ডানা

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

সৌমেনের দুটো ডানা আছে। জন্মের সময় ছিলো না। ও যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন প্রথম ব্যাপারটা ঘটতে শুরু করেছিল। পিঠের মাঝ বরাবর ভীষণ চুলকোতো মাঝেমাঝে। ক্লাশে লাস্ট বেঞ্চে দুলদুলি ওর পাশে বসত আর মাঝেমাঝেই এ ওর গায়ে একটুখানি হাত দিতো। বেশি কিছু না, ওই একটু ছুঁয়ে দেখা আর কী। সেই দুলদুলিই একদিন নরেশবাবুর ক্লাশে লাস্ট বেঞ্চে বসে অংক টুকতে টুকতে বাঁ হাতটা ওর শার্টের মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে পিঠটা ছুঁতে ছুঁতে ফিসফিস করে বলল, “তোর পিঠে কী রে? কেমন যেন খসখসে হয়ে আছে!”
“পিঠে আবার কী থাকবে? পিঠ। ভীষণ চুলকোচ্ছে। একটু চুলকে দে না!”
“সে কী রে? আমারও পিঠের মাঝখানটায় একটু একটু চুলকোয় তো! দাঁড়া, আগে তোরটা চুলকে দি—তারপর-”
দুলদুলি তার পিঠটা খানিক চুলকে দেবার পর সৌমেনের পালা। সবে সে দুলদুলির জামার ভেতর দিয়ে পিঠের ওপর বা হাঁতটা বাড়িয়েছে তখন হঠাৎ হিমাদ্রি বলল, “ও স্যার, দেখুন, সৌমেন আর দুলদুলি না—”
হিমাদ্রি নরেশবাবুর পেটোয়া ছাত্র। ভালো ছেলে বলে সুনাম থাকায় মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করাটাও ওর আর হয়ে ওঠে না। সৌমেনের ওপরে তাই তার রাগ থাকাটা স্বাভাবিক। তাকে সৌমেন দোষ দেয় না।
তারপর তো বেজায় গন্ডগোল বেধে গেল। নরেশবাবু বেশ প্রাচীনপন্থী লোক। বিয়েথাও করেন নি। অংক খান, অংক ঘুমোন। বাথরুমে গিয়েও নির্জনে অংকই কষেন। দুলদুলির গার্জিয়ান কল হল এবং তাকে ইশকুল থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল। সৌমেনের অবশ্য গার্জিয়ান কলের রাস্তা ছিল না। ওর তখন সতেরো বছর বয়েস। এক হাতুড়ে হোমিওপ্যাথিকের বাড়িতে কাজ করে খায়। রাতে তাঁর ডিসপেনসারি পাহারা দেয়। আর দুপুরবেলা নিতান্ত অনিচ্ছায় ইশকুলে যায় ডাক্তারের তাড়নায়। ডাক্তারটি বেশ আধুনিক মনের মানুষ। তাঁর ধারণা সবাইকেই নাকি পড়াশোনা করতে হয়। কাজেই ইচ্ছে না থাকলেও আর বার তিনেক ফেল করা সত্ত্বেও সৌমেনকে ইশকুলে যেতেই হচ্ছিল।
ঘটনাটার পরে তার দশাও ওই দুলদুলির মতই হল, তবে কপালে বেশ খানিক ফাউ মারধোরও জুটে গেল। মারধোর খেলেও সৌমেনের এতে শাপে বরই হল। ইশকুলের জ্বালা ঘুচে গেল তার একেবারে। সে ল্যাঠা চুকতে ডাক্তার বেশ পরিষ্কার বিবেকসহ তাকে আরো একচোট মারধোর করে চব্বিশ ঘন্টার জন্য ডিসপেনসারিতেই বাহাল করে দিলেন। সৌমেন ছেলেটা সৎ। পয়সারও খাঁই নেই বেশি। খোরাকিও বেশ কম। এমন ছেলে, মেয়েদের গায়ে একটুআধটু হাত দিলেই তাকে কাজ ছাড়িয়ে দিতে হবে সেটা কোন কাজের কথা নয়। ডাক্তারের বউ এই নিয়ে নিভৃত শলাপরামর্শের সময় ডাক্তারকে চোখ মেরে বলেছিলেন, “ও বয়সে তুমি কেমন ছিলে সে আমার থেকে বেশি কে জানে?” তাঁরা দুজন পাশাপাশি পাড়ার ছেলেমেয়ে। একসাথেই বড় হয়েছেন।
দুলদুলিরও ভালোই হয়েছিল এতে। তার বাবা মাসদুয়েকের মধ্যে তার বিয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন মুম্বাইতে। শোনা গেছে ছেলে সেখানে স্যাকরার কাজ করে। ভালো রোজগার। সম্বন্ধটা এনেছিল যে পিলুমাসী সে-ই তথ্যগুলো দিয়েছিল। পিলুমাসী কলকাতায় থাকে। তার কথায় সন্দেহ করবে এমন জ্ঞানগম্যি দুলদুলির বাবার ছিল না।
যাবার সময় দুলদুলির হাসি আর ধরে না। তার বয়েস তখন চোদ্দ পেরিয়ে পনেরো। এহেন উঠতি বয়সে অংক ভূগোলের থেকে শরীরশিক্ষা আর গার্হস্থবিদ্যার পাঠ নেবার ইচ্ছেটা তার তখন প্রবল হয়ে উঠেছিল।
গাহাতপায়ের ব্যথাটা মরলে পরে একদিন রাতে ডিসপেনসারির ভেতরে ঘুমোবার আয়োজন করতে করতে পিঠের চুলকুনিটা আবার উঠল সৌমেনের। তখন দুলদুলির কথাটা ফের একবার মনে পড়ে গেল তার। ডিসপেনসারিতে একখানা বড়োসড়ো আয়না ছিল। ডাক্তারের মাঝেমধ্যেই নিজের রূপ দেখবার শখ যায়। তাই আয়না এনে রেখেছেন। জামাপ্যান্ট খুলে ন্যাংটো হয়ে সৌমেন মাঝেমাঝেই রাত্রিবেলা তার সামনে দাঁড়িয়ে নানান কসরত দেখায় নিজেকে। সেদিন সবকটা আলো জ্বেলে জামাকাপড় খুলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সৌমেন দেখে তার পিঠে খানিক জায়গা জুড়ে কেমন ফ্যাকাশেমতন মেরে রয়েছে। জোরে জোরে তার ওপর চুলকোতে খানিক মরা চামড়া উঠে আসতে লাগল। সৌমেন অবাক হয়ে দেখল, তার নিচে কুঁচকে জড়োসড়ো হয়ে থাকা একজোড়া ডানা।
দেখে সৌমেনের ভয়টয় লাগলো না। শুধু একটু অবাক লাগল। খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সে সাবধানে ডানাদুটোকে একটু একটু নাড়াতে চেষ্টা করল। দেখা গেল, তারা তার ইচ্ছেতে সাড়া দিচ্ছে। দুপাশে ছড়িয়ে দিয়ে দেখা গেল আড়ে আট আট ষোল ফুট । এর ফলে সেই ছোট ঘরে আর কোন জায়গা বাকি ছিল না। আয়নায় নিজেকে ভালো করে দেখে নিয়ে সৌমেন ডানাটানা ভাঁজ করে সে রাত্রের মতন ঘুমিয়ে পড়ল।
