ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত

অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়


বাংলা শব্দভান্ডারের বহু শব্দ কালের গতিতে বদলে গেছে। এর পেছনে আছে দীর্ঘদিন ধরে নানাকারণে সংঘটিত উচ্চারণবিকৃতি বা অপভ্রংশের ভূমিকা তথা সামাজিক বদল। বিষয়টি দীর্ঘ গবেষণাসাপেক্ষ। সেই গুরুগম্ভীর তাত্ত্বিক আলোচনায় না গিয়ে কয়েকটি শব্দের আশ্রয়ে বাংলাশব্দের কিছু কৌতূহলোদ্দীপক রূপান্তর এবং বাংলা ভাষার বর্তমান হাল মোটা দাগে, স্বল্প পরিসরে ও হালকা ঢংয়ে তুলে ধরাই এই লেখাটির উদ্দেশ্য।

রাগ যে তোমার মিষ্টি ওগো অনুরাগের চেয়ে

রাগ শব্দটি আমরা আকছার ক্রোধ বা দ্বেষ অর্থে ব্যবহার করে থাকি কিন্তু হিন্দিতে যখন প্রথম রাগ কথাটি শুনলাম, দেখলাম মানেটা দ্বেষের একেবারে বিপরীত, অর্থাৎ অনুরাগ! সংস্কৃতে রাগ অনুরাগকেই বোঝায়। বাংলা শব্দভান্ডারের অনুরাগ এবং বীতরাগের ‘রাগ’ সংস্কৃত রাগের সমার্থক। অথচ বিচ্ছিন্নভাবে রাগ শব্দ ব্যবহার করলে ওমনি তার অর্থ আমূল বদলে হয়ে যায় ক্রোধ। মনে আছে ছোটবেলায় এই অনুরাগ=ভালোবাসা অথচ রাগ=ক্রোধ অঙ্কটা ধন্ধ জাগিয়েছিল কিন্তু কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে নি আর তারপর কখন একসময় দ্বন্দ্ব ভুলে বৈপরীত্যটাকে নিয়ম বলে মেনে নিই। মুম্বই এসে হিন্দির সঙ্গে ঘনিষ্ট হতে ব্যাপারটা খোলসা হয়। আমাদের কেতাবি পড়াশুনোয় এরকম বহু ফাঁক থেকে যায়। নিজের চৌখুপির বাইরে এইজন্যই বোধহয় বেরোতে হয়, কে জানে কখন কোন পথে হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে উপলব্ধি ঝলমল করে ওঠার ঘটনাটি ঘটে যাবে!

হেথায় আর্য হেথা অনার্য হিন্দু মুসলমান

আর্য কথাটির আদি অর্থ মহান, মান্য, ভদ্র, noble । পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অভিধানে আর্য শব্দের অর্থ দেওয়া আছে বিদ্বান, শিক্ষিত, সুসভ্য, মাননীয়, পূজ্য, গুরুজন, শ্রেষ্ঠ। পাশাপাশি অবশ্য মান্য ব্যক্তির প্রতি সম্বোধন এবং জনগোষ্ঠিবিশেষ, এই দুটি অর্থও বিদ্যমান। বেদে আছে, যে ব্যক্তি অবিচলভাবে ধর্মের পথে চলে সে-ই আর্য। বোঝা যায় এটি জাতপাতবর্ণবংশের বিভেদভাবনার পূর্বেকার অর্থ। কালে কালে এই উদার সার্বজনীন শব্দটি অর্থভ্রষ্ট হয়ে এক সংকুচিত খণ্ডিত পরিচয়ে সীমীত হয় যেখানে আর্য শব্দের মানে হয়ে দাঁড়ায় একটি বিশেষ জাতি বা গোষ্ঠি। অভিধানে প্রবেশ করে নতুন অর্থ। সেই থেকে আর্য আর স্বভাবের পরিচয়ে নয়, চেহারার পরিচয়ে বিশিষ্ট হয়ে ওঠে যথা দীর্ঘাঙ্গ, গৌরবর্ণ, তীক্ষ্ণনাসা, আয়তলোচন ইত্যাদি। আর এর বিপরীতে অনার্য বলে চিহ্ণিত হয় যে গোষ্ঠি দেখতে খর্বকায়, কৃষ্ণবর্ণ, কুঞ্চিতকেশ ইত্যাদি। শুরু হয়ে যায় উঁচুনীচুর বিভেদ, অন্যায় বিভাজন বৃত্তি, মানুষকে সংকীর্ণ সীমানায় ভাগ করার কূট চক্র। ফলস্বরূপ আর্য শব্দে বাইরের রূপ গুরুত্ব পায়, ব্যবহার বা চরিত্রগুণ গৌণ হয়ে যায়। অতএব আর্য বংশজাত ব্যক্তি সুভদ্র না হয়েও, ধর্মপথে না চলেও মহান, উন্নত ও আদর্শ বলে স্বীকৃত হয় আর সুসভ্য সুভদ্র হয়ে ধর্মপথে চলেও অনার্য ব্যক্তি মহান, উন্নত ও আদর্শ হবার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এইভাবে মানুষের হীন স্বার্থে আর্য অবক্ষয়িত ও ভিন্ন একটি অর্থ ধারণ করে।

