স্মৃতিসৌধের শহর বার্লিন

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়



বার্লিনকে বলা যেতে পারে ‘স্মৃতিসৌধের শহর’। শহরময় অজস্র স্মৃতিসৌধ তাদের যার যার বিচিত্র কলঙ্কের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে। বার্লিনবাসীরা তাদের গ্লানিময় ইতিহাস সম্বন্ধে এতটাই লজ্জিত যে নিজেরা তো ভুলবেই না, পরবর্তী প্রজন্মকেও ভুলতে দেবে না। তাই নাৎসিবাহিনীর প্রতিটি পাশবিক ঘটনাকে তারা মেমোরিয়াল বা স্মৃতিসৌধ রূপে শহরের সর্বত্র সাজিয়ে রেখেছে। আমার এক জর্মান বন্ধু একদা বলেছিল, অন্যদের দেখি নিজেদের দেশ বলতে গর্বে বুক ভরে ওঠে। আমাকে যখনই বলতে হয় যে আমি জর্মান, লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। অদ্ভুত এই অপরাধবোধ আরও অনেক জর্মানের মধ্যে নজর করেছি। এই সম্মিলিত জাতীয় গ্লানিরই প্রতিফলন বোধহয় বার্লিনের স্মৃতিসৌধগুলি। যদি এর মাধ্যমে নিজেদের জাতীয় লজ্জা কিছুটা লাঘব করা যায়, পিতৃপুরুষদের অনপনেয় পাপের কিছুটা অন্তত প্রায়শ্চিত্ত করা যায়। অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাবার জন্য ওদের এই ব্যাকুলতা আমাকে বিস্মিত করে! অপরের প্রতি দোষারোপ ও ঘৃণা না পুষে নিজেকে সংশোধন করার একনিষ্ঠ প্রয়াস এবং আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির চর্চা যেকোনও ব্যক্তি বা জাতির পক্ষে ইষ্টকারী। সম্ভবত সেইকারণে বিগত কয়েক দশকে জর্মানি এত দ্রুত এগিয়ে যেতে পেরেছে।

বার্লিনের Jewish Museum ইউরোপের বৃহত্তম ইহুদি স্মৃতি সংগ্রহশালা। এখানে প্রদর্শিত বিভিন্ন বস্তু, দৈনন্দিন সামগ্রী, শিল্পকর্ম, ঐতিহাসিক তথ্যাদি দেখলে পরিষ্কার বোঝা যায় ইহুদি ও জর্মানদের মধ্যে একসময় কি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল! আমাদের অভিন্ন বাংলার কথা মনে পড়ে। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ যখন অখণ্ড বাংলা ছিল তখন হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যেও যথেষ্ট সদ্ভাব ছিল। উভয়ের সৌহার্দ্যের সম্পর্ক নিয়ে কত কাহিনিই না লেখা হয়েছে! দেশবিভাগ শুধু ভৌগোলিক বিচ্ছেদ নয়, উভয়ের হৃদয়কে চিড়ে দুফাল করে দিয়েছে। তাই আজ দুই রাজ্যে এত হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, দুই সম্প্রদায়ে হাজার মিল সত্ত্বেও এত শত্রুতা। হিংসা ও পাশবিকতা বিশ্বে আগেও ঘটেছে, আজও ঘটছে। আর তার পেছনে চিরকাল থেকেছে রাজনৈতিক অভিসন্ধি যার মাশুল গুণে গেছে সাধারণ মানুষ। এদেশে কি কোনওদিন এমন এক মিউজিয়ম হবে যেখানে প্রদর্শিত থাকবে অখণ্ড বাংলায় হিন্দু-মুসলমানদের দীর্ঘ সৌভ্রাতৃত্বের ইতিহাস?