এরপর থেকে ভোরবেলাটা সৌমেন অন্য কাজে লাগাতে শুরু করল। সকালে উঠেই মুখটুখ ধুয়ে নিয়ে সে চলে যেত রেলইয়ার্ডের দিকে। সেখানে লোকজন বিশেষ থাকে না। রেলইয়ার্ড পেরোলেই একলপ্তে অনেকটা ফাঁকা জমি আছে। সৌমেন সেইখানে গিয়ে সকাল দশটা অবধি ওড়া প্র্যাকটিশ করে এসে ডিসপেনসারির তালাটালা খুলত। কাজটা বেশ কঠিন। ডানা ঝাপটালে আকাশে উঠে পড়া যায় বটে কিন্তু তার পর তাল সামলানোটা জটিল কাজ। পাখিদের বা বাদুরদের একটা সুবিধে আছে, তারা অন্য পাখি বা বাদুরদের দেখে কসরতগুলো শিখে ফেলতে পারে। তাছাড়া তাদের ওড়বার সময় ভারসাম্য রাখবার জন্য আরো নানা যন্ত্রপাতি আছে। শরীরগুলোও পাখির মত হালকা। কিন্তু সোমেনের এইসব সুবিধে না থাকবার দরুণ তাদের মতন করে ওড়ার কায়দা শিখে ফেলবার উপায় ছিল না।
তবে চেষ্টায় কী না হয়। মাসখানেকের মধ্যে সৌমেন দেখা গেল বেশ ভালোই ওড়াউড়ি করতে পারছে। ততদিনে শহরের লোকজনও ব্যাপারটা জেনেছে। খবরের কাগজে ছবিটবি ছেপে দুএকদিন হল্লা হবার পর দুটো নতুন ধর্ষণ বাজারে আসতে সৌমেনের খবরটা চাপাও পড়ে গেছে। আজকাল চারপাশে এত আশ্চর্য সব ঘটনা রোজ ঘটে যে লোকজন আর কোন কিছুতেই বেশিদিন আশ্চর্য থাকতে পারে না।
কিন্তু তবুও তার প্র্যাকটিশের সময় মাঠে স্থানীয় লোকজনের ভালো ভিড় হচ্ছিল রোজ। তাতেও সমস্যা হত না, কিন্তু যখন দেখা গেল, দোকানের খদ্দেররা ওষুধের চেয়ে তার ডানা নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছে তখন ডাক্তার সৌমেনকে একদিন ডেকে বললেন যে ডানা ধুয়ে জল খেলে তাঁর দিন চলবে না। ওসব ফক্কিকারী অনেক হয়েছে। সৌমেন এবার ডানাদুটো কেটে ফেলার বন্দোবস্ত করুক। হিঙ্গলগঞ্জে চেনা এক ডাক্তার আছে তাঁর। ফোঁড়াটোড়া কাটায় পাকা হাত। সে-ই বাড়িতে এসে অপারেশন করে দিয়ে যাবে। খরচখরচা ডাক্তারের। সৌমেন সেটা পরে গতরে খেটে উশুল দেবে। যদ্দিন উশুল না হয় তদ্দিন মাইনে পাবে না, তবে খাওয়াদাওয়া ফ্রি।
প্রস্তাবটা যে খারাপ তা ডাক্তারের অতিবড় শত্রুও বলবে না। সৌমেন রাজিও হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তার পরদিন সকালবেলা রেল ইয়ার্ড থেকে আকাশে উড়ে একটা স্পিড লিংকের মালগাড়ির সঙ্গে রেস দিতে দিতে হঠাৎ তার মনটা ঘুরে গেল। ডিসপেনসারি খুলতে সে ডাক্তারকে গিয়ে বলল, সে প্রস্তাবে রাজি নয়। ডাক্তার অতএব তাকে বাকি মাইনেটুকু বুঝিয়ে দিয়ে জবাব দিলেন।
কাজ চলে যেতে সৌমেনের এ শহরটা থেকে মন উঠে গেল। এমনিতেই এখানকার লোকজন তাকে একটা কিম্ভূত জন্তু বলেই ভাবে। সেই যে মেলাটেলায় মাকড়শামানবটানব এনে দেখায়, ভাবে সেইরকম একটা কিছু হবে। পথে বেরোলে ছেলেপুলের দল চলে তার পেছনপেছন। কাজটা যদ্দিন ছিল তদ্দিন তবুও সেসব সয়ে গেছে। কিন্তু এখন খালি পেটে আর সেসব উৎপাত তার সয় না। শেষমেষ তিতিবিরক্ত হয়ে সৌমেন ঠিক করল এ জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে সে অন্য কোথাও একটা চলে যাবে। সেখানে তাকে কেউ অত চিনবে না। ডানাদুটো পিঠে ভাঁজ করে রেখে ওপরে একটু ঢোলা জামা পরে সাধারণ কোন কাজকর্ম ধরে নেবে।
সেদিন রাতে তৈরি হয়ে নিয়ে সৌমেন আকাশে উড়ে গেল। অন্যান্যদিন যেমন নিচে নিচে ওড়ে সেদিন আর সেরকম নয়। আকাশে উঠে ডানা ঝাপটে সৌমেন সোজা চলল ওপরের দিকে। আকাশে বর্ষার মেঘ ছিল। মেঘ ছাড়িয়ে উঠতে পায়ের নিচে পৃথিবীটা একেবারে বদলে গেল তার। সেখানে তখন থালার মত চাঁদ উঠেছে একটা। তার দুধসাদা আলোতে সৌমেনের নিচে দ্রুত সরে যেতে থাকা মেঘের স্তর সমুদ্রের মত ছড়িয়ে ছিল।

।২।
ইছামতি পেরিয়ে আরো খানিকদূর গিয়ে বাণীপুর নামে একটা গঞ্জ মতন আছে কালিন্দীর ধারে। বছর চল্লিশেক আগেও এখান অবধি বাঘ আসতো নাকি। এখন অবশ্য পাকা রাস্তা হয়েছে। বাঘের মতন ডাক ছেড়ে লরিটরি যায়। জমজমাট বাজার বসে গেছে। মোবাইল ফোনের টাওয়ারও আছে। লোকজনের ভিড়ভাট্টা মন্দ নয়। সৌমেন এইখানে এসে ঠাঁই নিল। ডানাদুটো পিঠের সঙ্গে বেঁধে রাখে সবসময়। লোকসমক্ষে গায়ের জামা কখনো খোলে না। উঁচু হয়ে থাকা পিঠটা একটু ঝুঁকিয়ে লটরপটর করে হাঁটেচলে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলে জন্ম থেকেই পিঠটা তার বাঁকা।
অবশ্য এসব এলাকায় সেই নিয়ে কারো বিশেষ মাথাব্যথা নেই। গঞ্জ এলাকা। হাজার কিসিমের লোকের ভিড়। কে আর কার অত খবর রাখে। ওদিকে, দেখতে কুঁজো হলে কী হয়, সৌমেন কাজের ছেলে। চুরিটুরি করে না। একটু আধটু লেখাপড়াও জানে। ফলে কাজ তার একটা জুটেই গেল একটা ভাতের হোটেলে। হোটেল চলে সকাল থেকে রাত দশটা অবধি। সৌমেন কাউন্টারে বসে হিসেব রাখে। তার শ্যেনচক্ষুকে এড়িয়ে কারো একদলা ভাতও বেশি খেয়ে যাবার জো নেই নগদ না দিয়ে। মালিক বেজায় খুশি তার ওপর।
তবে মাঝে মাঝে সৌমেনের পিঠে ব্যথা হত বড়। ঘাড় গুঁজে ক্যাশবাক্সের হিসেব মেলাতে মেলাতে হঠাৎ হঠাৎ সে টের পেত, পিঠের ওপর ডানাদুটো তিরতির করে কাঁপছে, ঠিক যেমন চোখ নাচে তেমনি। কয়েকবারের অভিজ্ঞতা থেকে সৌমেন বুঝে ফেলত এইবারে একটু ডানা না ছড়ালে তার ব্যথা উঠবে। সে বড় মারাত্মক ব্যথা। পিঠের থেকে শুরু হয়ে হৃৎপিন্ডের মধ্যে দিয়ে যেন একটা লোহাকাটা করাত চালাতে থাকে কেউ। একবার উঠলে রাতভর তাকে জ্বালিয়ে একেবারে কাহিল করে দেয়। সৌমেনের তখন আর না উড়ে নিস্তার নেই। সেইসব দিনগুলোতে রাত গভীর হলে সৌমেন একা একা বের হয়ে পড়তো। গঞ্জের পাশেই কালিন্দী নদী। তার ওপারে কয়েক মাইল ছিটে জঙ্গল। তার পরেই ঘন বন। অন্ধকারের মধ্যে ডানা মেলে সৌমেন উড়ে যেত সেই জঙ্গলের দিকে। ওদিকে কারো তাকে দেখে ফেলবার ভয় নেই। কখনো অন্ধকারের মধ্যে, কখনো দুধসাদা চাঁদের আলোয় সারা আকাশ জুড়ে বড় বড় ডানার ঝাপট মেরে উড়ে বেড়াত সে। মাঝে মাঝে কোন গাছের উঁচু ডালের ওপর বসে একটু বিশ্রামও নিয়ে নিত। সে রাতগুলো তার বুকের ভেতরটা একেবারে ফুরফুরে হয়ে যেত। কেউ টের পেত না।
