বহু বাসনায় প্রাণপনে চাই

রত্নদীপা দে ঘোষ

চুপ ।
উৎকর্ণ সেতুটি কোথায় শুনতে পাওয়া যায়  । যদি এক চুড়ো গাছ পৃথিবীর জানালায় মাখামাখি দ্য্যয় মহানির্বাণের স্তূপ । অভিসারে বসে থাকা । যদি । চোখ স্বারস্বত মন্দিরের ঘরে নিরন্তর নিয়ে আসে তৃপ্তি । যদি ওমের দেওয়াল দৃষ্টিতে এসে বসে। হাত ধরে আর সুধন্য হয় তমসা । যদি সন্তান থেকে সন্তানে নতুন স্তন্য বয়ে নিয়ে যায় বুক । যদি কোনদিন বটের ছায়ার মত অনিবার্য দালান হয়ে ওঠে হাত । নিঃশ্বাসের অপার কুচি , বৈঠক আঁকড়ে ভিজে গা। নামের খণ্ড ।
প্রতি পংক্তির তাপ । শীতের অনির্বাণ । তাপমাত্রার প্রখর চাবিকাঠি হয়। যদি মাত্রাহীন এক পল ।
হঠাৎ অদ্ভুত ।
আবেশ দাবি করে শিখাময় দ্বাপরের কবি । যদি প্রদীপের তানে প্রজ্ঞাই একমাত্র প্রেয়সী । আর তাবৎ মূর্ছনার রূপসী । ঐশ্বর্যময় শুভ্রশঙ্খের দেবকুঁড়ি । যদি নিকনো উঠোন জুড়ে কল্কা । সলতে । হোমস্নান নিবিড় যদি শোনা যায় । শেষ অব্ধি অক্ষত থেকে জানতে পারা যায় । অধিবিদ্যাটি অভিমানের পদ্ম আর কস্তাপাড়ের ভূমি ।
অধিষ্ঠাত্রী দেবি তো সেই । শিলায় নৌকোয় আর তলদেশের আভাশে । আনত আহ্লাদ আহ্বান আর চিরাচরিত তোলপাড়ের ইশারা জুড়ে । দুর্দান্ত সুরাপাত্রে বাসনার মূর্তিপ্রতিমা । নিজস্ব সন্ধ্যার কাঠামো। সৈকতে সাজানো কত রঙের ঊষাপান। ভোরবেলা নিজেই তুরীয়। প্রত্যুষের দেরাজে পুঁটুলি বাঁধা, মীড়।অসময়ের সোল্লাস ফাটিয়ে ।
ঈশ্বরের শেষপ্রান্তে এসে তবেই না দেবতায় পৌঁছনো । এই পৌঁছনোর রাস্তাটি আসলে একটি ঘুমপুষ্ট পরমায়ু । যত গভীর ততই অস্ত্রহীন । দাহহীন । প্রসাধনহীন । বস্ত্রহীন হোয়ে বিবস্ত্র বিশ্বকে দ্যাখা মোহউজাড় । পাখি গাইলে পাখি । নদী গাইলে নদী । পবিত্র কিনার । সমাধির লাজুক ঘেঁসে জমিন আর আতপের সমাহার । সরীসৃপসম। মানুষ যাকে প্রণয় বলে ডাকে সেই ঝিল্লীর পশরা । তরুণী শিরোনামে আত্মঘাতী হতে না পারা সব চাইতে উজ্জ্বল এক গোধূলি যার ডাক নাম তারা । সদা একাকীত্বে দুঃখী আছে প্রবল ।
সেই ছন্দবাণীর দুঃখরত্নটি । তানপুরার একমাত্র বয়ান ।
আঙুলের কোরান থেকে জন্মানো নতুন কোনো প্রাণকোরাস । ভ্রমরের মুখ উড়ে এসে জুড়ে দিনদুনিয়ার ঘুড়ি । গমগম সেই কড় গোনা । কবেকার মেহেন্দি-মিলনের চিঠিতারানা। কোন এক সাংস্কৃতিক বেহস্তে । সেইসব সারিসারি বৃষ্টিরোদের গায়কীতে। উচ্ছল বোল। আয়াত । কনকাঞ্জলি ।
লয়কারির মৃদুতায় কিশোরীজল । ছলছল । আনন্দে। বেদনায় । মাইলে। ফলকে। দংশনও এমন সুদর্শন হয় তবে । মধুরমের অথৈ-ও এমন পূর্ণজ্যোতি ।
এক ফোঁটা মথ না ছুঁয়েও অতিথি-প্রজাপতিদের চারদিক এমন সরোবর যে কলজের টাটকা প্রাণপাখিও খুবসুরত একটি ফুড়ুত । হ্যাঁ হ্যাঁ । জানি আমিও । উড়ে যাওয়ার বর্মটি । আর তার সাথে হাজার সান্ত্রী । পাইক । লেঠেল । আমলা-সভ্যতার সোনার হরিণ । মঞ্চের মাঝে আমিও যে বরকন্দাজ সেজে দাঁড়িয়ে ।
