হেনরি মিলার ও তাঁর আত্মানুসন্ধান

তুষ্টি ভট্টাচার্য


প্রতিটি সার্থক উপন্যাসই সম্ভবত সত্য ঘটনা। হেনরি মিলার সেই একই পথে চলেছিলেন। তাঁর নিজের জীবন নিয়েই লিখেছেন একের পর এক উপন্যাস। ব্যতিক্রম নন এ ক্ষেত্রে, ব্যতিক্রমী তাঁর উপস্থাপনা। যদি তাঁর ‘ট্রপিক অফ ক্যাপরিকর্ন’ উপন্যাসের কথায় আসি, সাধারণের থেকেও সাধারণ জীবন থেকে উঠে আসা দর্শনের প্রাবল্য টের পাওয়া যায়। উল্টো দিকে যৌনতা ও শারীরিক সুখ ভোগের বর্ণনার প্রাচুর্যও দেখি। দর্শনের সঙ্গে যৌনতার বিরোধ আছে কিনা আমি জানি না, কিন্তু সাদা চোখে এর বৈপরীত্য বড় চোখে লাগে! মনে হয় এই যে খাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, খাটছি বা নিছক আলস্যে গা ভাসাচ্ছি, এর মত দৈনন্দিন কাজের সাথে যৌনতার মিশেল দিলে, চললেও চলতে পারে। কিন্তু পূজা বা প্রার্থনার সাথে একাসনে যৌনতাকে বসানোর মত দুঃসাহস বা বোকামোকে মেনে নেওয়া যায়! আবার যৌনতার সময় খাওয়া, ঘুমনো ইত্যাদি চলে না। অর্থাৎ দর্শনের উচ্চ আসনের পাশে একদম মামুলি যৌনতার খোলামেলা আখ্যান, যাকে পর্ন বললেও অত্যুক্তি হবেনা, বসানো যায়! এও কী সম্ভব!

ট্রপিক অফ ক্যানসারের দিকে যদি তাকানো যায়, “I have found God, but he is insufficient.” মিলারের এই বক্তব্য- ঈশ্বরকে অস্বীকার করা, এমন কিছু বাহাদুরির কাজ না, অনেকেই ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখেন না, অস্বীকার করেন। মিলার আসলেই যৌনতাকে তাঁর ঈশ্বর রূপে পুজো করেছিলেন। ১৯৩৪ সালে পারিসের ওবেলিস্ক প্রেস থেকে ট্রপিক অফ ক্যানসার প্রথম বারের মত প্রকাশিত হয়। কিন্তু অশ্লীলতার দায়ে বইটি অ্যামেরিকান যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৬১ সালে অ্যামেরিকার গ্রুভ প্রেস থেকে এই বইটির আর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এবং এতদিন বাদে ১৯৬৪ সালে অ্যামেরিকান সুপ্রিম কোর্ট এই বইটিকে অশ্লীলতার দায় থেকে মুক্ত করে।

১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের সময়সীমায় এই বইটি লেখেন মিলার। এই সময়ে তিনি লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য লড়াই করে যাচ্ছিলেন। পুরো উপন্যাসটিই তিনি প্রথম পুরুষের বয়ানে লিখেছেন। মিলারের প্রকৃত কার্যস্থল, সহকর্মী, বন্ধু এবং তাঁর ও তাঁদের জীবনের ঘটনাবলী - এদের নিয়েই আত্মজীবনীমূলক থ্রিলার হল ট্রপিক অফ ক্যানসার। এই বন্ধুদের মধ্যে কেউ ভবঘুরে, কেউ পেটের দায়ে চুরি পর্যন্ত করে, কারুর ঘর নেই, কেউ বা সমকামী, কেউ খুল্লমখুল্লা বেলেল্লাপনায় অভ্যস্ত। এদেরই মধ্যে কেউ মিলারকে প্যারিসে মাথা গোঁজার জায়গা দিয়েছে, সমকামীতায় লিপ্ত করেছে, কেউ বা তার শয্যাসঙ্গিনীকে ভাগ করে নিয়েছে মিলারের সাথে। আর মিলার অবাধে যৌন লীলায় মেতে থেকেছেন।



এই উপন্যাসটি লেখার সময়ে মিলার অ্যানেস নিন নামের এক মহিলার সাথে তীব্র ভাবে জড়িয়ে গেছিলেন। একই সাথে তানিয়া নামের আরও এক মহিলা, যার স্বামীর নাম ছিল সিলভেস্টার, তার সাথে যৌনতায় মেতে থাকতেন।
“O Tania, where now is that warm cunt of yours, those fat, heavy garters, those soft, bulging thighs? There is a bone in my prick six inches long. I will ream out every wrinkle in your cunt, Tania, big with seed. I will send you home to your Sylvester with an ache in your belly and your womb turned inside out. Your Sylvester! Yes, he knows how to build a fire, but I know how to inflame a cunt. I shoot hot bolts into you, Tania, I make your ovaries incandescent.” লেখার সময়ে Anais আর Tania-র ‘T’ ও‘s’ জায়গা বদলে দিতেন সুবিধে মত!

