নির্মাণ খেলা

সুবীর সরকার ও রঞ্জন রায়



(এই সংখ্যার 'নির্মাণ খেলা'-য় থাকছে উত্তরবঙ্গের কবি সুবীর সরকারের এক গুচ্ছ কবিতা এবং ওর কবিতা নিয়ে উত্তরবঙ্গেরই এক ঋদ্ধ পাঠক ও কাব্য-আলোচক রঞ্জন রায়ের দীর্ঘ আলোচনা।)

গুচ্ছ কবিতাঃ সুবীর সরকার

পান্ডুলিপি

হাঁস ও পাখির জগত। জনপ্রিয় খেলনাগুলির তালিকা তৈরী
করি
গামছাবান্ধা দই নেই।
কী ঝলমলে একটা সন্ধ্যা নামছে
কাজ বলতে পান্ডুলিপিতে ছবি
আঁকা

নিম্নবর্গের ইতিহাস

পিঁপড়ের গতিবিধির দিকে ভঙ্গি ও রঙের
খেলা
পুরোন বাঘের হুঙ্কার
দ্রুত পালাতে থাকলে ফিরে আসে ঠোঁটের
হাসি

দৃশ্য

কেউ কি অপেক্ষা করছে! হাড়ির কালি দিয়ে
দেওয়াললিখন। ইতিহাসের পুরোটাই তো প্রায়
জানা। মেঘ ঝুঁকে পড়ছে
দৃশ্যাবলিতে।

হিট ছবির গান

রাস্তায় রাস্তায় হিট গান গেয়ে বেড়াবে সে আর হবে
না
বাচ্চারা হুইসল দিলে
দূরে কোথাও রেখে আসি ঢোল
আর বাঁশি

কাহিনি

কাহিনি থেকে জীবনের কথা। তিনি প্রচন্ড হাসতে
শুরু
করেন। লাইন লাইন লিখে ফেলবার পর
অন্যমনষ্কতা। ঝাঁপিয়ে পড়ি শান্ত নদীর
জলে।


আলোচনাঃ রঞ্জন রায়

প্রান্ত-উত্তরের কবি সুবীর সরকার এবং কবিতায় তাঁর 'যাপন চিত্র'

" সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি :" -- বহু ব্যবহারে 'জীর্ণ' হলেও কিছু কথা তবু বারবার উচ্চারণ করা যায়! একবিংশ শতকের এই পর্বে দাঁড়িয়ে যদিও অনেকেই এমন মনে করেন যে কবিতারই যখন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া যায় না, তখন কোনটি কবিতা আর কোনটি নয় -- তার মানদণ্ড কী হবে? সেই সূত্রেই কবি আর অ-কবির মধ্যে ভেদ-রেখাই বা কীভাবে নির্ণীত হবে? এমন সব প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। পাশাপাশি এটাও সত্যি যে উত্তর ঔপনিবেশিক এই বাংলাদেশে কলকাতা কেন্দ্রিক একটি স্বঘোষিত সাহিত্য ধারা রয়েছে এবং এঁরাই বাংলা কবিতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক, ঠিক যেন লোকাল ট্রেনের নিত্য যাত্রীর অধিকার! এমন বিপ্রতীপতার ঢেউ সরিয়ে কখনও কখনও দূরবর্তী কোনো যাত্রী নিজের আসনটি দখল করে নেয় অনায়াসে। প্রান্ত- উত্তরবঙ্গের কবি সুবীর সরকার নি:সন্দেহে এমন একজন যাত্রী-কবি। নয়ের দশক থেকেই যাঁর কবিতা চর্চা যথেষ্ট গতিবেগ লাভ করেছিল। উত্তরের প্রকৃতি মাটি ঘাম রক্ত অশ্রুসহ মানুষের যাপনের এক অনবদ্য দলিল হয়ে উঠেছে সুবীরের কবিতা। দীর্ঘ দুই দশকের (1996--2016) অতিক্রান্ত সময়ের বিষবাষ্প, বিবর্তমান পৃথিবীর যাপনচিত্রের বৈচিত্রময় রেখাপাত, আর 'একক' হয়ে যাওয়া মানুষের অন্তরের গহনে ডুব দিয়ে কবি অনবরত তুলে এনেছেন অজস্র মণিমুক্তো। এই মুক্তো সন্ধান থেমে নেই। তোর্সার তীর ধরে কবি অনায়াসেই হেঁটে যান সূর্যাস্ত পর্যন্ত। কিম্বা বর্গক্ষেত্রের মত শহরে কবি খুঁজে ফেরেন তাঁর অন্তরে জমে থাকা অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর। আবার কখনো বা প্রেয়সীর পায়ের নূপুরের নিক্বণ শোনার জন্যে তিনি মানসাই নদীর শুকিয়ে যাওয়া স্তন বৃন্তে জোয়ারের ঢেউয়ের উন্মত্ততা আবিষ্কারের জন্যে সারারাত প্রতীক্ষা করেন। রূপসী বাংলার কবির মত জনপদ আর প্রকৃতির ভেতরে নিজেকে বিলীন করে দেন! নষ্ট সময়ের দলিলে আর মুকুরে বিকৃত জীবনের বিধ্বস্ত রূপ দেখে কবি অরাজনৈতিক বলে কোনো শব্দের প্রতি আস্থা রাখতে পারেন না। শেষপর্যন্ত অবশ্য ক্ষণপ্রভার ক্ষণিক চমকের মত একটা প্রবল আশাবাদের কথা উচ্চারণ করেন ---
''নিরাপদে ফিরে আসাটাই বড়ো কথা'' (ব্রত, জাহাজডুবি )