তবে কথায় বলে কি না, চাঁদসদাগরের লোহার ঘরেও একটা ফুটো ছিল। সেই পথে কালনাগিনী এসে লখিন্দরকে কামড়ে গেছিল। তা সৌমেনের সব সাবধানতার মধ্যেও একদিন একটা ফুটো পেয়ে যে এসে ঢুকে পড়ল সে কালনাগিনী টাগিনী কিছু নয়, নিছক একজন মেয়েমানুষ। ব্যাপারটা সে সৌমেনের গোচরে আনল একদিন দুপুরবেলা। আড়াইটে মতন বাজে তখন। বাজারের লোকজনের খাওয়াদাওয়ার হল্লা কমে এসেছে। হোটেল মোটামুটি ফাঁকা। আগের রাতটা সৌমেন উড়তে গেছিল। ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেছে। ভিড়ভাট্টা না থাকায় সে তখন ক্যাশবাক্সের সামনে বসে একটু ঢুলে নিচ্ছে। এমন সময় কানের কাছে কে যেন ডেকে উঠল, “এই যে নাগর। রাতটা কার কুঞ্জবনে জেগে এলে গো?”
সৌমেন ধড়মড় করে মুখ তুলে দেখে করালী মন্ডলের মেয়ে এসে ক্যাশবাক্সের কোণাটা ধরে দাঁড়িয়েছে। বয়েসে তারই কাছাকাছি হবে। ঢলোঢলো যৌবন। করালী তাকে বিশেষ খেতে পরতে দিতে পারে না, তবু গতরের চকচকানি কম নয় মেয়ের। লোকে অবশ্য সে নিয়ে নানা কথা বলে থাকে। করালী বা তার মেয়ের তাতে বিশেষ হেলদোল নেই।
সৌমেন মুখটাকে বেঁকিয়ে বলল, “কাজের সময় কেন বাজে কথা কইতে এলি বল তো মালতি?”
সে মুখ নেড়ে বলল, “ও মা। একটু রসের কথা কইলে বাজে কথা হয়ে গেল বুঝি? আমি বলে এলুম দুটো মাছমাংস খেতে, তা উনি আবার—”
“ইস! খাবার খুব শখ যে! চিকেন তো দূরে থাক, ফিশমিলের দাম জানিস?”
“সে আমার জেনে কী কাজ? খাওয়াবে তো তুমি।”
সৌমেন আকাশ থেকে পড়ল, “আ-আমি?”
“হ্যাঁ গো নাগর,” এই বলে সৌমেনের মুখের কাছে মুখটা নিয়ে এসে সে বলল, “ঘাটের পাশে ঘর। ভোরবেলা বাগদার মীন ছাঁকতে কালিন্দীতে যাব বলে দোর খুলেছি তখনই দেখলাম গো। দেবো পাঁচজনের সামনে হাঁড়ি ভেঙে?”
সৌমেনের বুকটা ধড়াস করে উঠল। তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “থাম থাম,” তারপর টেবিলবয় মৃগেনকে ডেকে বলল, “একে একটা চারাপোনার ফিশমিল দিয়ে দে তো মৃগাংক। আমার নামে বিল করে দিস।”
সেদিন রাত্রিবেলা গাঁজার আসরের শেষে লোকজন চলে গেলে শুতে যাবার আগে পাশের খাট থেকে মৃগাংক তাকে বলল, “সৌমেনদা, তোমায় ভালো কথা বলি। ওই ছেনালের চক্করে যেন ভুলেও পোড়ো না তুমি। সাতঘাটের জল খাওয়া মেয়েমানুষ--”
সৌমেন কোন উত্তর দিল না। মেয়েটা তাকে ভয় দেখিয়ে তার পয়সায় খেয়ে গেল আজকে। তাতে তার রাগ তো হবারই কথা। কিন্তু কি আশ্চর্য, সৌমেনের সব রাগ ছাপিয়ে মনের ভেতর একটা আনন্দ তিরতির করে কাঁপছিল। মেয়েটা তাকে উড়তে দেখেছে! তার পরেও তার সঙ্গে কেমন মিঠে হেসে হেসে নাগর বলে ডেকে কথা বলছে! মালতির নাকে একটা ঝুটো সোনার নাকফুল আছে। সেদিন সৌমেন সেটা একেবারে নিজের মুখের কাছ থেকে দেখেছে। মালতির মুখে ঘাম, মৌরিভাজা আর পাউডারের মেলামেশা গন্ধ ছিল। সে কথাটা মনে পড়তেই সৌমেনের শরীরটা একেবারে গরম হয়ে গেল।
এরপর থেকে মাঝে মাঝে মালতি এসে দাঁড়াত তার ক্যাশবাক্সের পাশে। সৌমেন কিছু না বলে ইশারায় ভেতরের টেবিলের দিকে দেখিয়ে দিত। বরাদ্দ ওই একই। চারাপোনার মিল। বিল জমা হত সৌমেনের খাতায়। মালতি শুকনো লংকার বাটা দেয়া ঝোল দিয়ে ভাত মেখে হুশহুশ করে খেত আর তার দিকে চেয়ে দেখত।
গাঁগঞ্জের ব্যাপার। কোনোকিছুই কারো নজর এড়ায় না। কয়েকদিনের মধ্যেই বাজারে খবর হয়ে গেল, কুঁজো সৌমেন মালতির নতুন নাগর হয়েছে। মালতি তার মাথায় হাত বুলিয়ে খুব খাওয়াদাওয়া করছে। তাতে অবশ্য লোকজন বিশেষ অবাক হল না। বাজারে মালতির অনেক নাগর। ওই করেই তার ভাতকাপড়ের অভাব ঘোচে। মৃগাংক এখন মাঝে মাঝেই সৌমেনকে চোখ টিপে বলে, “তা এত যে খাওয়াদাওয়া করাচ্ছো, তার দাম উশুল করছো তো, না কী? না করতে ইচ্ছে যায় যদি তো বলো, আমিই নাহয় তোমার হয়ে, হে হে—”
দিনকয়েক পরে আবার একদিন সৌমেনের ডানা তিরতির করতে শুরু করল। অতএব রাত বারোটা নাগাদ মৃগাংক ঘুমুলে সে উঠে নিঃশব্দে বাইরে বের হয়ে কালিন্দীর দিকে চলল। পথে বের হয়েই খেয়াল হল, মালতি বলেছিল তার ঘর কালিন্দীর ঘাটের পাশে। মেয়েটার চোখ বড় সেয়ানা। কথাটা খেয়াল হতেই সৌমেন একটু থমকালো। অন্য রাস্তায় যাবে নাকি আজ! কিন্তু তারপর ফের কী ভেবে ঘাটের রাস্তাটাই ধরল আবার।
মালতিদের ঘরটা একেবারেই ঘাটের লাগোয়া। কালিঢালা অন্ধকারে গুটিকয়ে ঝোপমতো গাছপালার ফাঁকে একটেরেতে দাঁড়িয়ে। তার কাছাকাছি যেতে হঠাৎ সৌমেনের চোখের ওপর ভেসে উঠল, ঘরটার মধ্যে মালতি শুয়ে ঘুমিয়ে আছে। গায়ে জামা নেই। শুধু ফেরতা দেয়া কাপড়। বুকদুটো উঠছে নামছে। মুখে মৌরির গন্ধ—
পায়ে পায়ে কখন যে ঘরটার দিকেই এগিয়ে গেছে সৌমেন সে কথা তার নিজেরও খেয়াল ছিল না। যখন খেয়াল হল ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। তার পিঠের কাছে দাঁড়িয়ে একখানা ডানা চেপে ধরে মালতি ফিসফিস করে বলছিল, “ঠিক জানতুম একদিন না একদিন ফের বেরোবে রাত্তিরে। সেই সেদিন থেকে তক্কে তক্কে আছি। তা আকাশে না উড়ে এখানে জানালায় উঁকি মারছ কী মতলবে? লোকজন ডাকবো? উড়ে ভাগতে পাবে না নাগর। ডানা চেপে ধরে আছি। ডাকি?”
