নিখিলের খেয়া

উত্তম বিশ্বাস


আজ আবার দখিণা ঝামট মারতে শুরু করেছে। বহুদিনের ঘাটিগাড়া কসাড় কচুরিপানার দাম সরে গিয়ে নদীর বুক চিরে ময়াল সাপের মত কালো জল বেরিয়ে পড়েছে। দাঁড় টানতে টানতে কিছুক্ষণের জন্যে স্তব্ধ হয়ে জলের গভীরে চেয়ে থাকে নিখিল। হঠাত আবিষ্কার করে, যখনই সে প্রিয়জন নিয়ে শ্মশানের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, অমনি নদীটা যেন শ্মশানমুখী খরস্রোতা হয়ে ওঠে! বাগী থেকে হেড়েভাঙ্গা শ্মশান মাত্র দেড় কিলোমিটার। মাঝে মাঝে এটুকু জল কাটতেই যেন ছ’মাসের ক্ষেপ মনে হয় নিখিলের।

‘আজ আর বাইরে বেরিও নাকো। এট্টু ঘরে থাকো। কোঁকের কাছটায় খুব ব্যথা; হাত দিয়ে দেখো!’ মৃতবৎসা মায়ার কাতর আবেদন যেন বাশের-বাতায় ঘুণ পোকার মত একটানা কিরকির করে বাজতে থাকে নিখিলের কানে। খুঁটিতে ঝোলানো ছিলুমটা টেনে নিয়ে তাতে ভালো করে দম দেয় নিখিল। এক পা দু’পা করে নেমে আসে উঠোনে। একখানি স-ফুল সজনের ডাল মচকে পড়ে আছে উঠোনের মাঝখানে। ধুলোয় লুটানো ফুলগুলির দিকে তাকিয়ে হঠাত মায়ার জন্যে বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে নিখিলের! নিখিল শক্ত হবার চেষ্টা করে। জগতে সবাই যদি সজনের ডালের মত নরম হয়, তাহলে মানুষ সান্ত্বনা পাবে কার কাছে! কিছু একটা ভেবে সে আবার মায়ার কাছে ফিরে আসে। মশারী উঁচু করে দ্যাখে, মায়া অঘোরে ঘুমোচ্ছে। হঠাৎ মনে পড়ে, নৌকাটা ভাল করে বাঁধা হয় নি কো। দক্ষিণের ঝাপটায় উল্টে গেলে পাটাতন খুঁটা-দড়া সব ভেসে যাবে। আজ অলকার আসবার কথা! অভিসারী অলকা আজকাল নিখিলের ঘুম নিনেও যেন ছিনিমিনি খেলতে শুরু করেছে! নিখিল মনে মনে চঞ্চল হয়ে উঠল। মায়ার গায়ে একটা পাতলা কাঁথার ওপর আরও একটা চাদর চাপা দিয়ে, খেয়াঘাটের দিকে হনহনিয়ে এগিয়ে এল।

ফজরের আজান শুরু হবার আধঘণ্টা আগেই নিখিলের খেয়া রেডি রাখা চাই। জয়নুদ্দিন মোয়াজ্জেম নদী পেরিয়ে দক্ষিণ পাড়ার মসজিদে আজান দিতে যান; এট্টু বেগড়বাই হলেই নৌকো চলা হয়ে যাবে না! খোলের জল সেঁচে, খড়-বিচালি সাফাই করবার আগেই হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ে পাটকেলপোতার ইটভাটার কুলি, হাঁসের ডিমের ব্যাপারী, আর পাঁড়ের বাঁশের অবনী গোয়ালা আর দাসপাড়ার বিধবা অলকা। ভুল-ভবিষ্যৎ পথ ভুলে চলে আসে ক্ষ্যামা বাউরি। যদি না দেখেছে নিখিল নৌকোর গুড়োয় বসা; অমনি সে তার ভিক্ষার ঝুলিটি মুঠো মধ্যে উঁচু করে নিয়ে জলে নেমে কচুরিপানা ঠেলতে ঠেলতে নদী সাঁতরাতে থাকবে। নিখিলের নৌকোটি সে ভুলেও মাড়াবে না। ওকে দেখলেই নিখিলও ধ্যাতলার মত হাঁক পাড়তে থাকবে, ‘ও ক্ষ্যামা পিসিইইইই--- এবারও আমার মেয়েটা মরে গেল গো! আঁটকুড়োর নৌকোটা আর বুঝি তোমার পদসেবার সুযোগ পেল না!’
ক্ষ্যামার ধারণা, সকাল সকাল নিখিলের মত মানুষের মুখ দ্যাখা অযাত্রা! ভিক্ষেয় বেরোলে সেদিন শূন্য ঝুলি নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়; নিলম্বু দিন কাটে অনামুখো দর্শনে!

