রাজেন্দ্রানী সুখ

সংগীতা দাশগুপ্ত রায়


রাত করে বাড়ি ফিরতে এখানে ভয় লাগেনা নূরের। একে তো যাতায়াত খুব ছিমছাম সাজানো কয়েকটা পাড়ার ভেতর দিয়ে। আর মানুষজনও খুব শান্ত, ভদ্র ধরনের। মা যদিও সাবধান হতে ব্যাগে একখানা পেপার স্প্রেও ঢুকিয়ে দিয়েছিল তবে সে এখনও ব্যাগেই রয়ে গেছে।

কিছুদিন হল ওর ভবানিপুরের বাড়ি ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে, পরমব্রতকে ছেড়ে নূর চলে এসেছে দিউতে। আসার কারনটা একটু অদ্ভুত। কুট্টিমামুর ওষুধের দোকান দেখাশুনো করে চালু রাখতে আসা।

আসলে এই ছোট্ট শহরে মাত্র দুজন ডাক্তার। তারমধ্যে একজন দমন-এ থাকেন। আর একজন, কুট্টিমামু, দিউতে। গত তিরিশ বছর ধরে কুট্টিমামু এখানে ডাক্তারি করে। চেম্বারের সঙ্গেই মাঝারি গোছের ওষুধের দোকানও। মামু সকাল বিকেল রুগি দেখে। অতীশ নামে একটি ছেলে দোকানের ক্যাশ সামলায়, প্রেসক্রিপশন দেখে ওষুধ দেয়।

কিছুদিন আগে মামিমার হঠাৎ ভীষণ শরীর খারাপ হওয়ায় কলকাতায় যেতে হয়েছে মামুকে। গিয়ে ক’দিন পর থেকেই মন আনচান করছে খুব। একটাই বড় ওষুধের দোকান অতখানি এলাকায়। অতীশ ছেলেটি বিশ্বাসী কিন্তু নতুন। সে একা দোকান চালাতে ভরসা পায় না। এদিকে দোকান বেশিদিন বন্ধ থাকলে ওখানকার মানুষগুলো যায় কোথায়! খাবার টেবিলে বসে বাবার সাথে এসব আলোচনাই চলছিল। শুনতে শুনতে মাথায় পোকা নড়ে নূরের। দোকান চালানোর মত একটা কাজ নিশ্চই তেমন কঠিন না।

সারা রাত ভেবেচিন্তে সকালের চা-টা নিয়ে গুটিগুটি মামুর কাছে গিয়ে আবদার পেশ করেছিল। মা আর বাবা তো হাঁ হাঁ করে উঠল শুনেই। তবে কুট্টিমামু, যে কিনা হানিমুনে দমন দিউতে ঘুরতে গিয়ে জায়গাটাকে ভালোবেসে সেখানেই জমে বসে গেছে, সে কিন্তু ভাগ্নির আবদার মন দিয়ে শুনে হ্যাঁ করে দিল। মাকেও বোঝাল দিউ একটা ভীষণ সেফ সুন্দর জায়গা। সেখানে বাড়িতে চব্বিশঘন্টা গুঞ্জন আছে। পাড়ার লোকজনও সবাই সবার দেখাশোনা করে। দোকানের দায়িত্বও তেমন কিছু না। অতীশ নিজেই দেখতে পারবে দোকানের কাজ। নূর শুধু সাথে থাকবে মামুর রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে। তাছাড়া নূর যদি কোন চাকরী পেয়ে এমন একটা জায়গায় যেতে চায় তাহলে কি মা বাবা তাকে আটকাবে?