তবে সত্যি সত্যি লোকজন ডাকবার মতলব যে মালতির ছিল না সেটা তার নিচু ফিসফিসে গলাতেই মালুম হচ্ছিল। মালতির হাতের টান বেজায় আলগা। সৌমেন ইচ্ছে করলেই এক ঝটকায় তার হাত ছাড়িয়ে উড়ে পালাতে পারতো। কিন্তু সে করতে তার মন সরল না। উলটে হঠাৎ এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়িয়ে দুহাতে মালতিকে বুকের ভেতর সাপটে ধরে বলল, “এইবার? লোক ডাকবি না? ডাক দেখি? আসতে আসতেই তোকে নিয়ে---”
মালতি তার চোখের দিকে চোখ রাখল একবার। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিল না বটে তবে সৌমেন টের পাচ্ছিল চোখদুটো তাকে ছুরির মত বিঁধছে। হঠাৎ গোটা শরীরটা দিয়ে সাপের শংখ লাগবার মতন তাকে পাকিয়ে ধরে মালতি চিৎকার করে উঠল, “ও বাবা গো, মেরে ফেলল গো—কে কোথা আছো—”
সৌমেন আর একমুহূর্ত দাঁড়ালো না। মালতিকে বুকের কাছে ধরে রেখেই ডানাদুটো খুলে বড় বড় ঝাপটায় বাতাসে ভেসে উঠে সোজা পুবমুখো চলল কালিন্দীর ওপর দিয়ে।
কাটার খালের দোয়ানির মধ্যে নতুন চর উঠেছে একটা। আড়েদিঘে হাত তিরিশেক বড়জোর। তার বালির নিচে নতুন পলির গর্ভসঞ্চার হয়েছে সবে। আধখাওয়া চাঁদের আলোয় ইতিউতি ঠেলে উঠতে থাকা ঝোপঝাড়ের অবয়ব চোখে পড়ে। শংখলাগা মানুষদুটো সেই নতুন মাটিতে এসে নামল। মালতির গোটা শরীরটা তখন ভালো বাজিয়ের মতই আগুনে সুর তুলেছে অনভিজ্ঞ সৌমেনের তাজা শরীরে-
--ক্লান্ত, ঘুমন্ত মানুষটার শরীরে মরা আলো ছড়িয়ে দিয়ে চাঁদ অস্ত গেল একসময়। মালতি জেগে ছিল। অল্প দূরেই কোথাও কোন বন্য জন্তু জল খেতে নেমেছে। শেষরাত্রের মৃদু হাওয়ায় তার শরীরের বুনো গন্ধ পাওয়া যায়। মালতির ভয় লাগছিল না। কত দোপেয়ে বাঘই তো তার মাংস খেল সেই চোদ্দ বছর বয়স থেকে। এখন একটা চারপেয়ে এসে তার চেয়ে বেশি আর খাবে কী?
তলপেটে ব্যথা করে দিয়েছে একেবারে দামাল ছেলেটা। মালতি সেটাকে গ্রাহ্য করল না। অমন কতই হয়। তার অভ্যাস আছে। অন্যমনস্কভাবে পেটের ওপর একবার হাতটা বুলিয়ে নিল সে। ওখানে কেউ একটা আছে। মাসদেড় হয়ে গেল বোধ হয়। সুবলের? নাকি আর কারো? মাঝে একদিন তুলে নিয়ে গেল সুবল ক’দিনের জন্য। নেউপাড়ার দিকে ওর একটা ঘাঁটি আছে জঙ্গলের ভেতর। বড় কোন দাঁও মারলে কি লাশটাশ ফেললে ওখানে গিয়ে লুকোয়। দিন সাত সঙ্গে করে রাখল। খাইয়েছে দাইয়েছে ভালো। টাকাও দিয়েছে কিছু। বদলে চারজন মিলে গোটা হপ্তা ধরে খরচা উশুল করেছে। এ মাসে শরীর খারাপ হল না মালতির। খালি বমি বমি ভাব। গা ভারী ঠ্যাকে। লক্ষণগুলো তার অজানা নয়। হঠাৎ পাশ ফিরে সদ্য পুরুষ হয়ে ওঠা কিশোরটির সরল, ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে দেখল সে। ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছে। নাঃ। পেট খসাবার দরকার হবে না আর। সব ঠিক আছে। পায়ের কাছ থেকে পরণের কাপড়টা তুলে এনে সৌমেনের গায়ের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে নিজের গায়েও ঢাকা দিয়ে শুয়ে পড়ল মালতি। সৌমেন ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে কী যেন বলে হাসল একটু। দেয়ালা করছে।
*****
করালী চোখ কুঁচকে সৌমেনের দিকে আপাদমস্তক দেখল একবার। তারপর মুখের খৈনিটা থু থু করে ফেলে দিয়ে বলল, “শালা কুঁজোর আবার নাগরালির শখ! আমার মেয়েটাকে ফুসলে নিয়ে গিয়ে সব্বোনাশ করলি, এবার তার ম্যাও সামলাবে কে? বেওয়ারিশ মাল ভেবেছিলিস নাকি শালা? আজ তোর একদিন কি আমার –”
“আহা অত উত্তেজিত হবার কী আছে করালী? মাথা ঠান্ডা করো। একে মারধোর করে কি তোমার মেয়ের ঝামেলা ঘুচবে? তার চেয়ে বরং আমি বলি—” পঞ্চায়েত প্রধান মন্মথ সেন মাথা নাড়াচ্ছিলেন। তাঁর গলার স্বর শান্ত এবং আদেশ অমোঘ। তাঁর ঠাকুরদাদা বাণীপুরের জমিদার ছিলেন। তিনিও তাই আছেন। শুধু পদনামটা বদলেছে এই যা।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মালতির দিকে তাকিয়ে মন্মথ এবারে প্রশ্ন করলেন, “তোর বাপ যা বলছে তা সত্যি?”
