এলিস ওয়াকার এর পরিচিতি এবং কবিতার অনুবাদ

অশোক চক্রবর্তী

এলিস ওয়াকার: ১৯৪৪-
একজন জন্ম প্রতিবাদী মানুষ, তীব্রকন্ঠ একটিভিস্ট, প্রতিবাদী কবি, সাহিত্যিক, গল্পলেখক এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি নিবেদিত।
জর্জিয়ায় জন্ম। আটটি সন্তানের কনিষ্ঠতম। ছোটবেলায় এক ভাইয়ের অসতর্ক গুলি তার এক চোখ অন্ধ করে দেয়। ভাইকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে বাবা মাকে সেকথা বলেননি। ১৯৬০ সালে মার্টিন লুথার কিং এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার। আটলান্টার লরেল কলেজ বৃত্তি পেয়ে পড়াশুনো। কলেজের অধ্যাপক হাওয়ার্ড জিনের প্রভাবে সিভিল রাইট মুভমেন্ট এ যোগদান।
১৯৮২ তে বর্ণবিদ্বেষী শেতাঙ্গ সভ্যতা আর পুরুষ তান্ত্রিক কৃষ্ণাঙ্গ মানসিকতা নিয়ে "কালার পার্পল" লেখেন। পরে ওপরা উইনফ্রি এর সার্থক চলচিত্রায়ন করেন।
মার্চ ৮, ২০০৩ হোয়াইট হাউস এর সামনে ইরাক যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন ও গ্রেপ্তার হন। তিনি বলেন - এখানে আমরা প্রতিবাদীরা বিশ্বাস করি ইরাকের নারী ও শিশুরা আমাদের পরিবারের নারী ও শিশুদের মতই মূল্যবান। জোরা নীল হার্স্টন এর লেখার ভক্ত ছিলেন। হার্ষ্টনকে প্রায় বিস্মৃতি থেকে ফিরিয়ে আনেন।
২০০৮ সালে বারাক ওবামাকে ভাই ওবামা সম্বোধন করে অভিনন্দন পত্র পাঠান - তুমি তোমার নিজস্ব স্থানে পৌঁছতে পেরেছ। ২০০৯ সালে টরন্টো ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভালে ইস্রায়েল ফিল্ম "সিটি টু সিটি" র বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ পত্র পাঠান - ইস্রায়েল, তোমরা একটি এপারঠাইড দেশ।
২০০৯ সালে কোড পিঙ্কের সঙ্গে গাজা অভিযান করেন পালেস্তাইনের সমর্থনে। অথচ তাঁর স্বামী ছিলেন ইহুদি। একটি পালেস্তাইন মহিলা যখন তাঁকে বলেন - ভগবান তোমাকে ইহুদির হাত থেকে রক্ষা করুন, তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে ওঠেন - বড় দেরী হয়ে গেছে, আমি যে তাদেরই একজনকে বিয়ে করে ফেলেছি। অবশ্য ১৯৭০ তেই তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। এঁরা ছিলেন প্রথম আইনত বিবাহিত মিশ্রবর্ণের দম্পতি। এজন্য তাদের বিস্তর অসুবিধের মধ্যে পড়তে হয়। K. K. K. এঁদের বহুদিন ধরে ভীতি প্রদর্শন করেছে।
তাঁর ভাষণে তিনি অনায়াসে বলতেন - মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রায়েল সব থেকে বড় টেররিস্ট। আমেরিকা আর ইস্রায়েল হলো সংঘবদ্ধ লিগাল টেররিস্ট অর্গনাইজেশন।
নব্বইয়ের দশকে গায়িকা সঙ্গীত রচয়িতা ট্রেসি চ্যাপম্যান এর প্রেমে পড়েন। এঁদের লেসবিয়ান সম্পর্ক প্রায় মিথের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বলতেন - এটি অতীব আনন্দের সম্পর্ক, delicious, আমি আনন্দ করেছি এবং ট্রেসিকে পরিপূর্ণ ভালবাসি। এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, আর কারো নাক গলাবার দরকার নেই।
মেডিটেশন করতেন, বলতেন আমার অস্তিত্ব সমগ্রের একটা অংশ মাত্র। ভারতীয় বংশোদ্ভুত প্রতিভা কারমার (কেনিয়া) তাঁর ওপর কিছু ফিল্ম করেছেন।
অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন : পুলিটজার (১৯৮৩), লেনন - ওনো শান্তি পুরস্কার, ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড এবং আরও অনেক।
------------------------------------------------------------ -
প্রত্যেকে, রাশ টেনে ধরো
এলিস ওয়াকার