প্রতিদিনের গড়পরতা জীবনের সাথে কবির অনিবার্য দূরত্ব তৈরী হয়ে যায়। আর তখনই তিনি সকলের সাথে থেকেও 'একা' হয়ে যান। সুবীরও এর বাইরে নন! আর সব মানুষের সাথে পথে নামলেও তিনি 'শহরের ঝুলে থাকা রাস্তাঘাট' কিছুতেই অতিক্রম করতে পারেন না। গতানুগতিকতা ভেঙে কবি তাই উচ্চারণ করেছেন ---
''অথচ নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে সুপুরিবাগান পর্যন্ত
যাওয়া হয়ে ওঠে নি আমার।'' ( যাপনচিত্র, যাপনচিত্র )

'লাশকাটা ঘরে' ঘুমিয়ে থাকা কোনো পূর্বসূরির পথ অনুসরণ করে কবি 'আত্ম হত্যা করব বলে আমি একদিন ঘর ছেড়ে' বেরিয়ে এসেছিলেন রাস্তায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত সফল হন নি --
"আত্মহত্যা করব বলে আমি একদিন ঘর ছেড়ে
বেরিয়ে এসেছিলাম রাস্তায়
কেন আমাকে আত্মহনন থেকে ফিরিয়ে আনলে মিলিদি?" ( হাসপাতালের গল্প, যাপনচিত্র )

'ব্যক্তিগত জানলার পাশ' থেকে কবি 'ডুব সাঁতারে' পৌঁছে গেছেন জীবনের গভীরতম প্রদেশে। প্রিয়তমার দীর্ঘশ্বাসের ভেতরে আবিস্কার করেছেন 'নড়বড়ে সাঁকো', 'ডায়ারির ছেঁড়া পৃষ্ঠা'। তারপর পুনরুত্থান শুরু হলে তিনি উপলব্ধি করেছেন "সবই আসলে সাবানের ফেনার মতো ক্ষণস্থায়ী"। সেজন্য তিনি অনায়াসেই বলতে পেরেছেন ''সাবানের ফেনা আমার খুব প্রিয় বিষয়'', কিম্বা দীর্ঘ একটা সাঁতারের জন্যে অপেক্ষা করে তাঁর উপলব্ধি 'আপাতত একটাই রাস্তা' সাবান ফ্যাক্টরির গেট'। 'বুক পকেটে রিটার্ন টিকিট' নিয়ে ফিরে আসার কথা ভাবতেই তিনি অনুভব করেছেন ---
"আসলে সমাপ্তি বলে কিছু নেই
প্রতিটি সংগম থেকে মুগ্ধতা তৈরী হয়!" ( সংক্ষিপ্ত সংবাদ, যাপনচিত্র )