সারাদিন দাঁড় টানা কাজ। আজকাল বুকের খাঁচাটা যেন ব্যথায় টসটস করে নিখিলের। ইদানিং নদীর এপার-ওপার মোটা একগাছি দড়ি টাঙিয়ে রেখেছে নিখিল। বোরো সিজেনে হাম্বার মেশিনের টানে হুহু করে ছুটে আসে পাটাশ্যাওলা; চলাচলের পথ আটকে যায় নিখিলের। গরু-বাছুর, হাঁসমুরগি, আলু-পটল, কুমড়ো কোস্টা যাই উঠুক না কেন, পারে নিয়ে তাকে ফেলতেই হবে। গ্রামবাসীদের চাল-গমে বাঁধা নিখিলের সম্বৎসর। ঝুরো যাত্রী উঠলে নৌকোর খোলে ছুঁড়ে দেয় একআধটা কাঁচা টাকা। নদীতে জল বেশি থাক আর কম থাক---একমাত্র ক্ষ্যামা বাউরি ছাড়া আর কেউই পা ভিজোবে না। নিখিল মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয়, দক্ষিণ পাড়ের মাঠে দারুণ ধান হয়েছে এবার; হাওয়ায় মাথা দোলাচ্ছে গুচ্ছ গুচ্ছ থোড়! নিখিল মনে মনে ভাবে, এবছর মাসকাবারিটা বাড়াতে বলব রশিদ শেখকে ধরে। দু’পালির পরিবর্তে মাথাপিছু তিনপালি দিলেও ফেলে ঝেলে দুটো প্রাণীর হামেশাই চলে যায়। তাছাড়া মায়ার শরীরটাও ত ভালো না; ডাক্তারের জন্যে নৌকোর গলুইতে কাচা টাকা ভিজিয়ে রাখতে হয় চব্বিশ ঘণ্টা! এসব চিন্তায় নিখিলের বালিশে মাথা রাখার বাসনা সেই কবেই যেন উড়ে গেছে; আজ আর মনে নেই!

‘হ্যাদে ও মরণ! জ্যান্ত-মরা সব এক গত্তোয় নিবি নাকি! বলি এই জন্যিই কি মাথানীর ধানগুলো দিয়ে তোরে পুষে রাখা? নামা, আমার নামা বলছি!’ সরলা খুড়ির চিৎকারে নদীর কচুরিপানা পর্যন্ত দলছুট হয়ে এদিক সেদিক ছুটে পালায়; গ্রামের গণ্যিমাণ্যির মা বলে কথা! আর সেখানে কি না এমন ছোঁয়া নেপার এক্কাকার কাণ্ড! মানিক তলায় দুধ দিতে যাবেন বলে পেতলের মাজা বালতি ভরে দুধ নিয়ে নৌকোয় সবে পা দিয়েছেন, অমনি জলিল শেখের কাফন নিয়ে হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ে শেখ পাড়ার মিঞারা। আর মিঞাদের মরা মানে একসাথে ঝংকে পড়বে আশেপাশের সাত গাঁয়ের মানুষ! এইখানে নিখিল নিরুপায়! কাকে ফেলে কাকে নেবে সে! জ্যান্ত মরা যে’ই উঠুক পার তাকে করতেই হবে। পালিমাপা মজুরি তার; তাছাড়া কার ভরসাতেই বা ফেলে রাখবে সে! পাটাতনের নীচে ছোট্ট একটা কাচের শিশিতে গঙ্গাজল রাখা আছে; শুচিবাই মানুষের জাতধর্ম রক্ষা করার জন্য দরকার বেদরকারে ওটুকু লাগে! কিন্তু এখানে সেটুকু বার করে ছেটালে মিঞারা জ্যান্ত জবাই দেবে ওকে! নিখিল ভাবে, কাফন ডিঙিয়ে গঙ্গাজল! কে ছেটাবে? তার চে’ বরং সরলা খুড়ির এক বালতি দুধের ওপর দিয়ে যাচ্ছে যাক!