বার্লিন জিউইশ মিউজিয়মের দুটি ভাগ – পুরনো বিল্ডিং এবং নতুন বিল্ডিং। এর প্রবেশদ্বার পুরনো বিল্ডিংয়ে, সেখানে সিকিউরিটি চেক করে সুদৃশ্য সিঁড়ি দিয়ে বেশ খানিকটা নীচে নামলে পৌঁছে যাওয়া যায় জিঙ্ক-প্যানেল দেওয়া ঝাঁ চকচকে নতুন বিল্ডিংয়ে যেটি ড্যানিয়েল লিবেস্কিন্ডের স্থাপত্য। এটি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে লিবেস্কিন্ড বলেন - “The new design created a year before the Berlin Wall came down was based on three conceptions that formed the museum’s foundation: firstly, the impossibility of understanding the history of Berlin without understanding the enormous intellectual, economic and cultural contribution made by the Jewish citizens of Berlin. Secondly, the necessity to integrate physically and spiritually the meaning of the Holocaust into the consciousness and memory of the city of Berlin. Thirdly, that only through acknowledgement and incorporation of this erasure and void of Jewish life in Berlin, can the history of Berlin and Europe have a human future.” (Source: Jewish Museum Berlin Wikipedia)। সিঁড়ি দিয়ে বেসমেন্টে নামলে তিনদিকে তিনটি পথ চলে গেছে যেগুলির নাম যথাক্রমে Axis of continuity, Axis of exile এবং Axis of the Holocaust । অ্যাক্সিস অফ এক্জাইলের দেয়াল বরাবর কাচের কেসে সংরক্ষিত হলোকস্টে মৃত ইহুদিদের ব্যবহার করা খুঁটিনাটি জিনিস – কাপ, বোতাম, কম্বল, এক টুকরো চিঠি - আর প্রত্যেকটির পাশে তার সম্বন্ধে যৎসামান্য বিবরণ। দেখলেই বোঝা যায় কি যত্ন, অধ্যবসায় ও মমতা সহকারে এগুলি সংগৃহীত ও সংকলিত। অ্যাক্সিস অফ এক্জাইলের শেষ প্রান্তের দরজা দিয়ে বেরোলেই Garden of Exile & Emigration-এর নিরুদ্ধ স্থপতি। খোলা আকাশের নীচে নির্মিত মোট ৪৯টি স্তম্ভ বিশিষ্ট এই স্ট্রাকচারটির ৪৮টি স্তম্ভ ১৯৪৮ সালের (স্বতন্ত্র দেশ হিসাবে ইজ্রায়েল-এর জন্মসাল)প্রতীক এবং এর প্রত্যেকটি ঠাসা বার্লিনের মাটিতে। ৪৯তম স্তম্ভটি বার্লিনের প্রতীক যাতে ভরা জেরুজালেমের মাটি। এইভাবে বারবার বার্লিন ইহুদিদের একেবারে তার নিজের মধ্যে মিলিয়ে একাকার, আত্মস্হ করে নিতে চেয়েছে। স্তম্ভগুলির সুউচ্চ মাথায় লাগানো অলিভ গাছের দোদুল্যমান সবুজ হাতছানি অপ্রাপনীয় মুক্তির প্রতীক। সমগ্র স্হপতিটির উদ্দেশ্য ছিন্নমূল, নিপীড়িত, নিঃস্ব, হতোদ্যম যে ইহুদিরা নাৎসিবাহিনীর নৃশংসতা অতিক্রম করে পালিয়ে আসতে পেরেছিল, তাদের মানসিক বিপর্যয়ের খানিকটা অন্তত আভাস যাতে এখানে আসা পর্যটকরা পেতে পারে। বলা বাহুল্য, সে প্রয়াস সর্বতোভাবে সার্থক কারণ স্বল্পক্ষণ এখানে কাটালেও এর বিষণ্ণ চাপ মনকে ভারাক্রান্ত করে এবং যেমানুষগুলি এই পরিস্থিতিতে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছিল তাদের জন্য সহমর্মিতার বোধ না জেগে পারে না।