অথবা কখনো তাঁর মনে হয় 'অত:পর একদিন সব প্রত্যাবর্তনই থেমে যায়'। 'হলুদ শহরে ভোরবেলা' যে পথচলা শুরু হয় তা ক্রমশ এগিয়ে চলে! অন্ধকার পেরিয়ে রচিত হয়ে যায় 'ফুলবাগান'। আর কবি শুয়ে থাকেন 'নি:সঙ্গ নক্ষত্রের মতো'। তিনি প্রত্যক্ষ করেন 'অন্ধকারে বেজে ওঠে ব্যান্ডপার্টি'। জীবন তখন ক্রমশ অন্যরকম হয়ে ওঠে! মনে হয় সব কিছু বদলে যায় এভাবেই! তাঁর দৃষ্টিপথে ভেসে ওঠে বৃষ্টিস্নাত এক নুতন পথ! এই ছবি তিনি তুলে এনেছেন বিচ্ছিন্নভাবে 'বৃষ্টির রূপ' শীর্ষক কবিতায় ---
"আজ আমার গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া
আর আচ্ছন্নতার মধ্যে ধরা পড়ে একটানা বৃষ্টির শব্দ।" (বৃষ্টির ১ম রূপ, সাদা করতলের কবিতা)

কিন্তু কবি দেখেন চারপাশে অসংখ্য ভুল আলোচনা হচ্ছে। ফলে তিনি কোথাও অংশগ্রহণ করেন না। অথচ বিকল্প রাস্তাও তাঁর জানা নেই! একক পথ চলতে হয় কবিকে। হামাগুঁড়ির মধ্য দিয়ে যেতে যেতে তিনি পিঁপড়েদের ভাষা শিখে নিচ্ছেন! এই হামাগুঁড়ি শেষ কবির মনে হয় ---
"জন্ম জন্ম ধরে আমাদের জমে থাকা পাপ
শরীরে লেগে থাকে কুঁজের মতো।" ( শীতখামারের কবিতা, উনিশে আগস্টের কবিতা ) প্রেমের ক্ষেত্রে সুবীরের অবস্থান চিরন্তনত্বের বিপরীতে। যেমন করে তিনি জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে লিখেছেন --
" জীবনটাই এন্টিক্লকওয়াইজ
যোগসূত্রহীন বসে থাকা।" ( ১২ নং কবিতা, সেপ্টেম্বরের পৃথিবী ) তেমনি প্রেমের ক্ষেত্রেও তিনি ক্ষণিকতার কথাই উচ্চারণ করেছেন অনেকটা জীবনানন্দকেই অনুসরণ করে! যদিও কোনো অসতর্ক মুহূর্তে হয়ত কবির মনে হয়েছিল-
"আমি ও তুমি অফুরান এক নদীবাঁক
আর লুকিয়ে থাকা রাত্রি পায়ে পায়ে ! ( শীতকালীন ,মেঘ কলোনির কবিতা )

কিন্তু অন্যত্র দেখতে পাই কবির খণ্ডিত প্রেমের উচ্চারণ। তিনি অকপটে বলেছেন ---
"এই যে হুটহাট প্রেমে পড়ছি। সারাদিন গুণগুণ করে গান গাইছি।" ( ৬নং কবিতা , রোগা প্রেমিকের কবিতা )
কখনো প্রেয়সীর উদ্দেশ্যে কবি বলেন --
"কেবল আর্তনাদ শোনার জন্য অপেক্ষা
আর দীর্ঘশ্বাস গোপন করে তুমি দাঁড়িয়ে আছ।
অথচ কান্না ছাড়া তোমাকে আমার কিছুই
দেবার নেই।" ( ১০ নং কবিতা , শোক ও শ্লোকের দিনগুলি )

এর বিপরীত অবস্থাও ঘটে আবার। চিরদিনের মতো কবিকে একটা গল্প দিয়ে চলে যায় 'তোমার একজোড়া চোখ'। ভালবাসার টানটান গদ্যে কবি লিখে রাখেন মনখারাপের কথা। নদীর বাঁকের মতো পুরনো গল্প এক সময় সরে সরে যায়। কখনো তাঁর ' প্রিয় নারী হেঁটে যায়, সারাদিন নীল রঙের শার্ট আর অস্পষ্ট হাসির শব্দ' তুলে। অথচ 'এক মুঠো ফুল নিয়ে কোনোদিন কেউ কাছে এল না।' ফলে 'মেয়েদের সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করবার আগে' কবিকে ঝুলিয়ে রাখতে হয় কয়েক টুকরো দিগন্ত রেখা। ' ' রাত্রিগুলো ক্যাসেটবন্দী, ছায়া বালিকারা হেঁটে যায়। জোকারের মতো কবি দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন বলেন , 'তুমি ভুলে গেলে আমি খুব কষ্ট পাব'। উত্তাপহীন প্রেমের শীতলতা টের পান তিনি , 'চেপে ধরো পাথরের মতো ঠান্ডা ঠোঁট।' তবুও কবি টের পান অন্তরের অন্ত:স্থলে 'কিছু কিছু মুখ সারাজীবন তাড়া করে'। 'দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ শোনা যায়, মৃত বন্ধুদের কথা মনে পড়ে'।