মৃদু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো মালতি। সৌমেন দেখতে পেল না। সে মাথা নিচু করে বসেছিল এক কোণে। সেই রাতটার পর মাস দুয়েক কেটে গেছে। মালতি আর এদিকে পা বাড়ায় নি। আর তারপর আজ সকালবেলায় হঠাৎ একেবারে এতবড় পেট নিয়ে বাপের সঙ্গে এসে—
“তা, মৃগাংক যা বলল তাতে এ ছোঁড়া রাতে মধ্যে মধ্যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেত। একেবারে রাত কাটিয়ে তারপর ফিরত। তুমিও তো বললে মেয়েও তোমার মাঝেমাঝেই বেরিয়ে যেত রাতে। এখন কেলেংকারি যখন একটা হয়েই গেছে আর তোমার মেয়ে সে কথা স্বীকারও করেছে তখন সে নিয়ে আর জল ঘোলা না করে মেয়ের কপালে একথাবা সিঁদুর পরিয়ে দাও ছোকরাকে দিয়ে। ঝামেলা চুকুক। কিন্তু একটা কথা, এলাকার মধ্যে মারধোর হুজ্জুতি চলবে না, আর তোমার মেয়ে বা এই ছোকরাকে কাল থেকে গ্রামের ত্রিসীমানায় যেন না দেখি। সেক্ষেত্রে জনগণ আইন নিজের হাতে তুলে নিলে আমায় দোষ দিও না।”
রায় দান করে মন্মথবাবু উঠলেন। ব্যস্ত মানুষ। তাঁর বিস্তীর্ণ রাজত্বে আরো বহুতর সমস্যা তাঁর আদেশের জন্য অপেক্ষা করে আছে।

।৩।
অতএব সৌমেন মালতিকে নিয়ে বাণীপুর ছেড়ে ফের রওনা হল। টাপুরে নৌকায় ভাঁটায় তিন জো চার ভাটির পথ। যাবে বাঁড়ুজ্জের বিল। বিয়ের পর করালীই খবরটা দিয়েছিল। বলে, “এ এলাকায় যা গন্ধ ছড়িয়েছো বাবাজি তাতে খানিক দূরে চলে যাওয়াতেই তোমাদের মঙ্গল।”
আসলে কুঁজোটাকে ঘরজামাই করে ধোঁকার টাটি সাজিয়ে মেয়েকে দিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য চালিয়ে যাবারই মতলব ছিল করালীর। কিন্তু ঘটনা হল, সিঁথেয় সিঁদুর পরে মালতির সাময়িক মনোবিকলন ঘটেছিল হঠাৎ করে। করালীর প্রস্তাবটা শুনেই সে একেবারে ফোঁস করে উঠল। সে করালীর অনেক হাঁড়ির খবর রাখে। বাপ বলে বিশেষ ভক্তিশ্রদ্ধাও করে বলে অতিবড় শত্রুতেও বলবে না। রেগে গেলে ফাঁসিয়ে দিতে কতক্ষণ। অতএব মানে মানে বিদেয় করাই ভালো।
সৌমেনেরও আর বাণীপুরে থাকবার ইচ্ছে ছিল না কোন। বলেছিল মালতিকে নিয়ে উড়েই রওনা দেবে। কিন্তু মালতি তাতে রাজি নয়। বলে, “ওসব পাখিগিরি আমার সংসারে আর চলবে না তোমার এই বলে দিলাম। থাকতে হলে বউবাচ্চা নিয়ে আর দশটা মানুষের মতন করে থাকবে।” আর তারপরেই সৌমেনকে একেবারে জড়িয়ে ধরে নিজের আদেশটাকে এমন সুস্বাদু করে তুলেছিল সে যে সৌমেনের কিছুই বলবার ছিল না।
বাঁড়ুজ্জের বিল জায়গাটা খারাপ নয়। নতুন পত্তনি হয়েছে। রাস্তাঘাট এখনো কাঁচা। লোকজন জমেছে ভালই। এইখানে এসে সৌমেন কয়েকটা হোমিওপ্যাথিকের জল, গুলি আর একটা চটি বই জোগাড় করে নিয়ে ডাক্তার হয়ে বসল। জ্বরেসর্দিতে রাসটক্স, পেটখারাপে নাক্স ভমিকা আর পড়েটরে গেলে আর্নিকা। ধ্যাদ্ধেরে অজ আবাদ এলাকায় ওইটুকু পেয়েই লোক ধন্যি ধন্যি করে।
বিয়ের ছ’মাসের মাথায় মালতির ছেলে হল। সৌমেনের সে নিয়ে হেলদোল হল না বিশেষ। দুনিয়াদারির জ্ঞান তার এমনিতেই কম, আর তার ওপরে সে তখন মালতি আর নতুন ডাক্তারির নেশা, এই দুয়ে মজে আছে একেবারে।
আর একটা আশ্চর্যের ব্যাপার হল, মালতিকে বিয়ে করবার পর থেকে তার পিঠের সেই তিরতিরে ব্যথাটা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। মালতি তাকে একটা ক্যাম্বিশের খোল খুব কায়দা করে সেলাই করে দিয়েছে। জামার মতন বুকেপিঠে পরে নিয়ে বোতাম এঁটে দিলে ডানাদুটো আঁটোসাঁটো হয়ে লেপটে থাকে পিঠের সঙ্গে। ওতে করে চলাফেরার অস্বস্তিটা অনেকটাই কমে গেছে। পিঠটাও আর অত বেঢপ লাগে না। কয়েকদিন যেতে না যেতেই খোলটায় তার এমন অভ্যাস হয়ে গেল যে দিনেরাতে সবসময়েই ওটা পরে থাকতে তার আর কোন অস্বস্তিই হয় না।
বছরদুয়েক বাদে একদিন রাত্রে আদর খেতে খেতে মালতি হঠাৎ বোতাম খুলে ক্যাম্বিশের খোলটা সরিয়ে তার ডানাদুটোয় হাত দিয়ে খিলখিল করে হেসে বলে, “ওমা, কেমন শুকিয়ে এসেছে, দেখো, দেখো—”
সৌমেন তাড়াতাড়ি তার ওপর থেকে উঠে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পিঠ বেঁকিয়ে দেখে, সত্যিসত্যি ডানাদুটো কেমন কুঁকড়ে ছোট হয়ে এসেছে। নাড়াতে গিয়ে দেখে তখনো নাড়াতে পাড়ছে বটে, কিন্তু তেমন জোর পাচ্ছে না আর। তারপর ফের বিছানায় ফিরে গিয়ে শুতে মালতি তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “বাঁচলাম। এইবারে একদিন মাখনকে দিয়ে ওদুটো কাটিয়ে ফেলে দেব। শুকিয়ে গেছে তো! বেশি লাগবে না। নইলে শীতগ্রীষ্ম ওই মোটা খোলশ পরে থাকা দিনরাত-”
