মাকু

উত্তম বিশ্বাস

কোল নরজে সেই ব্যাও খানেক কাপড় জড়িয়েছে ত জড়িয়েছে! এই মাস কালের মধ্যে শানা-বোয়ায় একটি টানও পড়ল না। কোমরে ব্যথা ত ব্যাথা!--- একেবারে খিলমারা ব্যথা, সব কি আর নুন- হলুদ পোড়ায় উপশম হয়! হপ্তাভর কলিজা খিচিয়ে হিস্টিরিয়া রুগির মত হাত-পা ছুঁড়ে মাত্র যদি আসে হাজার বারশো---- তখন কারও আর সুতো ভিজনোর ইচ্ছা থাকে না! সরিষা ক্ষেতের আলে ভুট হয়ে শুয়ে আছে লাটু। দূর থেকে ওর জুত বরাত দেখলে মনে হবে যেন, আ-হলদে আমসি শুকোতে দেওয়া আছে রোদে! রুপালি মাঝে দু’তিনবার পেটিকাঠ দিয়ে ওকে গুঁতো দিয়ে গেছে। লাটু ওঠেনি। শুধু সেদ্ধ ধানের মত খেজুর পাতার চাটাই এর এ কানা থেকে ও কানায় দু’একবার উলটে ভেজে পড়ে আছে! রুপালির এমন খোঁচাখুঁচি ওর গা সওয়া হয়ে গেছে, কেননা লাটু যে তাঁতখানায় শাড়ি বুনছে ওটি আসলে রুপালির সৌজন্যেই এ চালা পর্যন্ত পৌছেছে! তাছাড়া আস্ত একখান তাঁতি পাড়ায় রুপা’ই হল হাসুয়ার মত ঝকঝকে বৌ! যদিও ওর পাছাটা মনসার ঘটের মত ঠিলে পানা, ---তাতে কি! ননীর কি এমন মুরোদ যে ঘটকলসের মত পাছাভারি মেয়ের বাপেরা ওর হাতে পায়ে ধরে সাধবে? করে ত কুটিয়ালির কাজ! তাছাড়া যত মেদমাধুরিই হোক না কেন একমাস তাঁতঘরে বসলেই সবই গাবের আঁটি হয়ে ওঠে যে! এসব এখন সব মেয়ের বাপেরাই আঙুলের কর গুনে গুনে হিসেব রাখে!

পাড়ায় নতুন কুটুম ঢুকলেই লাটু ম্যাড়ার চামে আর হ্যাঁচকা টান মারে না। ত্রিপল আর পচা খড়বিচালির ঝাপ বাঁধা চালাটার নীচে ঘাপটিমেরে পড়ে থাকে; পাছে শব্দ হয়! ধুরন্ধর মাকুটাও বোয়ার সুতো গিলে আর ধা করে ছুটে আসে না! সেও দক্তির বাক্সে কচ্ছপের শুঁড় উঁচিয়ে চেয়ে থাকে! লাটু ঘন ঘন উরুতে হাতের চেটো দিয়ে ঘষা দেয়। অসাড়! সব অসাড়! ভীষণ নিরুৎসাহিত লাগে নিজেকে! লুঙ্গিতে ছোপ ছোপ সাবুর দাগ ----খই’এর মাড়; শীতের রোদে শুকিয়ে তা খানিকটা মড়মড়ে হয়ে ওঠে। লুঙ্গির খুঁট খুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দ্যাখে খোলের সুতোর খাপি। নাহ! শানা-বোয়া টানতেও আজ বড় অনীহা তার। টানতেও তো কোমরে জোর চাই! মুঠোর মধ্যে পুরুষের মাজা- কাঁকাল জড়ো হয়ে এলে, তাকে আর যাই হোক মরদ মনে করে না কেউ!