বৈশাখের বিকেল। এক আকাশ ঝোড়ো মেঘ মাথায় নিয়ে ঘরে ফেরে মায়া। নিখিলের বুকের ভেতরটা ভিজে কাঁথার মত মোচড় দিয়ে ওঠে, ‘প্যাকেট খালি ক্যান মায়া?’
‘সরলা খুড়িরা বলেচে ওরা এমাস থেকে আর ধান দেবে না!’
‘তবে কি দেবে,--কিছু কি বলেচে?’
মায়া কোনও কথার উত্তর দেওয়ার গরজ দেখায় না। খালি চটের থলেটা উঠোনে চেলে ফেলে দিয়ে দুপ-দাপ আওয়াজ করে ভেতরে প্রবেশ করল। নিখিল একা একাই গজরাতে থাকে, ‘খুব চুলকানি! দাঁড়াও চেটো মাঠে করছি! বাঁশ বেয়ে নদী পার হবা ভাবচ! কার ঝাড়ে ক’খানা বাঁশ আছে দেখিই না! হাকরমুখো নদীকে বাঁধানো অত্ত সহজ না! তাছাড়া চিত হয়ে যখন কচুরিপানার মধ্যি পড়বানি; তখন চিরছির করে আবার ডাক পড়ব্যানে এই বান্দার!’

বিকেলের দিকে নৌকোয় চাপ পড়ে খুব। মাঠ-ফেরত গরু ছাগল থেকে শুরু করে বড় চাষা, ছোট চাষা, হাটুরে মজুরে সবাইকে তখন এক জল-পাল্লায় তুলে নেয় নিখিল। ইট পোড়ানো কুলিরা নদীর ঠাণ্ডা হাওয়ায় মনের সুখে তখন একটু আধটু বিড়ি পোড়ায়। বাগদি, নাপিত, কচু-ঘেচু কুড়ুনীরা চুন মাখানো পাতা চিবোয়; আর ঘাস চেবানো জন্তু জানোয়ারেরা একটু সুযোগ পেলেই মনের সুখে চাল-কুড়োর বস্তা কেটে, চুনিয়ে, নাদিয়ে--- একসা করে তোলে নৌকোর খোল, ‘হ্যাদে দ্যাখ! খানেখরাপে গরাপ করেচে রে! নতুন চালের প্যাকেটখানা কী সব্বনাশ করেচে গো!’ আখের আলির ইচ্ছা করছিল আদুরীর পাঠীটাকে এক লাথি মেরে পানিতে ফেলে দেয়। কিন্তু আদুরীর হাতের চুবনি খাওয়ার হাত থেকে আখেরকে কে বাঁচাবে! নিখিল মাঝে খানিক খিচিয়ে ওঠে, ‘তুমাদেরও বলিহারি আক্কেল বাপু! মানষির জায়গা নেই; তার মধ্যি চেড্ডে খানিক ছাগল পাগল তুলে বসে আছ!’ চাষীরা আলু পটল ধান গম তুলে পারাপারের সময় নৌকোর খোলে দু’এক মুঠো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে; নিখিলের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে কেউ কেউ ওটুকু কাচিয়ে নিতে গিয়েও দু’বার ভাবেন, ‘মাজা ছ্যাও করে ওটুকুনি লিতি পারলাম না! ও বাপ লে; তুই কুইড়গ্যে লিস। ঝে কডা আছে, তোদের এক সন্ধ্যে হবেন।!’ আখের আলি নেমে যেতেই আদুরী কটাস কটাস করে নিখিলকে শুনিয়ে বলতে থাকে, ‘ভালোই ত আরাম! চাড্ডি ছাগল পাগল বেশি করে তুললিই ত আর হাড়ির জন্যি এত ভাবতি হয় না!’ কিন্তু আজ আদুরীর পাঠীর বর্জ্য মাখানো চাল ক’টি কুড়োতে গিয়ে নিখিলের কান্না পেল! আদুরীর মুখের ওপর লগির গুঁতো দিয়ে গলুই ছুপে ধরে ভুসভুস করে নৌকোটি ডুবিয়ে দিল সে। সবে আসেরের আজান শুরু হয়েছে। জগতের দুঃখী মানুষের কান্নার মত আজানের সুর যেন আজ নদীর এপার ওপার ভাসতে লাগল!