মাখনের ওপর মালতির এখন অগাধ ভরসা। ছোকরা সৌমেনের ডিসপেন্সারির অ্যাসিস্ট্যান্ট। কাজ শিখছে তার কাছে থেকে। চটপটে আছে বেশ। দরকারে রোগির নাড়িটাড়ি দেখে দেয়, ওষুধও বলে দেয় অনেকসময়। সৌমেন বাইরে বাইরেই ব্যস্ত থাকে বেশি। বাড়ির যাবতীয় কাজেকর্মে অতএব মাখনই এখন মালতির ভরসা। দুনিয়াদারির জ্ঞানও তার প্রখর। সাজোয়ান ছেলে। অবরেসবরে মালতি তাকে তাই একটুআধটু কৃপাও করে থাকে আজকাল। তাতে অবশ্য দোষ নেই। সামলেসুমলে চললেই হল।
সৌমেন অবশ্য মালতির প্রস্তাবে রাজি হল না। ডানাদুটো শুকিয়ে গেছে যাক। কিন্তু তাই বলে সেদুটোকে কেটে বাদ দিতে তার মোটেই মন করছিল না। মৃদু হেসে সে বলল, “ছেঁড়াকাটা করে অঙ্গহানি আর নাই বা করলাম মালতি। ও যেমন শুকিয়ে উঠেছে তাতে আর কদিন বাদে নিজেনিজেই ঝরে যাবে দেখো।”
********
ডানাদুটো কিন্তু ঝরল না। কুঁকড়েমুকড়ে লেপ্টে রইল পিঠের সঙ্গেই। এইভাবে আরো বছর পনেরো কাটতে সৌমেন মোটামুটি সে দুটোর অস্তিত্ত্বই ভুলে গেল একরকম। সেটাই স্বাভাবিক অবশ্য। ছেলে বড় হচ্ছে। পশারও বাড়ছে। মাখনের বুদ্ধিতে নৌপট্টি আর ঢাকির দুটো বাজারে দুখানা চালাঘর নিয়েছে সে বিশ বিশ চল্লিশ হাজার সেলামি দিয়ে। হপ্তায় চারদিন কেটে যায় সেই দুই ডিসপেনসারিতে ঘুরে ঘুরে প্র্যাকটিশ করে। বাকি তিনদিনও বাড়িতে থাকে সে নামমাত্রই। বাঁড়ুজ্জের বিলের ডিসপেনসারি সেসময় তার দিনরাত ভিড়ে ভিড়াক্কার থাকে। অবশ্য বাড়ি নিয়ে মালতি তাকে বিশেষ জ্বালায়ও না। মাস গেলে ঝনাৎ করে হাজার কয়েক টাকা তার হাতে ফেলে দিলেই হল। বাকিটা মাখন সামলে নেয়। লোকে বলে, কুঁজো সৌমেনের বেস্পতি তুঙ্গে।
এই সময় একদিন হঠাৎ করে তার ডানাদুটোর কথা ফের মনে পড়ে গেল একটা অঘটন ঘটে। নৌপট্টি জায়গাটা ইদানিং বেশ জমজমাট গঞ্জ হয়ে উঠেছে। গঞ্জের একটেরেতে খোকা সামন্ত আটদশটা ঘর নিয়ে একটা মাইফেলের আড্ডা বানিয়ে হইহই করে ব্যবসা চালু করে দিয়েছে। নৌপট্টিতে চেম্বার থাকলে সৌমেন মাঝেমাঝে এখানে এসে রাতটা একটু ফূর্তি করতে যেত খোকার আড্ডায়। বসবার জন্য কোন বাঁধা কেউ ছিল না অবশ্য তার। তবে খোকা তার পেশেন্ট। সৌমেন এলে তাকে খাতিরটাতির করে ভালো কোন ঘরে নিয়ে ঢুকিয়ে দিত এক রাতের জন্য। টাকাপয়সা নিয়েও বেশি বাড়াবাড়ি করত না।
এমনি একদিন খোকার আড্ডায় গিয়ে ঢুকতে সে বলে, “কীগো ডাক্তার নতুন আমদানি ঘোড়া পরখ করে দেখবা নাকি?” তারপর চোখ টিপে বলল, “খাঁটি পক্ষিরাজ গো! একবার চাপলে পরে আর অন্যে মন উঠবে না দেখো।”
সৌমেন মাথা নেড়ে হেসে বলল, “তা, তুমি নিজে সুপারিশ করছ যখন খোকা তখন তো একটু দেখতেই হয়—”
মেয়েটা সত্যিই বেশ তেজি। মন ভালো হয়ে গেল সৌমেনের। ঘন্টাখানেক কসরতের পর তার পাশে শুয়ে শুয়ে হাঁফাচ্ছে এমন সময় হাতপাখা নিয়ে তাকে বাতাস করতে করতে মেয়েটা বলে, “উঃ! এই গরমে গায়ে একটা ক্যাম্বিশের খোল বেঁধে রেখেছ কেন গো? এসো খুলে দি। আরাম পাবে।”
বলতে বলতে মেয়েটা সৌমেনের ক্যাম্বিশের খোলের বোতামে হাত দিতে যাচ্ছিল। সৌমেন একটা ঝটকা মেরে তার হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলল, “খবরদার। ওতে হাত দিবি না একদম।”
মেয়েটা এইবার একটু চুপ করে থেকে তারপর বলল, “ওইখানে কী আছে আমি জানি।”
সৌমেন একটু সতর্ক গলায় বলল, “কী আছে?”
মেয়েটা উত্তর না দিয়ে হাত বাড়িয়ে ঘরের আলোর সুইচটা টিপে দিল। তারপর তার কোল ছেড়ে উঠে বসে পেছন ঘুরে বলল, “আমার পিঠটা একবার দেখো।”
বালবের কর্কশ, হলদেটে আলোয় তার খোলা পিঠটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ সৌমেনের বুকের ভেতর একটা কাঁপুনি ছড়িয়ে গেল। দুটো দীর্ঘ, গভীর ক্ষতচিহ্নের শুকনো দাগ মেরুদন্ডের দুপাশ দিয়ে লম্বালম্বি ওপর থেকে নিচের দিকে নেমে এসেছে।
উলটো দিকে মুখ করে রেখেই মেয়েটা বলল, “আমার যা ছিল তোমার তা এখনও আছে, তাই না?”
এইবারে সৌমেন আয়নায় মেয়েটার ছায়ার দিকে ভালো করে ঘুরে দেখল। তারপর নিচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে বলল, “দুলদুলি—তুই—এখানে কী করে?”
