গ্রীষ্মকালের গাছ

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়



রোববার সকাল। কলিংবেল শুনে দরজা খুলতে দেখি ননীমামা। মার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। আসলে দেখা নয়, দাদা টাকা পাঠিয়েছে বোধহয়, সেটা দিতে এসেছে। সেবার ঝগড়া করে চলে যাওয়ার পর আর মার সামনে এসে দাঁড়ানোর মুখ নেই দাদার। তাই ননীমামার মারফত যোগাযোগ করার চেষ্টা। মার থুতনিটা থিরথির করে কাঁপে। গলাটা কি ধরা ধরা লাগে? খাটের ওপরকার ভাঁজ করা জামাকাপড়গুলোকে আরেকবার পাট করতে করতে বলে, আমি টাকা নিয়ে কি করব? ওর সংসার বাড়ছে, ওরই এখন টাকার দরকার বেশি । ননীমামা চেষ্টার ত্রুটি রাখেনা কিন্তু শেষপর্যন্ত টাকাটা ফিরিয়েই নিয়ে যেতে হয়। যাবার সময় মা ডেকে বলে, সময় করে একবার তনুকে আসতে বলিস ননী। যদি পারে। কবে আছি কবে নেই। প্রথম সন্তান বলে কিনা জানিনা, দাদাকে মা চিরকাল বেশি ভালবেসে এসেছে। এখনও বাসে। আমার কাছে থাকে বটে কিন্তু মার সারা অন্তঃকরণ জুড়ে শুধু দাদা।
ব্রেকফাস্ট খেল খুঁটে খুঁটে, অন্যমনস্কভাবে। মন ভালো নেই। এই এক জ্বালা আমার। একবার করে মাকে দাদা এইভাবে নাড়া দেয় আর তার জের সামলাতে আমাকে হিমশিম খেতে হয়। ধুঁইয়ে ওঠা রাগ জোর করে চেপে রাখি। সাড়ে বারোটার সময় দেখি তখনও ঠায় বিছানায়। দুচোখ ভরা চিন্তা। কি হলো, স্নান করবে না? ধীরে ধীরে উঠে বিমর্ষমুখে স্নানে যায় মা, আর স্নান সেরে যথারীতি হাতে কাচা কাপড়ের গোছা নিয়ে বেরোয়। ব্যস, আর থাকতে পারি না, ভেতরের দম ধরা রাগ মুহূর্তে ফেটে পড়ে। আশ্চর্য মা! এত করে বলি ছাড়া জামাকাপড়গুলো বালতিতে রেখে দাও, দীপালি কেচে দেবে। তবু রোজ জেদ ধরে কাচাকুচি করতেই হবে?
মার মেজাজ এমনিতেই খারাপ, ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, তুই থাম্! খালি এটা কোরো না ওটা কোরো না! পেয়েছিস কি তোরা? এতদিনের সব অভ্যেস তোদের কথায় ছেড়ে দেব?
আমার তখন রাগ চড়ে গেছে। সে যখন দরকার ছিল করেছো। এখন সুযোগ পেয়েছো আরাম করো, জীবনটাকে উপভোগ করো। খামোখা পরিশ্রম করার দরকারটা আছে? নাকি আমার কথা ধর্তব্যের বলে মনে করো না?
ঠেসটা বৃথা যায় না। মা আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। তুই ভাবিস কি বল্ তো? তোর কাছে আছি বলে আমার স্বাধীনভাবে কিছু করার অধিকার পর্যন্ত নেই? তোর কথামত উঠব, বসব? আমি কি একটা বাচ্চা?
কোথা থেকে কোথায়! চোখে জল এসে যায় আমার। চিরকাল করেও যাব আবার চোটপাটও খাব? এতটুকু ভালোবাসা, আন্ডারস্ট্যান্ডিং পাব না? কিছু মনে থাকে না, একটা কাজ নিজে করতে পারে না, বাচ্চা নয়তো কি? কিন্তু আঘাত দেওয়ায় বড়র ঠাকুর্দা! এরা যে কখন বড় আর কখন বাচ্চা সেই ধাঁধাঁটা আজও বুঝতে পারলাম না!
সন্ধেবেলা ঠাকুরের আসনে বসে পর পর ছটা কাঠি পুড়িয়ে তবে প্রদীপ জ্বাললো। ধূপদানিতে ধূপকাঠি গুঁজতে গিয়ে খালি সরে সরে যায়, কিছুতেই বসাতে পারে না । তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে প্রদীপ থেকে ধূপকাঠি জ্বালানোর সময় বেশ বুঝতে পারি সহায়তা চাইছে। কিন্তু না দেখার ভান করে আমি পাথর। মস্ত শক্তিমান তুমি, করো নিজের কাজ নিজে!
মা-মেয়েতে রাগারাগি পর্ব চলতে থাকে। সেদিনও যথারীতি জামাকাপড় কেচে বেরিয়ে এল মা। বয়সের ভারে মেরুদণ্ড ঝুঁকে গেছে। কিন্তু জেদ ষোল আনার ওপর আঠারো আনা। সামনের দিকে নুয়ে কাপড় হাতে টুকটুক করে ঘর পেরিয়ে বারান্দায়। কাপড় মেলার দড়িটা বেশ উঁচু, মার হাত যায় না। ভিজে কাপড় হাতে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। জানে চটে আছি তাই আমাকে ডাকে না, কেবল আড় নজরে একবার দেখে জানলার তাকে কাপড়গুলোকে এমনভাবে রাখে যাতে আমার চোখে পড়ে। তারপর টুকটুক করে ফের নিজের ঘরে। জানলা দিয়ে দুপুরের তেরছা রোদ মেঝের ওপর লুটিয়ে, সেই আলোর চৌখুপির ওপর মা এসে দাঁড়ায়। যেন এক প্রতীকী দৃশ্য, গন্ডীকাটা জীবনে বন্দী মা কিছুতেই তার ঘেরাটোপ থেকে বেরোতে পারছে না। হঠাৎ খুব মায়া হয়। বয়েসের চাপে চেহারা ভেঙে যায়, রক্তের জোর কমে যায়, শরীরের কলকব্জাগুলো এক এক করে অকেজো হয়ে যায় ঠিকই কিন্তু ভেতরের বোধগুলিও কি হারিয়ে যায়? নাকি আরো সংবেদী, আরো স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে? গ্রীষ্মকালের গাছের মত, উপবাসী বিধবার মত, স্নেহাতুর শিশুর মত?
এগিয়ে গিয়ে কাপড়গুলো জানলার তাক থেকে তুলে নিই।

ফেসবুক মন্তব্য