নদীর মানুষেরা

মৃন্ময় চক্রবর্তী


নদী লুট হয়ে গেছে। মরে গেছে। কিছুদিন আগেও তিরতির বইত। কচুরিদামের নিচে চোরা স্রোত টের পাওয়া যেত। এখন নদীর ধমনী ছিন্ন হয়ে গেছে। সারা তল্লাটের জল তাই নতুনপল্লীতে, বাঁশপোতা, হাতিপাড়ায়। জলের প্লাবন। হঠাৎ হঠাৎ মেঘভাঙা বৃষ্টি আর প্লাবন। জল নামছে না। কি করে নামবে নদীর বুকে যেখানে সেখানে বাঁধ, মাছের চাষ, সিন্ডিকেটের লরি যাবার রাস্তা, ঘরবাড়ি।
নদীই বলে লোকে। কি নাম তার জানতে চাইলে সবাই বলে কি জানি বাপু, তা'ত জানিনা। জগদীশ ভাবে একে যদি নদী বলে তবে তার বাংলাদেশের রুপকাঠি গাঁয়ের পাশ দিয়ে যে কীর্তনখোলা বয়ে গেছে তাকে কি বলবে এদেশের লোক। একে তো খালও বলা যায়না, কুকুর বিড়াল লাফ দিয়ে পার হয়ে যায়। কিন্তু নদীটা মরে গেল। মেরে ফেলা হল। অথচ নদীটা এই বিরাট অঞ্চলের এক অপরিহার্য ধমনী। এই পথেই বর্ষার জল সরে।
বর্ষার আগে কেউ টের পায়নি নদী মরে গেছে। কেউ ফিরে দেখেনি তার বুক প্লট করে বিক্রি হয়ে গেছে। যখন দুদিনের ভারী বর্ষা হল। যখন হঠাৎ মাঝরাতে সবাই বিছানা ছেড়ে উঠে দেখল জল ঘরে বারান্দায় থৈ থৈ করছে। টিনের তোরঙ্গ, দরকারি কাগজ, জামাকাপড়, হাড়িকুড়ি, সামান্য চাল সামান্য আনাজ সহ যা কিছু মাটির কাছাকাছি ছিল সব জলের নীচে চলে গেছে তখন, না ঠিক তখনও নয়, বুঝল তখন যখন উঁচু অঞ্চলের বাবুরা ডুবে গিয়ে হৈ চৈ করল, সাংবাদিক এল।
এই অঞ্চলের বহু পরিবার হাতিপাড়া প্রাইমারি ইস্কুলে আশ্রয় নিয়েছে। প্রশাসন এক আধবার চিড়েগুড় দিয়ে গেছে। শহরের উপান্তে এমন আশ্চর্য বন্যা কেউ কস্মিনকালে দেখেনি।
জগদীশ ইস্কুলের প্রান্তে তালগাছটার কাছে গিয়ে মাঠের দিকে তাকায়। কত বাড়ি বেড়েছে গত পাঁচ ছয় বছরে। সবই বাংলাদেশি মানুষ। সাতক্ষীরা খুলনা ভোলার দাঙ্গা খেদানো, আয়লা তাড়ানো গরীব মানুষ। সে তার দরমার ঘরটা দেখার চেষ্টা করে। খানিক দূরে নিমগাছ মাথায় নিয়ে হেলে পড়া ঘরটা তার। সে দেখে আর ভাবে, বেড়া আর বাঁশের গোড়াগুলো পচে যাবে এভাবে জল যদি দাঁড়িয়ে থাকে। ভাবতে ভাবতে চোখে জল এসে যায়। কত পয়সা আছে তার, আবার নতুন করে ঘর করা কি মুখের কথা। নদীর পাড়ে বলে মুদিখানাটা একেবারে ডোবেনি। তাই কোনোরকম চলছে। তাও ধার বাকিতে অস্থির অবস্থা। এই দুঃসময়ে কিছু বলারও নেই। সে নতুন করে মালও তুলতে পারছেনা। কী যে হবে!
কাঁধে হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে ওঠে জগদীশ, ও রাখহরি, আমি ভাবি কে। আজ বাইরও নাই। না দাদা কাম কাজ ভালো হয়না, সর্বত্র জল। সবাই দুশ্চিন্তায় কেডা বলেন অর্ডার দিব এখনে। আর অর্ডার ধরিয়া কামডা করমু কোনহানে, এইসব তো তেরান শিবিরে হয়না দাদা।
রাখহরি বালাপোষ বানায়। সারাবছর অর্ডার নিয়ে ঘোরে। জগদীশ বলে, তবু তো কিছু করন লাগে, টাকা না থাকলে খাবা কি ভাই? রাখহরির বিষন্ন মুখের উপর জগদীশের চিন্তিত মুখের ছায়া পড়ে। সবারই এক দশা।