“কী করে আবার? যা হয়। আমার বর আর পিলুমাসী মিলে দরদস্তুর আগেই ঠিক করে রেখেছিল। সিঁথেয় সিঁদুর দিয়ে বোম্বে নিয়ে গিয়ে দুদিন ফুর্তি টুর্তি করে তারপর কামাথিপুরার একটা কোঠিতে তুলে দিয়ে এলো দুজন মিলে।”
“অ। তার মানে এ লাইনে অনেকদিন আছিস? ভালো। কিন্তু তোর পিঠে—”
“বলছি। কামাথপুরাতে বছরদুয়েক থাকবার পর হায়দার বলে একজন আমায় বাঁধা করে নিয়েছিল। লোকটা গুন্ডামত ছিল তবে আমায় খুব ভালোবাসত। বলেছিল কলমা পড়িয়ে ঘরে নিয়ে রাখবে। আমারও তখন তোমার মতন পিঠের চুলকুনি বেজায় বেড়ে উঠেছে। তা সে-ই একদিন ভালো করে চুলকে দিতে গিয়ে পিঠের মরা ছাল তুলে দিয়ে ডানাদুটো বের করে আনল। তারপর আমায় ঘুরে ঘুরে দেখে আর বলে, ‘তু পরী হৈ। মুঝে ছোড়কে ভাগ যায়েগি।’ এই বলে খুব আদরটাদর করে সে আমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ল। কিন্তু পেটে পেটে যে তার অন্য মতলব ছিল সেটা তো আর বুঝিনি। মাঝরাতে হঠাৎ উঠে পড়ে আমায় কিছু বুঝতে না দিয়েই মুখটা বেঁধে উপুড় করে মাটিতে ফেলে দিয়ে পিঠের ওপর চেপে বসে একটা মাংসকাটা চপার দিয়ে ডানাদুটোর গোড়ায় কোপের পর কোপ মারতে শুরু করল।
“জ্ঞান ফিরতে দেখি হাসপাতালে পিঠে বিরাট ব্যান্ডেজ বেঁধে পড়ে আছি। পরে জেনেছিলাম, কান্ডটা নিয়ে খবরের কাগজে বেশ তোলপাড় হয়েছিল। হায়দারকে খুনের দায়ে পুলিশে ধরেছিলো। তার পরির গল্প কেউ বিশ্বাস করে নি। বলেছিলো মাথার গোল হয়েছে। তবে ঘরে অত পালক কী করে এলো সেই নিয়ে খবরের কাগজে বিস্তর আলোচনা হয়েছিল। এরপর কামাথপুরাতে বেশ ক’বছর কাটিয়ে আর ভালো লাগলো না, তাই দেশে ফিরে এসেছি। আচ্ছা আমায় একটা কথা বলো না, ও ডানা দিয়ে সত্যি সত্যি ওড়া যায়?”
হঠাৎ করে সৌমেনের কী যে হয়ে গেল, সে উঠে বসে এসে দুহাতে দুলদুলিকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে বুকের ভেতর মুখটা গুঁজে দিল। সে পেষণে কাম ছিল না, প্রেম ছিল না, শুধু একজন ডুবন্ত মানুষের হঠাৎ নাগালে আসা খড়কুটোকে চেপে ধরবার আবেগটুকু ছিল। অথবা রথের মেলায় পথ হারানো ছেলেটা যেমন করে পরিচিত মানুষটিকে ফিরে পেয়ে জাপটে ধরে সেইরকম একটা স্বস্তির গন্ধ ছিল। দুলদুলি বুঝতে পেরেছিল। এসব কথা মুখে না বললেও ঠিক বোঝা যায়। আস্তে আস্তে , সৌমেনকে কোল থেকে সরিয়ে না দিয়েই সে তার ক্যাম্বিশের খোলটার বোতামগুলো খুলতে লাগল এক এক করে। তারপর একসময় সেটাকে এক টান মেরে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সৌমেনের কুঁকড়ে ছোট হয়ে যাওয়া জীর্ণ ডানাদুটোকে বের করে আনল বাইরে। অসীম ভালোবাসায় তাদের গায়ে খড়খড়ে আঙুলগুলো বোলাতে বোলাতে বলল, “নাঃ, এতে ওড়া যায় না। জোরই নেই কোন।”
হঠাৎ তাকে একটা ধাক্কায় ঘরের এক কোণে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল সৌমেন। মাথার দুপাশের শিরাদুটো দপদপ করছে তার। দাঁতে দাঁত পিষে বলল, “কী বললি তুই মাগী? আমি পারি না? আমি পারি না?” তার ডানাদুটোর মধ্যে সেই পুরনো তিরতিরানির স্মৃতিটা ফিরে আসছিল যেন একটু একটু। টের পাচ্ছিল, গরম রক্তের স্রোত ফের ধেয়ে যাচ্ছে পালকের নিচে লুকনো দুর্বল পেশিগুলোর শিরাউপশিরা দিয়ে। হঠাৎ একটা প্রাণপণ চেষ্টায় কঙ্কালসার ডানাদুটোর একটা ঝাপটা মেরে মাটি থেকে লাফিয়ে বেশ খানিকটা উঠে গেল সৌমেন, আর তারপরেই সটান আছড়ে পড়ল নিচের শক্ত সিমেন্টের মেঝের ওপর। মুখটা ঘষটে গিয়েছিল তার।
দুলদুলি ছুটে এসে তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে রক্তাক্ত গালদুটোকে মুছিয়ে দিতে দিতে বলছিল, “এমন করে না। তুমি উড়তে পারো। সত্যি বলছি। নিজেচোখে দেখলাম তো! তুমি—”
মেয়েরা মায়াবিনী তো হয়ই। আর যে মেয়ের ডানা ছিল এককালে সে তো আরো বেশি মায়াবিনী হবে। দুলদুলির গলার আওয়াজে আর তার হাতের ছোঁয়ায় জাদু ছিল কিছু। সৌমেনের সব রাগ, সব দুঃখ কেমন করে যেন মিলিয়ে গেল একেবারে। চোখদুটো বুঁজে ভীষণ আরামে ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে সে শুধু জড়ানো গলায় বলল, “আমি পারি রে। কায়দাটায়দাগুলো শুধু ভুলে গেছি এই যা। সব মনে পড়ে যাবে আবার। তুই দেখিস—”
ঘুমন্ত মানুষটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রেখে ঠায় জেগে বসে রইল দুলদুলি। তার পিঠের কাটা দাগদুটোর ভেতরে পুরনো ব্যথাটা ফের দপদপ করছিল অনেকদিন বাদে। বহুদূরে, অন্য একটা অন্ধকার বারান্দায় বসে বসে মাখন তখন মালতিকে শিখিয়ে দিচ্ছিল কেমন করে সৌমেনকে এইবারে বাড়িটা দোতলা করাবার জন্য রাজি করাতে হবে। এইবারে ছেলেটাকে হোস্টেল থেকে ফিরিয়ে এনে তার বিয়ে দেয়া দরকার। তার জন্য সবকিছু আলাদা করে বানিয়ে রাখতে হবে আগেভাগেই।
মাখন বড় ভালো পুরুষ। মালতির জন্য গোটা জীবনটাই উৎসর্গ করে রেখেছে সে। মালতির প্রসাদের টুকরোটাকরার বেশি আর কোন চাহিদাই তার নেই জীবনে। সৌমেনকেও সে ভালোই বাসে। একটু ন্যালাখ্যাপা মানুষ, কিন্তু মাথার জোরে কেমন রাজ্যপাট বানিয়ে ফেলল এ দেশে এসে, সেটা সে অনেকের কাছেই গর্ব করে বলে থাকে আজকাল।

।৪।
নৌকোটা ভেসে ভেসে যতক্ষণ চোখে আড়ালে না গেল ততক্ষণ তারা কেউ জায়গা ছেড়ে নড়ে নি। জায়গাটার নাম বাঘমারীর চর। জিজ্ঞাসা করতে মাঝিই নামটা বলেছিল। দূর থেকে পাড়ে দুতিনটে চালাঘরমতন দেখা যায় জলের ওপর থেকে। তারা দুজন যখন বলল এইখানেই তারা নামতে চায় তখন একটু অবাক হয়ে মাঝি বলেছিল, “সে কী? দেবীপুর তক যাবেন বলে নৌকা ভাড়া করলেন যে! এখন মাঝপথে এসে--” আসলে তার চিন্তা হয়েছিল মাঝপথে নেমে গিয়ে গোটা পথের ভাড়াটা আবার ফাঁকি না দেয় লোকটা।
সৌমেন মাথা নেড়ে বলেছিল, “সে কথা ছাড়ো। ভাড়া তুমি পুরাপুরিই পাবা। এখন নাও ভেড়াও তাড়াতাড়ি।” “চলেন তাহলে,” বলে জলের ভেতর লগি ডুবিয়ে পাড়ের দিকে ঠেলতে ঠেলতে মাঝি ফের একবার সতর্ক করে দিয়েছিল, “ওখেনে গ্রামট্রাম কিছু নাই কিন্তু। চালাঘরটর যা দেখতেছেন, ও হল গিয়া মউলেদের ঘাঁটি। মাঝেমধ্যে নৌকা নিয়া চাক ভাঙতে আসে, বা ধরেন গিয়া হোগলা বা গোলপাতা কাটতে এলো কেউ। তখন চরে এক দু রাত কাটায়। সেইজন্য চালা বেঁধে রেখেছে একদুইখান।”
ঘোমটার নিচে থেকে দুলদুলি ইশারায় ঘাড় নেড়েছিল একবার। সৌমেন আর কথা বাড়ায়নি। বলেছিল, “সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। ভাড়া পাবে পুরা। এখন লগি ঠেলো তাড়াতাড়ি।”
চালাঘরটায় অনেকদিন কারো পা পড়েনি। ভরা ভাদ্রমাস চলছে। মধুর সময় নয় এটা। আরো বেশ কয়েকমাস এই চরে তৃতীয় কোন মানুষ আসবে বলে মনে হয় না। সঙ্গে করে আনা পুঁটুলিগুলো একটা চালার মধ্যে বসে খুলতে খুলতে দুলদুলি ফিক করে হাসল। তারপর বলল, “বাঘ আসলে কী করবা?”