ভ্যান নর্ডান নামের তাঁর সবথেকে কুখ্যাত বন্ধু, যে কিনা মহিলাদের বিন্দু মাত্র সম্মান দেওয়ার কথা ভাবতেনই না, বরং মহিলাদের তিনি সম্বোধন করতেন এভাবে - "my Georgia cunt", "fucking cunt", "rich cunt", "married cunts", "Danish cunt", and "foolish cunts"। এই ভবঘুরে বন্ধুটিকে তিনি হোটেলের ঘর ভাড়া করে থাকতে দিয়েছিলেন এবং এর বদলে তিনি রোজ একজন করে নতুন মহিলা সঙ্গিনী পেতেন! এই রকম চরিত্রদের নিয়ে তাঁর যৌনলীলাকে আর যাই হোক সাহিত্য পদবাচ্য বলা খুব মুশকিলের।

এর পরেও একটা ‘তবু’ থেকে যায়। I make your ovaries incandescent – এই লাইনটায় এসে থমকে যেতে হয়। কী তীব্র প্যাশন রয়েছে এই ক’টি শব্দে! এই কি নিছকই ভোগের বাসনা? প্রেম না থাকলে এই তীব্রতা আসে! শরীর বাদ দিয়ে তো প্রেম হয় না। হয়ত প্রেম বাদ দিয়ে শরীর হতে পারে, কিন্তু তাতে কি এই উন্মাদনা আসে? এভাবেই কিন্তু হেনরি মিলার অনেকটা বিতর্ক নিয়ে থেকে যান আমাদের মননে। কিন্তু একদম ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে অস্বীকার করার কোন উপায় থাকে না।

আবার যদি এই লাইনটি নিয়ে ভাবি - “To have her here in bed with me, breathing on me, her hair in my mouth—I count that something of a miracle.” মিলারকে প্রেমিক না ভেবে উপায় নেই। অসম্ভব রোমান্টিক না হলে এভাবে ভাবা যায়! শরীর উপভোগের বাইরেও সঙ্গিনীর চুলের স্পর্শ তাঁর মনে ছাপ ফেলে। একটা যাদুময়তায় জড়িয়ে যান তিনি। আমি কিছুতেই মিলারকে শুধুমাত্র যৌনাচারী বলতে পারি না। আবার এও ঠিক, যৌনতাই তাঁর কাছে ঈশ্বর হয়ে ওঠে। ইশ্বরকে তিনি হয়ত এই কারণেই বলেছেন insufficient ।

ধরা যাক, আপনি একজন মহিলা। আপনি কাউকে ভালোবেসে তার সাথে সঙ্গম করলেন। এবং এই ক্রিয়ার ঠিক পরেই আপনার ভালোবাসার জন আপনাকে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করে দিল। কারণ হিসেবে তিনি আপনাকে বললেন যে আপনার ভালোবাসা তাঁর কাছে শিকলের মত। তিনি যথেচ্ছ স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছেন না। তাই তিনি আপনাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দিলেন। এবার আপনার কী প্রতিক্রিয়া হবে? আপনার সমস্ত আবেগ, ভালোবাসা, আশা ভরসা সেই এক মুহূর্তে নষ্ট হয়ে যাবে। আপনি প্রচন্ড অপমানিত হয়ে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে আপনার ভালোবাসার মানুষটিকে শাপ শাপান্ত করতে করতে ফিরে যাবেন, কিম্বা আপনার যদি বিন্দুমাত্র আত্মসম্মান না থাকে, আপনি আপনার প্রেমিকের কাছে গিয়ে তাঁকে কাকুতি মিনতি করবেন আপনাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পুরোটাই নির্ভর করছে আপনার মানসিক গঠনের ওপর। আপনি যদি পুরুষ হতেন আর আপনার প্রেমিকার থেকে এমন ব্যবহারই পেতেন, আপনার ক্ষেত্রেও এই দুরকম আচরণের একটি আশা করা যেত। কিন্তু মিলার কী বলছেন দেখুন - “And for that one moment of freedom you have to listen to all that love crap... it drive me nuts sometimes... I want to kick them out immediately... I do now and then. But that doesn't keep them away. They like it, in fact. The less you notice them the more they chase after you. There's something perverse about women... they're all masochists at heart.”

অবজ্ঞা, উপেক্ষা, অপমান পেতে নাকি মহিলারা ভালোবাসে! যত বেশি উপেক্ষা করবে তাদের, তত নাকি পুরুষের পেছনে ছুটবে তারা! তাদের হৃদয় অবদমিত হতে চায়! এইরকম মনোবৃত্তির একজন পুরুষের জন্য ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই বুঝি থাকে না। মনে হয় একজন যৌনদাস ছাড়া এই পুরুষের আর কিছুই তকমা জোটা উচিৎ না। এঁর লেখা ছুঁড়ে ফেলে দেওয়াই উচিৎ। অশ্লীলতার যে দায়ে তাঁর উপন্যাস দীর্ঘদিন ব্যান করা হয়েছিল, সেটি সম্ভবত ঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। মহিলাদের ভোগের সামগ্রী ছাড়া ইনি কিছুই ভাবেন নি আসলে। ওই সব রোমান্টিসজমের পুরোটাই লোক দেখানো। এই সব মানুষের পচে গলে রাস্তায় মরে পড়ে থাকাই উচিৎ।

