ঠাকুরদাদার ঝুলি

অমিতাভ প্রামাণিক


- সো ইউ আর সেয়িং ইউ নিউ হিম?
- ইয়েস। ভেরি মাচ।
- অথচ আপনি কোনদিন ইন্ডিয়ায় যান নি?
- না। আসলে ছোটবেলা থেকে বিভিন্নজনের কাছে ভারতবর্ষ সম্বন্ধে এত কথা শুনেছি, আমার কাছে সেটা হয়ে গেছিল যেন একটা স্বপ্নের দেশ। সেই যে ফেয়ারি টেলে থাকে না, এক যোদ্ধা স্বপ্ন দেখে যে কোন এক দেশে এক পরমাসুন্দরী কন্যা একলা একটা ঘরে বন্দিনী হয়ে আছে, আর তাই দেখে তার মন উতলা হয়ে যায়, কবে সে সেই দেশে গিয়ে যুদ্ধ করে সেই বন্দিনীকে উদ্ধার করবে, আমার অবস্থাও হয়েছিল একেবারে সেই রকম।
- ডাজ দ্যাট মিন ইউ নিউ এ লট অ্যাবাউট ইন্ডিয়া?
- নো, আই ডিডন্ট। আমি শুধু শুনেছিলাম ভারতীয়রা বেঁটেখাটো, আর তাদের গায়ের রং ঘোর কালো। তারা বিধবাদের জ্বলন্ত চিতায় ছুঁড়ে দেয় আর স্বর্গে যাবার প্রবল বাসনায় জগন্নাথদেবের রথের তলায় নিজেকে ফেলে ক্ষতবিক্ষত করে। কিন্তু আমার যখন বয়স এই ধরো ন-দশ বছর মত, আমার স্কুলের কপিবুকের মলাটে একটা ছবি দেখে আমার সেই ভুল ভাঙলো। ছবিটা ছিল কাশীর গঙ্গাস্নানের ঘাটের। ছবিতে দেখলাম মানুষজন মোটামুটি লম্বাই আর বেশ সুশ্রী। ছবির মন্দিরগুলোর উঁচু উঁচু চূড়া আর তাদের স্থাপত্য সৌন্দর্য আমাকে এমন মোহিত করল, মনে হল এর তুলনায় আমাদের গীর্জা আর প্রাসাদগুলো তো কিছুই না। আমি সেই সব দেখে ভাবে বিভোর হয়ে ছিলাম, শিক্ষকমশাই এসে আমার কানটি মুলে বলল, কী হে, চুপ করে বসে আছ যে, খাতায় কপি করার নামটি নেই। নাও, আরো দুপাতা বেশি কপি করো।
- হে হে হে। তারপর?
- তারপর আর কী! অনেক বছর চলে গেল। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গেলাম, তখন শুনলাম সেখানে সংস্কৃত পড়ানো হবে। প্রফেসর ব্রকহস নামে একজন সেখানে ভারতীয় সাহিত্য নিয়ে লেকচার দেবেন। ব্যাস, আমি সেই কোর্সে আমার নাম লিখিয়ে দিলাম। রাজা নলের শরীরে কী কৌশলে কলি প্রবেশ করলো, দুষ্মন্ত-শকুন্তলার প্রণয় কাহিনীর পরিণতি কী হলো, প্লাস ঋগ্বেদের কিছু কিছু শ্লোক, এসব শিখলাম ওঁর কাছে। আমার ইন্টারেস্ট হু হু করে বেড়ে গেল। আমি বার্লিন আর প্যারিসে গিয়ে সংস্কৃত অধ্যয়ন করতে লাগলাম।
- কিন্তু সংস্কৃত শেখার জন্যে ভারতে না গিয়ে বার্লিন-প্যারিস ...
- ঠিকই বলেছ। ভারতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল আমার তীব্র। ইওরোপীয় ছাত্ররা যেমন রোম আর এথেন্স দেখার জন্যে পাগল হয়, আমিও ভারতে যাওয়ার, কাশীর পবিত্র গঙ্গায় স্নান করবার স্বপ্ন দেখতাম রোজ। কিন্তু ভারত তখন ছিল ছ’মাসের পথ, আর প্রচুর খরচা। আমি ছাত্র, আমার অত পয়সা কোথায়? যৌবনে অর্থের অভাবে আমার সেই স্বপ্ন সফল হল না। পরে অবিশ্যি প্রচুর ভারতীয় বন্ধু আমাকে কত নেমন্তন্ন করেছে, কিন্তু এখন বুড়ো হয়েছি, আর সেই এনার্জি নেই। আর একটা নতুন জায়গায় বেড়িয়ে এলেই তো হল না, সেখানে দু’তিন বছর না থাকলে, সেখানকার ভাষাগুলো মোটামুটি না শিখলে, সেখানকার পণ্ডিতদের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা না করতে পারলে আর সেই যাওয়ার মানে কী বাপু? শুধু কলকাতা-বোম্বাই ঘুরে এসে কী লাভ? সে তো আমি ইচ্ছা করলেই অক্সফোর্ড বা বন্ড স্ট্রীট ঘুরে আসতে পারি।
- তাহলে ভারতবাসীদের ভালমন্দ আপনার আর জানা হ’ল না?
