প্রমিথিউস, এখন/ রণদেব দাশগুপ্ত

অরিণ দেব


বন্যাগ্রস্ত সময়ের সব ধান গোলায় ওঠে না। পরিণত কৃষক প্রকৃতির বিরুদ্ধ লড়াই কোরে তবুও কিছু ধানবীজ সঞ্চয় করেন, আগামীর জন্য। ধানের ওই সঞ্চয়টুকু প্রাণেরও সঞ্চয়! সঞ্চয় শেখায় খিদের কথা, সভ্যতার কথা, বেঁচে থাকার কথা। সঞ্চয়কারী কৃষককে আমি বলি- ধর্মচাষি! ধর্ম কোনও বিশ্বাস নয়, ধর্ম হল অস্তিত্ব। ধারণ নয়, কী পালন করছো জীবনে - সেটাই আমার কাছে ধর্ম! ধর্মচাষি আমাকে পালন করতে শেখান, নিজের কাছে নিজে পালিত হতে হতে বুঝতে চেষ্টা করি - এই ধান একদিন হৃদয়ের মর্মরে? রূপান্তরধর্মী জীবনে অর্জন আমাদের সামান্যই, শুধুই ব্যয়। ধর্মচাষি দু-একটা ধানবীজ সব্বাইকে ভাগ কোরে দেন, ক্ষুধার্ত কোনও এক আমি সেই ধানবীজ খেয়ে ফেলি, অতি-ক্ষুধার্ত কোনও এক আমি সেই ধানবীজ রোপণ করি। রোপিত এবং ভোগ্য'র এই রূপক-খেলা আমরা চালিয়ে যেতে থাকি, যেতে থাকি, যেতে থাকি যতক্ষণ শ্বাসে থাকে প্রাণের অস্তিত্ব! বন্যাগ্রস্ত এই মন্বন্তর সময়ে বেশীরভাগ কবিতাফসল যখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তখন মুষ্টিমেয় কিছু কবিকৃষক সকলের অগোচরে গোলায় সঞ্চিত করছেন কবিতাধান । তিনি যতটা না নিজের জন্য সঞ্চয় করছেন - জীবনের জন্য করছেন তার চেয়ে অধিক! হাভাতেদের হয়তো কবির দেওয়া সামান্য ধানে খিদে মেটে না, কিন্তু আমাদের মতো অতি ক্ষুধার্তরা মাঠে চরতে যাওয়া গাভিনির দুধের বাট-টানা বাছুরের মতো অপেক্ষা করি - এই অপেক্ষায় বাঁচিয়ে রাখে কবিতাধানকে! পাঠকেরা হয়তো ভাবছেন কবিতা নিয়ে কথা বলে এসে কীসব উল্টোপাল্টা বকছি। কৃষক, ধান, গোলা, এসব আবার কবে কবিতা হল? আসলে কথারা অসংগঠিত শ্রমিকের মতো, কথারা গাছপাকা শিমুল তুলোর মতো, বাঁধাধরা নিয়মে চলে না, চলতে জানেও না। তাই অতিকথন আমাদের রক্তগত, তাই অতিকথন আমাদের শ্বাসগত। কবিতা নিয়ে বলতে এসে সময়কে আর ভূমিকাদোষে দুষ্ট করতে চাইছি না। ধান, গোলা, কবিতাকৃষকের যে পর্দা এতক্ষণ আপনাদের চোখের সামনে ছিল সেই পর্দা উন্মোচন করার সময় এসেছে এবার। আসুন পাঠক, আগে একটা কবিতা পড়া যাক - কবিতা পড়তে পড়তে না হয় কবির সফরসঙ্গী হয়ে যাবো আমরা সবাই।