জেলেপাড়ায় ক্রমশ অশান্তি ফেনিয়ে ওঠে। একসময় এর ঘোলা এসে আছড়ে পড়ে নিখিলের উঠোনে। ওদের একটাই অভিযোগ, ‘নিখিল অত রাতে কার জন্যি খেয়া দেয়? অন্ধকারে জাল-সুতো দড়ি-দড়া লগিতে দলা করতে করতে লৌকো চালায় ও!’ একে একে উঠতে থাকে অন্য প্রসঙ্গ----‘সুবল দাসের বিধবা বৌডা বহুত বেলাল্লাপানা শুরু করেচে! ঝেদিন বাগে পাব না,---ডুঙ্গায় ফেলে-----!’ বেগতিক বুঝে নিখিলের বৌ গুগলি উগরানো হাঁসের মত খ্যাঁক খ্যাঁক করে ধেয়ে আসে উঠোনে, ‘শোকে-তাপে একে মাথাডা ওর ঠিক নেই! তার ওপর বুক দিয়ে কচুরি ঠেলে চকা করে রাখে নদীটা,--তুমাদের জাল পাতার জন্যি? তুমাদের আর মরার জায়গা নেই? আস্ত একখান নদী পড়ে থাকতি লা’ চলাচলের রাস্তায় এসে হত্যে দিয়ে মরো কোন দুঃখে?’ দুঃখের বারোমাস্যায় বালিতেও প্লাবন আসে! আঁচলের খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে মায়া বলতে লাগল, ‘ঝাল টিপে ভাত খাই! কোনোদিন বলতি পারবা তুমাদের জাল চাগিয়ে দুটো পুঁটি মাছের আঁশটে হাতে বাধিয়ে ও বাড়ি ফিরেছে!?’