--‘ ও ঠাকুরপো ওঠ! খাটো বেলা, শুয়ে থাকলি হয়! মাচায় এখনও চল্লিশ মোড়া সুতো পড়ে আছে। বুনে শেষ কর!” এই নারী আহিংকে গ্রামে একমাত্র আমসি রুপালিই যেন অপ্সরা হয়ে ধরা দেয় লাটুর চোখে! ননী যখন ধানকলে যায়; তুষ-কুড়ো মেখে ভূত হয়ে হাট-গামাল ঘেঁটে বেড়ায় ----তকন রুপালি একান্ত অবসরে লাটুর নির্জন তাঁত ঘরে ঢুকে শৌখিন সুতোর গল্প শোনায়! টানা দেওয়া কাপড়ের ওপর এমন আদুরে পেটিকাঠের বাড়ি লাটুর মা জীবিত কালেও বুঝি কোনদিন মেরে দ্যাখাতে পারেনি তার জাত শিল্পি বাবা জগন্নাথ’কে! লাটু দ্যাখে আর অবাক হয়ে যায়, ঝরঝরিয়ে ঝরে পড়ে সুতোর ভাজের জল; আর পান চেবান কথার ফাঁকে খই’এর মণ্ডটি নরম হাতে আলতো আদরে বুলিয়ে দেয় কাপড়ে খোলে! রসুনের খোলের মত মড়মড়ে হয়ে ওঠে খাপিমারা কাপড়। লাটুর চোখদুটো চিকচিক করে ওঠে! অন্ধকার চালাঘরে রুপালি খিলখিল করে হেসে ওঠে----‘ হিহিহি--- আমি জানতাম, আমি না এলেই আজ আবার লুঙ্গিতে আঠা লাগিয়ে ফেলতে! যেখানে সেখানে আঠা বেশি মাখিও না ঠাকুরপো; শক্ত হলেই কিন্তু জট পাকিয়ে যাবে----তখন কিন্তু ছাড়ানো মুশকিল হবে!’

রুপালি মাঝে মাঝে এসে ম্যাড়ার চামে হাত লাগায়; সুতো গলাবার অছিলায় সুচালো মাকুটা নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নাড়াচাড়া করে, আর বলে,---‘তোমার ননে দা আর জম্মে সন্নেস টন্নেস ছিল,-- বুঝলে ঠাকুরপো! কিডা যে ওর বিয়ে করার জন্যি কানে ফুঁ দিয়েছিল কে জানে বাবা! কতকিছু করলাম, এট্টুও গায়ে মাংস লাগাতি পারলাম না!’ লাটুর মুঠো শক্ত হয়ে আসে। সে মনে মনে ভাবে ,--‘ মেয়েমানুষের এসব ছেনালি মারা কথায় কান দিলেই কাজে ক্ষতি! দু’দিন তাঁতে বসলি সব কেরাচিন এমনিতেই উবে যাবেনি! আচ্ছা নতুন কুটুম কাদের ঘরে আসল রে রুপা?”