আজ দু'দিন তেমন বৃষ্টি নেই, তবু একটুও জল নড়েনি। কি করে নড়বে, নদী কি আর নদী আছে। তাকে যারা বেচে খেয়েছে তাদের কোনো সমস্যা হবেনা। তারা মাটির ঘর ভেঙে তিনতলা করেছে। কিন্তু যে খেদা খাওয়া লোকেরা মাথা গুঁজবার জন্য নদীকে কিনতে বাধ্য হয়েছে তারা মরবে। যে কিনেছে দায় তার যে বেচেছে তার বমাল ছাড়। ভোটের কাজে সমাজসেবী লাগে। দলকে দলের সরকারকে তাদের পুষতে হয়।
কাল লোকাল নেতা ওরফে পুরসভার পিতা সিণ্ডিকেটের সমাজসেবী বাহিনী নিয়ে অঞ্চল পরিদর্শনে এসে বলে গেছে- পরশু মন্ত্রী আসছে, যে কুলুপ খুলবে তার চোপা আস্ত থাকবেনা, সে 'অরুণ বিশ্বাস' হয়ে যাবে। সুতরাং মুখ সামলে। সহ্য কর, খাস জমিতে সস্তায় থাকবে আর জ্বালা নেবেনা একটু? দরকার মত যারা পয়সা নিয়ে বসিয়েছে তারাই আবার তুলে দেবে সমাজের সেবায়, সরকারের মুখ রক্ষায়!
'অরুণ বিশ্বাস' কে এরা জানে না। তার নামই শোনেনি কখনো। তবু হুমকি এলো অরুণ বিশ্বাস বানিয়ে দেওয়া হবে। জগদীশের ছেলে নির্মল জানে অরুণ বিশ্বাস কে। সে কলেজে পড়া ছেলে। পল্লীতে ছাত্র ঠেঙিয়ে পড়ার খরচ চালায়। সে বলে অরুণ বিশ্বাস একটা নদীর নাম। যে নদীর পথ বাঁধা যায়নি।