মৃত্যুর আগে আমরা সমবেত কন্ঠে প্রশ্ন তুলছি:
আমরা সুস্পষ্ট ঘোষণা করতে চাই -
আমরা কি কৃষ্ণাঙ্গ? আমরা কি নারী? সমকামী?
আমরা কি ভুল কৃষ্ণাঙ্গ? নাকি আমরা বিবর্ণ হলুদবর্ণ?
ভগবানের দোহাই, আমরা কি ভুল মানুষকে ভালবাসছি?
ভুল দেশকে? কিংবা রাজনীতিকে?
আমরা কি এগনেস স্মেড্লি, না জন ব্রাউন?
সব থেকে বড় কথা, আমরা যা দেখছি সেসব কি লিখে রাখছি?
যতটা স্পষ্ট করে লেখা যায়? আমরা কি এখনো চিৎকার
আর কেঁদে ফেলার মত বর্বর আছি?
তা না হলে নোংরা আর কাদা দিয়ে ওরা আমাদের
চোখ, কান, নাক, আর মুখ বন্ধ করে দেবে,
নিঃশেষ হযে যাবে আমাদের অস্তিত্ব।
অন্ধকার রাতে ছিন্নভিন্ন করে দেবে আমাদের আঙ্গুল
আমাদের লেখার কলম দাঁতের ঔজ্জ্বল্য বাড়াবে ওরা
আমাদের সন্তান আর সৃষ্টির, শিল্প আর বিবেকের
বারোটা বাজিয়ে দেবে ওরা।
আমরা যেভাবে দেখি সেভাবে দেখাতে পারলে
ওরা নিশ্চিত জানবে ওদের পূজো করিনা আমরা
পূজো করিনা ওদের, কিংবা ওদের তৈরী সভ্যতাকে
বিশ্বাস করিনা ওদের কথা, যোগ্যতার দাবি
ওদের কলকারখানা আর সৃষ্টি করা ধোঁয়াশা
টেলিভশন প্রোগ্রাম, রেডিও একটিভ লিক
একঘেয়ে সংবাদ পত্র, গাড়ি, কিংবা ব্লন্ড মেয়েদের
জন্য আমাদের বিশেষ প্রেম নেই।
ওদের রেনেসাঁস নিয়ে চিন্তা করিনা, ইংল্যান্ড নিয়ে মাথা ব্যথা নেই
ওদের মস্তিস্কের উর্বরতা নিয়ে ঘোরতর সংশয় আছে।
এক কথায়, আমরা যারা কবি, শিল্পী, গান করি
চিত্রকর, ভাস্কর লেখালেখির মধ্যে আছি
জনগনের সঙ্গে আমাদের বুদ্ধি ও বৃত্তির লেনদেন করি
ওদের সঙ্গে সেখানে আমাদের একটুও তফাত নেই
ভিতরে বাইরে ওপরে নিচে, আমরা আসলে একই রকম
তাহলে পূজো করার কারণ থাকবে কেন?
পূজো করিনা, কেননা চলচ্চিত্র বল, গান বা সংবাদপত্র বল
কেউ সঠিক কথা বলেনা, সঠিক সংবাদ দেয় না
ওদের প্রেসিডেন্ট এর জন্য আমাদের কোন মুগ্ধতা নেই।
আমরা জানি হোয়াইট হাউস কেন সাদা।
সত্যি বলতে কি ওদের সন্তানদের অসাধারণ মনে হয় না
পৃথিবীর অধিকার শুধু ওদের হাতে, মানতে রাজি নই আমরা।
ইদানিং তোমরা চেষ্টা করছ আমাদের জ্যান্ত কবর দেওয়ার
তোমরা বলছ - কিং একজন নারীখাদক, ম্যালকম x একজন থাগ
সজুর্নে অতি সাদামাটা, হান্স্বেরি বিশ্বাস ঘাতক ও বেশ্যা।
জোরা হার্স্টন, নেলা লারসেন, টুমার, প্রতিক্রিয়াশীল, ব্রেনওয়াশ্ড
সাদারা ওদের বাড় বাড়িয়েছে, আর এগনেস স্মিডলি? নির্ঘাত স্পাই।
আমি তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারি - তুমি কাদা ছুঁড়ছ
একসঙ্গে কবরের কিনারে দাঁড়িয়ে আমি ঘোষণা করছি -
এই নারকীয় মিথ্যে - থামাও
এসো, একসঙ্গে সকলে রাশ টেনে ধরি।
দ্যাখো, আমি এই কবরের কিনারে দাঁড়িয়ে আমার মাযের হাত
আর পিতার পা স্পর্শ করে আছি, স্পর্শ করে আছি
রবসনের হাত, লাংষ্টনের উরু, জোরার বাহু ও কেশরাজি
তোমার পিতামহের উন্নত চিবুক, একটি গোল্লায় যাওয়া মেয়ের কনুই
অথচ তুমি তোমার পিতামহীর ভ্রুকুঞ্চন প্রানপণ ভুলে যাবার চেষ্টা করছ।
প্রত্যেকে, সূর্যের আলোর নিচে এক একজনকে এনে ফেলে
অগুনতি কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছি আমরা
শুধু মনে রেখো, ওরা যাই করুক না কেন
হয় আমরা সকলে মিলে বেঁচে থাকব
অথবা কেউই থাকব না।
------------------------------------------------------------ -------

