‘লালমাটি’র কথা

রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায়


রাজর্ষি চ্যাটার্জী-র পরিচিতি: "আমি কে নিজেই তা আজও ভালো করে জানি না, কী পরিচয় দেব নিজের!" সংক্ষেপে আত্মপরিচিতি লিখতে বলাতে এই উত্তর তিনিই দিতে পারেন প্রথাগত পরিচয়ে বলার জন্য আদপেই যার ঢের কিছু থাকে। মুম্বাইবাসী আমরা, যারা তাকে চিনি, ভালো করেই জানি যে পুরুলিয়ায় লাল-সবুজের সমারোহে, এক সাঙ্গীতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা তার প্রকৃত পরিচয়ে এখনো লেগে আছে মাঠাবুরুর স্মৃতি, লালমাটির টান আর ধামসা-মাদলের লাব-ডুব। যার পিতামহী ছিলেন সাহিত্যিক বনফুলের বোন এবং দাদামশাই শুধুমাত্র সেই সময়ের একজন বিশিষ্ট আইনজীবিই নন, ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন এবং নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের ঘনিষ্ট এক জাতিয়তাবাদী মানুষ, সেই রাজর্ষি চ্যাটার্জীর যতই একটা ঝাঁ-চকচকে শহুরে-পেশাদারী পরিচয় থাকুক, তা ওর শিকড়ের সপ্রাণতাকে কখনোই ক্ষইয়ে দিতে পারে না, পারেনি। অবহেলিত পুরুলিয়ার জন্য সাধ্যমত কিছু করার অদম্য ও অকৃত্রিম ইচ্ছাটাই বোধহয় আজ ওর সঠিক পরিচয়। 'ঝর্ণা-রঞ্জিত কাঁসাই ইকো ফাউন্ডেশন'-এর কর্ণধারের এই লেখাটা পড়লেই আপনারা পেয়ে যাবেন তার অন্তরমহলের প্রকৃত পরিচয়।

‘লালমাটি’র কথা

‘লালমাটি উৎসব ও গান মেলা’ নিয়ে কিছু বলতে বা লিখতে গেলে এক অদ্ভূত আবেগ এসে যায় মনের মধ্যে। এই আবেগ আমার ফেলে আসা সেই লালমাটির দেশ পুরুলিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্মৃতির সরণী বেয়ে যদি পিছন ফিরে তাকাই এখনো স্পষ্ট দেখতে পাই সেই দিনগুলো যখন থেকে এই স্বপ্ন দেখার শুরু।

১৯৯০ সাল। হাইস্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছি। পুরুলিয়ায় বাড়ির দুর্গাপুজোয় নবমীর রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সব জ্যাঠতুতো, পিসতুতো ভাইয়েরা মিলে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে চলে গিয়েছিলাম পুরুলিয়া শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে পারিবারিক সম্পত্তি খয়ের বনে যাতে একসময় খয়ের গাছের জঙ্গল ছিল ও গুটিপোকা চাষ করা হত। সেই খয়ের বনের পঁচানব্বই শতাংশ প্রাইভেট ফরেস্ট এ্যাকুইজিশন আইনের আওতায় সরকার কর্তৃক অধিগৃহীত হয় এবং বাকি পাঁচ শতাংশ ছিল শুকনো ডাঙা জমি আর কিছু ভাগচাষীদের হাতে। সেই নবমীর রাত আমার কাছে আজও স্মরণীয়, সেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, জঙ্গলের গাছগুলো যেন তারা ভর্তি আকাশের তলায় ঘোমটা পরে বসে আছে। আমরা ছয় ভাই কোন কথা না বলে আশ্বিনের শিশির ভেজা মাঠে চুপ করে বসেছিলাম আর গেয়ে উঠেছিলাম ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্বভরা প্রাণ’। কখন যে ভোর হয়ে গিয়েছিল বুঝতে পারিনি। তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরতেই বড়দের তুমুল বকুনির সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নীচু করে বলেছিলাম, আমরা সূর্য ওঠা দেখতে গিয়েছিলাম।