--“নতুন কুটুম না ছাই! তাঁতি পাড়ায় কেউ মেয়ে দেয়! তোমার বন্ধু বিশের বৌ আজ ঘর ভেঙে বাপের বাড়ি চলে গেল! বাপরে বাপ! পোঁদে ত্যানা না থাকলে কি হবে টমক আছে চোদ্দ আনা! বলে কিনা শহরে গিয়ে বাবুদের বাসন মেজে খাব, তাও স্বীকার --- কিন্তু তাঁত ঠ্যাঙ্গাতি পারব না সারাজীবন! দিব্বি ক্যামন ড্যাং ড্যেঙ্গিয়ে চলে গেল!” লাটুর বুক ঠ্যালা দীর্ঘশ্বাসে সরিষা ক্ষেতের ছেটানো পরাগ আজ বাসি উনোনের ছাইয়ের মত একরাশ হতাশা আর বৈরাগ্যভারে শৈত্যপ্রবাহের মুখে যেন কোথায় উড়ে গেল! বিশেরও ঘর ভাঙল! বিশে আর লাটু সমবয়সী। বিশে লাটুর চেয়ে পুড়ূষ্ট; চ্যাটা কোমর, মোটা বাহু--- মোচড়ানো উরুর অধিকারী হওয়ায়, ঘটক লাটুকে দেখতে এসেও বিশেকে পছন্দ করে ফ্যালে! এ নিয়ে সে দুঃখ করেনি কোনদিন! গোপালের মজুরী মোটা, সে’ও বৌ’এর কথায় তাঁত ছাড়ল! কাশলে কফের সাথে রক্ত ওঠে বলে, ননী কুটিয়ালিতে গেল; বিশেও নাহয় তাই করত, তাঁত ছাড়ত! চোখদুটো সহসা নয়ানজুলি হয়ে আসে লাটুর ! তবু বিশের জন্য গর্ব হয় তার,---‘ সামান্য একটা শরীর ছাড়া আর তো কিছু না! শালার ভা’র এমন পেশা, কপালে একটা মেয়েলোক পোন্ত জোটে না! ধুর তোর মুখি মুতি! বাপ চোদ্দপুরুষের পেশা, শুধুমাত্র একটা মেয়েমানুষের লোভে --- না জোটে থাক দরকার নেই!’ আবার এও ভাবে, মাঠা বুনে খেলো শাড়ি বুনে বুনে, ফুলিয়ার তাঁতিপাড়া আজ পৃথিবীর কাছে হাসি ঠাট্টার সেরা ঠিকানা হয়ে ঊঠেছে দিনকে দিন! কি হবে এসব অতীত অসুখ পুষে রেখে! তার চেয়ে বরং মাজায় গামছা জড়িয়ে জোগালের কাজে নেমে পড়লে আর যাই হোক জীবন যৌবনের কাছে দু’বেলা এমন জবাবদিহি করা লাগে না! দুপুরে দু’মুঠো ভাত আর সন্ধ্যেয় আয়েশ করে টিভি সিরিয়াল তো দ্যাখা যেত!” এসব সুখের কথা চিন্তা করে মাঝে মাঝে ভীষণ মুষড়ে পড়ে লাটু! কিন্তু খুঁটিতে কে বলবুদ্ধি জোগাবে তার? শুকনো বাঁশপাতার মত সংসার--- ক্ষুধার আগুন এখানে মারাত্মক রকম ভয়ঙ্কর! শুধু ননী কেন, জীর্ণ কঙ্কালসার হ্যাণ্ডলুমের তাঁত চালাটা আজকাল আর কেউই তেমন আকড়ে ধরে থাকতে রাজি নয়---- বিশেও না হয় ওই চালাটার নীচে দু’পাচটা হাঁসমুরগি কিম্বা শুয়োরের খোঁয়াড় বানাতে পারত! --- তাহলে বৌটা তো আর এমনভাবে হাতছাড়া হত না! ---- তাঁতিদের হিসেব সুতো মাপা; একটু বেখেয়াল টান পড়েছে তো অমন ঘ্যাচাত---- ! অকারণ আর অন্যের জন্যে মন পোড়াতে ইচ্ছা হয় না লাটুর!

--“ তুমি ঝদি তাঁত ছাড়, তুমারও ডানাকাটা পরি জুটে যেতি পারে, বলা কি যায়!”
---“ আমার দরকার নেই! ওতে আমি মুতি সাতশোবার!”
---‘ ইশ! এই জন্যিই এত ঘন ঘন সাবু ভেজাও বুঝি!” দুর্বল পুরুষকে দুর্বল বললে সত্যি সত্যি তারা একসময় সিংহ হয়ে ওঠে! লাটুর চোখমুখ অসম্ভব রকমের লাল হয়ে উঠল!

