পেশাদার শিল্পী হয়ে ওঠা জীবনের গভীরে যে মুসাফির সত্তার নিভৃত বাস, নিজের কলমে আজ তার সঙ্গেই পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন শ্রী তাপস মাইতি।

--------------------------- *** --------------------------


খালপাড়ে মাটি ফুঁড়ে ওঠা বটের পুরুষ্টু শিকড়ের উপর তাপ্পিমারা রংচঙে ঝোলাটি মাথার নিচে রেখে গা এলিয়ে দিয়েছেন এক ফকির, পাশে তাঁর আদরের একতারা। পাতার ফাঁক দিয়ে ভোরের ছেঁড়া ছেঁড়া আলো পড়েছে তাঁর প্রসন্ন দাড়িময় মুখে। চৈত্রের সকালে হালকা স্নিগ্ধ বাতাস সুর ভাসিয়ে দিচ্ছে, "ভোর হলো ওঠ জাগ মুসাফির আল্লাহ্ রসুল বল" ... হাফপ্যান্ট পরা খালি গায়ের সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া এক বালক মাঠের আলপথ ধরে সুরের উৎসের দিকে দৌড়োচ্ছে। "কীরে তুই এখনো উঠিসনি .." বলে মা রেডিওর নব্ টা ঘুরিয়ে বন্ধ করে দিতেই ছিঁড়ে গেল প্রভাতীর সুর, তড়াক্ করে উঠে বসলাম মাদুরের উপর। দূর থেকে ভেসে আসছে হিন্দি কোনো সিনেমার গান। কিন্তু এক মুসাফির যেন স্থায়ী আস্তানা গেড়ে নিয়েছিল সেই বালকের বুকের ভেতরে সেই তখন থেকেই।

এরপর সকাল গড়িয়ে দুপুর, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, বাড়ি বা পাড়ার বড়দের মুখে বিশেষ খবর -- দাসপাড়ার তিনজন ছেলে আড়াই বছর পর বাড়ি ফিরেছে বোম্বে থেকে। মা ভোরবেলায় প্রতিদিনের দুধ আনতে গিয়ে দেখে এসেছে ওদেরই একজনকে, তাকে নাকি চেনাই যায় না! যে লিকলিকে ছেলেটা ছেঁড়া প্যান্ট আর রোদে ঝলসানো চামড়ায় ক্ষেতমজুরের কাজ করতো তাকে একেবারে সিনেমার হিরোর মতো লাগছে -- ঝকঝকে কাপড়, চকচকে গায়ের রং, হিন্দি মেশা ভাঙা ভাঙা গ্রাম্য ভাষা, যেন অন্য কোনো গ্রহের মানুষ পথ ভুলে ঢুকে পড়েছে মাটির ঘরে।
ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ও আমার একা একা অন্য পাড়ায় যাওয়ার অনুমতি ছিল না। তাই সারাদিনের খেলা-পড়া-দৌড়ঝাঁপের মাঝেই প্রতীক্ষা কখন তাদের রাস্তায় দেখতে পাবো। শুনছি দারুণ একটা টেপরেকর্ডার এনেছে একজন, গমগম করে হিন্দি গান বাজছে সারাদিন ধরে, রাস্তায় বেরোচ্ছে জিন্স আর টি-শার্ট পরে, পুকুরে চান করছে লাইফবয় নয় লাক্স আর লিরিল সাবান মেখে, তোয়ালে দিয়ে গা মুছছে, ওরা হেঁটে গেলে দামী পারফিউমে রাস্তা ম-ম করছে সুগন্ধে। একজন নতুন একটা হারকিউলিস সাইকেল কিনেছে। একজনের বাবা দু-কাঠা জমি কিনবে ঠিক করেছে, অন্য জনের বাড়ির খড়ের চালাটা এবার টালির হবে। কানাঘুষোয় শুনেছি সন্ধ্যায় নাকি ওরা একটু বিলিতি খাচ্ছে, লন্ঠনের আলোয় পাড়ার এক দিদিমা দেখে ফেলেছে। কিশোর মনে তখন ঔৎসুক্যের শেষ নেই অদেখা সেই তিন যুবরাজকে নিয়ে। শেষমেশ দেখা মিলল চার দিনের দিন স্কুলের জানলা দিয়ে। চৈত্রের দুপুরে ধূসর রাস্তায় রঙিন ছাতা মাথায়, চোখে সানগ্লাস, কাঁধে হাত রেখে দুজন হেঁটে চলেছে। সত্যিই যেন অন্য গ্রহের দেবশিশু ভুল করে গ্রামের পথে ঢুকে পড়েছে। দেখে যেন আর আশ মেটে না! ওদের পেছনে ছায়ার মতো চলেছি ... হঠাৎ হ্যাঁচকা টান -- উঃ কানটা ভোঁ ভোঁ করছে, প্রায় ছিঁড়ে যায় যায় ..." কোন্ দিকে মন হুঁ:?" ঘড়াই স্যারের গলা। এরপর প্রায় দুদিন ডাঁ কানটায় হাত দিতে পারিনি।