তখন থেকেই স্বপ্নটা মনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। তারপর ধীরে ধীরে নিজের প্রফেশনে থিতু হতে হতে পেরিয়ে গেছে কয়েকটা বছর। চলে এসেছি মুম্বই। কিন্তু যে স্বপ্ন দেখার সূত্রপাত হয়েছিল সেই প্রথম যৌবনের দিনগুলোতে, সেই স্বপ্নটা ভুলতে পারি নি। তাই ২০০৮ সালে পারিবারিক সেই অবশিষ্ট পাঁচ শতাংশ যা প্রায় কুড়ি একর জমি অধিগ্রহণ করা শুরু হল। এই জমি অধিগ্রহণে অনেক বাধা বিপত্তির সামনাসামনি হতে হয়েছে। কিন্তু এসব বাধা পেরিয়ে অবশেষে ২০১০ সালে জমির চারদিকে দেওয়াল উঠল। সেই সময় শুধু একটা কথাই সবাইকে বলতাম যে এ জায়গা কোনমতে বেহাত হতে দেব না, প্লট করে বিক্রিও হবে না। এ জায়গা হবে পুরুলিয়ার কৃষ্টির পীঠস্থান। স্বপ্নটা একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল – ‘রঞ্জিত ঝর্ণা কাঁসাই ইকো ফাউণ্ডেশন’। এই সংস্থার উদ্দেশ্য পুরুলিয়ার গ্রামীণ মানুষদের জন্য কাজ করা, তাদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া, তাদের স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা এবং পুরুলিয়ার লোকশিল্পকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এখানে গ্রামের মেয়েদের সেলাই বা হস্তশিল্পে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতের কাজ দেশের নানা শহরে পাঠানো হয় প্রদর্শনীর জন্য। এর উদ্দেশ্য মেয়েদের স্বনির্ভর করে তোলা। পুরুলিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যেমন – মৃৎশিল্পে দিয়ালি পুতুল, আদিবাসীদের হাতে ঘাস দিয়ে তৈরি নানা জিনিস, ছৌ নাচের মুখোশ, গ্রামের প্রাচীন সূচীশিল্প প্রভৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং সেগুলিকে যুগোপযোগী করে তোলার কাজ করা হয় এই ফাউণ্ডেশনে। এখানে গড়ে তোলা হয়েছে ছৌনাচের শিল্পীদের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। শিশুদের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজও শুরু হয়েছে। এই সংস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ মানুষদের নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা এবং চিকিৎসা শিবিরও করা হয়ে থাকে। একটি ইকো ভিলেজও তৈরি করা হচ্ছে এখানে – ‘নীলকণ্ঠ উডস’; গ্রামের ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হবে এর ফলে।

কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে পাশে পেয়েছি অনেক মানুষকে এবং ২০১৫ সালে প্রথম নবী মুম্বইয়ের আর্বান হাটে ‘লালমাটি উৎসব ও গান মেলা’ আয়োজন করা হয় রঞ্জিৎ ঝর্ণা কাঁসাই ইকো ফাউণ্ডেশনের উদ্যোগে। সেই শুরু আর এ বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে তৃতীয় লালমাটি উৎসব। এই উৎসবে রাঢ় বাংলার লোকশিল্পকে তুলে ধরাই মূল উদ্দেশ্য। ‘লালমাটি উৎসব’ এক অর্থে মানুষের মিলনমেলা। এখানে একই মঞ্চে যেমন অনুষ্ঠান করেছেন পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা ছৌ নাচের শিল্পীরা, সাঁওতালী নাচের দল, ঝুমুর গানের শিল্পী আশীর্বাদ কর্মকার তেমনই অনুষ্ঠান করেছেন ধ্রুপদী শিল্পী বিশ্বমোহন ভাট, রোনু মজুমদার প্রমুখ। শিল্পই তাঁদের সকলকে মিলিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ বা মুম্বইয়ের নবীন এবং প্রবীণ প্রতিভাদেরও মিলনস্থল এই লালমাটি উৎসব। সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে গিয়ে মানুষকে ভাল কিছু দেওয়াই এই লালমাটি উৎসবের উদ্দেশ্য। এ যেন এক সাদা ক্যানভাস – তার ওপর শিল্পীরা তাদের নানা রঙের তুলি বুলিয়ে যান। উৎসব শেষে তৈরি হয়ে যায় নানা রঙের এক অপূর্ব কোলাজ। আর সব থেকে বড় কথা আমাদের দেশের লোকায়ত শিল্পের প্রতি যাতে মানুষ শ্রদ্ধাশীল হয় ‘লালমাটি উৎসবের সেটিও একটি লক্ষ্য।

আর এবারের লালমাটি উৎসবে থাকবে আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া। বাংলাদেশের শিল্পীরা তো অনুষ্ঠান করবেনই; সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকেও অনুষ্ঠান করতে আসছেন শিল্পীরা। সুতরাং এবারের ‘লালমাটি উৎসব’ দেশের সীমাকে মিলিয়ে দেবে পৃথিবীর সঙ্গে। আসুন না, আমরা সকলে মিলে সামিল হই এই বিশ্বভ্রার্তৃত্বের লালমাটি উৎসব ও গান মেলায়।

ফেসবুক মন্তব্য