অলকা নৌকোয় উঠলেই নিখিলের গান পায়। বলিষ্ঠ শরীরে উদোম নদীর শীতল বাতাস খেলে গেলে যেমন শিরশিরানি আসে, ঠিক তেমনি। নিখিল ছপছপ করে জল কাটে আর গায়,----------
‘মেলা চাইলাম ঘোলা খাইলাম ছইএর তলায় পানি
মরা মাছে ভরা আমার সেঁউতি নৌকাখানি---
জনম গেল নদী যাতনায়!’
‘বুঝলে নিখিল’দা বৌটাকে আর হাতুড়ের কাছে নিও না। ভালো ডাক্তার দ্যাখাও। ওর কোলে এট্টা বাচ্ছা এলে তুমারও ভাললাগবে!----এবারেরটা যেন কী ছিল?’ সহসা গানের লয় পলির তলদেশে তলিয়ে যায়। এসব হিসাব আর মনের মধ্যে পুষে রাখতে ইচ্ছে করে না নিখিলের। শুধুমাত্র ন্যায্য পাওনাদারের মত কড়ি গুনে অলকাকে শুধোয়, ‘রোজ রোজ তোর এত রাত হয়; তুই কনে কী করিস অলকা?’ অলকা রাতচরা জল-পাখির মত কুটিকুটি হেসে লুটিয়ে পড়ে নৌকোরপাটাতনে, ‘শুনিচি, কলকাতার বাবুরা মেয়েদের নিয়ে জলে খেলা করে; আমারও খুব ইচ্ছে তোমার নৌকোয় একা একা এট্টু ঘুরি!’ কিছুক্ষণ সরু আঙুলের ফাঁকে জল সরানোর পর অলকা নিখিলের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘কি, ভয় পাও?’
‘আজ আর না! ঘরে বৌটার শরীর ভালো না; চল পাড়ে উঠি। তাছাড়া নদী কি শুধু আমার একার! সন্ধ্যা হলে জেলেরা ওত পেতে বসে থাকে। শালারা দ্যাখ মাছ মারছে খাচ্ছে দাচ্ছে, আর বছর পেরোতেই এট্টা করে বাচ্চা দেচ্ছে! আর আমিও এনেচি এট্টা খোলামুচি----!’
‘ডালিম দেখতে খুব আরাম; কিন্তুক চারা পুঁতে ফল ফলানো জোড়ন আছে! বৌ শুধু একখান পুষলি হবে না; তার তদম্যানি করতি হয়!’
‘খাতি দিতি পারি নে তাই বাচ্চা থাকে না!---তুই বলছিস?’
‘না। তা না। ভরাপেটে এপাড়া ওপাড়া ধান-কুড়ো উঠোতি পাঠাবা; কলসি ভরে জল চেপে তোলবে চাপা কল’থে; নৌকো চিত উবুড় করতিও সেই মেয়েলোককেই কাজে লাগাবা! তুমিও কি নিয়মকানুন কিছু মান?---তুমার দেখে ত আমার সন্দ হয়!’ নিখিল খপ করে অলকার হাতখানি ধরে বেসামাল হয়ে পড়ে, ‘কী করলে এট্টা জ্যান্ত বাচ্চা পাব বল? মায়াকে দিয়ে আর আমার ভরসা নেই! তুই যদি বলিস আমি তোর সারারাত নৌকোয় করে নদীর এমাথা ওমাথা ঘুরোব!—তুই বল কী করলে এট্টা জ্যান্ত বাচ্চা পাব?’
দূরের তারার পানে স্থির চোখে চেয়ে থাকে অলকা। তারপর বুকঠ্যালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘আচ্ছা বলবক্ষণ; মোকছেদের সমস্যাডা আগে মিটে যাক!’
‘মোকছেদের আবার কি সমস্যা? ওর দলুজে তুই কাজ করিস? নাকি-----?’
অলকা লজ্জায় লাল হয়ে উঠল, ‘আরে না। তেমন কিছু না; ভাড়া খাটি!’ অলকা আরও কাছে সরে আসে, ‘আচ্ছা নিখিল’দা পরের বাসায় ভাড়া খাটতে হলেও কি লেখজোখা করতে হয়?’
‘তোর হেয়ালি আমি কিছুই বুঝি নে। ব্যাপারটা কী বল ত?’
‘ও তেমন কিছু না! চল আজ তোমাকে আমিই বাইচ করি হিহিহি-----!’ সবে কথার পালে বাতাস লেগেছে। নেশাগ্রস্ত নৌকো আজ এই অন্ধকারে কতদূর ভেসে যাবে, নাকি ডুববে--- তা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল!