পরদিন বিকেলে হঠাৎই ভাগ্য খুলে গেল। পাড়ার দাদাদের সাথে রাস্তার মোড়ে নারকেল গাছের নিচে গল্প করছে ঐ তিন রাজপুত্র। দুটো গুলিতে ঠোকাঠুকি করতে করতে দৌড়ে যাচ্ছিলাম মার্বেল খেলতে, দাঁড়িয়ে পড়লাম কথা শোনার জন্য।

...... সে এক ঝকঝকে রাংতা-মোড়া শহর যে কখনোই ঘুমোয়না, সেখানে সবাই দৌড়োচ্ছে, ছোটো ছোটো গোছানো ফ্লাট আর উঁচু উঁচু বিল্ডিং, ঝাঁচকচকে গাড়ি, মিনিটে মিনিটে লোকাল ট্রেন, সমুদ্র বীচ্, সবকিছুই দামী, নিত্য ব্যবহারের জলও পয়সা দিয়ে কিনতে হয়, মাঝে মাঝে ফিল্ম স্টারদের দেখা যায়, শুটিং দেখতে পাওয়া যায়, বাংলার বিখ্যাত "বনধ্" শব্দটা সে শহরে কেউ জানেই না, সবাই খুব নিয়ম মেনে কাজকরে, এমনি আরো কত কী! ওদের একজন আমার হাত থেকে একটা মার্বেল নিয়ে নাচাতে লাগলো, হঠাৎ ওর হাত থেকে পড়ে গেলে বলে উঠল "আইগাঃ" ... নতুন শব্দ কানে বাজলো, মনে গেঁথে গেল। পরে টিভিতে ক্রিকেট খেলা দেখার সময় কিরণ মোরের হাত থেকে সুযোগ ফসকে গেলে একথা বলতে শুনে সেদিনের সেই "আইগাঃ"-র মানে উদ্ধার করতে পেরেছি।

গ্রাম্য কিশোরের মনে তখন এক অপূর্ব স্বপ্ন-নগরী! বুঝলাম যে শহরে তারা গেছে সে জাদু জানে, তুলির এক পোঁচে ম্যাড়ম্যাড়ে হতশ্রী দরিদ্র জীবনকে স্বচ্ছল সুন্দর রঙিন করে দিতে পারে।
এরপর বছরে দু'বছরে তারা একবার করে আসতো, দেখা হতো। বয়স বাড়ার সাথে-সাথে ওদের সাথে কথা বলাটাও সহজ হলো -- ক্রমে ছবিটা আরও পরিষ্কার হতে লাগলো। গ্রামের অনেকেই তখন ভাগ্য বদলাতে ওদের হাত ধ'রে স্বপ্ন-নগরী মুখো হয়েছে।

এর প্রায় চোদ্দ বছর পর এক মাসতুতো দাদা বোম্বে থেকে গ্রামের বাড়িতে এলে, দেখা করতে গেলাম। তাকে আমার আবৃত্তি শোনালাম। গল্প করতে করতে সে জানালো বোম্বের এক ক্যাসেট কম্পানির গানের রেকর্ডিং-এর দায়িত্ব নিয়ে নাকি সে কলকাতায় এসেছে এবং সেই কাজই চলছে। ওই সংকলনে বিখ্যাত কোনো শিল্পীকে দিয়ে গ্রন্থনার কাজটা করাবে। শিল্পী এখনো ঠিক হয়নি। আমি রাজি থাকলে একবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। মা-কে বললাম, কিন্তু গ্রাম থেকে কলকাতা যেতে খরচ আছে, তার কী হবে! মা বলল "দেখি।"

বাস ভাড়া আর দু'দিনের খাওয়া খরচ নিয়ে সোজা পৌঁছে গেলাম স্টুডিও। এতো বছর পর আবার সেই স্বপ্ন-নগরীর সংযোগ। রেকর্ডিং হলো, পাঠের কথা লিখলেন বিখ্যাত গীতিকার শ্রী ভবেশ গুপ্ত।

এরপর আবার চার বছরের বিরতি। স্বপ্ন-নগরীর সাথে যোগ শুধু গল্পে, পত্র-পত্রিকায় আর টেলিভিসনের-র মাধ্যমে।