কবিতা:- প্রমিথিউস, এখন

"বিনীত গাছের মতো চুপ করে থাকি| ছায়া শুধু সরে যায় মানুষের দিকে নিরন্তর| কোমল মেঘেরা এলে সকলের কবিতায় বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ে| মুখে চোখে ভেজা শব্দ - সমস্ত শাখা ও প্রশাখা জলগীতি লেখে আর্দ্র হাতে| অথচ আমি তো সেই শূন্য রোদে বেড়ে ওঠা জ্বালাময় দিনের ফসল| সমস্ত বোতাম খুলে শুয়ে থাকি পরাগে ও প্রবালের বুকে| শ্রীময়ী ঋতুর কথা এ আঙুল কখনো জানেনি| মধুছন্দা বসন্তের কোনো রঙ আঁকেনি দু'চোখ| শুধু এই শিকড়ের অন্ধ অভিযান, শুধু এই স্থিতিশীল বৃক্ষজীবন - যার কোনো পূর্বদিক নেই| শিহরণে কেঁপে ওঠা ত্বকের ভূগোল - এখানে অচেনা পথচারী| বহুদূর থেকে ঐ তোমাদের রঙিন সন্ধ্যার চিকচিক আলো দেখা যায়| অযাচিত গণনায় লিখে রাখি যুবকের অশান্ত পাঁজর| লিখে রাখি তরুণীর গোপন ও কাল্পনিক আশ্লেষের শ্বাস, লিখে রাখি বধূটির নিরুপায় সন্ধ্যার উনুন| লিখে রাখি কিশোরের পাপবোধ, বালিকার লাল ফিতে, শিশুটির রক্তহীন মুখ| এইসব লিখি আর ক্রমশঃ বিনীত হতে থাকি| এছাড়া উপায় নেই| পংক্তির কোনো রন্ধ্রে সর্বভুক আগুন জ্বলে না| এখন মেঘের দিন - সমস্ত স্তবক জুড়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ে| সমস্ত পাণ্ডুলিপি ডুবে যায় পিচ্ছিল কাদায়|"


পঞ্চাশের দশকে বিনয় মজুমদার - জেগেছিলেন সবিনয়ে, ওই সময়ের শক্তি চট্টোপাধ্যায় ঘুম ভেঙে সবিনয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশতে চেয়েছিলেন। এই ঘটনার প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর পরে এই সময়ের কবি শ্রী রণদেব দাশগুপ্ত মহাশয় গাছেদের মতো 'বিনীত' চুপচাপ থাকতে চেয়েছেন। প্রকৃত কবিদের চলন কী তাহলে সমকেন্দ্রিক? পঞ্চাশ - একশো বা পাঁচশো বছরের গ্যাপটা তেমন বড় কোনও গ্যাপ নয় একজন কবির সঙ্গে আর একজন কবির সেতুবন্ধনে! কখনও - কখনও মনে হয় সমস্ত কবিরা বোধহয় একটা রিলে দৌড়চ্ছেন, একজন যেখানে শেষ করেন দ্বিতীয়জন সেইখান থেকে শুরু করেন । এসব কথা আপাতত উহ্য থাক, ভবিষ্যত তো রইল। এখন উপরের কবিতাটা নিয়ে দু-চার কথা বলা যাক। কবিতাটির প্রথম লাইনটি একটা সুর বেঁধে দিয়েছে, অর্থাৎ প্রথম লাইনটি অনন্য হয়ে উঠে কবিতার নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে। কবিতার কবি গাছেদের মতোই যেন সমস্ত উপেক্ষা পান করে 'বিনীত' হয়েছেন। মানুষ যদি গাছেদের মতো প্রকৃত 'বিনীত' হতে পারে, তাহলে মাথায় পাখি এসে বসে। গাছেদের মতো বিনীত হলে পারলে - দেহে ফসলের ম ম গন্ধ বিরাজ করে। একটা কবিতার মধ্যে সবসময় একটা মাত্র কবিতা থাকে না, থাকতে পারে একের অধিক কবিতাও। দশ - পনেরোটা কামরা নিয়ে একটা ট্রেন, একই গন্তব্য কামরাগুলোর, কিন্তু ভাবুন, কামরার মধ্যে মানুষগুলো কী রকম ভিন্ন ভিন্ন! কবিতাকেও ওইরকম মনে হয়, সমস্ত শব্দ এবং লাইনগুলোর গন্তব্য একদিকে হলেও ভেতরের অনুভূতিগুলো কত ... কত স্বতন্ত্র। তাই প্রকৃত কবিতার মধ্যে এক থেকে হাজারটি কবিতা থাকতে পারে, যে যেমন ভাবে খুঁজে পায় সেই কবিতা। "প্রমিথিউস, এখন" - এমনই একটা কবিতা যার প্রতিটি লাইন একটা স্বতন্ত্র কবিতার দাবী রাখে। কিন্তু সময়াভাবে এবং আপনাদের নিজস্ব চেতনাকে বিস্তৃত করার জন্য কিছু লাইন আমি আলোচনা নাই বা করলাম, সেইসব লাইনের মধু-সংগ্রাহক আপনারা নিজেরাই না হয় হলেন। কবিতার প্রথম লাইনেই পাচ্ছি-

"বিনীত গাছের মতো চুপ করে থাকি।"