একাকীত্বের যন্ত্রণা নিয়ে কবিকে তখন বলতে শোনা যায় --
"তোমার শরীর ধূপকাঠি অথচ ছুঁতে পারছি না
শহরে খুন জখম ,রোদবৃষ্টি আর শিকারের কাহিনি
হরিণের চোখ খুবলে নিচ্ছে ডোরাকাটা বাঘ
কী ভীষণ একা হয়ে গেছি।"( ৪ নং কবিতা, রোগা প্রেমিকের ডায়রি )

এই একাকীত্ব নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। যেন বিনা বাতাসে বেঁচে থাকার মত। আর প্রিয়তমার জন্যে মুচড়ে ওঠে বুক। অভিমান করে কবি শুধু বলেন ---
"কেন তুমি আমাকে ভূমিকম্পের দিকে ঠেলে দিলে
এখন আমাকে দেখে কেউ আর টুপি খোলে না
সবাই তুই- তোকারি করে কথা বলে। ( আর ভূমিকম্পের পর ফিরে আসুক, সাদাঘোড়া ও লোকপুরানের কবিতা )

অভিমান শেষে নিজেকে খাদ থেকে টেনে তোলার আহ্বানও জানিয়েছেন কবি। কেননা তিনি জানেন 'প্রতিটি মানুষকেই ভালবাসার কাছে ফিরতে হয়'।

উত্তরবঙ্গের প্রান্ত জেলা কোচবিহারের জনজীবন মাটি ঘাম অশ্রুর গন্ধে মাখা সুবীরের কবিতার শব্দেরা সংবেদনশীল। শতবর্ষ অতিক্রান্ত এই শহরের অন্তরে রয়েছে সার্বভৌম চেতনা ঋদ্ধ এক ঐতিহাসিক পরিধি। এই পরিধির কথা ব্যক্ত করে সুবীর লিখেছেন ---
"এই শহরে অসংখ্য লাল রঙের বাড়ি আছে
শতবর্ষ আক্রান্ত ,হেলে পড়া কার্ণিশ
এবং খানিক ঐতিহাসিক।" ( ওড টু এ টল পোয়েট ,বরফ বিষয়ক সেমিনার )

শতবর্ষ পুরনো এই শহরের ইতিহাসের গভীরে অবগাহন করে কবি তুলে আনেন রাজ - ইতিহাসের একেকটি খন্ড চিত্র। যুদ্ধ, যুদ্ধের গান, সুবর্ণ কবচ ঝোলানো জনপদ কাহিনি। এই প্রাচীন শহরের রাস্তায়' কমিক নায়ক পথে পথে হাঁটছেন'। বিবর্তমান সময়ের তালে কবির চোখে ভেসে ওঠে তাঁর প্রিয় শহরের বিচিত্ররূপ।' অশ্লীল ভঙ্গীতে নেচে ওঠে শহরের সবকটি রাজহাঁস।' আবার কখনো' হলুদ শহরে ভোরবেলা 'কবি দেখেন' প্রতিটি মসৃণ রাস্তার দু-পাশে ঘুমিয়ে পড়া শহর'। কিছু কিছু রাস্তায় নির্জনতা ছড়িয়ে পড়ে। আবার বৃষ্টি হয়ে শহরের ঘরবাড়িগুলো সব সবুজ হয়ে যায়। কখনো কবি অনুভব করেন ---
"আমাদের শহরে
সব রাস্তা চলে গেছে মানসিক হাসপাতালের দিকে
আর কেউ কারও দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে
হলুদ পোস্টকার্ড।" (৫ নং কবিতা ,জুবেদা জেবিনের জন্য কয়েকটি রূপকথা ,সাদা করতলের কবিতা)

