বাংলা সিরিয়ালের পাকা মেয়েরা

অনিরুদ্ধ সেন


আমরা প্রথম ‘বোকা বাক্স’টি কিনেছিলাম একটু দেরিতেই। আর তখন থেকেই ভেবেছিলাম, যাই হোক অন্তত সিরিয়ালের চক্করে জড়াব না। ধীরে ধীরে যখন অবসরের সময় ঘনিয়ে এল আর পুরনো লেখার রোগটাও আবার একটু চাগাড় দিল, দেখলাম বাংলা সিরিয়াল-টিরিয়ালও দিব্বি গিলছি। এর সপক্ষে অবশ্য একটা যুক্তি আবিস্কার করেছি – প্রবাসে (থুড়ি, বহির্বঙ্গে) বসে সিরিয়াল না দেখলে আপ-টু-ডেট বাংলা ‘লিঙ্গো’ জানব কী করে? আর তা না জানলে সময়োপযোগী লেখা লিখব কী করে?
তবে এই সিরিয়াল-পর্যটন থেকে ভাষাজ্ঞান হোক বা না হোক কিছু বেম্মোজ্ঞান আমার নিশ্চিত হয়েছে, যা শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই এই কলমবাজি। বাংলা চ্যানেল অজস্র। বহির্বঙ্গে বসে নাই-নাই করেও যে ক’টা পাই, তাদের হিসেব রাখাও সহজ নয়। স্বভাবতই সিরিয়ালের ধরণের ভালোমন্দ হেরফের হয়। এই আলোচনা তার মধ্যে মূলধারা বা ‘মেইনস্ট্রীম’ সিরিয়ালগুলির কিছু ইষ্টধম্মো আবিস্কারের চেষ্টা করবে। সৌভাগ্যবশত, সেগুলো এতই ‘কমন’ যে এক খাঁচায় অনেক চিড়িয়াই ঢুকে যাবে।
প্রথমে আসি সিরিয়ালের গড়ন বা ‘স্ট্রাকচার’ প্রসঙ্গে। ম্যারাথন প্রভৃতি রোড রেসে দেখেছেন নিশ্চয়ই প্রতিযোগীরা এক দীর্ঘ পথ সোজা দৌড়ে এসে স্টেডিয়ামে ঢুকে এক বা একাধিক পাক খেয়ে তাদের যাত্রা শেষ করে। অধিকাংশ বাংলা সিরিয়ালও এই পদ্ধতি অনুসরণ করে। শুধু প্রথম দৌড়টি এক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত আর তারপর পাক খাওয়াটা প্রায় চিরন্তন। প্রথম টানা দৌড়ের সময় ঘটনার সুতো দ্রুত ছাড়তে থাকে, নিত্য নতুন কিছু ঘটে। এই অংশে সিরিয়ালগুলি সাধারণত উপভোগ্য হয়। তাই আমি কিছু নির্বাচিত সিরিয়াল শুরু হওয়ার পর কিছুদিন দেখার চেষ্টা করি। তারপর ঘটনা ও চরিত্রগুলি থিতু হয়, গল্পও শেষ করে দিলেই হয়। কিন্তু সবাই তো আর ঋতুপর্ণ ঘোষ নন যে গপ্পো ফুরোলেই সিরিয়াল ফুরুৎ। ‘বেওসা’ বলে একটা বেপার আছে না! তাই এরপর সিরিয়াল একটা বৃত্তে ঘুরতে থাকবে। এবার প্রতি মুহূর্তে রুদ্ধশ্বাস রহস্য – কখন যাত্রা শেষ হবে? যেমন পাক খাওয়া গুবরে পোকার দিকে সসম্ভ্রমে তাকিয়ে আমরা অপেক্ষা করি, কখন ব্যাটা দম হারিয়ে নিশ্চল হয়ে পড়ে আমাদের একটু স্বস্তি দেবে।
কিন্তু সিরিয়ালে স্বস্তি চট করে হওয়ার জো নেই। যখনই এই অনন্ত ঘূর্ণি শেষ হওয়ার সব উপাদান বিদ্যমান অর্থাৎ সব ‘কনফ্লিক্ট’ই ‘রিজলভড’ হওয়ার নিশ্চিত লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তখন আবার প্রযোজকের যাদুকলে নতুন দম, গুবরে পোকার আবার ঘূর্ণন। এই ঘূর্ণন পর্যায়ের একটা উপযুক্ত মুহূর্তে সাধারণত আমি সিরিয়ালটির মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে আসি।