ধর্মেও আছি জিরাফেও আছি

ধর্ম শব্দের গোড়াকার অর্থ ছিল, যা ধরে রাখে। তার মধ্যে একটা সংযম ও শৃঙ্খলার ব্যাপার নিহিত ছিল যার স্বরূপ সার্বজনীন। সততা, অহিংসা, অপরের অনিষ্ট না করা, সবার মঙ্গল কামনা করা ইত্যাদির চর্চা দেশকালজাতিবর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়ধর্ম বলে স্বীকৃত। ক্রমে মানুষ ছোট ছোট সম্প্রদায়ে নিজেদের খন্ডিত করতে শুরু করে এবং প্রত্যেকে যারযার সম্প্রদায়নির্দিষ্ট বিধিনিয়ম অনুসরণ করতে থাকে। ধীরে ধীরে সেইসব আচার-অনুষ্ঠান ও ক্রিয়াকর্মের নাম হয়ে যায় ধর্ম । একেক সম্প্রদায় একেক রকম আচার-অনুষ্ঠান পালন করায় শীঘ্র পরস্পরের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয় এবং প্রত্যেকে যার যার ধর্মকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগে। ধর্মের নামে শুরু হয় ঘোর রেষারেষি, তর্ক, হিংসা। ধর্ম তার উদার সার্বজনীনতা হারিয়ে হয়ে ওঠে সংকীর্ণ, বিচ্ছিন্নতাবাদী। যা ছিল সকলের ধারণ করার বস্তু, তা হয়ে যায় মুষ্টিমেয় কিছু লোকের সম্পত্তি।

বেদনায় ভরে গিয়েছে পেয়ালা

দু হাজারেরও বেশি বছর আগে বেদনা ছিল অনুভূতির (sensation) প্রতিশব্দ যার মধ্যে সুখবেদনা ও দুখবেদনা উভয়েই উপস্থিত । বেদ-এর উদ্ভব বেদনা (অনুভূতি বা sensation) থেকে, তাই তার নাম বেদ । হিন্দি, বাংলা তথা সংস্কৃত থেকে জাত সমস্ত ভাষায় সংবেদনা বা স্বয়ং-বেদনা আজও অনুভূতিকেই বোঝায় কিন্তু এককভাবে ব্যবহৃত হলে বেদনা শুধু বাংলায় নয়, সংস্কৃতজাত সমস্ত ভাষায় দুঃখকে বোঝায়।