অ্যক্সিস অফ হলোকস্ট ধরে এগোতে থাকলে পৌঁছে যাবে Holocaust Tower-এর অন্ধ প্রান্তে। এর উঁচু আলোবাতাসহীন অন্ধ দেয়াল যেন দম বন্ধ করে দেয়। লিবেস্কিন্ডের ভাষায় -"That which can never be exhibited when it comes to Jewish Berlin history: Humanity reduced to ashes.” (Source: Jewish Museum Berlin Wikipedia)। উঁচু দেয়ালের গায়ে এক চিলতে জানলা বাইরের ছিটেক পরিমান আলো ও আওয়াজ বয়ে এনে নিঃসঙ্গতার ভার শতগুণ অবহ করে তোলে। এর হেলানো মাটিতে হাঁটলে মাথা ঝিমঝিম করে। উপরদিকে তাকালে গা গোলায়। চারদিক থেকে দেয়ালগুলো যেন শ্বাসরোধ করতে এগিয়ে আসে। যেকোনও পরিদর্শক কয়েক মিনিটেই নিঃসীম একাকিত্ব, অগাধ শূন্যতা এবং চরম নৈরাশ্যের বোধে ক্লিষ্ট হয় এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওখান থেকে পালাতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই অবাস্তব নির্বেদ কত সহস্র গুণ বৃদ্ধি করলে সেই তাপিত ইহুদিদের দুঃসহ ক্লেশ আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব?
Axis of Continuity ভাগ্যহীন ইহুদিদের জর্মানিতে এসে নতুন করে পথ হাঁটার প্রতীক। এর প্রান্তে স্থিত সিঁড়ি নিয়ে যায় দোতলার প্রধান সংগ্রহশালায়, যেন সব গ্লানি, লজ্জা আর বেদনার জড়ত্বকে নীচে ফেলে রেখে আত্মশুদ্ধির সোপান বেয়ে বাস্তবে ফিরে আসা, নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে এবার ইতিহাসকে পর্যালোচনা করা। সংগ্রহশালার দুটি ভাগ, পার্মানেন্ট এক্জিবিশন যেখানে আছে জর্মান-ইহুদি ইতিহাসের সযত্ন সংকলন এবং চেঞ্জিং এক্জিবিশন যাতে আছে আধুনিক শিল্পভাবনা, থিম ও ধারার প্রদর্শনী। মিউজিয়াম শেষ হয় এক অডিও ইনস্টলেশনে যেখানে আছে ১৯৪৫ পরবর্তী জর্মানিতে বড় হয়ে ওঠা ইহুদীদের ছোটবেলার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্মৃতিকথা।

জিউইশ মিউজিয়ামের Shalekhet বা Fallen Leaves মেঝের ওপর ছড়িয়ে থেকে অগুন্তি ভয়ার্ত স্টিলের মুখ। স্রষ্টা মেনাশে কাদিশমান এটিকে নিবেদন করেছেন হলোকস্টে মৃত ইহুদিদের উদ্দেশ্যই শুধু নয়, বস্তুত হিংসা এবং যুদ্ধে হত সমস্ত মানুষদের উদ্দেশ্যে। পরিদর্শকদের আমন্ত্রণ করা হয় ওই মুখগুলির উপর দিয়ে হেঁটে স্টিলে স্টিলে ঘর্ষণের আওয়াজ শুনতে যদিও কাতরানো, ক্লিষ্ট, মৃত ব্যক্তিদের প্রতীক মুখগুলির ওপর পা রাখতে আমার মন তীব্রভাবে অস্বীকার করে।
বার্লিন শহরের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত Memorial to the Murdered Jews of Europe যা বেশি পরিচিত হলোকস্ট মেমোরিয়াল নামে। এটি অসংখ্য ছাই রঙা বিভিন্ন দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বিশিষ্ট কংক্রিট স্ল্যাবের এক সমাহার। দেখে মনে হয় এক কবরখানা। এর মধ্য দিয়েও একটুক্ষণ চললে সেই এক মাথা ঝিমঝিম করা অনুভূতি জাগে।