এবার আসি চরিত্রে। প্রায় অবধারিত ভাবেই আজকাল প্রত্যেক সিরিয়ালের মুখ্য চরিত্র বা ‘প্রোটাগনিস্ট’ হচ্ছে একটি পাকা মেয়ে। আজকাল বোধহয় এটাই খুব ‘খাচ্ছে’। এই পাকা মেয়েটি প্রতিবাদী। সমস্ত কাণ্ডজ্ঞান ও কৌশলের বিপরীতে হেঁটে সে রঘু ডাকাতি ভঙ্গীতে অমিত শক্তিধর ভিলেনদের মুখের ওপর ছুঁড়ে দেয় কবে তাদের কীভাবে টাইট দেবে তার বিস্তারিত শিডিউল। স্বভাবতই এর ফলে পাকা মেয়ে বার বার ফ্যাস্তাকলে পড়ে, বিপদের জালে জড়ায়। কিন্তু শেষ অবধি সে জাল কেটে বেরিয়ে আসে – পরমুহূর্তে আবার জালে পড়ার জন্যই। তারপর আবার জাল, আবার কাটান – এভাবে চলতে থাকে ঐ অন্তহীন ঘূর্ণন। প্রায়শঃই এই পাকা মেয়ের কর্মভূমি হচ্ছে শ্বশুরবাড়ি, যেখানে সে মোটামুটি ভিলেন পরিবৃত। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদও অবশ্য কেউ কেউ থাকবেন।
আমরা যখন প্রথম টিভি কিনি, আমার মেয়ে খুব ছোটো। কোনও চরিত্রের প্রবেশ হলেই সে উত্তেজিতভাবে বলত, “বাবা, এ ভালো লোক, না দুষ্টু লোক?” আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতাম, “কে জানে! পেছন ফিরুক, দেখে নিস কী লেখা আছে।” তা, বাংলা সিরিয়ালের চরিত্রদের পেছনে কিছু লেখা না থাকলেও কোনও অসুবিধে হয় না। ভিলেনরা চোখ ঘুরিয়ে, গোঁফে তা দিয়ে, বাঁকা হেসে, অঙ্গভঙ্গী করে ও তারস্বরে স্বগতোক্তি করে গোলা পাবলিকের কাছেও স্পষ্ট করে দেয় তাদের স্বরূপ।
আধুনিকতার ধাক্কায় যৌথ পরিবার আজ বিপন্ন প্রজাতি। তারা হয়তো উত্তর কলকাতার কিছু পকেটে ও মেগা সিরিয়ালেই বেঁচে আছে। যৌথ পরিবার কেন্দ্রিক সিরিয়ালের অনেক সুবিধে। একটা বলতে পারি, কোনও ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত সকলের ক্লোজ-আপ দু-তিনবার দেখালেই অ্যাড থেকে অ্যাডান্তরে চলে যাওয়া যায়। পাকা মেয়েকে সাধারণত এমন এক শ্বশুরবাড়িতেই দেখতে পাবেন।
বাংলা সিরিয়ালে ‘নারীশক্তি’র এহেন উত্থান দেখে যদি কেউ চমৎকৃত হয়ে থাকেন তো বলা দরকার: (১) এই পাকা মেয়েরা প্রতিবাদের সাথে সাথে রন্ধন প্রভৃতি সমস্ত রকম গৃহকর্মেও বাধ্যতামূলকভাবে নিপুণ। (২) তারা শত প্ররোচনাতে, এমনকি তাদের খুন করার চেষ্টা সত্ত্বেও ভিলেনদের কুপোকাৎ করে কিন্তু কচুকাটা করে না। হয় তারা ঘরের লোক বলে, যখন ব্যাপারটা শেষ অবধি ‘বহু, ম্যায় গলদ সমঝা’র হৃদয় পরিবর্তনের অশ্রুধারে শেষ হয়। নইলে তারা ভিলেনকে ‘বুন্দ বুন্দ সে’ মারার সিরিয়াল রক্তক্ষরণের পথ ও শপথ নেয়। এ ছাড়া গতিও নেই। বীরাঙ্গনা বা খলনায়ক, একজন পড়ে গেলেই তো ‘ম্যাগো’ সিরিয়ালের ঘূর্ণনও শেষ।