এই 'বিনীত' এবং 'চুপ' থাকা থেকে শুরু হচ্ছে কবিতার চলন। চুপ থাকা হল ষ্টেশন, যেখান থেকে ছাড়ছে কবিতাগাড়ি। কোনও একটা পাণ্ডববর্জিত রুক্ষভূমির 'বিনীত' গাছ হয়ে লক্ষ্য রাখছেন কবি, লক্ষ্য রাখছেন ছায়া নিরন্তন সরে যায় মানুষের দিকে। কার দিক থেকে ছায়া সরে যাচ্ছে? সেই ছায়া কি নিজের দিক থেকে সরে যাচ্ছে না? তাহলে কি রোদের কাল শেষ হচ্ছে? সূর্য গুটিয়ে নিচ্ছে তার ঠিকানা! এ তো এক অনন্ত জিজ্ঞাসা, এ তো মানুষের অপূরণীয় হাহাকার। সৃষ্টিরপর্ব জুড়েই রয়েছে সূর্যের উৎপীড়ন, সূর্যসোহাগী জন্মের মূলস্তম্ভ সূর্য, সূর্য সৃষ্টি, সূর্য প্রাণ! তাহলে কি বিদায়ের সময় এগিয়ে আসছে, এগিয়ে আসছে জীবনের বিনাশকাল। এই বিনাশ কার বিনাশ? আমার? আপনার? নাকি অন্যকিছুর বিনাশ! কিছু প্রশ্ন চিরকাল উত্তরহীনতায় ভোগে। তেমনই এক প্রশ্নের সামনে আমাদেরকে হাজির করিয়েছেন কবি। এই শাশ্বত এবং অমর প্রশ্নের সামনে আমরা তর্ক কোরে জিততে পারি না, শুধু গাছেদের মতো বিনয়ের ভূমিকা গ্রহণ কোরে মেনে নিতে হয়।
আগেই বলেছি - কবিতার প্রতিটি লাইন এক একটা কামরা। তাই প্রথম কামরার মানুষের মতো দ্বিতীয় কামরার মানুষের চলাচল হতেই হবে, এমনটি নয়। কবিতার দ্বিতীয় কামরায় এসে কিন্তু কবি স্বপ্নের বীজ বোনেন, স্বপ্ন দেখান জীবনের। আকাশে মেঘ জমে, আকাশ ভারি হয়ে ওঠে জলীয় দ্রবণে - আর বৃষ্টি নাম নিয়ে ঝপঝপ নেমে পড়ে কবিতায়! কবিতা তখন সদ্য যুবতী, কবিতা তখন রূপমতী প্রেমিকা। কিন্তু, বৃষ্টি কাকে ভেজায়? পৃথিবীর দু-একজন ভিজতে পারে, আর বেশিরভাগ মানুষেরা থাকে বৃষ্টির বিপরীত ঢালে। বৃষ্টির অভ্যন্তরেই থাকে খরাপ্রবণ অঞ্চল, তাই তো কবি বলেন -

"অথচ আমি তো সেই শূন্য রোদে বেড়ে ওঠা জ্বালাময় দিনের ফসল|"

- সৃষ্টি থেকে দূরে দগ্ধ ফসলের ঘা নিয়ে আমিও (পাঠক , আপনিও হতে পারেন) কি দাঁড়াই না ফসলপোড়া শূন্যতায়? শূন্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকাটাই তাহলে জীবনের ভবিতব্য! দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে তখন কি জ্বলে যায় যৌথযন্ত্রণা? অবশ্য অনুভবের কোনও অবস্থানই বোধহয় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর লিজ প্রাপ্য নয়। জল আজকে যেখানে ঢেউ ভাঙে কালকে যে সেখানে শ্যাওলা জমবে না, এমন আত্মসন্তুষ্টির বানী নদীও শোনাতে ব্যর্থ। কারণ তারপরেই তো- "সমস্ত বোতাম খুলে শুয়ে থাকি পরাগে ও প্রবালের বুকে|"