ভালোবাসার পাশে একটা অসুখ শুয়ে আছে

অসুখ শব্দটি সুখ-এর বিপরীত এবং সবাই জানে এর অর্থ দুঃখ । অথচ বাংলায় অসুখ রোগ অর্থেই কায়েম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত এই ছত্রটিতে অবশ্য অসুখ উভয় অর্থেই স্বচ্ছন্দ। উঁচু দরের কবিদের কৃতিত্ব এখানেই। শব্দ তাদের হাতে সংকীর্ণ বন্ধনে বাঁধা পড়ে না বরং বিস্তার পায়। শব্দের এই জ্ঞান, দখল এবং প্রয়োগক্ষমতার ফারাকেই ‘সকলেই কবি নয় কেউ কেউ কবি’!
শব্দ এবং ভাষা প্রসঙ্গে বাংলা বিজ্ঞাপনের কথা এসেই যায়। কারণ বাংলাভাষার বিবর্তনে বাংলা বিজ্ঞাপনের দায় অনস্বীকার্য। মিডিয়ার দৌরাত্ম্যে বাংলা ভাষা আজ বিজ্ঞাপনকে জীবনের অঙ্গ করে তুলতে বাধ্য হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে আসে বাঙালা বিজ্ঞাপনের মান। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে কপিরাটারদের কা়জটা সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার । এজেন্সিগুলিতে মাস্টার অ্যাড হয় হিন্দিতে যেটা বাংলায় অনুবাদ (বা অনুসৃষ্টি) করা বাংলা কপিরাইটারের কাজ। এখানে উল্লেখযোগ্য, আমাদের শব্দভান্ডারে অজস্র হিন্দি শব্দ আছে কিন্তু বহুক্ষেত্রেই সেগুলির বাংলা অর্থ হিন্দি থেকে আলাদা। আগে শব্দটিকে ধরা যাক। বাংলায় আগে বলতে পূর্বে (before) বোঝায় কিন্তু হিন্দিতে আগে মানে পরে। কাজেই ‘আগে কেয়া হ্যায়’ বাংলাতে ‘আগে (ভবিষ্যৎ অর্থে) কি আছে’ অনুবাদ করলে ভুল হবে কারণ হিন্দি ‘আগে’ ভবিষ্যৎবাচক কিন্তু বাংলা ‘আগে’ অতীতবাচক। নিজের ভাষা সম্বন্ধে এই জ্ঞান এবং দখল একজন রাইটারের থাকা খুব আবশ্যক। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও সকলেই রাইটার নয় কেউ কেউ রাইটার বাক্যবন্ধটি প্রযোজ্য। দুর্ভাগ্যবশত, কবি হতে যেমন কোনও ডিগ্রি লাগে না তাই “তোমার যোনিপর্দায় রক্তকরবী মঞ্চস্থ হতে চাইছে / পৃথিবীর এপ্রান্ত ফুটো করলে সাঁতার / ওদিকে কৃষ্ণগহ্বর মাখনছুরি” স্বরূপ আবর্জনা কবিতা নামে চলে, তেমনি রাইটার হতেও কোনও যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে হয় না অতএব বোধহীন ভাষাজ্ঞানহীন কিম্ভুত লেখারা বাংলা কপি হিসেবে চলে । একজন অবাঙালি ল্যাঙ্গুয়েজ কোঅর্ডিনেটরের পক্ষে বাংলা লেখার ভালোমন্দ বিচার করা সম্ভব নয়। তার ওপর যদি রাইটার নিজের ঢাক নিজে পেটানোয় এবং যথাস্থানে তৈলমর্দনে পটু হয় তবে তো কথাই নেই! কারণ বাংলা ভাষা আজ নাথবতী অনাথবৎ, তাকে ক্ষতি বা অসম্মান থেকে আগলে রাখার কেউ নেই।

এইবার, বাজারে কাটতি হওয়া কিছু অনূদিত বিজ্ঞাপনরত্ন পরিবেশন করা যাক।

১. (Pears) Masoom Pears নিরীহ পেয়ার্স
২. (Pond’s) Aapke chehere ko suit Karen আপনার চেহারাকে স্যুট করে
৩. (No Marks cream) Daag mitaye দাগ মেটায়
৪. (Sunsilk) Uljhe huye baal উস্কো চুল
৫. (Godrej Mosquito Repellant) Don’t underestimate Golu গলুকে ফ্যালাচোড়া কোরো না
৬. (Surf excel bar) Peele daag pichhe chhod jaate hain হলুদ দাগ পেছনে ছেড়ে যায়

উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এগুলি কারও বানানো জোকস নয়, রীতিমত ঘটনা, নামকরা পত্রপত্রিকায় এবং টিভি চ্যানেলে বহুপ্রচারিত অ্যাড। অথচ এই বিজ্ঞাপনগুলি নিয়ে কলকাতা থেকে কোনও প্রতিবাদ আসে না, বাংলাভাষার এমন প্রকাশ্য ধর্ষণেও কেউ বিচলিত হয় না, বস্তুত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বাঁচামরা নিয়ে সাধারণ বাঙালি আদৌ ভাবিত বলে মনে হয় না! ভাঙছে ভাঙুক, ডুবছে ডুবুক, চলছে চলুক মনোভাব। মজার ব্যাপার, ঠিক এই মনোভাবের একটা বাংলা শব্দও এসে গেছে – ল্যাদ। অর্থাৎ তলায় তলায় গড়ার কাজ অব্যাহত! এবং মনে রাখতে হবে, প্রকৃতি জগতে ঘেঁটুফুলও ফুল!

অতএব গলুকে ফ্যালাচোড়া না করা ল্যাদবাঙালি নিরীহ পেয়ার্স দিয়ে স্নান করে চেহারার দাগ মিটিয়ে উস্কো চুলে হলুদ দাগ পেছনে ছেড়ে যাওয়া সাবানে কাপড় কেচে যাক! কোনও ক্ষতি নেই। প্রকৃতি তার কাজ নীরবে করে যাচ্ছে। বালির তলায় স্রোতের মত, মাটির তলায় বীজের মত, গাছের গভীরে প্রাণের মত সৃজনের কাজ চলছে ।

তাই যখনই বাংলাভাষার অবক্ষয়, দৈন্য ও লাঞ্ছনা চোখে পড়ে, নিজেকে মনে করাই - ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত!

ফেসবুক মন্তব্য