The Memorial to the Sinti and Roma Victims of National Socialism নাৎসিবাহিনীর সিন্টি ও রোমা গণহত্যার স্মরণে স্থাপিত। এই সিন্টি এবং রোমা উপজাতিরা যে ভারতীয় সিন্ধি এবং রাজস্থানি উপজাতিদের পূর্বপুরুষ ছিল এমন একটা জোরদার মতবাদ আছে। দেয়াল ঘেরা সৌধটির মধ্যিখনে এক ক্ষুদ্র জলাশয় যার কেন্দ্রে একটি ত্রিকোণাকৃতি পাথর আর তার উপরে প্রতিদিন রাখা হয় একটি করে তাজা ফুল। ত্রিকোণ পাথরটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিদের বাহুতে বাঁধা ব্যাজের প্রতীক। চারদিকের ঘেরা দেয়ালে সিন্টি ও রোমা গণহত্যার খুঁটিনাটি বিবরণ টাঙানো। এর ঠিক উল্টোদিকে আছে আরেকটি অনন্য স্মৃতিসৌধ Memorial to Homosexuals persecuted under Nazism। একটি চৌকোণা কংক্রিটের গঠনের সামনের দেয়ালে ছোট একটি জানলা আর তার মধ্যে চোখ রাখলে দেখা যায় একটি ফিল্ম যাতে দুজন পুরুষ পরস্পরকে চুম্বন করছে। লেসবিয়ানদের জোড়াজুড়িতে এখন নাকি প্রতি দু বছর অন্তর দুটি সমকামী নারীর চুম্বন দৃশ্য দেখানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বার্লিনের রাস্তায় ফুটপাথের ওপর ধাতব Stolpersteine যার আক্ষরিক অর্থ হোঁচট খাওয়ার পাথর, আমার মনে গভীর দাগ কাটে। স্টোলপারস্টেইন বস্তুত ফুটপাথে বসানোর সাধারণ চৌকো কংক্রিট টাইল মাত্র, যার ওপর লাগানো ধাতুর পাতে খোদাই করা থাকে ওইস্থানে নিহত বা গ্রেপ্তার হওয়া ইহুদির নাম ও ঘটনার তারিখ। জর্মন শিল্পী গুন্টার ডেমনিংয়ের মস্তিষ্কপ্রসূত এই শিল্পভাবনার পিছনে আরেকবার দেখি জর্মনদের নিজেদের গ্লানিময় ইতিহাসকে জাতির স্মরণে জাগিয়ে রাখার দুর্মর প্রচেষ্টা, কারণ সংগ্রহশালায় না গিয়ে থাকা সম্ভব কিন্তু প্রতিদিনকার চলার পথকে মানুষ এড়িয়ে যাবে কি করে?

Synagogue Museum -এর বিশাল হলে প্রদর্শিত পুনরুদ্ধার পর্বে মাটির তলা থেকে খুঁড়ে পাওয়া তোড়া (Torah) ও স্ক্রোল। এছাড়া আছে ইহুদিদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানান অনুষঙ্গ - পরনের পোষাকের টুকরো, পর্দা, চার্চের ভাঙা স্তম্ভ, পাথরের বাটি, চলটা ওঠা ভাঙা বেসিন -- সবকিছু সযত্নে সাজানো আগামীদিনের মানুষদের জ্ঞাতার্থে। কোনও বাচ্চার কচি হাতে আঁকা ছবি, কোনও শিক্ষার্থীর হাতে লেখা স্বরচিত কবিতা, একটি পবিত্র স্ক্রোল -- বিগতদিনের ইতিহাসকে ধরে রাখার উদ্দেশ্যে নিতান্ত তুচ্ছাতিতুচ্ছ বস্তুও কাচের শোকেসে মূল্যবান সম্পদ রূপে সযত্নে সংরক্ষিত।
Berlin Wall Memorial জর্মন এলাকার মধ্যস্থলে ঐতিহাসিক বের্নওয়ার স্ট্রাসে অবস্থিত। পুরনো বর্ডার স্ট্রিপের ১.৪ কি.মি. দেয়াল এখানে স্মৃতিসৌধ হিসেবে সযত্নে সংরক্ষিত । পেছনে খোলা মাঠ। কত বন্দি এইখান দিয়ে পালাতে গিয়ে নিহত হয়েছে, কত নেপথ্য অত্যাচার ও করুণ দৃশ্যের সাক্ষী এই মাঠ ও দেয়াল। আজও ওখানে দাঁড়ালে যেন তাদের বেদনাদীর্ণ দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়, বুকটা বহুক্ষণ সেই চাপে ভার হয়ে থাকে। উল্টোদিকে ডকুমেন্টেশন সেন্টারে সংরক্ষিত বার্লিন ওয়াল সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্য সম্বলিত এক স্থায়ী প্রদর্শনী, আর আছে লিফ্টে করে বিল্ডিংয়ের ছাতে গিয়ে বার্লিন ওয়ালসহ পুরো জায়গাটার বিস্তারকে ওপর থেকে দেখার ব্যবস্থা।