সকাল হতে-না-হতে পাবলিকের গাল খিস্তি, পশু-জানোয়ারের হাম্বাডাম্বা আর রাত হলে কুহকিনী ডাহুকের মত ডাক আসে মজা নদীর ওপার হতে। অলকার ডাক। কিন্তু সেই অস্ফুট রহস্যের ন্যাকা ন্যাকা সোহাগে ঢলে পড়া ডাক, ‘অ্যাই নিখিল’দাআআআআ----আর হাওয়ায় ভাসে না! মাঝে মাঝে নিখিলের ঘুম ভেঙে যায়; কিন্তু ঝড়ের ঝাপটার সাথে রক্তমাংসের মানবীর কোনও সংস্রব খুঁজে পায় না নিখিল। সে প্রায় কয়েক মাসের কথা; নৌকোর খোল থেলে অলকার গায়ের গন্ধটা ক্রমশ মুছে যেতে থাকে! আজকাল মায়া মনের দিক থেকে একটু একটু করে আরাম অনুভব করে। মাসান্তে মাথায় শ্যাম্পু দেয়; কচুরিপানার শেকড়ের মত চুলগুলি আঙুলে চিকতে চিকতে নিখিলের গায়ের কাছে সরে আসে। ছিলুমটানা পুরুষালি মুখের গন্ধটা ভারি মিষ্টি লাগে মায়ার! ফ্যাকাশে চোখে মোটা গোঁফটার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে মায়া, ‘ডাক্তার কি বলেচে শুনেচ?’
‘হূম! বল শুনচি।’
‘চেষ্টা করলে এখুনি, তা নইলে ফুল বন্ধ হবার সুমায় হয়েচে!’
‘সেই ত ঝরা মুচি!’
‘আমার আর কী বল! চল্লিশ বছর ধরে রক্ত-জল ত কম বিসর্জন দিলাম না!’
চুলের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে মায়াকে আদর করতে ইচ্ছা করে নিখিলের, ‘জান, আজ নৌকোটা লগির গুঁতো দিয়ে ডুবিয়ে রেখে এইচি। এরবার ওর খোলে এট্টু আলকাতরা না মাখালি কবে যে মনে মনে তলা-চলা খসে যাবে তার ঠিক আছে!’ মাঝরাতে খয়াটে চাঁদ লজ্জায় আকাশের একপাশে সরে যায়! আনন্দে আবেগে মায়ার খশখশে চোখদুটো ভিজে ওঠে!---- শেষবারের মত চেষ্টায় রাজি হয়েছে তার নিখিল!

হঠাৎ উঠোনে বেশ কয়েক জোড়া পায়ের শব্দে নগ্ন শরীরে বিছেন কাঁথা জড়িয়ে উঠে বসে নিখিল। এবার যেন দর্মার বেড়ার ওপর হাতের চাপড় পড়ল, ‘এই নিখিল ওঠ! নৌকো লাগবে!’
‘নৌকো ডুবানে রয়েচে ত!’
‘ওঠ! সেচতে হবে। জলদি ওঠ; কথার সুমায় না! অলকা অসুস্থ!’
পরিচিত মানুষের নাম-গন্ধে তড়াগ করে লাফ দিয়ে উঠোনে নামে নিখিল। গামছা জড়িয়ে সেঁউতিটা হাতে নিয়েই ঝড়ের বেগে ছুটে আসে খেয়াঘাটে।

