মন খারাপ

অপরাজিতা ভট্টাচার্য


এ জায়গা পাথুরে পাহাড়ি। কালচে মাটি যেন সেপিয়া চাতক। বহুদিন হল আমাদের অ্যাপার্টমেনটের উলটো দিকে হাই রাইজ হবে বলে বিস্তৃত এলাকা পাঁচিল ঘেরা পড়ে আছে। এ বছর গণপতি পুজোর পরেই দেখলাম সে মাটিতে কাশ ফুল। বিরামহীন বর্ষায় চোখ তখন স্যাঁতসেঁতে, ক্লান্ত। তাই চোখ রগড়ে ঘষে আবার দেখলাম। হ্যাঁ, কাশ ফুলই তো।আগে দেখি নি কখনও। দিন দুয়েক পর দেখি বেশ কয়েকটা বক উড়ছে কাশ ফুলের মাথায় মাথায়।আবার চোখ রগড়ালাম। হ্যাঁ, এতো দেখি বকই। কলকাতার থিম পুজোর মণ্ডপ যেন। মণ্ডপের ক্যামফ্লেজে অদ্ভুত রূপান্তর ঘটেছে এলাকাটার যাই হোক না কেন। কখন হল তা ভগায় জানে।আমার জানা হল না। কাশ ফুল কিন্তু শরতের অ্যাসিড টেস্ট। শরৎ কনফার্মড। সত্যি কথা বলতে কি, দূষণ মাত্রা আজকাল সহন সীমার এতটাই ওপরে থাকে যে, মুম্বইতে ( বোধ হয় সব মেট্রো শহরেই)দুর্গাপুজো না হলে এবং ছোট বেলায় ছয় ঋতুর নাম মুখস্থ করা না থাকলে বর্ষা আর শীতের মাঝের দুটো ঋতু শুধু স্মৃতিসুধা হয়েই থেকে যেত।

স্থলপদ্ম ফুল গাছগুলোতে ফুল ধরছে এখন। আমার প্রিয় ফুলগুলোর অন্যতম। পুজো অতিক্রান্ত শরতের রেশ শেষ হবে হবে করছে। বিশাল অ্যাপার্টমেনটের পাঁচিলের ভিতরের গায়ে মালীদের রোপণ চর্চা থেকে শুরু করে ফুল ফোটা সবই বড় নিয়মিত।ভোরবেলা রোজ ফুটছে সাদা ফুল—উন্মন, কতক্ষণে সকাল নটা থেকে ধীরে ধীরে রঙ বদল হয়ে হালকা গোলাপি হবে। দুটো রঙই রোজ দেখতে পাই শুধু রূপান্তরের সময়টায় কোনদিন থাকতে পারি নি। এমন অনেক “পারি নি”, “হয়ে ওঠে নি" থাকে সবার। তা থেকেই কি মন খারাপ না আফসোস না বিষাদ আসে? জানি না।

এটা জানি যে আর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে আমার চোখ আর যাবে না ঐ গাছগুলোর দিকে। কোজাগরী পূর্ণিমা পেরোলেই ধীরে ধীরে স্থল পদ্ম ফুল ফোটা বন্ধ হবে। যেদিন থেকে দেখব ফুল ফোটে নি একটাও হতাশ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নেব। পরের দিন থেকে আর চেয়েও দেখব না ওদিকে। এটাই কি তবে মন খারাপের প্রভাব না কি স্বতঃস্ফূর্ত স্নায়বিক অভ্যাস! দুটো আলাদা শব্দ জুড়ে গেলে যে প্রভাব বা ইমপ্যাক্ট তৈরি হয় মনখারাপ, তার সঙ্গে বোধ হয় আমার তেমন সখ্যতাই নেই।

এরই মধ্যে এক নবীন কিশোরী শেষ শরতের এক গড়ানো বিকেলে স্কুল বাস থেকে নেমে দেখি রাস্তার ধারে ভারী ব্যাগ কাঁধে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের জন্যই অপেক্ষা করছে নিশ্চয়ই। গুনগুন করে একটা গান গাইছে – কিন্তু চেয়ে আছে বাকি বন্ধুদের দিকে, যারা মায়েদের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। আসন্ন হেমন্ত চাক্ষুষ করলাম ওর চোখ দুটোতে। খুব যে দীঘল টানা টানা চোখ তা নয়। শরতের শেষ।মুখে তেমন ঘাম জমে নি। উৎকণ্ঠার ছাপ নেই। মা আসবে। প্রত্যয়ী। তবু গুনগুন গানের বিপরীতে মায়ের পথ চেয়ে চোখ দুটোতে হেমন্ত নেমেছে করুণ। দিন দশেক আগেই বোধ হয়।
বুকের অলিন্দ পাণ্ডুর হল আমার,মেয়েটারও কি? একেই বুঝি বলে মন খারাপ! ও মেয়ে তো অচেনা, পাসারসবাই। নাকি শরতের শেষ বলে অভিঘাত প্রবল হল। কে জানে।

শেষ চিঠিতে না বাচক অনেক কিছু লেখার সময় তার চোখ দুটোতেও নিশ্চিত এমনি হেমন্ত নেমেছিল। আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে চিঠিতে যা গলতে দেয় নি তা তবে ভালবাসা না কি মনখারাপ! এমনও তো হতে পারে যে ভাগ না দিয়ে শ্রীহীন হেমন্তকেই পাঁজরবন্দী করেছিল সে। সে রূপান্তরও যে দেখা হয় নি।

অপরূপ রিক্ত হবার পর বিরতির শৈত্য অমোঘ, অন্তরলীন তাপ ঘনীভূত হবার জন্যই। রূপান্তরেই নিহিত থাকে উষ্ণতা, রং, প্রেম ইত্যাদি যাবতীয় পজিটিভ কিছু। হিমজ রিক্ততায় মন ভার হওয়াটা তাই বোধ হয় জরুরী আগামী উষ্ণতার জন্য। দিওয়ালির আলোকসজ্জায় যখন রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ভাসছে, তখন হিমজ ঘনীভবনের সূচক হয়ে আমার গ্যালারিতে এলইডি সজ্জার একপাশে টিমটিম করছে আকাশপ্রদীপ আঙুল গুলোর খোঁজে।

অলংকরণঃ স্বাতী বাউরা

ফেসবুক মন্তব্য