শহীদেরা
এলিস ওয়াকার

একটা সামান্য বা বিশাল বিজয়ের পর
শহীদেরা কোথায় যায়, কখনো ভেবে দেখেছ কি?
অজানা কোনো মহান উদ্দেশ্যের জন্য
যে সব শহীদ তাদের মূল্যবান রক্ত আর জীবন দিয়েছে
আমি অনুভব করি, তারা আমার আশেপাশেই আছে
আমাদের এই জমায়েতের আশেপাশেই আছে তারা
কান্নাকে বুকে চেপে রেখে আমাদের আনন্দ আর হাসির
সঙ্গে খুশি হয়ে হাততালি দিচ্ছে তারা
আমি দেখতে পাই তাদের বুকের রক্তের দাগ শুকিয়ে
গোলাপের পাপড়ি হয়ে গিয়েছে, দেখতে পাই
তুমি যখন তোমার চিবুক মুছে নিচ্ছ, তখন শুধু চোখের জল নয়
মুছে নিচ্ছ ওই শুকিয়ে যাওয়া গোলাপের পাপড়ি
শহীদের কোনো আফশোষ নেই
তার যা করণীয় ঠিক তাই সে করেছে
তার জন্য একটুও উদ্বিগ্ন নয় সে
তার সংগ্রাম একটি পরিপূর্ণ রহস্যের মধ্যে আবৃত
ঠিক এইজন্যই তারা আমাদের উপরে থাকে
সঙ্গে থাকে আর আমাদের ভিতরে থাকে
আমাদের দিকে মানব সূর্যের মত
মহান কিরণ বিম্বিত করতে থাকে অবিরাম

ফেসবুক মন্তব্য