- ভালটা বেশ কিছুটা জানা হল, মন্দটা নয়।
- মানে?
- মানে এখানে যতজন ভারতবাসীর সঙ্গে আলাপ হ’ল, তারা সর্ববিষয়ে এত উৎকৃষ্ট যে বলার নয়। আমি ম্যাগনিফাইং লেন্স লাগিয়েও তাদের মধ্যে কোন রকম নিকৃষ্টতা খুঁজে পাইনি। এক দিক দিয়ে ভালই। দেখা হ’ল, একটা জাতির কতগুলো ভাল দিক। আমি জানি যে, সব ভারতীয় নিশ্চয় এদের মত মহদাশয় নয়, তা সম্ভবও নয়, কিন্তু যে জাতির মধ্যে এতজন মহচ্চরিত্র মানুষ জন্মেছেন, তার জাতীয় চরিত্র মোটেও উপেক্ষণীয় নয়।
- ওঁকে কীভাবে চিনলেন?
- সে এক আজব ঘটনা। সম্পূর্ণ ঘটনাচক্রেই বলতে পার। পঞ্চাশ বছর আগে তো ভারতবাসীরা এমন হুটপাট অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারত না। কালাপানি পার হওয়া মানেই একটা বিশাল ব্যাপার, তার একটা বিভীষিকা ছিল প্রবল, তার ফলে সমাজচ্যুত হতে হত। সেসব আমি জানতাম। তাই যখন শুনলাম যে একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু প্যারিসে এসে এখানকার সবচেয়ে বড় হোটেলের সবচেয়ে ভাল ঘরটার বাসিন্দা হয়েছেন, তখন তো সারা প্যারিসে হুলুস্থূল পড়ে গেল। আমারও ইচ্ছা জাগল গিয়ে আলাপ করার। আমি ফ্রান্সের এক কলেজে প্রফেসর বার্নুফের কাছে সংস্কৃত পড়তাম। দেখলাম সেই ভদ্রলোকও ওঁর কাছে এসেছেন কথাবার্তা বলতে। প্রফেসর আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন, আর অমনিই আমাদের ঘনিষ্ঠতা হয়ে গেল।
- সংস্কৃত নিয়ে কথাবার্তা হ’ত বুঝি আপনাদের?
- ওয়েল, সে এক মজার ঘটনা, জানো? তিনি সংস্কৃতে যে বিশেষ পন্ডিত ছিলেন, তা বলা যাবে না, অবশ্য সংস্কৃত সাহিত্যজ্ঞান তাঁর ভালই ছিল। প্রফেসর বার্নুফের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি, প্রফেসর তাঁকে একখানা ঝকঝকে ছাপানো ভাগবতপুরাণ উপহার দিলেন। তার একদিকে সংস্কৃত শ্লোক লেখা, অন্যদিকে তাদের ফরাসী তর্জমা। তিনি তাঁর সুন্দর আঙুলগুলো সেই ফরাসী ছাপার ওপর বুলিয়ে বললেন, আহা, এগুলো আমি যদি পড়তে পারতাম! আমার মনে হল, নিজের দেশের প্রাচীন ভাষা সম্যকভাবে জানার চেয়ে ফরাসী ভাষা জানতেই তাঁর যেন বেশি উৎসাহ।
- আপনাদের মধ্যে কী নিয়ে কথা হ’ত?
- যেই শুনলেন আমি সংস্কৃত বিষয়ে উৎসাহী, আমার ওপর তাঁর বেশ একটা আকর্ষণ জন্মে গেল। আমাকে প্রায়ই নেমন্তন্ন করতেন, আর আমি গিয়ে বেশ সময় কাটিয়ে আসতাম ওঁর সঙ্গে। ভারতের নীতি নিয়ে কথা বলতে খুব ভালবাসতেন।
- শুনেছিলাম উনি খুব সঙ্গীতপ্রিয়ও ছিলেন।
- অফ কোর্স। খুবই। ইটালি আর ফ্রান্সের সঙ্গীতও তিনি ভীষণ পছন্দ করতেন। উনি গান করতেন, আমি পিয়ানো বাজাতাম, আমাদের দিনগুলো বেশ আমোদে কেটে যেত। ওঁর গানের গলা ছিল খুব সুন্দর। আমি একদিন অনুরোধ করলাম একটা খাঁটি ভারতীয় গান গাইতে, তো উনি গাইলেন একটা পারস্যের গজল। তাতে আমি তেমন মাধুর্য পেলাম না। আবার বললাম, প্লীজ একটা খাঁটি ভারতীয় গান শুনান।
- গাইলেন উনি?