এবম্বিধ কারণে গোটা ব্যাপারটার ‘পলিটিকাল কারেক্টনেস’ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে ভেবেই হয়তো পাকা মেয়েদের দিয়ে মাঝে মাঝে কিছুটা খাপছাড়া ভাবেই ওজস্বী ভাষণ দেওয়ানো হয়ে থাকে।

আমার মা একবার বলেছিলেন, “দেখিস, সিরিয়ালে প্রথমেই একটা বিয়ে হবে।” সত্যিই তাই। ঐতিহাসিক-পৌরাণিক উপন্যাসে নায়ক-নায়িকার অন্তে মিলন হতো, ‘অ্যান্ড দে লিভড হ্যাপিলি এভার আফটার’। এখন কিন্তু এই পাকা মেয়েদের শুরুতেই পট করে বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে হয়, কিন্তু ‘ইয়ে’ হয় না আর এই বিয়ে-ইয়ের কনফ্লিক্টের রেজলিউশনের ওপরই পাক খায় সিরিয়াল। হচ্ছে-হবে-হল না, আবার হচ্ছে-হবে-হল না, এভাবে চলে সুতো ছাড়া আর গোটানোর অন্তহীন খেলা।
বিয়ের প্রসঙ্গে বলি, সিরিয়ালে নায়ক-নায়িকাদের বিয়ে একবার নয়, বার বার হয়। হয়, ভাঙে, আবার হয়, আবার ভাঙে। প্রায়ই অবশ্য পরে দেখা যায় (দুষ্টু লোকের সাথে) তাদের বিয়ে পাকা মেয়ের চালাকিতে অবৈধ হয়ে গেছে। তবে বৈধ বা অবৈধ, বিয়ের ধুম লেগেই থাকে আর লেগে থাকে শাড়িগয়না, প্রসাধন সামগ্রীর দোকানগুলির ঐসব অনুষ্ঠান মোটা টাকায় ‘স্পনসর’ করা।
যা বলছিলাম। বিয়ে-ইয়ের সমস্যা না মেটার প্রকৌশল অনেক। খুব ‘কমন’ কয়েকটি হচ্ছে: (১) কেউ ‘মাথার দিব্যি’ দেবে। তবে বরকেও বলা চলবে না, তাই তার সাথে পাকা মেয়ের ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হবে। (২) পাকা মেয়ে অনেক তথ্য জানতে পেরেও বরকে তক্ষুণি জানাবে না, কারণ তাহলে বর ‘আপসেট’ হয়ে যাবে। অবশ্য এর ফলে যে শেষ অব্দি বরের আরও বেশি আপসেট হওয়ার কারণ ঘটবে, সেটা ধর্তব্য নয়। (৩) পাকা মেয়ের খাবারে বিষ মেশানো হবে। তাতে অবশ্য সে ফাইনালি মরবে না, তবে সেটা বুঝতে বুঝতে অন্তত বিশ-ত্রিশটা এপিসোড পার হয়ে যাবে। (৪) তার আলমারিতে টাকা বা গয়না লুকিয়ে রেখে চুরির অপবাদ দেওয়া হবে। (৫) ঐ যে বললাম, পাকা মেয়ে বা তার বরের আবার বিয়ে হবে। সেটা জেনুইন হোক বা ফলস, ধুমধাম, সাজুগুজুর ভুরিভোজ থেকে দর্শকদের চক্ষুকর্ণ বঞ্চিত হবে না।