লোহার জিহাদটি যদিও নাড়ি টিপে বসে রয়েছে । বিধর্মী কোনো চরাচর গজরাচ্ছে ঝমঝম।
রেলঅন্ধকার । লম্বাপাহাড়ভ্রমণ ।
তীব্র হুইসিলের ফুল্কি পায়ের তলার মাটি পিষে দিচ্ছে । লকলকে আঘাতলাল । ইচ্ছে দিলেই ফিরিয়ে আনতে পারা যায় । পালক জমানো সুতনুকা অভ্যেস । ইচ্ছে করলেই হাজার বরষাআলো , কুর্নিশ পরা ভাসান । নতুন ত্বক , নিশান । গা ঢাকা দেওয়া এক প্রকার নিশানাও বটে ।
বারান্দাদূর । তিরিশ বছরের পুরনো পতঝর । পান করতে করতে।
কামরাঙা গাছে ঝুলে আছে সবুজ খুঁটে খাওয়া চাঁদ ।
দুলে আছে বহুদিন । চাঁদের বিনীত কণ্ঠ ।
পরমহংসের সংসার ।
ভিজে মোম । লক্ষ্মীবিলাস । দুঃখের খালে সনাতন গরীব । জ্যোৎস্নার রথ । দুর্ভিক্ষের ধুলো । ভেবেছি সব । সব ঠিক হোয়ে যাবে । সারা শরীরে একটাই কাচের শিখা। তারও একটাই শাখা । বিনা পারিশ্রমিকে আশার কুহুলতাটি । শোকের সমস্ত রূপ । দোসর চুরি কোরে পালানো।
এই যে অমন অলীক গলানো হাতছানি। তা আসলে ভুলে যাওয়ার মতই নড়বড়ে । যতখানি ভুলে যাওয়া নয় তারচাইতেও বেশি । অনেক বেশি ভুলেযাওয়াময় নেশাগঙ্গার ঘাট। বিশ্বাসের মত স্পষ্ট কিছু । আবার অবিশ্বাসের মত অস্পষ্ট । বিভা । সাদা-সাপটা সমস্ত জিত । দৌড় দিয়ে বাঁধানো নাবিকহেন সেই মন্দমন্থর । গরিমাটিকে মরমের দ্রুতি । নাই বা হল নাব্যতা । না হোক মন্ত্রের গায়ত্রী । এই যে অনবরত অন্বেষণ । উপমার সৎ ডিঙানো ওম ।
নতুন কিছু নয় । এ ঘুণাক্ষরে লেখা করতলের পলাশ । বহুযুগের পুরনো রহস্যপিরামিড । চেনা-অচেনার তিনদিক । বারোটি মমিমৌন । আলাপের অমোঘ উপাদান। নির্বোধ অশ্রু । অসহায় সাবধান।
এই উপাদানেই । এই উপধ্যানেই ঘরবাড়ি । সাঁজোয়ার সম্পদ।
নৃতত্ত্ব বিছানো । নক্ষত্রের মাদুরপাতা ঈর্ষার ভৌতবিজ্ঞান।
এই প্রেমময় পুলকনাট্যসন্ধ্যাটি । এই পাথরস্লেট । পাতার কুরচিবাটি । আন্তরিকের যৎসামান্য চরণমুদ্রা । শরৎ হেমন্ত সাধ্য এবং সাধক । যাপনবীমার প্রকাশ । প্রকাশিত মেদুর । অমলিনের একাগুলি ।আঁকাগুলি স্নেহের রক্ত । শব্দের । পরিক্রমার । কত কথা ডাকছে । কত গান বইছে গানের আকারে ।
আত্মার ভেতরেও কত রকমারি বাঁশী । একটি বাঁশী পেরিয়ে আরেকটি বাঁশী । এক বাঁশীর মহত্ব লুপ্ত করে অন্য একটি । কোন বাঁশীর চর্চা সবচেয়ে উপযোগী । কোনটি ফোঁটা ফোঁটা উৎক্ষেপণ । কোন বাঁশী খাসমহলের খাসভৃত্য ? কোন বাঁশীর বাঁকে শ্রেষ্ঠ গণৎকার। কোনজন বাসনা। কে বা চাবুকের ছায়া । গ্রহণের দোষে জারানো কোন বাঁশী আসলে এক শিশুবেলার বৃদ্ধ উপলব্ধি ।
এই অনিশ্চিত বেজে থাকা , বেঁচে থাকা কি কম ?

ফেসবুক মন্তব্য