“I need to be alone. I need to ponder my shame and my despair in seclusion; I need the sunshine and the paving stones of the streets without companions, without conversation, face to face with myself, with only the music of my heart for company.” এই কথা গুলি যিনি লিখেছেন, এই লেখকই কী সেই ভোগী মিলার! কী অদ্ভুত এই বৈপরীত্য! কী মায়াময় এই লেখা! বুকের ভেতরটা টনটন করে ওঠে পড়লে। একাকীত্বের কাছে, নৈশব্দের কাছে যেতে চাওয়া এই মানুষটি নিজের লজ্জা ও ক্ষোভের কাছে কতটা অসহায় হলে আত্মপ্রবঞ্চনার মুখোমুখি বসতে চান! মুখ বুজে নিজের সাথে মোকাবিলা করতে চান! হ্যাঁ, ঠিক এইভাবেই তো নিজের ভেতরে টংকারের শব্দ শোনা যায়, একদিন না একদিন তিন তার সুরে বেজে ওঠে একসাথে।

সৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রই কমবেশি মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কেউ স্বীকার করেন, কেউ করেন না। তিনি নিজেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন বলেই নিজের কথা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারেন না। হয়ত ভালোবাসা এলে তিনি বদলে যেতেন! ভালোবাসতে তিনিও পারতেন। একদিন এক জলকন্যা সমুদ্র থেকে উঠে এসে তাঁকে দুহাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিলেন। এই উষ্ণ আলিঙ্গনে ডুবে যেতে যেতে তিনি দেখলেন, হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ চোখ তাঁদের দেখছে, কতগুলো নাক উঁচু হয়ে তাঁদের গন্ধ নিচ্ছে, হাত-পা তাঁদের দিকে আঙুল তুলছে, কতগুলো জানলা আচমকা খুলে গেল, হাওয়ায় টাকা উড়তে থাকল, সমুদ্রে ভেসে গেল কত দীর্ঘনিঃশ্বাস! সেই জলকন্যা তাঁর পাশে বসে অবিরাম, অবিশ্রান্তভাবে কত যে কথা বলে চলল! কত আনন্দ, প্রেম, চোখের জল খেলা করতে লাগল সেই কথায়! কিন্তু তিনি তাঁর একটিও শুনলেন না, তিনি শুধু চেয়ে থাকলেন তাঁর প্রিয়তমার মুখের দিকে। তিনি বুঝলেন যে তিনি এই সুন্দরীকে ভালোবাসেন। এই মুহূর্তে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। আর এই আনন্দে তিনি মরে যেতে চান এখুনি।

ট্রপিক অফ ক্যাপরিকর্ন ১৯৩৯ সালে প্যারিসে প্রকাশিত হয়। এটিও একটি আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস, যাকে ট্রপিক অফ ক্যানসারের দ্বিতীয় পর্বও বলা যেতে পারে। এই বইটিকেও অ্যামেরিকার কোর্ট অশ্লীলতার দায়ে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত ব্যান করে রাখে। এই উপন্যাসের নায়কের নাম হেনরি ভি মিলার যিনি অ্যামেরিকার একটি টেলিগ্রাফ কোম্পানিতে কাজ করতেন। মিলার নিজে ১৯২০ সালে অ্যামেরিকার ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন টেলিগ্রাফ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। এবং উপন্যাসটিও সেই সময়কার জীবন এবং জীবনযুদ্ধের কাহিনী। তাঁর প্রথম স্ত্রীর বিয়েত্রিচের সাথে প্রেম ও বিয়ের সময়কালও এটা। এই সময়েই তাঁর লেখকসত্ত্বার উন্মেষ ও বিস্তার ঘটে। এই একই সময়ে ট্রপিক অফ ক্যানসার লেখা হয়েছিল।

“I found that what I had desired all my life was not to live - if what others are doing is called living - but to express myself.” প্রকৃত অর্থেই মিলার নিজেকে এখানে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি শুধুমাত্র বাঁচার জন্যই বাঁচতে চান নি। তিনি চেয়েছেন নিজেকে প্রকাশ করতে, আর তা পেরেছেনও নিজের মত করে। তাঁর যন্ত্রণা, তাঁর জীবন যুদ্ধ, তাঁর স্বপ্ন, তাঁর প্রেম ও যৌনতাকে উদোম করে প্রকাশ করেছেন। তিনি তো কোনদিন কখনই হতাশায় ভোগেন নি, তাই তাঁর উদ্দাম জীবন আমাদের কাছে বিস্ময়। তিনি সবসময়ে নিজেকে বদলাতে চেয়েছেন। কখনও চেয়েছেন জলচর হতে, কখনও হতে চেয়েছেন উভচর, আবার কখনও ধ্বংস করতে চেয়েছেন নিষ্ঠুর ভাবে। তাঁর প্রতিটি চাওয়াই এত প্যাসনেট, যে আমাদের অবাক হয়ে চুপ করে দেখে যাওয়া ছাড়া বুঝি আর কোন উপায় নেই। এই পৃথিবীর পেট চিরে ঢুকে গিয়ে এক গরসে তার নাড়িভুঁড়ি গিলে নিতে পারলেই যেন তাঁর শান্তি হত। অথবা সমুদ্রের একদম নীচে যে জাহাজটি ডুবে আছে বহুযুগ ধরে, সেই জাহাজের কেবিনে মোমের আলোয় নিজের মনের মত কোন বইয়ে ডুবে যেতে চেয়েছেন। তিনি এমন এক দিব্যদৃষ্টি চেয়েছেন যেন সেই দৃষ্টি দিয়ে তিনি নিজেকে স্বচ্ছ ভাবে দেখতে পান, নিজের শরীরকে, নিজের ইচ্ছেগুলোকে চিনতে পারেন। আর হাজার হাজার বছর ধরে তিনি শুধু একা থাকতে চান যাতে এই দিব্যদৃষ্টি দিয়ে তিনি যা দেখলেন, যা অনুভব করলেন, তার পুরোটাই যেন আত্মীভূত করতে পারেন। এবং তার পরেই সেই আত্মীকরণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে চান, ভুলে যেতে পারেন সব।