রঙে চোবানো সুতো শীতের হাওয়ায় একসময় দড়া হয়ে আসে! শানার চিরুনির ফাঁকে গমের কাঠি, পচা সুতোর ছাট ধুলো আর অনাদর জমে জমে একহাঁটু পুরু হয়ে উঠেছে! ছটকার দড়ি বোধহয় দু’এক জায়গায় ছিঁড়েও গেছে কিম্বা ন্যেংটি ইঁদুরে কুচি করে রেখেছে। রতন এসে সেদিন খুব তড়পাচ্ছিলি,--“ না পারলে টানা খুলে মালিকের ঘরে মোড়া ফেরত দিয়ে আয়! না হলে বাপের জমিদারি আছে তাই একদাগ লিখে দে --- সুতোর দাম দিয়ে আসি!” রুপালি মাঝে মাঝে এসে শূন্য তাঁত ঘরে উঁকিঝুঁকি মারে,--“ ছিলা পন্তি না এলি, আমিই বা টানা খুলি ক্যামনে! তাছাড়া পাটার আঁচলে রুপালির হাতের নতুন নকশা উঠেছে খানিকটা ---- এটুকুর জন্যেও লাটু নেতিয়ে পড়তে পড়তে গা ছেড়ে দিতে দিতেও আবারও উঠে বসে; মাকুটা ছুটতে থাকে! কচি হাতের নতুন গুটির কাজ দেখে রতন মুগ্ধ হয়; ---“যাক মাকুর খোঁচা খেয়ে ঝদি এক নরজ ছিঁড়েও ফ্যালে তাতেও লাভ! মেয়েমানুষের হাত না পড়লে ফুলিয়ার সুতোয় ফুল ফোটে নাকি!”

রুপালি উৎসাহ পেয়ে স্তন উচু করে করে শ্বাস নেয়! ননী তুষ কুড়োমাখা দাঁত বার করলে, রুপালি ঝামটা দিয়ে বলে,--“ তাই বলে আবার একখানা তাঁত একে আমাকে কুঁজো কলসির মতো ঘাড় ধরে বসিয়ে দিও না ----আমিও কিন্তু বিশের বৌএর মত---!” রতন ভাবে,--“ রুপালি দারুণ চালাক, ওকে দিয়েই হেলেকে গোখরো বানাতে হবে! অতএব তাঁতিদের আগে মাজা সোজা করার মালিশের ব্যবস্থা করতে হবে! পচুক সুতো! আগে ওদের মাজায় টানা দেওয়া দরকার!”