সবুজ ছেয়ে যাওয়া শহরে কবি দেখেন 'গাছের পাতার আড়াল থেকে হেসে ওঠে আমাদের ফ্রক - পরা শহর'। এইভাবে কবির চেতনায় শহরের খন্ড খন্ড পৃথক চিত্র উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।
শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদী, এখানকার জনজীবন, সবকিছু মিলিয়ে একটা নাগরিক কবির স্মৃতি- সত্তা- ভবিষ্যতের মেলবন্ধন ঘটে যেতে দেখি। নি:সঙ্গ কবি নদীর পাড় থেকে কুড়িয়ে আনেন শূন্যতা। সেই অবস্থায় কবি নিজের আর তাঁর প্রেয়সীর মাঝেও এক বহুমাত্রিক শহরের অস্তিত্ব টের পান। ---
"তোমার ও আমার মধ্যে বহুমাত্রিক এক শহর
শহর : রেখাহীন
শহর : কাঞ্চন কুন্তলা
চিরুনির ফাঁক গলে বৃষ্টি নেমে আসে সীমান্ত শহরে।" ( ২ নং কবিতা ,রাতপাখি ও সীমান্ত শহর বিষয়ক কবিতা, কান্না বিষয়ক ২৪ রিল )

এইভাবে শতবর্ষ প্রাচীন বর্গক্ষেত্রের মতো শহরের পরিধি জুড়ে কবির যাপন নির্দিষ্ট হয়ে যায়। সুবীর মূলত লোকপুরাণকেই তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন নানা প্রসঙ্গে। কবির মনে হয়েছে 'মধ্যযুগের ইতিহাস আসলে পুরোটাই স্যাড সঙ' অনেকদিন বাদে নিজের শহরে ফিরে এসে কবি দেখেন 'মনখারাপের মতো নেমে আসছে শ্রীমতি প্রতিমা বড়ুয়ার লোকগান।' ব্রতকথা, ছড়া ও পাঁচালির এই দেশে দিবারাত্র শকুন ওড়ে। সুবীর সেই তথ্যচিত্রের শেষাংশে দেখতে পান -
"কৃষিকথার আসর শুনে ভোররাতে
বাড়ি ফিরছেন লোককবি ... আর
লুকিয়ে থাকবার একটা নিরাপদ জায়গা
খুঁজছেন।" ( লোককবির ডায়ারি,বরফ বিষয়ক সেমিনার )

'সার্কাসের হাতি দীর্ঘ শুঁড় বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় শহরের যাবতীয় লোককথা' এমন দৃশ্য সুবীরই আঁকতে পারেন। কিম্বা তিনি কফিনবন্দী হয়ে হঠাত ঘরে ফেরা মানুষদের জন্যে কবি সাজিয়ে রাখেন মেঘ রচিত উপাখ্যান ,ব্রতকথার পালকি আর ঝুঁকে পড়া আকাশ। মোরগ ডাকা বিকেলে কবি দেখতে পান --- 'রেলিং ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে উপকথার নায়ক'। এইভাবে মাটি ঘেঁষা জীবনের সোপান বেয়ে কবি পৌঁছে গেছেন লোকপুরাণের মায়ামুগ্ধকর জগতে। তুলে এনেছেন লোকায়ত ইতিহাস আর জনপদকাহিনি -- যা তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে।

এরিস্টটল তাঁর 'পোয়েটিক্স' গ্রন্থে ক্যাথারসিস প্রসঙ্গে হাসপাতালের অনুষঙ্গ প্রয়োগ করেছিলেন। কবিতায় জীবনের নানা ওঠাপড়ার সঙ্গে কবিরা কখনো হাসপাতালের কথা বলেছেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূলত চিকিৎসাক্ষেত্র হিসেবেই হাসপাতালের কথা এসেছে। সেদিক থেকে সুবীরের কবিতায় 'হাসপাতাল' এসেছে কিছুটা ভিন্নমাত্রা নিয়ে। মানসিক হাসপাতাল, পাগলা গারদ ইত্যাদি অনুষঙ্গের কথা বললেও কবির কাছে হাসপাতালের একটি ভিন্নতর তাৎপর্য রয়েছে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় কবি এক সময় বলেছেন তাঁর রোমান্টিক ভাবনার সূত্রেই হাসপাতালের অনিবার্য ব্যবহার হয়েছে তাঁর কবিতায়। হাসপাতালের নার্স, ওডিকোলনের গন্ধ, স্যালাইন, ডেটল ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর একটা দুর্বলতা রয়েছে। এমনকি তাঁর মনে হয়, 'হাসপাতাল থেকে ঘুমন্ত মেয়েগুলি আমাকে চিঠি লেখে।' এমন অদ্ভুত ভাবনা সুবীরের কবিতাকে স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে। দীর্ঘদিন তিনি হাসপাতালে যান নি বলে আক্ষেপও করেছেন। কেননা --
হাসপাতাল আমাকে উপহার দিয়েছে
আর্তনাদ ,ওডিকোলনের গন্ধ এবং ভাঙা হাসি !" ( হাসপাতালের গল্প, যাপন চিত্র )