এই উপন্যাস লেখার সময়ে মিলার বিবাহিত। এক শিশু সন্তানের পিতা। এ সময়ে তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়ায় গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নেন। যেদিন মিলারের স্ত্রী ক্লিনিকে যান, সেদিন সেই সময়ে মিলার তাঁর সন্তানের আয়া, ভালেস্কা নামের এক মহিলার সাথে যৌনতায় মাতেন। এই ভালেস্কা তাঁর সহকর্মীও বটে। আর তাঁদের মিলনক্ষেত্রটি ছিল মিলারের শিশুপুত্রের খেলাঘর! অথচ স্বামী হিসেবে তাঁর তখন স্ত্রীর পাশে থাকার কথা। কী অসম্ভব সুযোগসন্ধানী ও প্রতারক এক স্বামীর ভূমিকায় অভিনয় করে গেলেন তিনি! এছাড়াও মিলার অনেক অনেক রাত কাটিয়েছেন তাঁর এক যৌনক্ষুধার্ত বন্ধু, ম্যাকগ্রেগরের সাথে। সমকামে যেমন তাঁর অনীহা ছিল না, তেমনই নাবালকের সাথে যৌন সম্পর্ক পাতাতেও না। হারলেম থেকে আসা ১৭বছরের কার্লির থেকে বিস্তর মজা লুটেছেন তিনি। এই কার্লি আবার চুরি, ছিঁচকেমিতে সিদ্ধহস্ত ছিল! এমন রুচির, এমন পারভার্ট একজন মানুষ ঠিক এই সময়েই আবার নিজেকে খুঁজছেন, নিজের ভেতরে হারিয়ে যেতে চাইছেন, নৈঃশব্দের কাছে আশ্রয় নিচ্ছেন আবার কখনও বা স্বপ্নগুলোকে মুঠোবন্দী করে রেখে দিচ্ছেন দিব্যদৃষ্টির সীমায়।

এই উপন্যাসেই তিনি তাঁর ছেলেবেলার কথা লিখেছেন। তাঁর স্মৃতিতে ছিল তাঁর গোপন পাপ। অনেক বছর আগের এক গ্রীষ্মের বিকেলে খেলতে খেলতে তিনি এক ছোট্ট ছেলেকে পাথর দিয়ে খুন করেছিলেন। সেই সময়ে সেই ছেলেটির তুতো ভাইও উপস্থিত ছিল। এই খুনের ঘটনায় মিলারকে কেউ সন্দেহ করে নি, এমন কী বড় বয়সে সেই তুতো ভাইও সেদিনের সেই খুনের ঘটনার কিছু মনে করতে পারে নি। অথচ মিলারের মনে আছে স্পষ্ট। এই ঘটনা থেকে তিনি শিশু মনের স্বচ্ছতা সম্বন্ধে লিখেছেন। একটি শিশু তার পরিবেশে যা কিছু দেখে, তার থেকেই শিক্ষা নেয়। সত্য দেখলে সত্য শেখে, মিথ্যে দেখলে মিথ্যে। আবার এই মিলারের মত যারা, খেলতে খেলতে খুন করে ফেলল, অথচ খুনের মানে বুঝলো না, মৃত্যুর পরে যে সেই খুনের শিকারটি আর থাকবে না, খুনের মুহূর্তে তার সে কথা মাথায় এলো না। আবার এই ঘটনা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখে দিল অনেক গুলো বছর। সেই সময়ে সাক্ষী আর একটি শিশু কিন্তু সম্পূর্ণ ভুলে গেছে খুন বা খুনীকে! শিশু মনের সরলতার আড়ালেও যে কত জটিলতা লুকিয়ে থাকে, এই ঘটনাটি তার উদাহরণ। এই আত্মনুসন্ধানের পথে তিনি এবার সেই ছোটবেলা থেকে লাফ দিয়ে চলে এসেছেন তাঁর কুড়ি বছরের বয়সের ঘরে। যে ঘরে তিনি খুঁজে পেয়েছেন রয় হ্যামিল্টন নামের একটি উজ্জ্বল ছেলেকে। সে ছেলেটি তার বায়োলজিকাল বাবাকে খুঁজছিল। আর এই খোঁজের মানে ছিল খড়ের গাদায় ছুঁচ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা! এক সমুদ্রের মাঝখানে পাথর খোঁজার চেষ্টা! তবু এই রয়ের জেদ, সঙ্কল্প দেখে মিলার প্রচন্ড ভাবে প্রভাবিত হন। পাশাপাশি তাঁর মাতাল বাবাকে মিলিয়ে নিতেন মনে মনে। অল্প সময়ের জন্য হলেও রয়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গভীর হয়েছিল।