সকালের রোদে উঠোনে ঠ্যাং ছড়িয়ে রোদ পোহাচ্ছিল লাটু! রুপালি পেছন দিক থেকে ছুটে এসে এক খামচা হলুদ লাগিয়ে দিল লাটুর গালে! একদম শীলে বাটা কাঁচা হলুদ! আজ আর গাল গিস্তি করার সুজোগ পায় নি লাটু। কেননা ওর দাওয়ায় সকাল থেকে পা ঝুলিয়ে বসে আছে সুন্দরী তনুশ্রী, সঙ্গে সাঙ্গপাঙ্গ আরও অনেকে! কাল ওরা কোলকাতা থেকে এসেছে। রাতে রতনের ঘরে ছিল ওরা; আজ সকাল না হতেই সটান তাঁতি পাড়ায়--- উঠবি না ওঠ এক্কেবারে লাটুর দাওয়ায়! তনুশ্রী সুন্দরী মডেল। আজ সারাবেলা সুটিং হবে! বিষয় –“ ফুলিয়ার ফুল্লরা”! রুপালি রতনের চোখে চোখ রাখে আর মুচকি মুচকি হাসে , আর খুব ব্যস্ততা দ্যাখায় ! এসব টোটকা কাজে অবশ্য রুপালির আলস্য নেই! ননী তুষ কুড়ো মেখে ভূত সেজে থাকলে কি হবে,--- রুপালি সকাল সন্ধ্যায় পালা করে শাড়ি পালটায়! এসব নিশ্চই রতনকে দ্যাখানোর জন্য ----! দেখুক যেয়ে! ওই তো ভারি আমড়ার আঁটি পানা পাছা --- তাতে আবার ফুলিয়া ---!--- ভাবে লাটু! হলুদ মাখা শেষ করে শ্যালোর জলে হুশহাশ করে গা ধুয়ে আসে লাটু। সরিষা ক্ষেতের আলে আলমোড়া দিয়ে দাঁড়াতে হবে তাকে। পাড়ায় এত তাঁতি থাকতে লাটুকেই বা কেন পছন্দ করল কোলকাতার বাবুরা; এসব ভাবার দরকার আছে!--- মনে মনে ফুলে গোল হয়ে আসে লাটুর শীর্ণ বুকের ছাতিটা! পাল্টে পাল্টে শাড়ি পরবে তনুশ্রী ম্যাডাম! রতন আজ দারুণ ব্যস্ত; কিন্তু ওকে আজ দারুণ ফুরফুরে দ্যাখাচ্ছে! রতন বেছে বেছে লাটুর হাতে বোনা শাড়িগুলিই রুপালিকে দিয়ে সুটিংস্পটে পাঠিয়ে দেয়! পাশে তনুশ্রী ---- রুপালির চেয়ে অনেক অনেক রুপুসি সে! কী দারুণ তানপুরার মত পাছা;---যা কিনা তাতিপাড়ার কোনও মেয়েছেলের নেই! সর্ষে ক্ষেতের মাঝে হঠাতকরে লাটুর নিজ হাতে বোনা সবুজ- হলুদ ফুলিয়া শাড়ি উড়তে দেখে লাটুর নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস হয় না কিছুতে! চোখে সর্ষের ফুল দ্যাখে সে! সাবুর মাড় দেওয়ার পর ফাঁকা মাঠে শীতের হাওয়ায় কতই না শাড়ি ওড়ে একা একা! কিন্তু আজ এভাবে স্বপ্নেবোনা জরির ভাজে তার এতদিনের অধরা মাধুরি যে এভাবে ধরা দেবে সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি! এত অপূর্ব হাতের কাজ তার! তনুশ্রী আজ যেন ডানাকাটা পরি! সর্ষে ক্ষেতের আল বেয়ে তনুশ্রী শুধু উড়তে থাকে ---একেবারে হলুদ প্রজাপতি! গড়ানো লাউয়ের মতো ঢেউখেলানো শরীর ---- কানের দুপাশ বেয়ে লতিয়ে পড়া উদ্দালক মেঘ! আহ! ফুলিয়ার শাড়িতে মেয়েদের এত সুন্দর দ্যাখায়!--- তারই হাতে বোনা শাড়ি পরে মেয়েরা সিরিয়াল করে; সিনেমা বানায়! সে আগে জানত না!! মাঠের কিনারে ক্যামেরার আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এক আকাশ বিস্ময় নিয়ে হাসতে থাকে রুপালি; পাশে তৃপ্তির ঢোক গেলে রতন! এক একটা শাড়ির আঁচল খোলে আর তার সুক্ষ্ম গুটির কাজ দেখে বিস্ময়ে ফেটে পড়ে তনুশ্রী! আবেগে ফুল হয়ে ফুটে পড়ে সে! এবার তার কনকচাঁপা আঙ্গুলগুলো গুজে গেয় লাটুর রুক্ষ এলোমেলো চুলের মধ্যে! মেয়েমানুষের প্রকাশ্য আদরে লাটুর ভেতরটা ধুকপুক করে উঠলেও মনে মনে দারুণ শিহরণ অনুভব করে! তাঁতি পাড়ার সব পুরুষমানুষ যেন আজ হাঁ করে চেয়ে আছে লাটুর দিকে! ছিলা টানা খশখশে চামড়া ওঠা হাতের চেটোটা ঘামে জ্যাবজেবে হয়ে আসে লাটুর! মনে মনে মাকুটাকে আদর করার সুখ অনুভব করে সে!
-----“ এই শাড়িগুলো সব তুমি বানিয়েছ? ওফ! অসাম! ইউ আর সোওওওও--- গ্রেট ক্রিয়েটিভ জেন্টলম্যান! অ্যাই অ্যাই ক্যামেরা মুভ মুভ -----!” এইবার লাটু মনেপ্রাণে এনামেলের ডেচকির মতো দুমড়ে যেতে থাকে! তনুশ্রী খপ করে লাটুর হাতখানি ধরে ফ্যালে, ---“হাউ শাই! তুমি শিল্পী না! এই দ্যাখ, আজ আমি তোমারই শাড়িতে কত সুন্দর! জাস্ট আ শট ----রেডি ---!” শহরের সব মেয়েরাই কি তনুশ্রী মডেলদের মতো গাঁয়ে পড়া! তনুশ্রীর হাতখানি ছাড়াতে পারে না লাটু! –“ধুর ল্যাওড়া শাঁখ বাজাচ্ছে কিডারে!--- রুপালি না? না তো ,---আজকাল মোটরেও এমন মিষ্টি আওয়াজ হয় নাকি! বাজাচ্ছে বাজাক! এমন মেয়েছেলে সবার গায়েই ঝেদি গড়িয়ে পড়ত তাইলে তাঁতি পাড়ায় এমন হায়হায় খাইখাই থাকত না! তাছাড়া রুপালিও এট্টু দেখুক না, লাটুর মত ছেলেকে মেয়েলোক পছন্দ করে কি করে না না!” —মনেমনে সে তনুশ্রীর পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াবার মন্ত্র জপ করতে থাকে! দিগন্তের সন্ধ্যা সবিতা তার সিঁদুর পর্বের অলিখিত আভা শোভা ছড়িয়ে দিয়ে নিরুত্তাপ হতে থাকে ধীরে ধীরে! গাড়িতে উঠবার আগে রংমাখানো ঠোঁটে মিষ্টি হাসি হেসে তনুশ্রী একটি বিজ্ঞাপনী নামপত্র গুজে দেয় লাটুর হাতে----‘ আমি তনু! গড়িয়াহাট শাড়ি প্যালেস; ফুলিয়া সেকশান, ফোরথ ফ্লোর কোলকাতা-----!” ব্লেজারের শেষ বোতামটা খুলতে খুলতে রতনের চোখে চোখ পড়ে লাটুর! কখন যেন ওটা ওর গায়ে জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে রতন! পরের পোশাকে ছবি তুলতে খানিকটা সংকুচিত লাগে নিজেকে!
কয়েক গাছি জটপাকানো লাল টুকটুকে সুতো ছাড়াতে গিয়ে লাটুর এখন রীতিমত খাওয়া ঘুম ছুটে যাওয়ার উপক্রম! কেরোসিন ল্যাম্পের মোটা শিখাটা যেন ওর চোখের ওপর মডেল তনুশ্রীর উতলান লাবণ্যের মত দপদপিয়ে জ্বলে উঠছে রাত্রি দিনে মুহূর্তে মুহূর্তে! কি যেন নতুন কাজের বরাত দিয়ে গেছে তার প্রিয় শিল্পীকে! মাঝে মাঝে ভাঙা তাঁতচালাটার ফাঁক দিয়ে সর্ষে ক্ষেতের দিকে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে লাটু। দিন দশেক আগের সর্ষের শিস গুলি হঠাতকরে সব যেন ফলভারে আলের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। তনুশ্রীরা যখন এসেছিল, তখন কী নিবিড় ভুঁই ঠাসা পুঞ্জ পুঞ্জ ফুল ---যেন হলুদের হড়পাবান! শীতের বেলা গড়িয়ে ফুরোয় তাড়াতাড়ি। উত্তুরে হাওয়া সরিয়ে আবার যখন পলাশ শিমুল ফুটবে রুপালিদের হেলেপড়া গাছের ডালে ডালে; তখন নিশ্চই আরও একপ্রস্থ লাল রঙের ফুলিয়া শাড়ির শুটিং হবে। লাটুর উৎকণ্ঠার শেষ নেই। কালই হয়ত কয়েক মোড়া নতুন সুতো পাজা করে ছুটে এসে তাগাদা দেবে রুপালি! হুড়মুড়িয়ে গাঁয়ের ওপর এসে পড়বে বিয়ের সিজেন!