আজ সন্ধ্যায় তিন পল্লীর লোক জড়ো হয়েছে ইস্কুলের বারান্দায়। কাল মন্ত্রী আসছে। কী করা হবে, মন্ত্রীকে কী বলা হবে সেসব নিয়ে তারা তর্ক করছে চেপে মেপে। এখানেও কান আলগা করা আছে। এখানেও তাদের পলকহীন চোখ। তারা তাই সাবধানী, এত ক্ষতি সত্বেও হিসেবী প্রাণসম্বল মানুষ।
এখন কতদিন ছাত্রদের বিনা পয়সায় পড়াতে হবে নির্মল জানেনা। সে জানেনা কতদিন সে কলেজে ফি দিতে পারবেনা । ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা দেবার আগেই তাকে হয়তো রুটির সন্ধানে নেমে পড়তে হবে । একটা হারানো দেশ আর লুট হয়ে যাওয়া নদী কতকিছু বদলে দিতে পারে জীবনের। তার বয়স অনুযায়ী এখন মাস্টার ডিগ্রি হয়ে যাবার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের পড়াশুনার এদেশে কোনো মূল্য নেই। এখানে এসে বেশ খানিকটা নিচু থেকে শুরু করতে হয়েছে তাকে। সে একটা চাকরি চায়, একটু ভালো করে বাঁচতে চায়। সে 'অরুণ বিশ্বাস' হতে চায়না। লাশ হয়ে খালে ভেসে যেতে চায়না। কিন্তু চাঁদপাড়ার রমজান যেদিন হাতিপাড়ার দীপক মৃধার মেয়ে ময়নাকে তুলে নিয়ে গেছিল সেদিন একটা উল্কা এসে গিঁথে ছিল বুকে। মাঝে মাঝে সে টের পায়। যে জন্য তারা দেশ ছাড়ল এখানে এসেও তো তার হাত থেকে নিস্তার নেই।
প্রশাসন রমজানদের ধরেনি। উলটে হুমকি দিয়ে গেছে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ান চলবেনা। বাঙালগুলো নাকি সাম্প্রদায়িক, বিরোধী দলের লোক। এদের দিয়ে তারা গুজব ছড়াচ্ছে। মিথ্যে রটনা দিচ্ছে মুসলিমরা হিন্দুর মেয়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ মোতালেবমাস্টার আর তার কিছু প্রাক্তন ছাত্র রহমান, নিজামুল, আহাদও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিল। ওরা তারও বন্ধু, এককালের সহপাঠী। তাদের ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছে মোল্লা মাতব্বর নেতারা।
বিরোধিতার নামে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেবার লোকজনের এখানে অবশ্য অভাব নেই, ধর্মের নামে কিছু লোক উঠে পড়ে লেগেছে। ননীমাধব চাকলাদার ওদের নেতা। পাক্কা খচ্চর লোকটা। কলকাতায় ঠিকেদারি করে। লোক ধরে শহরে নিয়ে যায়। পুরুষ মজুরদের নিয়মিত কাজ দেবার নামে মজুরি কম দেয়, মেয়ে মজুরদের দেহভোগ করে। সবাই জেনেও তাকে কিছু বলতে পারে না। তারা বড় নিরুপায় মানুষ। নির্মল তবুও সর্তক করে, যাকে সুযোগ পায় তাদের বলে এদের পাল্লায় না পড়তে। খাটিয়ে মানুষ বোঝে কোনো দলই গরীবের বন্ধু নয়, কিন্তু তবুও তারা যায়, কিছু পাবার আশায় যায়, নিরাপত্তার আশায় যায়। এখানে নির্মলের কিছু করার থাকেনা। সে তো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা নয়, এত দায় মাথায় নিয়ে সে কি মরবে নাকি?