এরপরে আবার মিলারের আত্মানুসন্ধানের প্রয়াস দেখা যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর যৌনলীলার বর্ণনাও। এই সময়ে মিলার তাঁর সঙ্গিনীদের নামের একটি তালিকা তৈরি করে ফেলেন! ‘simpleton’ বলে যাকে ডাকতেন তিনি মিলারের সহকর্মী ছিলেন। ‘talking cunt’ উপাধি দিয়েছিলেন ভেরোনিকা নামের মেয়েটিকে। ‘laughing cunt’ শিরোপা দিয়েছিলেন ইভেলিনকে! শেষ পর্যন্ত তাঁর তালিকায় এক ডজন পাতায় নামহীন মেয়েদের বর্ণনা ছিল। এর মধ্যে এক মহিলার সাথে তাঁর দুরন্ত যৌন সম্পর্ক ছিল। সেই মহিলা সব সময়ে কালো পোশাকে আসতেন এবং কখনই অন্তর্বাস পরতেন না। এই মহিলার সঙ্গে তিনি সেই ভোরবেলা বিছানায় যেতেন এবং তাঁদের রতিক্রিয়া শেষ হত সন্ধ্যেবেলায়! এই একটানা ক্রিয়ার বর্ণনা ও আরও বিভিন্ন নারীর সঙ্গে যৌনকলাপ লিখেছিলেন তিনি বিস্তারিত ভাবে। যাকে পর্নো বলে ভাবলে কখনই ভুল ভাবা হবে না। আবার এই সময়েই তাঁর লেখালেখির জীবনে দুজন লেখক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিয়েছেন। Dostoevsky এবং Henri Bergson তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিলেন।

এরপর এই উপন্যাসে তিনি আবার ফিরে গেছেন ছোটবেলায়। এখানে তিনি তাঁর পিয়ানো টিচারের কথা লিখেছেন। যে পিয়ানো টিচারের কাছে তিনি তাঁর ‘কৌমার্য’ হারিয়েছিলেন। জীবনের সেই প্রথম অভিজ্ঞতাকে তিনি খুব যত্নে এঁকেছেন এবং পরবর্তী জীবনে মেয়েদের আকর্ষণ করার অস্ত্র হিসেবে এই পিয়ানো বাজানোর শিক্ষায় তিনি সফল হয়েছেন। এর বাইরে বা বলা ভাল এর ওপরে তিনি যা পেয়েছেন এই পিয়ানো শিক্ষায়, তা হল খাঁটি সুরের সন্ধান। এক একটি সঙ্গীত তাঁকে যেন নিয়ে গেছে বসন্তের দেশে, তাঁর জীবনে এই সুর এনে দিয়েছে সৃষ্টির সন্ধান। এক সময়ে তিনি লিখেছেন, এক থিয়েটার হলে দাঁড়িয়ে তিনি যখন দেখলেন, পর্দা উঠল আর শো শুরু হল, তাঁর মনে হল এই সুরও যেন তাঁর জীবনে সৃষ্টির পথে যাত্রা শুরুর একটা কার্টেন রেজার! তিনি তাঁর লেখালেখির মধ্যে এক নতুন জগত খুঁজে পেলেন এবং সেই লেখার মাধ্যমেই এক উচ্চ আধ্যাত্মিক জগতে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখেছিলেন এই জগতে প্রতিটি মানুষকেই ভুল বোঝা হচ্ছে বা ভুল বোঝার সম্ভাবনা রয়ে যাচ্ছে আপাত দৃষ্টিতে। তাই প্রতিটি মানুষকেই নিজস্বতা খুঁজে নিতে হবে। নিজেকে খুঁজে নিতে হবে। এই নিজের মধ্যে পেয়ে যাবে সে পূর্ণতাকে। এ যেন সেই সো অহম- নিজেকে জানো! আপনাকে জানা কি শেষ হয় কখনও? এরপর বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে মিলার বলেছেন, চিন্তা এবং কাজ এক। অর্থাৎ মন থেকে যে ভাবনা উঠে এলো, তা যদি প্রয়োগ করা না যায়, সেই ভাবনা অর্থহীন। অর্থাৎ কাজই তোমার পরিচয়। শরীর দিয়ে বাস্তব জগতে তোমার চিন্তার সূত্রগুলো না খাটালে সেই চিন্তার কোন মূল্যই নেই। চিন্তা এবং কাজ এক তখনই হবে, যখন দুইয়ের মিলিত শক্তি এক হয়ে কার্য ঘটাবে। এভাবেই তিনি নিজেকে অনুসন্ধান করে গেছেন এই উপন্যাসে শেষ পর্যন্ত।

