দীর্ঘ কবিতাঃ বুনো হাতি

অরিণ দেব


ভোরের আকাশ অনেকদূর পিছিয়ে গেছে
তুমি আর আমি স্মিতহেসে রাতকে বিদায় জানিয়েছিলাম
পোশাকে ছিলে না তুমি চাঁদের নগ্নতা
জড়িয়ে ছিল না আমাদের দেহে
ধর্মপ্রাণ বিশ্বাস হাতির শুঁড়
গীতাপাঠ চলছিল কত দূরে
হাওয়ার পদক্ষেপে আমরা জড়িয়ে ধরেছিলাম নিজেকে
সুপারির সারি কেঁপে উঠছিল
বনস্থল অন্তরীক্ষ এবং মর্ত্যের
মাদল বাজিয়ে মশাল জ্বালিয়ে বুনোহাতি তাড়ানো লোকেরা
জেগে উঠে কোথাও হারিয়ে যেতে চাইছিল না
বৃষ্টি হচ্ছে দেখে সূর্য ওঠেনি তখন
#
আমি হারিয়ে যাওয়া মানুষ তো নোই
গ্রহগ্রহান্তরে মিশে থাকা অগ্নি ও পাথর
ভেসে থাকা জেগে থাকা পরমাণুকণা
ধর্মগ্রন্থের বাণীতে ভ'রে থাকা নিশ্চল জগত
কাউকে কোনও অভিমুখে চলতে দেখিনি
সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ জেনে যারা সন্তান আনেন
তাঁদের মতোই ভবিষ্যতদ্রষ্টা হতে চেয়েও হয়েছি
হাসির খোরাক
আমরা ঘুমিয়েছিলাম জেগেও ছিলাম না তা তো নয়
আর একটা যথার্থ ব্যর্থতার ফুল পেলে
গুড়মোয়া তিলনাড়ু সর্ষেফুল
ফেলে পালিয়ে যাবোই পাহাড়ের বুকে
#
একজন চাটুকার শীর্ষাসনে
একজন রাজপুরোহিত আমাকে মন্ত্রের মধ্যে নামিয়ে দিলেন
হেরে যাওয়ার ভয়ে কাঁদছি সঙ্কটে ডাকছি তোমাকে
রেলপথ আর পথঘাট উপার্জন নিয়ে দূরে চলে যাচ্ছে
বেদে-তাঁবুর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে বিষ ও বিষয়
ঈশ্বর প্রেরিত পুরুষেরা ধ্যান শিখছেন
সামান্য ঘটনা নিয়ে রোজ ঘুমিয়ে পড়ছি পাশাপাশি
দেখছি প্রেমের নান্দনিক মুহূর্তে তোমার স্তনে বসন্তের পোকা
বুঝে না বুঝেই তাড়াতে চাইছি
অসুস্থতার বিষয় ঘামের বিষয় ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে ঘুমে
পিঠে সুড়সুড়ি মাখা কালোপিঁপড়েরা
ফিরে যাচ্ছে
#
কতগুলো সূত্র জেনেছি এরই মধ্যে
ক্রুশে তুলবার আগে মন্ত্রগুপ্তি ও স্মরণ গায়ছেন মনে মনে
তিনতালে ফেল করছে ভোরের রাগ
দড়ির ওপরে হাঁটতে হাঁটতে যাদুকর তার মেয়ে তার ছেলে
ফিসফিস ফিসফিস কেন এত ফিসফিস
কী বলছে না জনতাকে
ধরে ফেলেছি ইত্যাদি সূত্র
সূত্রগুলো ভোরের চাঁদের মধ্যেই পেয়েছি
বেণীখোলা তোমাকে লাগছে মজে যাওয়া নদীটি
তুলতুলে ধাক্কা দিচ্ছি ওঠ ওঠ
সকালের আগেই কোথাও দেখা হওয়ার কথা সকালের
জাহাজটা কোথাও নিয়ে কী যাবে
#
জাহাজের কথা বলা হয়নি কোনওদিন
বন্দর থেকেও বহুদূরে লাইটহাউস
সস্তা সরাইখানার আঁচে শীতরাতে একজন পাদ্রী আর বেশ্যা
পাতলা পোশাকে বেশ্যা মুখে দুষ্প্রাপ্য ওয়াইন গন্ধ
গুডফ্রাইডে দ্য লাস্ট সাপার নিয়ে তারা বিতর্কে জড়িয়ে
জাহাজের ভেঁপু বাজবার আগে চলে যেতে হবে নাবিককে
অথচ গল্পটা থামছে না
পাদ্রী যত হাত-নেড়ে বেশ্যা তত চিৎকার
জাহাজের ভেঁপু বাজে
জাহাজের কালোধোঁয়া শীত ভাঙে
নাবিক শুনবে কেন - জোর করে তুলে নিয়ে যায়
সেই থেকে ধর্ম আর বেশ্যা জাহাজে আজও তর্কে
#
আমরা নদীর কাছে পৌঁছে গেছিলাম
আধামানব পোশাক-পরা লোকেরা লুকিয়ে সেইখানে