- হ্যাঁ। বললেন, তুমি এর রস উপভোগ করতে পারবে না। বললেন, আবার গাইলেনও। নিজে নিজেই বাজিয়ে গাইলেন। সত্যি বলতে কী, আমার তা বাস্তবিকই পছন্দ হল না।
- তারপর?
- ওঁকে বললাম। এ কেমন গান? এর না আছে সুর, না ঝঙ্কার, না সামঞ্জস্য। তিনি শুনে একটু তেতে উঠলেন। বললেন, আগেই তো বললাম। তোমরা সবাই এক রকমের। যেই দেখলে একটা জিনিস নতুন, বা প্রথম অভিজ্ঞতায় তেমন মনোরঞ্জক নয়, তোমরা অমনি বলে দাও, এ নিকৃষ্ট। আমি যখন প্রথম ইতালিয় গান শুনি, আমিও তাতে কোন রস পাইনি, কিন্তু আমি ক্রমাগত চর্চা করতে লাগলাম যতক্ষণ না তার মধ্যে ঢুকতে পারি। একেবারে ভেতরে না ঢুকতে পারলে ক্লাসিকাল কিছুতেই রস পাওয়া যায় না। সব বিষয়েই তাই। তোমরা বোঝো না, তাই বল আমাদের ভারতীয়দের ধর্ম ধর্মই নয়, দর্শন দর্শনই না, কাব্য কাব্যই না। আমি বললাম, না, না, তা কখন বললাম? উনি বললেন, বলবে। না বুঝলে তাই তো বলবে। তোমাদের ইওরোপীয়দের স্বভাবই তাই। আমরা কিন্তু তা করি না। ইওরোপ যা বলে, আমরা তা বুঝতে চেষ্টা করি। আমরা তোমাদের সঙ্গীত, তোমাদের দর্শন সব বোঝার চেষ্টা করি। তোমাদের মত অন্যকে অবহেলা করি না। তোমরাও যদি সহিষ্ণু হতে, তাহলে আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোর মর্ম বুঝতে পারতে। তোমরা যা ভাবো, আমরা মোটেও সে রকম ভণ্ড বা অজ্ঞ নই। যে সব শাস্ত্র অজানা, তা যতটা তোমরা বোঝো, আমি বলতে পারি আমরা তার চেয়ে ঢের ভাল বুঝি। বুঝলাম, বেশ চটে গেছেন। প্রসঙ্গ বদলে তাই জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, আমি শুনেছি ভারতীয় সঙ্গীত নাকি অঙ্কশাস্ত্র থেকে উৎপন্ন হয়েছে। সত্যি নাকি? আমি একবার সংস্কৃত সঙ্গীতের একটা খসড়া দেখেছিলাম, তার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না।
- ভারতীয় সঙ্গীত শেখার ইচ্ছে ছিল বুঝি আপনার?
- খুবই। প্রফেসর উইলসন বলে একজন মিউজিশিয়ান ছিলেন। তিনি ভারতে বহু বছর কাটিয়েছেন। আমি তাঁকে ধরে পড়লাম, আমাকে শেখান। তিনি কিন্তু আমাকে উৎসাহিত করলেন না আদপেই। বললেন, তিনি নিজে এক ভারতীয় কালোয়াতের কাছে গেছিলেন। সেই কালোয়াত তাঁকে বলেন, সপ্তাহে দু-তিনদিন করে তাঁর কাছে ছ’মাস এসে শিখলে তবে তিনি বলতে পারবেন কোনো ছাত্র সঙ্গীত শিক্ষার উপযোগী কিনা। উপযুক্ত হলে তারপর টানা পাঁচ বছর রীতিমত রেওয়াজ করলে তবে কিছুটা শেখা সম্ভব। সেই শুনে প্রফেসর উইলসন নিজেই ভারতীয় সঙ্গীত শেখায় ক্ষান্তি দিলেন। আমাদের এখানে লাইব্রেরীতে সঙ্গীত রত্নাকর টাইপের অনেক নামী সঙ্গীতের বই ছিল। আমার খুব ইচ্ছা ছিল গান শেখার। কিন্তু প্রফেসরের মুখে ঐ গল্প শুনে আমার ইচ্ছাও দমন করতে হল। তোমাদের পরিবারে আরও বড় সঙ্গীতজ্ঞ আছেন বলে শুনেছি।
- ওঁর ব্যাপারে আর কী জানেন?