সৌমেনের মুখে জবাবটা এসে যাচ্ছিল, “তোকে বুকে ধরে নিয়ে উড়ে—”
একরকম ঠোঁট কামড়ে জবাবটাকে গিলে ফেলল সে। এখনো তার ডানায় সে জোর ফিরে আসে নি। ক্যাম্বিশের খোলাটা সে নদীর জলে বিসর্জন দিয়ে এসেছে এখানে এসে ওঠবার আগেই। শুধু পিঠের ওপর নেতিয়ে থাকা ডানাদুটো দুপাশে ছড়িয়ে একটা জোর ঝাপটা দিল সে। তারপর কাঠকুটো জুটিয়ে একটা বড়োসড়ো ধুনি জ্বালাতে বসল। দুলদুলি বোধ হয় বুঝতে পেরেছিল সে কী বলতে চায়। আস্তে আস্তে কাছে এগিয়ে এসে তার ডানাদুটোর গায়ে চুমু খেল সে। ঠোঁটের মধ্যে টের পাচ্ছিল, বহুদিন পরে ভালোবাসার স্পর্শ পেয়ে একটা শিরশিরানি ছড়িয়ে যাচ্ছে দুর্বল ডানাদুটোতে। শিরশিরানিটা সংক্রামিত হচ্ছিল তার সমস্ত শরীর জুড়েও।
*****
সঙ্গে করে আনা খাদ্যপানীয়ের সঞ্চয়টুকু ফুরোতে তাদের বড়জোর একটা সপ্তাহ কেটেছিল। নিয়মিত অভ্যাসে ততদিনে সৌমেনের ডানায় শক্তি ফিরে এলেও তখনও পুরোপুরি ওড়বার ক্ষমতা ফিরে আসেনি তার। দ্বীপটাতে খাবার যোগ্য কোন শস্যবীজ বা ফলের গাছ নেই বিশেষ। অতএব সঙ্গের খাদ্যপানীয় ফুরোতে কাঁকড়া, ক্যাওড়া, বেত ও গোলপাতার ফল এবং নদীর নোনতা জল খেয়ে তাদের দিন কাটতে শুরু করল এর পর। তবে তাতে একদিনের জন্যও সৌমেনের ওড়ার চর্চায় ছেদ পড়েনি। দুলদুলিরও একদিনের জন্য ছেদ পড়েনি তার ডানার যত্নআত্তিতে। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ক্লান্ত, যন্ত্রণাকাতর ডানাদুটোকে বড় আদরে সে পরিষ্কার করে দিত তাদের পরণের পোশাকগুলো থেকে তৈরি কাপড়ের খন্ডগুলো দিয়ে। তারপর সেই কাপড়ে জড়িয়ে তাদের সে উষ্ণতা দিত অনেক রাত পর্যন্ত। অন্ধকারের মধ্যে সে শুনতে পেত ঘুমন্ত সৌমেনের নিঃশ্বাসের শব্দ আর অলক্ষ্যে বন্যজন্তুদের চলাফেরার আওয়াজ। তার ভয় করত না। কেবল সামনে জ্বলন্ত আগুনের ধুনিতে কাঠ গুঁজে দিয়ে তাকে আরো সতেজ করে তুলত সে। আর তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে তার প্রিয় ডানাদের উষ্ণ পালকে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়ত। সেই যত্নে ও অভ্যাসে ক্রমশই পরিপুষ্ট হয়ে উঠছিল সৌমেনের ডানাদুটো।
এইভাবে প্রায় একমাস পার হবার পর একদিন গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসল সৌমেন। তার পিঠের ডানাগুলোতে সেই আগেকার দিনগুলোর মত পুরনো তিরতিরানিটা শুরু হয়ে গেছে ফের। ডানাদুটো তাকে ডাকছে যেন। তার মস্তিষ্কের মধ্যে ফের জেগে উঠছিল আকাশচারণের জন্য দরকারী পেশিসঞ্চালনের কৌশলগুলো। ওড়বার কায়দা এইবারে তার ফের মনে পড়ে গেছে।
দুলদুলি ঘুমিয়ে ছিল তার প্রসারিত ডানার ওপরে গুটিশুটি হয়ে। পালকের উষ্ণ আবরণ থেকে আস্তে আস্তে তাকে বের করে আনল সৌমেন। শেষরাত্রের ঠান্ডায় মেয়েটার খোলা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। ধুনির আগুনটা খুঁচিয়ে তাতে আরো কিছু কাঠ ছুঁড়ে দিয়ে তার পাশে দুলদুলিকে শুইয়ে দিল সে। তারপর সতেজ ও পুষ্ট ডানাদুটি দুপাশে ছড়িয়ে কোন এক প্রাচীন, নগ্ন ঈশ্বরের মতন সোজা হয়ে দাঁড়াল সেই অগ্নিকুন্ডকে সাক্ষি করে। তারপর, শুয়ে থাকা মেয়েটি, যে কিনা একদিন নিষ্ঠুরভাবে বঞ্চিত হয়েছিল ওড়বার আনন্দ থেকে, তাকে বড় আদরে বুকের কাছে ধরে নিয়ে শেষরাত্রের ঘনীভূত বাতাস কেটে উড়ে গেল পাশেই বহমান জলধারার ওপর দিয়ে গভীরতর দক্ষিণের দিকে। সেইখানে নদী ও সমুদ্রের ক্রমাগত মিলনে সৃষ্টি হয়ে চলেছে নতুন পলিমাটির উর্বর, কুমারী দ্বীপমালা। সেই তাদের প্রকৃত ঠিকানা হবে।


(দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যর এই অসাধারণ গল্পটা গল্পগুচ্ছ নামে একটা লিটল ম্যাগে (প্রিন্ট ভার্সান) বেরিয়েছিল। আমরা ওয়েবে পুনঃপ্রকাশ করলাম।)

ফেসবুক মন্তব্য