প্রসঙ্গত, আজকাল ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব চরিত্রই দামি শাড়িগয়না পরে এবং অষ্টপ্রহর পরেই থাকে। তাদের প্রসাধিত চামড়া টানটান, (বিশেষ কারণে জেট ব্ল্যাক না মাখা হলে) ফ্যাকাশে ফর্সা। ঘরবাড়িও সুসজ্জিত, অভাবের চিহ্ন নেই। আমাদের ছোটোবড়ো পর্দা সেই সময় পেরিয়ে এসেছে যখন রুক্ষ দাড়ি, শুকনো মুখ হীরোর শেষ সীনে কাশতে কাশতে মৃত্যু বা জমিদারের অত্যাচারে হীরোইনের পরিবারের গ্রামের ভিটে ছেড়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া দর্শকদের সহানুভূতি কুড়োত। এখন ‘এ দিল মাঙে more.’ সুতরাং মাঞ্জা দেওয়া ড্রেস, ঝাঁ চকচক বাড়ি, নব্যতম স্মার্টফোন আর দুরন্ত গতির চার বা নিদেনপক্ষে দু চাকা হীরো-হীরোইনের অপরিহার্য সঙ্গী।
বাড়ির প্রসঙ্গে আর এক কুচ্ছো মনে পড়ে গেল। ক’বছর আগে এক মেইনস্ট্রীম পত্রিকায় এক বিখ্যাত বাঙালি অভিনেতার সম্বন্ধে এই উক্তি উত্তেজিত বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল, “বাবার শ্রাদ্ধ কি প্রেমিকার বৌভাত, (ভাব প্রকাশের জন্য তাঁর মুখের) পেশি সেই একটিই।” তা, বাংলা সিরিয়ালেও ‘ইস্টার জলসা’ কি ‘ঝি বাংলা’, (অকুস্থল) ‘বাড়ি সেই একটিই’। লং শটে তো বটেই, ক্লোজ-আপেও প্রতিটি ফ্লোরের প্রতিটি কোনা আপনাদের দু-একটি সিরিয়াল দেখতে দেখতে মুখস্থ হয়ে যাবে। এমনকি দৃশ্যপট যখন নায়িকার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়িতে স্থানান্তরিত হচ্ছে, তখনও সামান্য মেক আপ বদলে সেই একই বাড়ি আপনার চোখের সামনে প্রতিভাত।
বিষয়ান্তরে যাওয়ার আগে একটা কথা বলে রাখি – সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গীর দিক থেকে আধুনিক বাংলা সিরিয়ালগুলি কিন্তু অত্যন্ত প্রগতিশীল। অর্থাৎ হাঁচি-কাশি-টিকটিকি থেকে শুরু করে মাথার দিব্যি, পুজোর থালা থেকে ফুল বা হাত থেকে সিঁদুর মাটিতে পড়ে যাওয়ায় ঘোর অমঙ্গল, বাবা বা মা’র প্রসাদে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে হীরোর অব্যহতি (এখানে হীরোইন চলবে না), এসবের এখন হে-ব্বি মার্কেট। আসলে এখন তো আমরা রেনেসাঁর যুগে, ঘোরবেগে অতীতের থেকে সব ফ্যান্টা জিনিস ছেঁকে আনছি। দুর্ভাগ্যক্রমে সতীদাহ বা গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জনের মতো দুর্ধর্ষ অতি পুরাতন ভাবের নব আবিস্কার এখনও চোখে পড়েনি।

কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে বারংবার করণীয় কোনও প্রক্রিয়াকে একটা ‘রুটিন’ হিসেবে কোনও ‘লাইব্রেরি’তে রেখে তারপর পরিবেশানুগ ‘প্যারামিটার’ দিয়ে ডাকা হয়। যেমন, কোনও সংখ্যার বর্গমূল বের করতে হলে বর্গমূল রুটিনকে ওই সংখ্যাটি দিয়ে ডাকা হবে। এই ব্যাপারটা প্রোগ্রামিং ল্যাংগোয়েজের ‘জেনারেশন’ বা পরিবেশ অনুযায়ী সাবরুটিন, প্রসিজার, ক্লাস/অবজেক্ট, ম্যাক্রো ইত্যাদি নামে অভিহিত। তেমন বাংলা সিরিয়ালেও কিছু সীন বা সিচুয়েশন আছে যা প্রত্যেক সিরিয়ালেই বলতে গেলে ঘুরেফিরে আসে। সেগুলোর ভিডিও নিয়েও প্রযোজকরা একটা ‘ম্যাক্রো লাইব্রেরী’ তৈরি করে রেখে দিতে পারেন। তারপর আধুনিক ক্যামেরা-কম্পিউটারের কারসাজিতে সেখানে উপযুক্ত পাত্রপাত্রী প্রক্ষিপ্ত করে দেখালে ঝামেলা কমে। আজকালকার প্রযুক্তিতে এটা অসম্ভব নয়। এমন কয়েকটি সম্ভাব্য সিচুয়েশন হচ্ছে:
(১) গাড়ির ধাক্কা। উদভ্রান্ত হীরো বা হীরোইন পথ চলছে/ ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। কাট। দূর থেকে একটা গাড়ি ধেয়ে আসছে। দেখলে মনে হয় স্পীড কম, কিন্তু ধরে নিতে হবে টপ গিয়ারে ছুটছে। হীরো(ইন) পথে পা দিল/ ক্রস করতে গেল। কাট। গাড়ি মনে হচ্ছে থেমে – তবে স্টিল শট তো, তাই ধরে নিতে হবে ছুটছিল। তার বনেটের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে হীরো(ইন)। কাট। রাস্তায় পড়ে হীরো(ইন)-এর আলতাক্ত দেহ। লোক ‘ই-স্‌-সস্‌' বলতে বলতে স্লো-মো’তে দৌড়ে আসছে। কাট। নার্সিং হোম, আই-সি-ইউ, মুখোশ। রক্ত-জল-গ্লুকোজ সব দেওয়া চলছে। গোমড়ামুখো নার্স একটা যন্ত্রে আঁকিবুকি লক্ষ করছে।
(২) আরোগ্য। উপরোক্ত বা অনুরূপ কারণে হীরো গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় নার্সিং হোমে। সেখানে হাজির তার উদভ্রান্ত স্ত্রী অর্থাৎ পাকা মেয়ে। ডক্টর বলছেন, বাহাত্তর ঘণ্টা না কাটলে...ইত্যাদি। কাট। পাকা মেয়ে রাধাগোবিন্দের সামনে চোখ বুঁজে হাত জোড় করে প্রার্থনারত, মুখ তেল চুকচুকে হলেও ধরে নিতে হবে চব্বিশ ঘণ্টা উপোসি আছে। কাট। জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ঠাকুরের দিকে ফিরে পাকা মেয়ের ‘আজ তোমার পরীক্ষা ভগবান’-স্টাইলে ওপেন চ্যালেঞ্জ। একটু পরেই একটা ফুল টুপ করে খসে পড়া। ফুল নিয়ে পাকা মেয়ের ঊর্ধ্বশ্বাস প্রস্থান। কাট। নার্সিং হোম। “আমি কি ওর সঙ্গে একবার –”, “অসম্ভব, ওনার যা অবস্থা –”, “পাঁচ মিনিট, প্লী-জ –” (অশ্রুধার), “কী বিপদ – আচ্ছা, পাঁচ মিনিটই কিন্তু, তার বেশি নয়।” কাট। ভেতরে প্রভূত প্রার্থনা ও অশ্রুধার। (পর্দার নিচের দিকে ‘গ্লিসারিন চোখের পক্ষে ক্ষতিকর’ সতর্কবাণী থাকতে পারে।) পরিশেষে হীরোর মাথায় ফুল ছোঁয়ানো। হীরো ধীরে ধীরে চোখ মেলছে। ডাক্তারের প্রবেশ। (যন্ত্রের আঁকিবুকি লক্ষ করে) “এ কী, এ যে চমৎকার!”