- ওহ, উনি খুব বুদ্ধিমান মানুষ ছিলেন। অবশ্য কেন জানি না, তিনি ব্রাহ্মণদের বিশেষ ভাল চোখে দেখতেন না। একদিন আমি তো জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, আচ্ছা, আপনি যে কালাপানি পেরিয়ে এসেছেন, আপনাকে দেশে ফিরে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না? উনি বললেন, সেই ছোটবেলা থেকে ব্রাহ্মণদের পুষছি, সেটা কি যথেষ্ট প্রায়শ্চিত্ত নয়? শুধু দেশি না, কালো কোট পরা বিলাতি ব্রাহ্মণদেরও উনি সহ্য করতে পারতেন না।
- আর বিদেশিদের?
- ইংরেজদের বেশ ভাল চোখেই তো দেখতেন। অবশ্য যখনি শুনতেন কোন খ্রিস্টান মিশনারি কোন নিন্দনীয় বা লজ্জাজনক কাজ করেছে, ওঁর খুব আমোদ হত তাতে। সঙ্গে একটা খাতা থাকত, উনি সেই নিন্দার কথার খুঁটিনাটি লিখে রাখতেন। সে এক অদ্ভুত সংগ্রহ। আমি মাঝে মাঝেই ভেবেছি সেই খাতাটার কী দশা হ’ল।
- আপনি সেই খাতা কী করে দেখলেন?
- যখনি কোন তর্ক বিতর্ক হ’ত খ্রিস্টধর্ম বনাম হিন্দুধর্মের, কে শ্রেষ্ঠ, উনি সঙ্গে সঙ্গে সেই খাতায় লেখা জোরে জোরে পড়তে আরম্ভ করতেন। হাতে হাতে প্রমাণ করার জন্যে। আমি অবিশ্যি বলতাম যে কোনো দেশেরই ধর্মযাজকদের চরিত্রের ওপর নির্ভর করে ধর্মের বিচার চলে না।
- কেমন ছিল তাঁর এখানকার বসবাস?
- ভীষণ জাঁকজমকপূর্ণ। মহা আড়ম্বর করতেন উনি। তখন ফ্রান্সের রাজা ছিলেন লুই ফিলিপ। রাজা ওঁকে খুবই সমাদর করতেন। উনি একদিন এক সান্ধ্য-সম্মেলনের আয়োজন করলেন, তাতে রাজা লুই ফিলিপ সমেত অনেক পাত্র-মিত্র-অমাত্য সস্ত্রীক নিমন্ত্রিত ছিল। উনি ওঁর ঘরখানা সাজিয়েছিলেন মহামূল্যবান কাশ্মিরি শাল দিয়ে। সেযুগে কাশ্মিরি শাল ছিল ফরাসি মহিলাদের অত্যন্ত আকাঙ্খার বস্তু। তারা তো সারা ঘরের দেওয়ালে কাশ্মিরি শাল দেখে প্রবল ঈর্ষান্বিত। সেই ঈর্ষা পরম আনন্দে পরিণত হল, যখন বিদায় বেলায় তাদের সবার গায়ে উনি চাপিয়ে দিলেন একটা করে কাশ্মিরি শাল, উপহার হিসাবে। ওরা সবাই তো আহ্লাদে আটখানা। ওদের সেই আহ্লাদি মুখ আমার আজও চোখে ভাসে।
- আপনি সত্যিই আমার ঠাকুর্দা দ্বারকানাথ ঠাকুর সম্বন্ধে বহু কিছু জানেন, যা আমি জানতাম না, মিস্টার ম্যাক্সমূলর।
- ওহ, আই হ্যাভ স্মোক্‌ড্‌ মেনি এ হুক্কা উইথ ইওর গ্র্যান্ডফাদার, সত্যেন্দ্র। হি ওয়াজ সাচ এ কালারফুল জেন্ট্‌ল্‌ম্যান, অ্যান্ড আই অ্যাম এভার সো গ্রেটফুল টু হিম। ইট্‌স্‌ এ রিয়েল পিটি, হি হ্যাড টু ডাই ইন এ ল্যান্ড সো ডিস্ট্যান্ট ফ্রম হিজ ঔন ...

অলংকরণঃ স্বাতী বাউরা

ফেসবুক মন্তব্য