নিয়ত যাপনের নিরিখে কবির মনে হয়েছে জন্মের পরে পরেই শিশুরা লিখতে শুরু করুক ব্যক্তিগত জার্নাল। আর তখনি কবির স্মৃতি ছুঁয়ে গেছে সেই হাসপাতাল, যেখানে তাঁর অনুভবি সত্তা জীবনটাকেই একটা হাসপাতালের সমার্থক বলে ভেবেছে।
বাক্যের ভেতরে থাকে সেই শক্তি যা মনোলোকের রহস্যময়তাকে ব্যক্ত করে তোলে ! সেই প্রকাশই সাহিত্য। আর এই সাহিত্য ব্যক্তি বিশেষের নয়, রচয়িতার নয় -- তা দৈববাণী। কবি যখন বাক্যবন্ধের ভেতরে অবগাহণ করেন, তখন সেই বাক্যশক্তির তেজ আরও বেড়ে যায়। সুবীর তাঁর কবিতায় এই বাক্য নিয়ে এক অদ্ভুত পরীক্ষা চালিয়েছেন। তাঁর কবিতায় সচরাচর এমন বাক্যকে তিনি উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে ব্যবহার করেছেন, যা পড়তে গিয়ে আপাত মনে হয় অন্য কোনো কবির কবিতা থেকে উদ্ধৃতি তুলে এনেছেন। কিন্তু নিবিড় পাঠে বোঝা যায় কবি মূলত ভাবনার অনুরণনের ( Vibration ) জন্যে এরূপ উদ্ধৃতি চিহ্নের ব্যবহার করেছেন। ক্ষণস্থায়ীত্বকে বোঝাতে গিয়ে কবি প্রেমিকাকে প্রথম চিঠিতে লিখেছিলেন -- "সাবানের ফেনা আমার খুব প্রিয় বিষয়"। প্রিয়জনের মৃত্যুতে এবং স্মৃতির প্রকাশে কবি যথাক্রমে বলেন -- "হে কষ্ট গর্তে ঢোক, হা দুঃখ উড়ে যা" এবং "স্মৃতি খুব স্যাঁতস্যাঁতে, মৃত্যু শ্যাওলার মতো"

বিমূর্ত ভাবনাকে যখন শব্দ আর বাক্যের সেতারের ঝংকারে ফুটিয়ে তুললেও থেকে যায় অস্পষ্টতা, তখন কবিকে উপমা - চিত্রকল্পের প্রয়োগ করতে হয়। এর মধ্য দিয়ে কবিত্ব শক্তিরও পরীক্ষা হয়ে যায়। সুবীরের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটে নি! তাঁর প্রিয় শহরের লোকায়ত পরিধি বোঝাতে কবি বলেন,"বর্গক্ষেত্রের মতো শহর।" আমাদের খণ্ডিত চেতনাকে প্রকাশ করতে গিয়ে কবি লেখেন -- "ঘুমের মধ্যে দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে লম্বা একটা দুপুর।" কিম্বা প্রেমিকার অন্তরস্থ সত্তাকে তিনি তুলনা করেছেন 'নড়বড়ে সাঁকো' র সাথে ! 'খোলা জানলার মতো জীবন' যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন তেমনি বলেছেন 'জীবন এখানে খসখসে আপেলের মতো।' প্রেমিকার ঠোঁটকে বলেছেন 'পাথরের মতো ঠান্ডা ঠোঁট' এই সব অলংকারের পাশাপাশি কবি চিত্রকল্প সৃষ্টিতেও নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন। 'সাপে কাটা রুগীর মতো বিপন্নতা', 'সাপ বেজি ঘিরে ধরে হাসপাতাল ', 'শূন্যে জাল বুনতে থাকে পতঙ্গভুক মাকড়সা ' ইত্যাদি ! এরই সাথে কবি শব্দ নিয়েও নিজের মত করে সাঁতার কেটেছেন ! আভিধানিক শব্দের সাথে মিশিয়েছেন আগন্তুক শব্দ, কথ্যভাষার শব্দ ইত্যাদি। এই শব্দ বৈচিত্রের পাশাপাশি তিনি এমন কিছু পঙতি রচনা করেছেন যেগুলো অসাধারণ প্রবাদ বাক্য হয়ে উঠেছে। যেমন -- "প্রতিটি সংগম থেকে মুগ্ধতা তৈরী হয়", "প্রতিটি মানুষকেই ভালবাসার কাছে ফিরে আসতে হয়" , "রাস্তার কুকুর রাস্তা ভালো চেনে" , যে দেশে খিদে নেই ,সে দেশে কোনো পাখি ডাকে না " ," চোখের জলে বন্যা হয় না " ইত্যাদি। রং নিয়েও সুবীর নিজেকে আলাদা করে চেনাতে পেরেছেন। রঙের কাজ যে কথা বলা সেটা তাঁর কবিতা পড়লেই বোঝা যায়। কবির প্রিয় রং হলুদ। তাঁর নিজের শহরের রংয়ে লেগেছে হলুদের ছোপ ---
" হলুদ শহরে ভোরবেলা 23 সেপ্টেম্বর দেখে নিও !"