(৩) প্রথম সংঘাত। পাকা মেয়ে আউটডোরে বা ইনডোরে অন্যদিকে তাকিয়ে চলছে। কাট। একই ভাবে হবু হীরো সম্ভবত হাতের কোনও কাগজপত্র দেখতে দেখতে উল্টোদিক থেকে আসছে। দুজনে এক ফ্রেমে। মুখোমুখি সংঘর্ষ, দুজনেই ভূপতিত। (কে ওপরে কে নীচে, সেটা প্রযোজক কতটা ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ তার ওপর।) কাট। ক্লোজ শট – দুজন দুজনের দিকে প্রথমে ক্রুদ্ধ, তারপর বিস্মিত, সবশেষে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তাকিয়েই আছে। ফ্রিজ, পরের সন্ধেয় আবার।
এছাড়াও রয়েছে টাইম বোমার বিস্ফোরণ, ভিলেনের আড়ালে আড়ি পেতে শোনা, ফলো করে পেছন পেছন গিয়ে সব দেখে আসা, (চিরকেলে শিহরণ) ‘চেজ সিকোয়েন্স’ এমন আরও অজস্র হ্যানাত্যানা। পাঠকের ধৈর্যচ্যূতির আশঙ্কায় বিস্তারিতে যাওয়া হল না।

শুরুতেই আভাস দিয়েছি, আমার সিরিয়াল দেখার অজুহাত অর্থাৎ চালু বাংলা শেখা তেমন এগোয়নি। যেটুকু ছিটেফোঁটা বুঝেছি, তার মধ্যে আছে: ‘ব্যাপক’ শব্দটার ব্যাপক প্রয়োগ করতে হবে, চরিত্রদের অনবরত ‘কেস’ বা ‘ঘ্যাম’ খাওয়াতে হবে আর ‘পাগলা কুত্তায় কাটাতে’ হবে। শেষোক্ত শব্দবন্ধটি এতই সর্বব্যাপী যে এমন একটি সিরিয়ালেও ঢুকে পড়েছিল, যার চরিত্রদের ‘করেচে’, ‘খেয়েচে’ বলিয়ে সেটিকে শতাব্দীখানেক আগের ‘পিরিয়ড’ সিরিয়ালের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। আরও জেনেছি যে ‘চমৎকার’ শব্দটার মানে বাংলা ডিক্সনারির ‘বিস্ময়কর’ ছাপিয়ে হিন্দি থেকে ছিটকে পড়া ‘মির‍্যাকল’। (যেমন, অমুক বাবার ‘চমৎকার’ দেখে অবাক হয়ে গেলাম।) এমন আরও কিছু মণিমুক্তো আমার কম্পুটারের ‘স্ক্র্যাপ ফাইল’-এ এন্ট্রি করে নিচ্ছি, ভবিষ্যতে লেখায় ছেড়ে আপনাদের ‘চমৎকৃত’ করে দেওয়ার জন্যে।
ভাষাজ্ঞান তেমন না হলেও আমার সাধারণ জ্ঞান কিন্তু বাংলা সিরিয়াল দর্শনে প্রতিদিনই সমৃদ্ধতর হচ্ছে। কয়েকটি মণিমুক্তো:
(১) ডিভোর্স হচ্ছে এমন একটি ব্যাপার, যাতে মিয়াবিবি রাজি হলে কাজিটাজির কোনও ব্যাপার থাকে না। তাই মিউচুয়াল ডিভোর্স দরখাস্তে সই হয়ে গেলেই ডিভোর্স হয়ে গেল। পাত্রপাত্রী সেই আসরেই পরবর্তী বিবাহ সেরে ফেলতে পারেন।
(২) প্ল্যাস্টিক সার্জারি হচ্ছে এমন এক প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে যে কোনও মানুষকে অপর যে কোনও মানুষের হুবহু প্রতিরূপ হিসেবে দাঁড় করানো যায়। এমনকি তাদের উচ্চতা, গলার স্বর সবই এক করে দেওয়া সম্ভব। অর্থাৎ কার্যত প্ল্যাস্টিক সার্জারি হচ্ছে ‘সুপার ক্লোনিং’।
(৩) কোনও মহিলা বিরাট ঘোমটা টেনে বিকৃত স্বরে কথা বললে কেউ তাকে চিনতে পারে না। ঘোমটার অভাবে হালকা দাড়িগোঁফ চলতে পারে।