প্রত্যেকের এক একটা বন্দুক আর অগুন্তি বুলেট
বেশ্যা আর জাহাজের গল্পটা তাদের জানা ছিল না কী ?
সস্‌প্যানে ফেলা মাছের ছবিতে ছ্যাঁত শব্দ পেলাম তোমার
ওরা জলপাইয়ের গল্প বলল - আমরা ওয়েদার
ওরা হাসল আমরা কিছুই না
চলে যাওয়ার আগে ওদের বন্দুক ওদের সভ্যতা পরখ করল
তখনও কিন্তু চাঁদ ওঠেনি তবুও জাহাজটা জলে ভাসছিল
ওরা বেশ্যা তর্ককেই বেছে নিল
পাদ্রী লোকটি ডেকের একটা নোংরা কোণে দ্য লাস্ট সাপার আঁকছিল কী
তুমি শুয়ে শুয়ে দেখেছিলে
#
সকাল কি বুকে এসে ঘাই মারছে - কি জানি
প্রেতপুরী থেকে কেন এসেছিলাম মাটিতে
একটা যথার্থ হত্যা শিল্পকে নির্যাস দিতে পারে - গানটা বাজছে
সূর্যোদয়ের প্রার্থনা পাখির ডানায় ভেজা জলে
ভোর হবে আলো হবে খাদ্য হবে খাদক আসবে
ব্লাউজের ফিতে খুলে যাবে
ট্রেন সাইরেন - আসলে সঙ্কেত দেবে ভোর হল ভোর হল
পিজারো বাহিনী কালোবাঘিনীর চোখ উপ্রে -
আসলে উচিত নয় বলা - কালোবাঘিনীর চোখ উপ্রে
উলটিয়ে পালটিয়ে রাজা নাড়বেন
হিংস্র সকাল আরও হিংস্র হবে বৃষ্টির সকালে
লেপ জড়িয়ে যতই ঢেকে রাখো না শরীর
#
যে হলুদ পাতা ঘেমে ওঠে গাছের তলায়
হাওয়া অথবা মাটি ঢেকে দেওয়ার আগে চোর ও কৃষক পাশে তার
কৃষকটি হলুদপাতাকে ফসলের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন
চোরটি পাতাকে বলছেন - বিনিময় হও
এস কৃষি হই
এস চোর হই
কৃষক পাতাটি কুড়িয়ে জমিতে ছড়িয়ে দেবেন
চোর পাতাটি কুড়িয়ে শীতের আগুন জ্বালবেন
একটা বিষাক্ত সাপ দু'জনার কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে
এই বিষ কাকে দেবে ? কে নেবে ? ফসল - নাকি চোর
বিষ হও
অন্তত প্রয়োগ করো না করো মুখে তো রাখো - সাপের ভাষণ
#
মৃতের সঙ্গেও শুয়ে দেখেছি পৃথিবী আলো জল এক
মৃত্যুর সঙ্গেও লড়ে দেখা পৃথিবী ওষুধ সব এক
একজন গণিতজ্ঞ বিষয় ও বস্তু সম্বন্ধে যা বলেছিলেন তা
একজন ভিখারি অথবা মাস্টার বললেও বিষয় বদলে যায় না
এটা বললেই ভালো হত শাড়ি আর শাড়ির মানুষ এক নয়
মনে হয় একটা স্বপ্নের বিছানায় ঘুমিয়ে রয়েছি
পাল পাল উড়ে যাচ্ছে প্রজাপতি
পাল পাল উড়ে মরে যাচ্ছে প্রজাপতি
একটা পালক উড়তে উড়তে মুখে
একটা পালক উড়তে উড়তে চোখে
প্রজাপতির মুখে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত
প্রজাপতির পাখনায় মাকড়সা-জাল
#
আবারও বৃষ্টি নিভে জাগছে আকাশ
আমি মৃত্যুর সঙ্গেও দরকষাকষিতে হেরেছি
ওঠ - নিথর একটা দেহজাত শব্দ ফুলজাত ভাব
খাটে শুইয়ে রেখেছি মৃত প্রজাপতি
পাখনা গুটিয়ে নিয়ে অদ্ভুত সারল্যে ঘুমিয়ে রয়েছে
ডাকবো না - উঠবে না
বুনোহাতি তাড়ানোর বল্লম মশাল নিয়ে জেগে উঠেছে দেশীয়
'হেই সামালো' বল্লম 'হেই সামালো' মশাল
সিলিং এ মাকড়সার জালে ফেঁসে মৃত প'ড়ে আছে
'হেই সামালো' বল্লম 'হেই সামালো' মশাল
বল্লম মশাল নিয়ে বেরিয়ে পড়ব পড়ব পড়ব পড়ব পড়ব না
বুনোহাতি ভয়ঙ্কর ধেয়ে ক্ষেতখামারের দিকে

ফেসবুক মন্তব্য