ঝরা পাতা মাড়ানো মুচমুচ শব্দে একসময় আবেশ ভেঙে যায় লাটুর, --‘আরে রতন’দা যে! এত রাতে কি ব্যাপার?’ পেছনে হাড়িমুখপানা রুপালি। মনে মনে লাটু ভাবল,-- ‘ওমা! এই রাত দুকুরে রুপালির’ই বা আবার কি ভীমরতি চাগাল!’
---‘এইবার আমার তাঁতখানি ফেরত দাও ঠাকুরপো!’ রুপালির কথাটা লাটুর মুখে হঠাত যেন ম্যাড়ার চাম ছিটকে এসে বাড়ি খেল! মুড়ির ছাতুর মত শুকনো ঢোঁক গিলতে চেষ্টা করল লাটু,---‘ কে চালাবে তাঁত?’
---‘ক্যান তোমার ননে’দা! জীবনে কষ্ট ছাড়া আর আছেই বা কি! রতন’দা সবার জন্যে এত ঝ্যাকন করচেন, আমাদের জন্যে নিশ্চই একটা মোটরের ব্যবস্থা উনি করেই ছাড়বেন! দুদিন কষ্ট করুক; মোটরওয়ালা তাঁতে শুনি তো এত কষ্ট না!’ লাটু হাজার চুরাশি প্রশ্ন নিয়ে নীরবে রুপালির দিকে চেয়ে থাকে! রুপালি আজ বাষ্প ঠ্যালা গরম সরার মত ঠনাস ঠনাস করে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগল,--‘ক্যান, ছাই ভুষি মাখা মানুষটাকে লায়েক হয় না বুঝি! শাড়ি বুনলে আমার তাঁতে, আর তুমি কিনা ফটাফট ছবি উঠালে ওই মডেলের সাথে! কোই তখন ত আমার নাম একবারও মুখে আনলে না? ক্যান, আমার পেছনে মাংস নেই তাই?’ অন্ধকারে ছায়ামূর্তির মত এসে দাঁড়িয়ে পড়ে ননী। সেও আর অধিক বাক্যব্যয়ে সময় পচাতে রাজি নয়। ফটাফট খটাখট তাঁত যন্ত্রটা খুলতে থাকে ননী। ওর সাথে হাত লাগায় রতন নিজেও! লাটুর মাথাটা সুতোহীন চরকার মত চক্কর দিয়ে ওঠে,--‘রতন’দা তুমি যে সেদিন ক্যামেরার সামনে বললে, আমি নাকি দারুণ শাড়ি বুনি; তাহলে?’

