সংখ্যা তত্ত্ব

অর্ঘ্য দত্ত


আজকাল আপনি খবরের কাগজে হিন্দি সিনেমার বিজ্ঞাপনে বা মেল খুলতে গেলেই নিউজ ফীডে দেখতে পাবেন 'ইয়ে জিন্দেগী' প্রথম সপ্তাহে কত ক্রোড় ব্যবসা করেছে, 'কাহিনী-২'-ই বা কতো। এই ক্রোড়ের হিসাব দেখিয়েই বোধহয় সম্ভাব্য দর্শকদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় সিনেমাটার সাফল্য। তুমি এখনো দেখো নি? এ মা, সে কি!! কী পিছিয়ে পড়া দর্শক গো তুমি! আর দেরি করো না, এখনি দৌড়ে ঢুকে পড়ো কোনো মাল্টিপ্লেক্সে। বিজ্ঞাপনে দেওয়া টাকার হিসাবের সত্যতা কে আর যাচাই করছে! প্রযোজক টাকা খরচ করে সিনেমা বানাচ্ছে ব্যবসা করার জন্যই, এই বিজ্ঞাপন তার ব্যবসা বাড়ানোর মার্কেটিং স্ট্রাটেজি বই তো নয়। কোনো সংবেদী পরিচালক, সিনেমাটি যার শিল্পকর্ম, বোধহয় তার সৃষ্টির উৎকর্ষতা বোঝাতে এমন বিজ্ঞাপনের কথা ভাবতেও পারেন না।
আজকাল দেখছি অনেক ওয়েব পত্রিকার সম্পাদকও এমন বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। পত্রিকা প্রকাশের প্রথম দিনেই কত হাজার পাঠক, প্রথম সপ্তাহে কতো। এখানে তো বানিজ্য জড়িয়ে নেই, তাহলে কোনো ব্যতিক্রমী পত্রিকাকে কেন, কী কারণে নিজের বিজ্ঞাপনে এমন প্রচলিত জনপ্রিয় পন্থার আশ্রয় নিতে হচ্ছে! আত্মপ্রচারের এমন ঢক্কানিনাদকে তো বাজারিদের লক্ষণ বলেই ধরে নেওয়া রীতি, যেখানে গুণমানের চেয়ে পরিমানই সম্মানীয়।
যেহেতু সব ওয়েব পত্রিকার সিংহ ভাগ পাঠকই ফেসবুকের মাধ্যমেই এই পত্রিকাগুলোর লিংক পায় ও পড়ে, তাই ফেসবুকে কবিতা পড়া, সব লেখাতেই লাইক টেপা এখানকার এই যে অগণিত পাঠক তারা তো ওরকম বিজ্ঞাপন দেখে ভাবছেন, তাই নাকি!! প্রথম দিনই এতো পাঠক! যাই তো দেখি কী আছে ওখানে। ডুগডুগির আওয়াজ ঘিরে সমাবেশ দেখলে আমরাও যেমন কৌতূহলে ভীড়ের মধ্যে গলিয়ে দিতাম মাথা।
সিনেমার ক্ষেত্রে যেহেতু নগদ কড়ি গুনেই দর্শক হওয়া যায় তাই ঐ বিজ্ঞাপনের মূল যে লক্ষ্য অর্থাৎ ব্যবসা করা তা হয়তো সফল হয়। কিন্তু ওয়েব ম্যাগের ক্ষেত্রে কতজন বিনি পয়সার পাঠক এমন বিজ্ঞাপন দেখে লিংকে ক্লিক করলো, তা দিয়ে কি বোঝা যায় ক'জন পাঠক সত্যিই পাঠ করছে ঐ পত্রিকা বা পত্রিকার নির্দিষ্ট কোনো লেখা! জানি না। তারপর সে সব লেখার শিরোনাম বা মলাট যদি তথাকথিত যৌনগন্ধী হয়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তখন আর নিখরচায় একবার উঁকি মারার মানুষের অভাব হবে কেন? কিন্তু, সেই সংখ্যা কি প্রকৃতই কিছু বলে? ঐ একটা সংখ্যার মধ্যে কি আদৌ থাকে প্রকৃত রসিক পাঠকের সন্ধান? ঐ সংখ্যা কি হদিশ দেয় ওর মধ্যে পাঠক ক'জন আর কতজনই বা পাঠোক। সত্যিই জানি না। শুধু মনে পড়ে যায়---
"এখানে কে কাকে ঠিক কেমন দেখে
বুঝতে পারা শক্ত খুবই..."

অথচ বিজ্ঞাপন তো দেওয়াও দরকার যাতে এত কষ্ট করে তৈরি করা পত্রিকা আরো বেশি সংখ্যক পাঠকের কাছে পৌঁছতে পারে। তাহলে কীভাবে দেব একটা পত্রিকার শ্লীল বিজ্ঞাপন? একজন পাঠকই বা কিভাবে খুঁজে নেবে একটা মনের মতো পত্রিকা? এসব ভাবনা মাথায় ঘোরে বলেই এত কথা। এত ভাবা।
আর মনের ভেতর থেকে বারবার একটাই উত্তর পাচ্ছি, যে কোনো পত্রিকার ক্ষেত্রে পাঠকদের মুগ্ধতার প্রকাশই হলো তার আসল বিজ্ঞাপন। বম্বেDuck-এর যাত্রা সবে শুরু, আমরা চাই একদিন আমাদের পাঠকেরা আমাদের হয়ে বলুক, সেই সব পাঠকেরা যারা কস্মিনকালেও লেখেন না, লিখলেও যাদের লেখা বম্বেDuck-এ কখনো প্রকাশিত হয়নি বা হয় না।

এ স্বপ্নও কখনো পূরণ হবে কিনা জানি না। তবে স্বপ্নই তো বাঁচিয়ে রাখে। তাই, স্বপ্নটাকেও আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

ফেসবুক মন্তব্য