তবে সিরিয়ালগুলির একটি ‘প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ’ হচ্ছে গান, যেগুলো সাধারণভাবে শ্রুতিমধুর ও প্রায়ই পরিবেশের উপযোগী – যদিও বঙ্গসন্তানের আবেগ আজকাল বেশি গাঢ় হলে প্রচলিত হিট হিন্দি গানার সাহায্য ছাড়া ততটা প্রকাশ পায় না। এক্ষেত্রে কিন্তু আরও একটা ‘চমৎকার’ – বাংলা সিরিয়ালে আমাদের বিখ্যাত দাড়িওয়ালার গান আজও গাঁকগাঁক করে চলছে। পঁচাত্তর বছরেরও আগে স্টেজ ছেড়ে যাওয়ার পরও লোকটা যেভাবে অরিজিৎ সিংয়ের আবেগঘন ‘ওঁ-ওঁ-ওঁ-’র সঙ্গে সমানে টক্কর দিচ্ছে, তাতে বোঝা যায় তার ‘ক্যালি’ ছিল।

সহজ-অনুমেয় পরিসমাপ্তির চারপাশে গোঁত্তা খেতে খেতে সিরিয়ালের গুবরে পোকা একদিন না একদিন মাটিতে পড়ে ধপ হয়। এটা দু’ভাবে হতে পারে। প্রথমত, আরও তেরো এপিসোড এক্সটেনশনের চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রযোজক গল্প শেষ করেন না। কিন্তু টি-আর-পি (নাকি ‘ট্যাম’?)-হতাশ চ্যানেল ‘অনেক হয়েছে, আর নয়’ বলে ব্যাপারটার অপমৃত্যু ঘটায়। ফলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যায়। অনেক রহস্যেরও ভ্রূণহত্যা ঘটে। এটা ক’বছর আগে বেশ দেখা যেত। আজকাল বোধহয় প্রযোজকরা সহজে ভবিতব্য মেনে নিতে শিখেছেন। তাই নোটিশ পেয়েই চটজলদি গুটোতে বসেন। তড়িঘড়ি কোনওভাবে শেষটা দেখিয়ে ছাড়েন, যদিও সেই ফাস্ট ফরোয়ার্ডের মধ্যেও অনেক কিছু না বলা থেকে যায়। তা, ক’জন ব্যক্তিমানুষের জীবনেই বা সমাপ্তিটা সব কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার পর গ্রেসফুলি আসে? আর ছোটো-বড়ো পর্দা তো বাস্তব জীবনেরই প্রতিফলন, তাই না?
আচ্ছা, ম্যাগো সিরিয়াল শেষ হওয়ার পর ঐ পাকা মেয়েদের কী হয়? এই প্রসঙ্গে মনে পড়ল আগের জমানার এক নামী শিশু সাহিত্যিকের এক জিজ্ঞাসা। তখন অব্দি বাচ্চারা পেন্সিলেই লিখত। এই পেন্সিল কাটতে কাটতে ক্রমে ছোটো হয়ে যায়, একটা সময় আর সেটাকে ধরা যায় না। কিন্তু সেই পরিত্যক্ত শেষাংশগুলি কোথায় যায়, এটাই ছিল লেখিকার প্রশ্ন। শেষে তাঁর অদ্ভুত কল্পনা, ওগুলো আকাশের তারা হয়ে যায়।
সিরিয়ালের এই পাকা মেয়েরা প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবেই তরতাজা, নতুন মুখ। সিরিয়াল চলাকালীন রাস্তাঘাটে, আড্ডায়, মহিলামহলে তাঁরা বীরাঙ্গনার সম্মান পান। সর্বত্র তাঁদের চালচলন, বাচনভঙ্গী অনুকরণের দুরন্ত প্রয়াসও নিশ্চয়ই তাঁদের উচ্ছ্বাসিত করে। কিন্তু সিরিয়াল ফুরোলে তাঁদের বেশির ভাগই আইডেন্টিটি হারিয়ে ফুরিয়ে যান। মুষ্ঠিমেয় কেউ কেউ আকাশের না হলেও হয়তো ছোটো বা বড়ো পর্দার তারা হন। কিন্তু অধিকাংশই টিমটিম করতে করতে একদিন ঐ পেন্সিলের অবশিষ্টাংশের মতোই হারিয়ে যান।

পুনশ্চ: ভালোমন্দ মিলিয়ে, অধুনা বাংলা সিরিয়াল বাঙালি ছোটো পর্দার দর্শকদের অভ্যেসের একটা পরিবর্তন এনেছে। ক’বছর আগেও ‘ব্যাপক’ টিপিক্যাল বঙ্গ দর্শক হিন্দি সিরিয়ালে অনুরক্ত ছিলেন। তাঁদের অনেকেই এখন সন্ধেবেলা চোখ গোল গোল করে বাংলা দেখছেন। আ মরি বাংলা ভাষা!

অলংকরণঃ স্বাতী বাউরা

ফেসবুক মন্তব্য