বার্লিন ওয়াল থেকে Kaiser Wilhelm Memorial Church খুব বেশি দূর নয়। এটি বার্লিন শহরের এক উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডমার্কও বটে। পুরনো চার্চের ধ্বংসাবশেষটি অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত এবং মূল্যবান একটি ওয়ার মেমোরিয়াল (war memorial) হিসেবে প্রদর্শিত। Chapel of Reconciliation পুরনো Church of Reconciliation-এর জায়গায় নবনির্মিত। আধুনিক স্থাপত্যে গঠিত গীর্জাটির বাইরে অবস্থিত রিকনসিলিয়েশন শীর্ষক স্থপতিটি লক্ষ লক্ষ সাথীহারা, প্রিয়জনবিচ্ছিন্ন ইহুদিদের স্মরণে মর্মস্পর্শী এক স্মৃতিসৌধ। এটি তৈরি করেছেন বৃটিশ শিল্পী জোসেফিনা ভ্যাসকনসেলোস। বাচ্চাদের যেখান থেকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যাওয়া হত সেই স্টেশনের বাইরেও আছে এক করুণ স্মৃতিসৌধ।



বার্লিনের সবকটি স্মৃতিসৌধ দেখে ওঠার মত যথেষ্ট সময় আমি পাই নি তবে পেলেও সমস্ত স্মৃতিসৌধ দেখার মত মনের জোর আমার ছিল না। দিনের পর দিন বার্লিনবাসীরা কি করে অতগুলি স্মৃতিসৌধের চাপ বহন করে বাঁচে ভেবে স্তম্ভিত হতে হয়! তবে স্মৃতিসৌধগুলি আমাকে মুহ্যমান করলেও সকৌতূহলে লক্ষ্য করেছি, কমবয়সী জর্মনদের মধ্যে অপরাধবোধের চাপ অনেক কম। তারা আসে, দেখে, কিন্তু অযথা আবেগে মথিত না হয়ে একধরনের ক্লিনিকাল নৈর্ব্যক্তিকতা নিয়ে সব তথ্য জানে। সম্ভবত দৈনিক ডোজে কাউকে তার কলঙ্কজনক ইতিহাস সেবন করালে একটা প্রতিবর্তনক্ষমতা জন্ম নেয় যার জোরে সে তার ক্লেদাক্ত ইতিহাস থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে পারে। ফলে তার মধ্যে দেখা দেয় এক সুস্থ নিরাসক্তি, সহিষ্ণুতা এবং সহানুভূতির বোধ। ইতিহাস তখন আর ব্যক্তিগত লজ্জা রূপে পীড়া না দিয়ে এক নক্কারজনক সার্বজনীন লজ্জার কাহিনিতে পর্যবসিত হয়।