মেয়েরা ধর্ষিত হচ্ছে, মেয়েরা তো এক একটা নদী। নদী লুট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু বলা যাচ্ছেনা কিছু বলা যাবেনা। বললেই অরুণ, গৌরব আরো আরো কত নাম... করে দেওয়া হবে। নামের পাহাড় হয়ে যাচ্ছে। কলেজে যে প্রতিবাদী মুখগুলো ওকে একসময় নানাভাবে ভাবাতে চেয়েছিল তারাও এখন আড়ালে চলে যাচ্ছে। কেউ এখন ঝামেলায় জড়াতে চাইছেনা। না না নির্মলও এসব আর ভাববেনা। কি দায় তার।
মোতালেবমাস্টারকে প্রায়ই বলতে শুনেছে নির্মল, এসব রোখা যাবেনা জগদীশ। তোমরা এক বিপন্নতা থেকে আরেক বিপন্নতায় এসে পড়লে। প্রাক্তন স্কুলমাস্টার মোতালেব বামপন্থী লোক। সে নামাজ রোজা দাড়ি কিছুই রাখেনা বলে, এলাকায় বিজ্ঞান প্রসারের লড়াই করতে গিয়েছিল বলে, নিজের দলের লোকের হাতেই একদিন মার খেতে হয়েছে তাকে। তারপর দল ছেড়ে একেবারেই একা। এখন বিনা পয়সায় ছাত্র পড়িয়ে সময় কাটে। জগদীশের মুদি দোকানে প্রায়ই আসে মাস্টার। নিজের পাড়ায় তার কথা বলার লোক কমে গেছে। কমবয়সী ছেলেদের গালে দাড়ি মাথায় টুপি। ওইটুকু চাঁদপুরে ঝাঁ চকচকে দু'দুটো মসজিদ।
জগদীশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে লড়েছিল। মোতালেবমাস্টার গত পঞ্চাশের খাদ্য আর ক্ষেতমজুর আন্দোলনে। কখন ভাব জমেছে দুই বুড়োয় নির্মল বলতে পারবেনা। বৃদ্ধ মোতালেবমাস্টারও আজ এসেছে কিন্তু একা। সে নীরব । সে তার উপস্থিতি দিয়ে বোঝাতে চায় সে পাশে আছে। এইটুকুই।
লন্ঠনের আলোয় ছায়া নড়ছে অনেক। নির্মলও চুপ করে রয়েছে। সে কোনো ঝুঁকি নেবেনা। তাকে পাশ করতে হবে। একটা চাকরি পেতে হবে যে করেই হোক। বাবা জীবনটা খুইয়েছে। কিছুই পায়নি। কিছু পাওয়া যায়না এই পথে। যদিও দেশ মানুষ চায়, নদী মানুষ চায়, পাহাড় অরণ্য মানুষ চায়। সে বোঝে তাই মাঝেমাঝেই তার বুকের ভেতর উল্কার আগুনটা দপ করে জ্বলে ওঠতে চায়। কিন্তু যখনই জ্বলে ওঠে তখনই সে জোর করে নিভিয়ে দেয়।

বাইরে হুহু করছে ডুবো এলাকার অন্ধকার। ভিজে বাতাস ভেসে আসছে। আবারো বৃষ্টি হবে মনে হচ্ছে। রাত বাড়ছে অথচ এখনো কোনো আলোচনা হয়নি। এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কাল মন্ত্রী আসবে।
এই গরীব পাড়াগুলোর প্রায় সব ঘরের ছাত্ররা তার কাছে পড়ে। কেউ পয়সা দিতে পারে কেউ পারেনা। অঞ্চলের মানুষ তাকে ভালোবাসে বিশ্বাস করে। এক্ষুনি তাকে আবার বলতে বলবে ওরা। অন্ধকার স্কুলঘরগুলো থমথম করছে হ্যারিকেনের আলোয়।
ময়নার সময়ে যা হয়েছিল এখনো তাই হবে। কিন্তু তারপর! সে জানে সে যদি একবার বলে...। কিন্তু আবার তাকে তুলে নিয়ে যাবে ভুনা-গদাই-রমজান। পুলিশ প্রশাসন কিছুই করবেনা। সঙ্গীরা একে একে সরে যাবে।
অসহায় মানুষগুলো তবু সামনে একজনকে চায়। সাহসী একজনকে চায়। কিন্তু না কিছুতেই না, সে যাবে না। ক্ষমতার বিরুদ্ধে সে পারবে না। লাশ হয়ে নদীর বুকে তাকে ভেসে যেতে হবে। সে জানে মন্ত্রীর কাছে তাকেই বলতে বলবে সবাই। কিন্তু মন্ত্রী হাত নেড়ে চলে যাবে। অভিনয় সেরে চলে যাবে। তারপর...। ওরা মনে করবে আবার শুরু হল। ওরা ভয় পাবে, মরিয়া হয়ে যাবে। তারপর...
আকাশে মেঘ। অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে উঠছে । গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুতের আলোয় নির্মল দেখতে পাচ্ছে অগুনতি মাথা স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকেই।

ফেসবুক মন্তব্য