উনিশশো সাতানব্বই সালে পকেটে চাকরির নিয়োগ পত্র, পিঠে ঢাউস্ বেডিং আর হাতে সুটকেস্ নিয়ে বোম্বেমেলে চেপে সোজা স্বপ্ন-নগরীতে পা রাখা। উত্তেজনা যখন চরম পর্যায়ে তখনই প্রথম যাত্রায় ধাক্কা ... সময়ে চলা শহরে বারো ঘন্টা লেটে সকাল ছ'টার জায়গায় সন্ধ্যা ছ'টায় পৌঁছোনো।

পা দিয়েই দেখলাম সবাই ছুটছে, অফিসযাত্রী থেকে ব্যবসায়ী, পড়ুয়া থেকে খেলোয়াড়। ধীর গতির জীবন থেকে আত্মীয়-স্বজনহীন ভারতের ব্যস্ততম জীবনশৈলির সাথে মানিয়ে নিতে বড়ই নাজেহাল অবস্থা হয়েছিল। মাসখানেক পর বাড়ির জন্য মন আনচান। অভাবের সংসারে সবেধন নীলমণি চাকরি ছেড়ে ফিরে যাবার কথা 'স্বপ্নেও ভাবা যায় না'। সেই সময়েই জানলাম অসামান্য সেই মন্ত্র -- প্রথম ছ'মাস এ শহরকে ঘৃণা করবে, পরের ছ'মাস মেনে নেবে, তারপর ছ'মাস পছন্দ করবে, আর পরে সারা জীবন ভালোবাসবে। কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। প্রথম দিন গুলো মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে পারলে এ স্বপ্ন-নগরী কাউকেই শূন্য হাতে ফেরায় না ... ঝাড়ুদার থেকে ম্যানেজার, শিল্পী থেকে স্পটবয় সবাইকেই আপন করে নেয়।

প্রথম বাড়ি ফিরলাম পাঁচ দিনের ছুটিতে আট মাস পরের কোনো এক সকালে। যথারীতি পাড়ার কাকিমা জেঠিমা-রা হাজির বোম্বাইয়া বাবুকে দেখার জন্য। প্রণাম-ট্রনাম করে ওঁদের সাথে কথা বলছি, কিছুক্ষণ পর ওঁদের বিস্ময় মেশানো প্রশ্ন "তোর ঘুম পাচ্ছে না রে? দুদিন ধরে ট্রেনে এলি একটু বিশ্রাম কর, ঘুমো! তোর গায়ের রংটা একটু উজ্জ্বল হয়েছে ঠিকই কিন্তু বিশেষ বদলাসনি তুই, তোর গ্রামের ভাষা বদলায়নি, চালচলন বদলায়নি" ইত্যাদি ইত্যাদি .. মানে তুই গ্রাম্যই থেকে গেছিস। তাঁদের এতোদিনের বোম্বে-বাসীর পরিচিত ছবি, ধারনা বদলে গেল ঘরের ছেলেকে দেখে। যে শহর সবাইকে বদলে দেয়, নিজের ছাঁচে গড়ে নেয় সে কেন একে বদলাতে পারলো না, এ যেন এক বিস্ময় ছিল তাঁদের কাছে।

স্বপ্নে একদিন ভোরের সুরের উৎস খুঁজতে গ্রামের আলপথ ধ'রে দৌড়ে যাওয়া সেদিনের সেই কিশোরের অন্তরমহল আজও যেন তেমনি ঔত্সুক্যে সজীব। যদিও আজ সে বাস্তবের স্বপ্ন-নগরীর রাজপথে বিশ্বাসী পা ফেলে ফেলে মানুষের কথা বলে - মাটির কবিতা শোনায় তবু তার বুকের মধ্যে যেন এক চির মুসাফিরের বাস....

সে যেন এক ফকির-ফেরিওয়ালা।

এ শহর সত্যিই জানে সময়ের মূল্য, বোঝে প্রতিটি কর্মের গুরুত্ব, দেয় মর্যাদা ও সম্মান। দেয় নিরাপত্তা এবং জীবনে উন্নতির সুযোগ, শেখায় নিয়মানুবর্তিতা। জীবন সম্পর্কে এক সদর্থক বোধ গড়ে দেয়, করে তোলে আত্মবিশ্বাসী। প্রকৃতই এ শহর তার প্রতিটি নাগরিককে বলে "জাগ মুসাফির ... জাগতে রহো।" কৈশোরের সেই স্বপ্ন-নগরী এখন বাস্তবের চারণভূমি। যেখানে অনুভব করি অসংখ্য প্রিয় মানুষের ছোঁয়া, বাংলা শিল্প সংস্কৃতির উজান, সাহিত্যের সবুজ চাষ, নিয়ম করে রবি-নজরুল-জীবনানন্দ, বাউল-ভাটিয়াল। মনে হয় বাংলার বাইরে বাংলা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃত র চর্চায় আজ ভারতের অন্য যেকোনো মহানগরীর শীর্ষে আছে 'আমচি-মুম্বাই।'

ফেসবুক মন্তব্য