মা, মেয়ের জেদের কাছে হার মানল শেষে। সবার আড়ালে অবশ্য মামু বলেছিল ‘থাক গিয়ে। তবে ভালো না লাগলেও ফেরা চলবে না যতক্ষন না আমি নিজে ফিরে গিয়ে চার্জ বুঝে নিচ্ছি’ রাজী হয়ে গেছিল নূর।

এখন এসে অবশ্য ভালোই লাগছে খুব। ছিমছাম ছোট্ট পর্তুগীজ সংস্কৃতিতে মাখামাখি একটা জলঘেরা দ্বীপ। ফোনের টাওয়ার এই আছে এই নেই। নূর ফোন নিজের কাছে খুব একটা রাখেও না আজকাল। বড় বেশি মানুষজন, বড় বেশি কথা হয়ে গেছে জীবনে। ক'দিন না হয় একটু চুপই থাক। শুধু মা আর কুট্টিমামার সাথেই কথা হয়। কিছুদিন এভাবে চলতে থাকলে পরমব্রতকে কি ভুলে যাবে?

পিছন থেকে একটা সাইকেল আসছে বুঝে রাস্তার ধারে সরে যায় নূর। আরও মিনিট দশেক হাঁটা। সবে 'ফরমজী ভিলা' পেরোল। দিনের বেলা মিসেস ফরমজী সাদা জর্জেটের গাউন আর গলায় মোতির মালা পরে ছাতা মাথায় বাগানের তদারকি করেন। নূরকে গুঞ্জনের সঙ্গে বাজার করতে বেরোতে দেখে নিজেই এগিয়ে এসে আলাপ করলেন একদিন। পরের দিন চায়ের নেমন্তন্ন। হাসিখুশি মিসেস ফরমজীর নিজের হাতে বানানো নারকোল ছড়ানো কুকিজ আর দাবেলি খেয়ে আর গল্প করে ভীষণ ভালো লেগেছিল। রাতে বাড়ি ফিরে ফোন করে কুট্টিমামিকে সে কথা বলতেই মামি গুঞ্জনকে ডেকে বলে দিয়েছিল মাঝে মাঝেই নূরকে দাবেলি বানিয়ে খাওয়াতে।

আরে! নূর বেটা! এত রাত অবধি দোকানে ছিলে নাকি? মিঃ দোশি সামনা সামনি স্কুটারটা দাঁড় করান। ভদ্রলোক মামুর জিগরি দোস্ত এবং এখন নূরের লোকাল গার্জেন প্রায়।

রাত কই আঙ্কল! এখন সবে ন’টা...

ন’টায় লোকজন বাড়িতে খিল এঁটে শুয়ে পড়ে আর তুমি দোকান খুলে বসে থাক? কি মুশকিল! শরীর খারাপ করবে যে!

বাড়ি ফিরেই বা কি করব? একা একা বোর হয়ে যাই। দোকান খোলা থাকলে তবু লোক দেখা যায়...

আহা! সত্যিই এখানে তো তোমার বন্ধুবান্ধব নেই। তোমার মা বাবা যে কী করে এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়েকে এখানে একা পাঠিয়ে দিল! দাত্তা আসবে কবে?

এসে যাবে। ওখানের কাজ শেষ হলেই আসবে আঙ্কল। আমি ফার্স্ট ক্লাস আছি। আপনি ভাববেন না
ওকে! সাবধানে যেও। অনেক সময় রাত হলে পাটেলদের কুকুরটা চেন ছাড়া ঘোরে। তাড়া করলে দৌড়িও না। থেমে একটু মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই ও শান্ত হয়ে যায়...

আপনি যে মাথায় টুপি পরে স্কুটার চালান, হাওয়ায় উড়ে যায় না?

হো হো করে হাসেন দোশি আঙ্কল... এটা কি কলকাত্তাই জোক! তোমাদের ওখানে তো আমাদের ভাই বেরাদরেরা টুপি পরে না শুনেছি।

আপনি গেছেন কখনও কলকাতা?