এই দুটি বই ছাড়াও তিনি লিখেছেন অনেক উপন্যাস। তাদের মধ্যে বিতর্কিতও হয়েছে কিছু। সেই একই অশ্লীলতার দায়ে। ‘সেক্সাস’, ‘ব্ল্যাক প্রিন্স’, ‘নেক্সাস’, ‘প্লেক্সাস’, ‘বিগ সুর অ্যান্ড দ্য অরেঞ্জেস অফ হিয়েরো’, ‘দ্য কলোসাস অফ মারাওউসি’, ‘দ্য এয়ার কন্ডিশনড নাইট’, ‘দ্য বুকস ইন মাই লাইফ’, ‘স্ট্যান্ডস স্টিল লাইক দ্য হামিং বার্ড’, ‘দ্য টাইমস অফ অ্যাসাসিনস’, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অফ সেক্স’, ‘দ্য কসমোলজিকাল আইস’, ‘দ্য উইসডোম অফ হার্ট’ এবং আরও আরও অনেক বই। এই লেখার বাইরে তিনি জলরঙে প্রচুর ছবি এঁকেছেন এবং এই ছবি বিষয়ে বইও লিখে গেছেন। অন্তত ২০০০ ছবি তিনি এঁকেছেন, যার মধ্যে ৫০টির অস্তিত্ব এখনও আছে। তিনি চারবার নিজে রবার্ট স্নাইডারের ডকুমেন্টারি ফিল্মের বিষয় হয়েছেন। The Henry Miller Odyssey (90 minutes), Henry Miller: Reflections On Writing (47 minutes), and Henry Miller Reads and Muses (60 minutes) – এই তিনটে তথ্য চিত্রের পরে আরও একটি তথ্য চিত্র রবার্ট স্নাইডারের মৃত্যুর পরে রিলিজ করে ২০০৪ সালে। এই ডকুতে হেনরি মিলারের জলরঙের কাজ সম্বন্ধে আলোকপাত করেছিলেন পরিচালক।

১৯৮১ সালে মিলারের ‘রিফ্লেকশনস’ নামের বইটি প্রকাশিত হয়। টুইংকা থিবো লিখিত মুখবন্ধটি থেকে আমরা জানতে পারি যে তিনি মিলারের জীবনের একেবারে অন্তিম পর্বে তার সঙ্গে চার চারটি বছর কাটান একই ছাদের নিচে, তার ভাষায়, মিলারের পাচক ও দেখভালকারী হিসাবে। এই চার বছর মিলারকে খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয় তার। তিনি আবিষ্কার করেন মিলার অসাধারণ বাকপটু, সুরসিক ও চৌকস একজন মানুষ, জীবন ও জগৎকে দেখার একেবারে নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে যার। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মিলারের কাছে আসতেন তাঁর বন্ধুরা। মিলার তখন তাদের সঙ্গে যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতেন সেগুলো তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে শুনতেন এবং পরে তা যথাসম্ভব মিলারীয় ভাষা ও ভঙ্গিতে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন। মিলার সেগুলো পড়ে খুবই খুশি হন এবং থিবোকে বলেন যে এটি তার জন্য অনেক বড় এক প্রাপ্তি। লেখাগুলো তিনি কিছুটা ঘষামাজা করে দেন তার স্বভাবসুলভ স্টাইলে। সেই লেখাগুলোকে একত্রিত করেই থিবো তার মৃত্যুর পরের বছর রিফ্লেকশনস নামে প্রকাশ করেন যেখানে তিনি লেখকের নাম হিসাবে মিলারের নামই ব্যবহার করেন এবং নিজেকে এর সম্পাদক হিসাবে উপস্থাপিত করেন। বইটির সুলিখিত ভূমিকায় তিনি মিলারকে তার শিক্ষক, গুরু, পালকপিতা ও বন্ধু বলে সম্বোধন করেন। এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত মোট রচনার সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশটির মত। এর মধ্যে একদিকে যেমন তার ব্যক্তিজীবনের অকপট উচ্চারণ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিভিন্ন লেখক শিল্পী সম্পর্কে খোলামেলা মূল্যায়ন এবং ভালোবাসা, মৃত্যু, যৌনতা ইত্যাদি বহুবিচিত্র বিষয়ে তাঁর সাহসী কথামালা।

মিলার এই বইয়ে বলেছিলেন – ‘ন্যুয়র্কে আমি একবার মনোবিশ্লেষক সেজেছিলাম। পারী থেকে আমি ও আনেই কয়েকমাসের জন্য সেবার ন্যুয়র্ক এসেছিলাম। আমার সঙ্গে তখন এক ইহুদি ডাক্তারের পরিচয় হয় যিনি আমাকে খুব পছন্দ করে ফেলেন। তিনি আমাকে বলেন যে আমার মনোবিশ্লেষক হিসাবে কাজ করা উচিৎ এবং তাহলে তিনি আমার কাছে রোগী পাঠাবেন। তার এক দল বিত্তবান রোগী ছিল। আমি তাই ভাবলাম কেন নয়? আমি সেইদিন থেকে ডাঃ মিলার নামে দুমাসের জন্য মনোবিশ্লেষক-জীবন শুরু করি। বিশেষ কোন পদ্ধতি অবলম্বন করি নি আমি, লোকেরা যখন হালকা হবার জন্য আমার সামনে নিজেদের মেলে ধরছিল আমি তখন তাদের কথা মন দিয়ে শুনছিলাম। মূল ব্যাপারটা হলো আপনার দুটো সুস্থ ও সক্রিয় কান রয়েছে কি না, এর চেয়ে বেশি কিছুর দরকার পড়ে না একজন সফল মনোবিশ্লেষক হবার জন্য।

