আনা আখমাতোভা প্রসঙ্গে

রিয়া চক্রবর্তী

রাশিয়ান কবি আখমাতোভার রচনার সাথে বাঙালি পাঠকের অল্পবিস্তর পরিচয় আছে। বাংলায় আখমাতোভার কিছু কবিতা অনুবাদ করেছেন শ্রী শঙ্খ ঘোষ, শ্রী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রী মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিকগন।

আনা আন্দ্রিয়েভনা আখমাতোভা ২৩ জুন ১৮৮৯ রাশিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। সেই সময় রাশিয়ায় বিপ্লব, বিদ্রোহ, দারিদ্র্য আর রাজনৈতিক উত্থানের পালা চলছে। অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। অনেকেই তখন দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। জারতন্ত্রের, নিরক্ষতার অভিশাপ, প্রতি ক্ষেত্রে অপমানিত হবার গ্লানি থেকে মেয়েদের মুক্তি দিয়েছিল সমাজতন্ত্র। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে কবি শিল্পীদের প্রতি দাবী করা হল যে -সৃষ্টিকে মৃতসঞ্জীবনীর মতো করে তুলতে হবে যে পান করা মাত্রই সব কিছু ভুলে ছুটবে সমাজতান্ত্রিক গঠন মুলক কাজে অংশ নেবার জন্য। আর দাবী পূরণ না হলে সেইসব শিল্পী ও কবিদের ঠাঁই হবে না দেশে। আখমাতোভার বিরুদ্ধেও নেমে এসেছে এই রায়। অভিযোগের বল্লমে বারবার বিদ্ধ হয়েছে তাঁর রচনা। কবিতার আলোচনায় বারবার আক্রান্ত, লাঞ্ছিত হয়েছে তাঁর নারীত্ব। সংবেদনশীল মনকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টায় কোন হাতিয়ার বাদ দেননি তখনকার সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বঘোষিত তাত্ত্বিকরা।
আখমাতোভার প্রথম দুটি বইয়ের নাম হল ‘ভেচের', লিখেছেন ১৯১২। আর দ্বিতীয় বই হল ‘চিওৎকি' লিখেছেন ১৯১৪। বিপ্লবের বছর ১৯১৭ সালে প্রকাশিত হল তাঁর তৃতীয় বই ‘বেলায়াত স্তায়া'। এই তিনটি বই সেই সময়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে যথেষ্ঠ। সরাসরি তুলনা করা হয় আখমাতোভার কবিতার সাথে সমসাময়িক জনপ্রিয় কবি মায়াকোভস্কির রচনার। যদিও চুকোভস্কির কথায় মায়াকোভিস্ক আর আখমাতোভা রচনাশৈলী এবং দৃষ্টি ভঙ্গির পার্থক্য ছিলো বিস্তার, তাঁর কথায় মায়াকোভস্কির চোখে ছোটখাটো কিছু ধরাই পরে না। আর আখমাতোভার চোখ এড়িয়ে কিছুই যায়না। এই আলোচনা যথেষ্ঠ প্রভাব পড়ে এবং শ্রোতাদের মধ্যে হৈ চৈ পরে যায়। নানা রকম আলোচনা, সমালোচনার ফলে ১৯২২ সালে আখমাতোভার রচনা নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। তাঁর বিরুদ্ধে স্বর ক্রমশ চড়া হচ্ছে। তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, হুকুম দেওয়া হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক গঠন কার্যের জন্য কবিতা লেখার জন্য।

১৯২৩ সালে ‘আন্না দোমিনি' প্রকাশিত হবার পর প্রায় সতের বছর সোভিয়েত ইউনিয়নে আখমাতোভার কোন লেখা প্রকাশিত হয়নি। ১৯৪০ সালে ‘এ ইজ্ সিয়োস্তি ক্ -নিগি' ও ১৯৪৩ সালে ‘ইজোব্রানিয়ে স্তিখি' প্রকাশিত হয়। তাঁর আরও একটি বিখ্যাত রচনা হল ‘রিকুয়েম (Requiem)’। রচনার সময়সীমা ছিলো ১৯৩৫ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত। এই রিকুয়েম এর কবিতা হল কবির সেই সময়ের দলিল। এতে নেই বেদনা উচ্ছ্বাস। রয়েছে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ। ছেলে লেভ এর প্রাণ বাঁচানোর জন্য মায়ের কাতর আকুতি। ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা।
প্রহরের আয়নায় একের পর এক ছবি, ছায়া, দ্রুত সরে যায়। কর্নেই চুকোভস্কির কথায় ‘এই কবিতায় যদি কেউ নায়ক থাকে তবে সে হল সময়।' পৃথিবীতে কাটিয়ে যাওয়া দিনগুলোর অর্থহীন অনিশ্চয়তা হয়তো মাঝেমধ্যে আখমাতোভাকে বিষন্ন করে তুলত। মৃত্যুর কল্পনার স্মৃতিতেও তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি সেইসব অপমান।

১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি. লিট. সম্মানে সম্মানিত করেন। বিদেশে অনেক সম্মান পেলেও দেশের মাটিতে তিনি যে কোন সম্মান পাননি তা নিয়েও তাঁর মধ্যে কোন অভিযোগ ছিলো না।

৫ই মার্চ ১৯৬৬ সালে ৭৬ বছর বয়সে মস্কোতে আখমাতোভা মৃত্যু বরন করেন।


অনুবাদ কবিতা

পেত্রোগ্রাদ --- ১৯১৯

কবি - আনা আখমাতোভা

অনুবাদ - রিয়া চক্রবর্তী


হিংস্র শহরের খাঁচায় বন্দী থেকে
আমরা ভুলে গেছি, আমাদের শহর, ভুলে গেছি জলাশয়, ভুলেছি সবুজ মাঠ।
ভুলেছি ভোরবেলা, আমরা ভুলে গেছি অসাধারণ দেশকে।
রক্তের একটা বৃত্ত দিন রাত আমাদের
পিষে ফেলছে ক্ষমাহীন উল্লাসে।
কেউ এসে দাঁড়াতে চায়নি আমাদের পাশে।
কারণ আমরা বাস্তুহারা হতে অস্বীকার করেছিলাম।
কারণ স্বাধীনভাবে উড়াল দেওয়ার ডানার থেকেও
আমরা আমাদের শহরকে ভালোবেসেছিলাম
সবার জন্য বাঁচাতে চেয়েছিলাম
আগুন আর জল।
এখন অন্যভাবে কাটছে দিন
মৃত্যুর ঠান্ডা হাওয়া জমিয়ে দিচ্ছে হৃদপিণ্ড
আমাদের নীরব সমাধিক্ষেত্র হয়ে উঠবে
পিটারের এই পবিত্র শহর।


Petrograd, 1919
by Anna Akhmatova

Caged in this savage capital,
We have forgotten forever
The townships, the lakes, the steppes,
The dawns, of our great motherland.
In the circuit of blood-stained days and nights,
A bitter languor overcomes us…
No one wishes to come to our aid,
Because we choose to remain here,
Because, in love with our city,
More than the wings of liberty,
We preserved to ourselves,
Its palaces, flames, and waters.
Now another time draws near,
The wind of death chills the heart,
And Peter's sacred city,
Will be our unsought monument.

ফেসবুক মন্তব্য