নাহ বেটি। আমি দমন দিউএর বাইরে কোথাওই যাইনি তেমন। বড় মেয়ে জামাই বারবার বলে দুবাইতে ওদের কাছে ঘুরে আসতে কিন্তু তোমার আন্টি বাড়ি ছেড়ে নড়লে তো! আচ্ছা তুমি এগোও । খুব বোর লাগলে মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে চলে এসো বরং... দোশি আঙ্কল স্কুটারে স্টার্ট দেন।

বাড়ির গেটটা ঠেললেই একটা ক্যাঁচক্যাঁচে আওয়াজ হয়। সামনের ছড়ানো জমিতে ছোটবড় গাছ। তার ফাঁক দিয়েই দেখা যাচ্ছে রান্নাঘরের আলো। গুঞ্জন আওয়াজ শুনে বেরিয়ে আসে, এত রাত করলে দিদি! খানা লাগাই?

তোমার খিদে পেয়ে যায়, না গুঞ্জন? মামু মামিমারা তো এতক্ষনে খেয়ে নিত। তুমিও খেয়ে নিও। আমার জন্য ওয়েট করবে না...

তা কি হয় দিদি? আপনি মেহমান। মাজি আপনি খেয়েছেন কিনা ফোন করে খোঁজ নেন রোজ। আপনি আগে না খেলে আমি কি করে খাব!

আচ্ছা আমার খাবার টেবিলে দাও, তোমারটাও নিয়ে এস। একসাথে খাব...

গুঞ্জন থমকে যায়... আমি টেবিলে খাই না দিদি। আমি রসুইঘরেই খাই।

তো চল, আমিও তোমার সঙ্গে রসুইঘরেই খাব। খেতে খেতে গল্প না করলে আমার খিদে আসে না ঠিক ...

কথাটা আংশিক সত্যি। কলকাতায় খেতে বসে সমানে ফোনে বন্ধুদের সাথে বকবক করত বা মেসেজ করত। মা সামনে বসে কিছু নিয়ে কথা বলতে গেলে অবশ্য পাত্তা দিত না। কিন্তু এখানে এসে থেকে ফোনটা বেশি হাতে নিতেই ইচ্ছা করে না। টিভি দেখতে দেখতেও খাওয়াই যায়। তবে একতরফা অচেনা লোকজনের মুখস্ত ডায়লগ শোনার থেকে মুখোমুখি গল্প করতে করতে খেতেই ইচ্ছা করে বেশি। মা-র ও কি তাই হত? তাই কি খেতে বসে কেবল নূর জানিস, নূর শুনছিস!

মা-র কাছে এখন কুট্টিমামারা আছে। মার কি খেতে মন কেমন করে নূরের জন্য? কে জানে। নূরের তো করে, একটু একটু।

দিদি আমি আমার খাবার নিয়ে এখানেই বসছি... একটু দেওয়াল ঘেঁষে নিজের থালাটি নিয়ে বসে গুঞ্জন। রুটি ডাল আলু ডিম ভাজা। তার পাশে চারটে কাঁচা লঙ্কা ...

এত ঝাল খাও নাকি তুমি! নূর আঁতকে ওঠে

ঝাল তো এ বাড়ির সব্বাই খায় দিদি। রান্নাতেও তাই খুব ঝাল দেওয়া হয়... এখনই, তুমি ঝাল খেতে পারো না ব'লে... এটুকু বলেই গুঞ্জন মিটিমিটি হাসে। মনিবের ভাগ্নী যে ঝাল খেতে পারেনা সেটা ভারি মজার ব্যাপার ওর কাছে।

তোমার বয়েস কত গুঞ্জন?

আঠাশ দিদি...

আরে বাহ! তোমাকে এত বাচ্চা দেখায়! আমার বয়েস পঁচিশ, দেখ আমাকে দেখে তোমার দিদি মনে হয়... হাসতে থাকে দুজনেই।

তুমি তো এখানে থাক, বাড়িতে কে কে আছে?

বর, শাস, শ্বশুরজী..

সেকি! তাহলে তুমি এখানে থেকে কাজ কর, অসুবিধা হয় না?

না দিদি, টাকা জমলে আমাদের বন্দকী জমি ছাড়িয়ে নিতে পারব। তখন বর আর বাবুজি মিলে ওতে চাষ করতে পারবে। ওই জন্যই সারাদিন থাকার কাজ নিয়েছি।

কিন্তু রাতে বরকে ছেড়ে থাকো, কষ্ট হয় না?