অধিকাংশ সময়ই আমি ক্লান্ত হচ্ছিলাম। আমি ঘুমে ঢলে পড়তাম প্রায়শই, তাই রোগীদের বলতাম ‘‘ঠিক আছে আপনি এখন একটু জিরিয়ে নিন। ছোট্ট একটা ঘুম দিয়ে উঠুন।’’ এই বলে আমরা দুজনেই ঘুমিয়ে পড়তাম। ঘুমটা আসলে ছিল আমার নিজের জন্য, কিন্তু রোগীরাও দেখতাম সেটা খুব ভালোবাসতো। লোকে যখন মনোবিশ্লেষণ বিষয়ে আমার অনুভূতি জানতে চায় তখন আমাকে বলতেই হয় যে আমি তাতে বিশ্বাস করি না। তবে আপনি যদি আমার পরামর্শ চান তাহলে বলি, শান্ত হোন। দুশ্চিন্তা করবেন না বেশি, সমস্যা নিয়ে খুব বেশি ভাববেন না। নিজের মন ও হৃদয়ের ব্যাপারে আপনিই আপনার সবচেয়ে বড় ডাক্তার। কিন্তু এটা যদি হয় ভাঙা হাড়ের ব্যাপার তবে তা আলাদা’।

অটো র্যাঙ্ক, সিগমুন্ড ফ্র্যেড, কার্ল গুস্তাভ উয়ুং-এর সঙ্গে পরিচয় করে মিলার যা বলেছিলেন, থিবো মিলারের হয়ে লিখেছেন –
‘ড. অটো র্যাঙ্ক-এর সঙ্গে আমার পরিচয় হয় আনেই নিনের মাধ্যমে যখন সে তাঁর সঙ্গে কাজ করছিল ন্যুয়র্কে। আনেই-এর ওপর তাঁর গভীর প্রভাব পড়েছিল, তাই সে আমাদের সাক্ষাতের ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিল যাতে করে আমার ওপরেও তাঁর একইরকম প্রভাব পড়ে। আমি ধরাধামের যাবতীয় বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রায় ঘন্টাখানেক কথা বলি। তিনি একজন আকর্ষণীয় মানুষ ছিলেন, গভীর ধীশক্তির অধিকারী, কিন্তু ভয়ঙ্কর রকম নিঃসঙ্গ। তাঁর ছিল অবিশ্বাস্য প্রাণশক্তি। তিনি তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে পারতেন, খুব সাধারণ কাজের মধ্যেও খুঁজে পেতেন গভীরতম অর্থ। আপনি যদি একটি ফুলদানির পাশে একখানা লবনদানি রাখেন তাহলে তিনি সেটাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করবেন যেন তা ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেবে। তিনি ছিলেন একজন দুর্দান্ত ভাবুক, কিন্তু সবকিছুর পরেও আমি বলি এতে কী লাভ? এইভাবে মনকে ব্যবহার করে কী উদ্দেশ্য হাসিল হবে?

আমার বয়স তখন আঠারো হবে যখন আমি প্রথমবারের মত সিগমুন্ড ফ্রয়েড এর নাম শুনি! ন্যুয়র্কের থিওসফিকাল সোসাইটিতে এক ব্যক্তি তাঁর সম্পর্কে বক্তৃতা দেন যেটা ছিল আমার কাছে ছায়াপথ আবিষ্কারের মত। তাঁর লেখা আমার মধ্যে তেমন আবেদন তৈরি করেনি, কেন না সেটা ছিল খুবই বিদ্যায়তনিক, তবে আমি অনেক বন্ধুর সঙ্গে তাঁর বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমরা সবাই তাঁর বই স্বপ্নের ব্যাখ্যা দ্বারা গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছি। পরে অবদমিত যৌনতা বিষয়ে তাঁর তত্ত্বসমূহ আমাদের কাছে কৌতুকের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, যদিও শুরুতে তাঁর চিন্তাগুলো ছিল বিপ্লবাত্মক, প্রায় মহাপ্লাবনিক।

কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং ছিলেন এদের মধ্যে সবচাইতে জবরদস্ত মনোঃসমীক্ষক। তিনি স্রেফ একজন মনোচিকিৎসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন কবি, রাহসিক, দ্রষ্টা। তিনিই ছিলেন এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আধ্যাত্মবোধসম্পন্ন এবং এই বিষয়ে সবচেয়ে ভালো লেখক। তাঁর লেখাগুলো তাত্ত্বিক নয় বরং অনেক বেশি অনুপ্রেরণাদায়ী।

মানুষের মনোজগতে এত বেশি চালক আর এত রহস্য রয়েছে যে একটিমাত্র চাবি দিয়ে তার সবকটার তালা খোলা অসম্ভব। সৃষ্টির আদি থেকেই মানবমনের রহস্য নিয়ে জগতের শ্রেষ্ঠ ভাবুকেরা চিন্তিত হয়েছেন এবং পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। এমন অযুত সম্ভাবনা বিশিষ্ট একটি বিষয়ে কোন বিশেষজ্ঞ থাকতে পারেন না, থাকতে পারেন কেবল পথিকৃৎ’।