আমার এই বিবরণ পড়ে যদি কেউ মনে করেন যে বার্লিন নিষ্প্রাণ বিষণ্ণ শীতল এক শহর, তবে তিনি ঘোর ভুল করবেন। বার্লিনের স্মৃতিসৌধগুলি আমাকে আকৃষ্ট করলেও বার্লিনে আনন্দের উপকরণেরও কমতি নেই। সুসমৃদ্ধ ওল্ড আর্ট মিউজিয়াম, নিউ মিউজিয়াম, বার্লিন ডোম, বার্লিন গেট, রাইশটাগ বিল্ডিং, অভিনব পট্সডামের প্লাট্জ (যেখানে হলিউড ঢংয়ে রাস্তার ওপর বসানো ক্যমেরায় চোখ পাতলে দেখা যায় বিখ্যাত নায়ক-নায়িকাদের নামকরা সিনেমার ক্লিপিংস), ফিল্ম ফেস্টিভাল, রিভার ক্রুজ, বীয়ার ফেস্ট ছাড়াও আছে ইতালিয়ান, মেক্সিকান, কোরিয়ান, ভিয়েতনামিজ প্রভৃতি নানান রেস্তোঁরা, স্নিগ্ধ বর্ণময় ফার্মার্স মার্কেট, সুদৃশ্য পার্ক, ইউ-বানের সুশৃঙ্খল রেলব্যবস্থা, শহরের মধ্যিখানে অবস্থিত হেল্থ স্পা এবং বিশ্বের বড় বড় শহরগুলিতে লভ্য যাবতীয় মনোরঞ্জনমূলক উপকরণের পসরাও। স্প্রী নদীবক্ষে আমার বার্লিন শহর পরিদর্শন করার মনোরম অভিজ্ঞতা কখনও ভোলার নয়। কার্ল মার্ক্স অ্যালীতে তিনদিন ব্যাপী বীয়ার ফেস্টও এক পরম উপভোগ্য ইভেন্ট যেখানে আসে ৮৬টি দেশ থেকে ২০০০ রকম বীয়ার। তার মধ্য এ অধম মাত্র চার রকম বীয়ার টেস্ট করে – ব্ল্যাক বীয়ার, কির্স্চবিয়ার রেড, হুইট বীয়ার আর সেলার বীয়ার। হুইট বীয়ার আমাকে এত মুগ্ধ করে যে বার্লিনে থাকাকালীন বাকি দিনগুলি আমি হুইট বীয়ার ছাড়া অন্য কিছু স্পর্শ করি না! ওখানকার বীয়ার গার্ডেনগুলিও উল্লেখযোগ্য। সন্ধ্যের পর দলে দলে মানুষ পরিবার ও বন্ধুবর্গসহ এখানে এসে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা জমায়। তবে সব ছাপিয়ে আমায় মুগ্ধ করে বার্লিনের চরিত্রবৈশিষ্ট্য যা আমার চোখে আমেরিকানদের থেকে তো বটেই অন্যান্য ইউরোপীয়দের থেকেও রীতিমত আলাদা ঠেকে। এদের মধ্যে ঔদ্ধত্য কম সহিষ্ণুতা বেশি, আড়ম্বড় কম নিয়মানুবর্তিতা বেশি, শঠতা কম অকপটতা বেশি, আবেগের আতিশয্য নেই তাই বলে আন্তরিকতার অভাবও নেই। এখানকার আরেকটা জিনিস আমার নজর কাড়ে। সেটা বার্লিনের সাইকেল। শহরের গাড়ি চলার বড়রাস্তা বরাবর সাইক্লিস্ট ট্র্যাক – বাচ্চাবুড়োনারীপুরুষ সবাই সাইকেলে সওয়ার, বস্তুত গাড়ির লেনে জ্যাম নেই সাইক্লিস্ট ট্র্যাকে ছইছপাছপ জ্যাম! নিজের দেশের কথা মনে না এসে পারে না। কেন নেই আমাদের দেশে সাইকেলের চলন, সাইকেলের আলাদা লেন? কেন আমাদের মত গরীব দেশে গাড়ির এত রমরমা? সরকার কেন এদেশে গাড়ির বদলে সাইকেলের প্রচার করছে না? একদিকে তা জনসাধারণের আয়ত্তাধীন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যচর্চার অনুগ, তার ওপর পরিবেশদূষণ ঘটায় না। দেশের বিকাশের পক্ষে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা সুযোগ কেন হেলায় হারাচ্ছি আমরা?

বার্লিন ভ্রমণ আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা! তবে এটাও সত্যি যে যদি আমার বার্লিনবাসী বন্ধু ক্লডিয়ার সুচিন্তিত প্ল্যানিং, দরাজ আতিথেয়তা আর শহর পর্যটনকালে সর্বক্ষণের সাহচর্য না পেতাম তবে হয়তো শহরটাকে এত ভালো করে দেখতে ও চিনতে পারতাম না। তাই স্বীকার করতেই হবে, আমার বার্লিনপ্রেমের সিংহ অবদান ক্লডিয়ার।

অনন্য বার্লিন এবং আন্তরিক বার্লিনকন্যা, উভয়কে আমার বিমুগ্ধ সেলাম!


ফেসবুক মন্তব্য