বহমান জীবনের রংও হলুদ হয়েছে ,যখন কবি লেখেন "ঘটনা বহুল জীবনের দিকে ছুটে যাচ্ছে হলুদ দেশলাই কাঠি।" এই হলুদ ছাড়াও ধূসর, সাদা, লাল, দামি ইত্যাদি রংগুলোও নানা অনুরণনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।

কবিতায় ছন্দ অলংকার চিত্রকল্প বিমূর্ত ভাবনা থেকে শুরু করে আধুনিকতা উত্তর - আধুনিকতাসহ বিভিন্ন সময়ে আন্দোলিত হয়ে ওঠা যত ইজমের কথাই বলা হোক না কেন, শেষপর্যন্ত সংবেদনশীল পাঠক হয়ত একটা গল্পই খোঁজে। সে গল্প জীবনের, ভালোলাগার, ভালবাসার ঘৃণা - বিষাদের। হোক সে খণ্ডিত! তবুও সেই খণ্ডিত গল্পেরই একটা পূর্ণাবয়ব কল্পিত হয়ে যায় পাঠকের মনোলোকে। কবিরা সেই গল্পের কথাই আবহমান কাল ধরে বলে গেছেন, বলে যান, সুবীরও সেই কালের একজন। তিনিও তাঁর 'যাপন চিত্র' থেকেই জীবনের বিখন্ডিত নানা গল্পকথাই বলেছেন তাঁর কবিতায়। আবার শুধু কবিতা নয়, যে কোনো সাহিত্য শাখায় কবি- শিল্পীর মূল্যায়ণ করতে গিয়ে পন্ডিত সমালোচকেরা অনায়াসেই সেই কবিকে কোনো না কোনো পূর্বসুরির সঙ্গে একই ছকে বেঁধে ফেলেন, কিংবা তাঁকে ' বাংলার স্কট', 'বাংলার মিল্টন ', 'বাংলার বায়রণ ' ,'বাংলার এলিয়ট' ইত্যাদি নানা আলংকারিক অভিধায় অভিহিত করেন। আসলে এই সব গতানুগতিক ভাবনা থেকেও বোধহয় সরে আসা যায়। কারণ কবিদের কোনো গড ফাদার হয় না ! কবি নিজের জগতে স্বতন্ত্র, একক! হয়ত পূর্বসূরী তাঁর রচনাকে প্রভাবিত করে কিন্তু একজন প্রকৃত প্রতিভাকে কখনো গ্রাস করতে পারে না। আর যদি তাঁর নিজস্বতার কোনো পরিচয় ফুটে না ওঠে তাহলে তাঁকে কোনো পুরস্কার দিয়েও বাঁচিয়ে রাখা যায় না! সবচেয়ে বড় পুরস্কার পাঠকের ভালবাসা! সুবীর সেই ভালোবাসায় ঋদ্ধ। ব্যক্তিগত যাপনের মতো তাঁর কবিতার ভেতরেও রয়েছে সহজ- সরলতার একটা অকৃত্রিম সুর -- যে সুরে মেঠোপথে বাউলের একতারা আর উত্তরের 'মৈষাল বন্ধু'-র সারল্য মাখামাখি হয়ে আছে।

ফেসবুক মন্তব্য