এইখানে দুটি শব্দের দিকে পাঠক যদি লক্ষ্য রাখেন তাহলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় না কি? 'পরাগ' আর 'প্রবাল' - শব্দ দু'টির উৎকৃষ্ট ব্যবহারের দ্বারা কবিতা সৃষ্টিমর্মরে যেমন পৌঁছতে চেয়েছেন, অথচ উপেক্ষাও রয়েছে তার মধ্যে। পরাগের বুকে শুয়ে পরাগ মিলনে ফুল-ফলের রূপান্তর ঘটাচ্ছেন, কিন্তু, তিনি তো অণুঘটক নন, স্রেফ দর্শক। দেখছেন, দেখছেন সৃষ্টি কিন্তু সৃষ্টির সঙ্গে মিলতে পারছেন না, এ তো সেই ব্যর্থতা। সবকিছু থেকেও কোনও কিছু ছুঁতে না পারার ব্যর্থতা। যেন কোনও অ্যালকেমিস্ট, কৃত্রিম সোনা তৈরি শিখেছেন, কিন্তু খিদের মুহূর্তে সেই সোনা তার কোনও কাজে লাগছে না। পরাগ আর প্রবালের বুকে শুয়ে বিশ্বচরাচরের সৃষ্টি তার হাতের মুঠোয়, কিন্তু ধরতে পারছেন না ।সমগ্র কবিতা জুড়ে কবি কিছু একটা খুঁজছেন, খুঁজছেন যেন, কিংবা খুঁজছেন না কিছু, কিংবা কিছুই খুঁজবার নেই তার। প্রবাল ও পরাগে অবস্থান শেষ হতে না হতেই কবি আবার অস্তিত্ব সংকটে ভুগছেন -

"শুধু এই শিকড়ের অন্ধ অভিযান, শুধু এই স্থিতিশীল বৃক্ষজীবন - যার কোনো পূর্বদিক নেই| শিহরণে কেঁপে ওঠা ত্বকের ভূগোল - এখানে অচেনা পথচারী|"

শিকড়ের অন্ধ অভিযানটা কীরকম বস্তু? পাতালস্পর্শী শিকড়ের তো একটাই অভিযান, লবণজল ও মাটির দৃঢ়তা খুঁজতে থাকা। শিকড় কি তাহলে নিজের অবস্থানে সংকুচিত? তাহলে কি শিকড় দেখতে পাচ্ছে ঝড়ের সংকেত! ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে কি গাছের ইহকাল-পরকাল? কিন্তু তাও তো নয়, অভিযানের পরেই তো পাচ্ছি -

"শুধু এই স্থিতিশীল বৃক্ষজীবন"

স্থিতিশীল বৃক্ষজীবন যদি হবে শিকড় অন্ধ অভিযানে নামবে কেন? নামবে, কারণ এটাকেই বলে দ্বন্দ্বমূলক মনবাদ। আমরা যা দেখছি সেটা সবসময় দৃশ্য হবে এমনিটিও নয়। যা ভাবছি সেটা যে সবসময় কোনও ভাবনা হতে এমনও নয়। তাই "শুধু এই স্থিতিশীল বৃক্ষজীবন" একটা অনিরপেক্ষ ভাবনা, কারণ তার পরের বাক্যেই যে পাচ্ছি - "যার কোনো পূর্বদিক নেই"- পূর্বদিক নেই মানে - আলোর উৎস নেই। পূর্বদিক নেই মানে - সূর্যগ্রন্থি নেই। তাহলে যে স্থিতিশীলতা দেখছি সেটা মনের ভ্রম? হাসপাতালে নিকটাত্মীয় কেউ মারা যাবেন জেনেও আমরা তাকে বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখি না? এ তো মনের দ্বৈতসত্ত্বা, যে সত্ত্বা আমাদের ঘুমোতে দেয় না, জাগতে দেয় না, বাঁচতে দেয় না, মরতেও না । আর এই দ্বৈতসত্ত্বাই আমদের নিয়ে যাবে-

"বহুদূর থেকে ঐ তোমাদের রঙিন সন্ধ্যার চিকচিক আলো দেখা যায়| অযাচিত গণনায় লিখে রাখি যুবকের অশান্ত পাঁজর| লিখে রাখি তরুণীর গোপন ও কাল্পনিক আশ্লেষের শ্বাস, লিখে রাখি বধূটির নিরুপায় সন্ধ্যার উনুন|"

কবি এতক্ষণ পরে মুঢ় আমিত্বের দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে বহুবিধ আমিতে পরিণত হলেন। হলেন, কারণ - "লিখে রাখি যুবকের অশান্ত পাঁজর।" কেন লিখতে যাবেন যুবকের পাঁজরের ইতিহাস? সেই যুবক কে হন তাঁর? কেউ হন হয়তো সেই যুবক, আবার হয়তো কেউ হন না, কোনোদিন হয়তো দেখেনওনি কবি। আসলে মানুষ যেঁটুকু দেখতে চায় সেইটুকুই দেখতে পায়। তাই তো সেই যুবকটিকে আমি দেখতে না পেয়েও যেন দেখতে পাই, তাঁর ভাঙা পাঁজরের গান শুনতে না পেয়েও যেন শুনতে পাই। তাঁর যন্ত্রণা উপলব্ধি করি আমার যন্ত্রণার সাথে। যে যুবককে কবি আঁকেন সেই যুবক যেন কেমন করে আমি হয়ে যাই, আর কবি ও আমি দু'জনে ভাঙা সময়ের প্রতিনিধি হয়ে গাইতে থাকি পাঁজরভাঙা গান। কিন্তু, কবি তো শুধু যুবকের প্রতিনিধি হয়ে কবিতায় আসেন নি, তিনি তো স্রষ্টা । তিনি থামতে জানেন না - তিনি আঁকতে থাকেন -