মুখ লাল করে রুটি ছেঁড়ে গুঞ্জন... হাসি চেপে বলে 'ওর হয় দিদি। আমার অত হয়না...'

আজ খেয়ে দেয়ে তুমি বাড়ি চলে যেও। কতদূরে বাড়ি তোমার?

হকচকিয়ে যায় বেচারি ... বাড়ি তো কাছেই কিন্তু খেয়ে বাড়ি যাব মানে? তুমি একা থাকবে নাকি! মাইজী আমাকে আর আস্ত রাখবে না তাহলে

কি মুশকিল! মাইজী জানবে কি করে তুমি বাড়ি গেছ?

না না, প্রবল বেগে মাথা নেড়ে আপত্তি করে গুঞ্জন ...তা হয় না দিদি। তুমি এখানে কিছুই চেন না। এত বড় বাড়িতে একা একা থাকবেই বা কেন? আমি কি কিছু ভুল করেছি দিদি? তুমি কি আমার ওপর রাগ করে চলে যেতে বলছ!

গুঞ্জনের করুণ চোখদুটো দেখে ওকে কাছে টেনে নিতে ইচ্ছে করে নূরের। বেচারি একটু বরের আদর খাবে ভেবে বাড়ি পাঠাতে চাইছিল। কিন্তু এ তো পুরো উল্টো বুঝছে।

হাল ছেড়ে দেয় নূর। আচ্ছা থাক, আজ যেতে হবে না। আমি কাল দোকানে চলে গেলে তুমি তোমার বরকে এখানে ডেকে নিও।

কাল দোকান কেন খুলবে দিদি! কাল তো রবিবার!

ওহো, তাও তো বটে। তো তুমি কাল ছুটি নিয়ে বরের সঙ্গে বেড়িয়ে এস বরং কাছে পিঠে কোথাও ...দিউ কিল্লা বা বীচ ... যাও কখনও বীচে বেড়াতে?

উত্তর না দিয়ে হাসতে হাসতে থালা তুলে উঠে যায় গুঞ্জন।

মাকে ফোন করলে প্রথম প্রশ্নটা প্রত্যেকবার একই থাকে, খেয়েছিস? কি খেলি? কালও তাইই ছিল।
কাল কুট্টিমামুর সাথেও কথা হয়েছে। ডাক্তার প্রচুর টেস্ট করতে বলছে। অতএব অন্ততঃ আরও কয়েক সপ্তাহের ধাক্কা।

রান্নাঘর থেকে টুংটাং আওয়াজ আসছে।

অনেকবার ফোন করেছে পরম। নিশ্চই বাড়িতেও খোঁজ নিয়ে জেনেছে কোথায় আছে নূর। আশ্চর্য! এত বার অথচ সাড়া না পেয়ে কি বুঝছেও না যে ওর ইচ্ছে নেই কথা বলার! শ্রেয়া, শৌভিকরাও কিছুদিন আগে অবধি ফোন করছিল। শ্রেয়াকে হোয়াটস অ্যাপে জানিয়ে দিয়েছে ফিরে কথা বলব। ডিটক্সিং ব্রেইন।

ফোনের অ্যালবাম ঘাঁটতে থাকে নূর। গুচ্ছ গুচ্ছ পরমের ছবি। খোয়াইতে বাউলের পাশে বসে ছিলিম হাতে, পার্ক স্ট্রীটে সিসা বার-এ হুঁকোর নল মুখে, গোসাবায় নৌকোতে মাছভাজার প্লেট নিয়ে... একগাদা সেলফি, নূরের গালে ঠোঁট ঠেকিয়ে , নূরের কান টেনে ধরে... পর পর সরতে থাকে ছবিগুলো। পরম ছাড়া এক বেলাও চলত না একসময়। পরম বুকে হাত রাখলে জোছনার ঢেউতে ভেসে যেত নূর। তারপর কি যে হল! অতিব্যবহারে ফুরিয়েই গেল বুঝি উচ্ছ্বাসের দাপট। পরমব্রতর প্রেমে অভ্যস্ত হতে হতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিল নূর। আজকাল তো বলার মত কথাও খুঁজে পায় না। কেবল যেদিন প্রচুর ফ্রাস্টেটেড থাকে সেদিন গালিগালাজ করতে পরম বা শ্রেয়া চাই।