---‘দাওয়ায় পেয়ে তুইও তো লম্বাচওড়া কম মারলি না! ঠিকানা তো নিয়েছিস, এবার শোরুমে যা! কটা নালিকাটা আর কোন শাড়িতে কোথায় মাকুর খোঁচা লাগিয়েছিস সব চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে অখন যা!’

সারারাত আজ দারুণ শৈত্যপ্রবাহ! খরখর মড়মড় শব্দে শূন্য তাঁত চালার ওপরের পচা খড়বিচালি, ছেঁড়া প্লাস্টিক, সুতোর ছাট ---সব যেন রুপালির টুকরো কথার মত উড়ে যেতে লাগল! লুঙ্গিটা গায়ের ওপর মুড়ি দিয়ে মাওড়ার মত গোটোমোটো হয়ে শুয়ে আছে লাটু! পাশেই রুপালির ঘরখানা যেন নতুন বরাত পাওয়া প্রতারক পাওয়ারলুমের অফিস! ওদিকে তাকাতেও চরম ঘেন্না লাটুর! ঘন কুয়াশার ভারে পাতলা তাবু ঘেমে ঝরঝর করে ঝরে পড়ে জল। ভোর হল বুঝি! লাটুর একসময় মনে হল, এই বুঝি রুপালি পেটিকাঠ দিয়ে বাড়ি দিয়ে গেল তার গোটানো কোল নরজে! কিন্তু না! ভুল দেখছে লাটু! আজ লাটুর জন্য পথ আগলে দারুণ অ্যাঙ্গেলে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরী তনুশ্রী! হাতে তার নরম খইয়ের মণ্ড; পরম মমতায় লাটুর গায়ের ওপর বিছানো শতছিন্ন লুঙ্গিটায় যেন মাড় বুলিয়ে দিচ্ছে তনুশ্রী! ক্রমশ পূর্বদিকের সর্ষে ক্ষেতের ঢেউগুলি লাল হয়ে আসে। রুপালির ঘর থেকে খটাখট শব্দ ভেসে আসে শিশির পতনের শব্দের মত মৃদু মন্থর লয়ে! আর তখনও চিকানো সুতোর জন্যে অস্থির একটি মাকু লাটুর তলপেট বেয়ে কলিজার খাঁচা বেয়ে একেবারে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিতে লাগল!

ফেসবুক মন্তব্য