মিলার তাঁর জীবনে বহু মানুষের সমালোচনার মুখে পড়েন। তাঁর বহুচর্চিত যৌনজীবনের বিস্তারিত বিবরণ এর কারণ। সেই সময়ের বিখ্যাত অ্যামেরিকান নারীবাদী সমালোচক কেট মিলেট তাঁকে তাঁর ‘সেক্সুয়াল পলিটিক্স’ বইয়ে তীব্র নিন্দা করেন। মিলারের ‘সেক্সাস’ বইটির যথেচ্ছ যৌনাচারের বিস্তৃত বর্ণনার জন্য মিলেট মিলারকে কাটাছেঁড়া করেন। মিলেট এখানে বলতে চেয়েছেন, যে ভাষাতে মিলার বিবরণ দিয়েছেন তা আসলে যে কোন মেয়েদের পক্ষে অপমানের। এক্ষেত্রে মিলার আসলে পুরুষতান্ত্রিক শাসক মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। মেয়েদের তিনি নিছক খেলনা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ছলে বলে কৌশলে মেয়েদের বিছানায় নিয়ে আসাই মিলারের একমাত্র লক্ষ্য। এবং তাদের ভোগের পর ছুঁড়ে ফেলে দিতে তিনি সময় নেন নি। শুধুমাত্র ছুঁড়ে ফেলাই নয়, তাদের সম্বন্ধে কটু বাক্য ও হীন যুক্তি সাজাতেও তাঁর জুড়ি মেলা ভার। মিলার প্রকৃতপক্ষে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রতিভূ এবং মেয়েদের তাঁকে নিন্দা করার কোন প্ল্যাটফর্ম না থাকায় তারা শোষিত হচ্ছে। মেয়েরা তাদের নিজস্বতাকে মেলে ধরার কোন সুযোগ পাচ্ছে না, তারা শুধু এক একজন একেকটি চরিত্র বা সাবজেক্ট হয়ে যাচ্ছে। যেমন ভাবে মিলার একেকটি মেয়েকে তাদের যৌনাঙ্গের ধরন অনুযায়ী নাম দিয়েছেন, তা শুধুমাত্র নিন্দার না, মিলারকে এ জন্য কঠিন শাস্তি দেওয়া উচিত বলেই মিলেট লিখেছেন। প্রতিটি নারীর উচিত মিলারের মত এক বদ চরিত্রকে বয়কট করা।

মিলেট প্রথমে আদর্শগত ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন মানুষের রকমফেরের। মানুষকে দুভাগে ভাগ করলে, এক ভাগ পুরুষ ও আর এক ভাগ নারী- এই দুই বিভাগের কথাই উল্লেখ করেছেন মিলেট। আমার মনে হয়, সেই সময়ে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি বা অস্তিত্বকে মানা হত না বলেই বোধহয় এই দুটি ভাগের কথা বলেছেন মিলেট। এরপরে তিনি বলছেন, এই সমাজে এই নিয়মটাকেই স্বাভাবিক বলে ধরা হয় যে, পুরুষ অর্থাৎ অধিকার, ক্ষমতা, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা, এই সব গুণ থাকবে তাদের মধ্যে। নারী অর্থাৎ নির্ভরশীলতা, অজ্ঞতা, অপারদর্শিতা, মিথ্যাচার এমন সব গুণের অধিকারী। পুরুষ স্বাভাবিক ভাবেই তাই নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে সমাজের মাথায় চড়ে বসে নিজের একনায়কতন্ত্রের ধ্বজা ওড়াবে আর নারী মুখ বুজে ঘরকন্নার কাজ করবে, ছেলেমেয়ে মানুষ করবে। মিলারের যৌনাচার ও তার বিস্তারিত বর্ণনায় এই ধরণের সব লক্ষণই দেখা গেছে আর তাই এই রকম রাজনীতিকে তিনি বরদাস্ত করতে পারেন নি।

কেট মিলেটের ‘সেক্সুয়াল পলিটিক্স’ বইটি প্রথম প্রকাশের (১৯৭০) এক মাসের মধ্যেই বাইশ হাজার কপি নিঃশেষিত হয়ে যায়। এর থেকেই বোঝা যায়, তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সেই সময়ের সমাজের বেশির ভাগ মানুষ একাত্ম হয়েছিলেন। ব্যক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়, এই ধরনের একজন কঠোর সমালোচকের আজকের দিনেও খুব দরকার। এখনও এই সময়েও মিলারের মত মানুষের অভাব নেই। তারা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাহিত্য বা শিল্পক্ষেত্রে। শিল্পের সাথে প্যাশন অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত, এ কথা আমি মানি। মেনে নিয়েও বলতে চাই, প্যাশনের মানে শুধুমাত্র ভোগ নয়। যৌনতা তখনই সমর্থন যোগ্য, যখন তা হবে দুই পক্ষের আনন্দ ও সম ইচ্ছা থেকে উঠে আসা একটি আচার। এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ছোট চোখে দেখবে বা নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করবে – এই রকম নীতি থেকে দূরে থাকাই একজন সুস্থ মানুষের কর্তব্য।

মিলারের অসম্ভব প্রতিভাকে সেলাম জানাতেই হচ্ছে এরপরও। এটাও বাস্তব সত্য, একজন মানুষের মহান কীর্তির কাছে তার দূরাচার অনেকটাই চাপা পড়ে যায়। যেহেতু সাদায় কালোয় একজন মানুষ, তার সাদা দেখার চোখই আমাদের মনে থেকে যায়। সবার ওপরে এটাও দেখার, মিলার কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও আত্মানুসন্ধানের রাস্তাটি ভোলেন নি। তিনি হতে চেয়েছেন এক মহাশূন্য, এক অতীব দূরের, অখন্ড নিস্তব্ধতার মানুষ। তাই আর যাই হোক মিলারকে অস্বীকার করার কোন উপায় আমার নেই।

(ছবিগুলি আন্তর্জাল থেকে সংগৃহীত)

ফেসবুক মন্তব্য