ক'দিন আগে পরমের বুকের ওপর চিবুকের চাপ রেখে গল্প করতে গিয়ে ঘামের গন্ধের ঝাপটা খেল একটা। এমন তো হওয়ার কথা না! নূর তো ভালোই বাসে পরমের ঘামে মিশে যেতে! তাহলে নাকে অমন বিশ্রী লাগল কেন! ভয়ে উঠে বসেছিল নূর। তবে কি পরমব্রতর শরীরের গন্ধ নূরকে আর টানছে না? খুব অবাক লেগেছিল । এখনও লাগে। এই যে প্রায় মাস খানেক হল এসেছে, এর মধ্যে পরমকে একবারও চায় নি তো মনে মনে! বরং কথা না থাকলেও নিয়মমাফিক রোজ দেখা করতে হচ্ছে না, ইচ্ছে হোক না হোক ফ্রাস্টু খেয়ে পলিটিশিয়ানদের গাল দিতে হচ্ছে না, হুক্কা বারের স্ট্রবেরি ফ্লেভারড ধোঁয়া টেনে টেনে সোস্যালাইজ করতে হচ্ছে না বলেই সব কিছুই আজকাল বেশ ভালোই লাগছে। একের পর এক ছবি দেখতে দেখতে ঘুমে তলিয়ে যায় নূর।

মুহূর্মুহু মেঘের ডাকে ঘুম ভাঙে। বাইরের আকাশ ঘোলাটে কালো। সমুদ্র আগে বহুবার দেখেছে নূর কিন্তু সমুদ্রের গা ডুবিয়ে বসে থাকা ঘুমন্ত মফস্বলি বর্ষা দেখেনি কখনও। তাড়াতাড়ি পায়ে চপ্পল গলিয়ে বেরিয়ে আসে। ভোর থেকেই বোধহয় সোঁ সোঁ হাওয়া ছেড়েছে। বাগানের গাছগুলো আনতাবড়ি এ ওর ঘাড়ে এলিয়ে পড়ছে। বড় দোলনাটা উড়ে আসা শুকনো পাতা বুকে নিয়ে দুলছে। উল্টোদিকের মোহন জরিওয়ালাদের নতুন লাগানো কাঁচের জানলায় নাকি চিড় ধরেছে খবর দিল গুঞ্জন...

এ বাড়িতে কিছু ভাঙে টাঙ্গে নি তো?

নাহ, এ বাড়ি খুব মজবুত দিদি। আদা এলাচ দিয়ে চা করি? খাবে? এমন ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ভালো লাগবে ...

কর। তারপর বিদেয় হও। এমন বর্ষার দিনে কোথায় মেঘদূত পড়বে, তা না... কেবল চা খাও রুটি খাও... বাড়ি যাও দেখি তুমি!