সেঁউতিতে জল সেঁচার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েমানুষের মিষ্টি কাতরানি, আর অচেনা নারীকণ্ঠের অস্থির সান্ত্বনার আওয়াজ আসছিল বোরখার আড়াল থেকে, ‘আর এট্টু সহ্য কর মা! পানিটুক সেঁচা হয়ে গেলিই ত শুবগ্যে দোব! আ’লো ম’লো জা, মুচ্চি ভেঙে এসতেচ দেখচি!’ নিখিল অস্থির হয়ে উঠল। অনেক আগেই সে বুঝে গেছে, অলকা আসন্ন প্রসবা! নৌকোটাকে একাই যেন দুই হাতে কাত করে, এদিক ওদিক ছুপে ধরে নিমেষে সেঁচে ফেলল সে! পাটাতনে দুটো পুরু কাঁথার ওপর অলকা শুয়ে আছে। দাঁড় বাইতে ভুলে গেছে নিখিল। কখন যেন অলকাকে অনুসরণ করে সরে এসেছে তার পুরুষালি হাত, ‘অলকা! এই অলকা! সত্যি সত্যি তুই আমার জন্যি বাচ্চা নিয়েছিস? এই বাচ্চা আমার? সত্যিই আমার? তোকে আমি সারাজীবন ধরে রাত জেগে নৌকো করে ঘুরোব!---- বল এই বাচ্চা তুই আমার দিবি ত?’
বোরখার আড়াল থেকে একসময় আঁতুড় ভাঙা অতিষ্ট পাতিহাঁসের মত খ্যাঁক করে আওয়াজ আসে, ‘বাচ্চা এত সস্তা তাই না! অলকা পেট ভাড়া দিয়েচে; এ বাচ্চা মোকছেদের! পার-পারানীতে ক’পয়সা পাও বাপু? এই পেট’টুনি খসাতি ঝা সুমায়; কচকচে দেড় লাখ!---সে হিম্মত আছে তুমার?’


ছিন্নভিন্ন দলছুট কচুরিপানার দামের ধাক্কা খেয়ে খেয়ে নৌকোটি আপন বেগে পাক খেতে খেতে কোনদিকে যে এগিয়ে যাচ্ছে, সে দিকে মোটেও হুশ নেই নিখিলের! দাঁড়খানি ছুড়ে ফেলেছে শ্যাওলার মাঝে। নৌকোটা বাইতেও আজ চরম ঘেন্না হয় নিখিলের! কিন্তু অলকার পাশে বসা অজ্ঞাত মহিলার ভয়ার্ত চিৎকারে সম্বিত ফিরে পায় নিখিল, ‘ও বাপ! এ যে হেড়েভাঙ্গা শ্মশানের দিকি যাচ্ছে! তোর ব্যাগাতা করি; নিষ্পাপ পুষ্যি দুটোর এভাবে তুই মারিস নে! এট্টু হাল ধর!’
নিখিলের একবার মনে হল, যে হাতে তার তিন-তিনটি সন্তান হেড়েভাঙ্গার শ্মশানে পুঁতে রেখে এসেছে; ঠিক তেমনিভাবে অলকা ও তার পেটের বাচ্চাটিকে এখানেই পুঁতে রেখে যায়! মানুষিক টানাপোড়েন তাকে মারাত্মক রকম অস্থির করে তোলে, ‘বাচ্চাটি কার? অলকা আমার থেকে তবে কী নিল? তবে ওই বাজা মোকছেদই কি-----?’ ঝড়ের মেঘে বিদ্যুৎ কখনও কখনও মোহ আবরণ ছিন্ন করে দিয়ে যায়! অলকার মুখখানি আজ অত্যন্ত ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে; ঠিক মায়ার মত! চোখদুটো অসম্ভব ফোলা ফোলা আর ভিজে ভিজে! নিখিল বুঝতে চেষ্টা করে, বাচ্চাটা বাঁচাতে না পারলে তার অনেকটা টাকা লোকসান হবে,----এই ভেবে হয়ত সে কাঁদছে!

নিখিল মাথায় গামছাটা ফেট্টি বেঁধে অন্ধকারে ঝাঁপ দিল। জগতের পারাপারের ভার নিয়েছে নিখিল; সেখান থেকে পিছিয়ে আসা পাপ!----এটা জানে নিখিল। এবার শ্যাওলা আর কচুরিপানার সাথে শুরু হল সংগ্রাম! চকা ঘাট থেকে অনেকটা উজানে সরে এসেছে সে। সেখানে নৌকোটা তাকে টেনে তুলতেই হবে!---- যে ঘাটে গেলে ভোর ভোর হাসপাতালের অটো পাওয়া যায়,--- সেই ঘাটে!

মায়ার শেষ কথাটা তখনও কচুরিপানার পাতার মত শতকরতলে হাওয়ায় বাজতে থাকে!

ফেসবুক মন্তব্য