"লিখে রাখি তরুণীর গোপন ও কাল্পনিক আশ্লেষের শ্বাস, লিখে রাখি বধূটির নিরুপায় সন্ধ্যার উনুন | লিখে রাখি কিশোরের পাপবোধ, বালিকার লাল ফিতে, শিশুটির রক্তহীন মুখ |"

পাঠক, কবির অঙ্কিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আপনার দেখা হয় না মাঠে-ঘাটে-তুলসীমঞ্চে! ক্রমশ কবি এবার সুতো ছাড়ছেন, সুতো ছেড়ে ঘুড়িকে তুলছেন মহাকাশে। এতক্ষণের একমাত্রিক কবি এই মুহূর্তে হয়ে উঠছেন বহুমাত্রিক। তাঁর চলন ছেড়ে গেছে তাকে, তাঁর নিজস্বতা ছেড়ে গেছে তাকে, তাঁর দুঃখ তাঁর আর ভারবাহী হতে রাজি নয় মোটেও। কবি যেন পাঠকের দিকে লাইন কয়টি ছুঁড়ে দিয়ে কবি বলছেন - আসুন পাঠক, ডুবলে একসঙ্গেই ডুবে মরি কালসলিলে। কবিতা যত শেষের দিকে এগোচ্ছে আমাদের রক্তের বেগ তত কমে আসছে। শিরার অমার্জিত ইশারায় পাচ্ছি অস্তিত্ববিলোপের তত্ত্ব। কবি আর বলছেন - "এইসব লিখি আর ক্রমশ: বিনীত হতে থাকি| এছাড়া উপায় নেই| পংক্তির কোনো রন্ধ্রে সর্বভুক আগুন জ্বলে না| এখন মেঘের দিন - সমস্ত স্তবক জুড়ে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ে| সমস্ত পান্ডুলিপি ডুবে যায় পিচ্ছিল কাদায়|"
কার কাছে বিনীত হতে থাকেন কবি, কার কাছে? বিনয়ের যেখানে শুরু তারপর থেকে বোধের উন্মেষ, বোধ আমাদেরকে ফুলের মতো কোমল করছে -? হে সন্ধ্যার পাখি ঘরে ফিরবার আগে তোমার কাছে এই প্রশ্নটি রাখি!
আমরা তো ফিরতে চাইছি নিজের কাছে, নিজের কাছে ফিরবার আবেদন গেল না কোনোদিন, আমাদের । কিন্তু, ফিরব বললে কি পথ পায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়, বলে কি- এই দিকে রয়েছে তোমার ঘরের ঠিকানা? আদৌ কি ঘর আছে মানুষের? ছিল কোনোদিন মানুষের? যখন কবি লেখেন- "সমস্ত পান্ডুলিপি ডুবে যায় পিচ্ছিল কাদায়|" হায় - অবিদ্যার পৃষ্ঠা, পাণ্ডুলিপি যেন তাঁর মুছে যাওয়ার ইতিহাস।

শ্রী রণদেব দাশগুপ্ত মহাশয়ের উপরিউক্ত কবিতাটি আমাদের হাজারো প্রশ্নের মুখে রাখে। আমরা উত্তর দিতে পারি কিংবা না পারি সেটা হয়তো বিষয় নয়, বিষয় হল এ সব প্রশ্নেরা অমর। বংশানুক্রমিক আমাদের রক্তের সঙ্গে বহন করতে হয়। আমার উত্তরহীনতা নিয়ে উত্তরপুরুষেরা দাঁড়াবে আবার উত্তরপুরুষের সামনে। যেন একটা খেলা, খেলতেই হয়। হারজিৎ থাকুক না কেন খেলতে হয়। খেলতে খেলতে ক্লান্তিতে ঘুমের মধ্যেও জেগে থাকে খেলা। এই কবিতার সামনে থমকে থাকে সময়, এই কবিতার সামনে জল খুঁজতে আসে চাতক।

ফেসবুক মন্তব্য