গুঞ্জন বাড়ি যাওয়ার পর মেঘ যেন আরও ঘন হয়ে আসে। সমুদ্রের গন্ধে মাতাল বাতাস। খুব ইচ্ছা করছে শাড়ি পরতে একটা। ঘরে ঢুকে চটপট মামিমার একখানা কালচে লাল রঙা শাড়ি পরে নেয় নূর। গুঁড়ো লাল টিপ, চোখে কাজলের টান, খোলা চুলে ধুনো ধুনো রুক্ষতা নিয়ে একলা পথে হাঁটা নূরকে দেখে ঠিক একটা পথভোলা পরী মনে হয়। জরিওয়ালাদের নতুন ছেলেমানুষ বউটা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ডাল ধোকলি বানাচ্ছিল। নূরকে দেখে হাসিমুখে হাত নাড়ে। উঁচু নিচু সরু সাজানো রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলোর দেওয়ালে ক্রিপারের আলপনাগুলোও যেন ঘুরে দেখে নূরকে। হঠাৎ ভীষণ ভীষণ ভালো লাগতে থাকে। ফাঁকা রাস্তার ঢাল বেয়ে একটা মেয়ে গোলাপি লেডিবার্ডে ঝর্ঝরিয়ে নেমে আসছে। সামনের বাস্কেটে পাওয়ের প্যাকেট আর খবরের কাগজ। বাজার থেকে ফিরছে হয়ত। নূর ওর দিকে তাকিয়ে হাসে। শুনেছে বিদেশীরা নাকি সৌজন্য বশতঃই অপরিচিতদের দিকে তাকিয়েও হাসে ... কলকাতায় এমনটা কখনও করে নি কেন কে জানে। নোনা ঝড় মুখে মাখতে মাখতে মেয়েটাও হেসে সাইকেল নিয়ে নেমে যায়।

বীচ মোটামুটি খালিই থাকে এদিকের। চটিটা খুলে বালি খুঁড়ে পুঁতে দেয় নূর। এটা ওর প্রিয় খেলা। এদিক ওদিক হাঁটতে হাঁটতে ভুলে যায় চটি কোথায়। তারপর এলোমেলো খুঁড়তে থাকে বালি। একসময় পেয়েও যায় ইচ্ছে করে হারিয়ে ফেলা চটিজোড়া।

প্রায় খালি বীচ ছুঁয়ে রাগী সাগর আর সাগরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া কালো ভয়ানক মেঘ ...একটু দূরে একটি ছেলে মাথা নিচু করে হেঁটে আসছে...সাদা শার্টটা হাওয়ায় উড়ছে। প্যান্ট নিচের দিকটা গোটানো…

ভেজা বালিতে বসে নূর আঙ্গুল দিয়ে চিঠি লিখতে শুরু করে। সবাইকে এক লাইন ক'রে লিখবে
মা, আমি ভালো আছি, চা খেয়েছি...

পরম, ভালোবাসি কিনা বুঝতেই এতদূর চলে এলাম রে

বাবা, নিজের রোজগারে প্রথম টাকায়...

এটুকু লিখতে লিখতেই বিশাল ঢেউ এসে আছড়ে মুছে দেয় সব চিঠি

ওহো ! ইউ পোয়েট? ছেলেটি কাছেই এসে দাঁড়িয়েছে

মি? নো ও ও ... ঝরঝরিয়ে হাসে নূর ... হোয়াট মেড ইউ থিঙ্ক আই অ্যাম অ্যা পোয়েট?

হেই, স্লো, লেডি... আমি তাড়াতাড়ি বলা কথা বুঝতে পারিনা ... বসতে পারি?

মাথা ঝাঁকায় নূর। মাতাল হাওয়ায় চুলগুলো গোটা মুখে গলায় জড়িয়ে যায়।

পোয়েট না তো লিখছিলে কেন? একা এই ওয়েদারে এখানে বসেই বা আছ কেন?

এমনিই... এবারের ঢেউটা নূরের কোলে আছড়ে পড়ে... তুমি একা একা ঘুরছিলে, তুমি কি পোয়েট?

নাহ, আমি আর্সেনিও... তুমি? ওয়েট! আমি জানি তুমি কে... তুমি অ্যানাবেল লী।

ভিজে মৎসকন্যার মত আলোআলো চোখে তাকায় নূর। অ্যানাবেল? না তো! আমি নূর...

উঁহু, হতেই পারে না... তুমি অ্যানাবেল লী, সমুদ্রের ধারের রাজকুমারী... তোমাকে আমি আগেও দেখেছি।

ইট ওয়াজ মেনি এন্ড মেনি ইয়ার্স এগো /ইন অ্যা কিংডম বাই দ্যা সি / দ্যাট অ্যা মেইডেন দেয়ার লিভড হুম ইউ মে নো / বাই দ্যা নেম অফ অ্যানাবেল লী...

মেঘ, সাগর, ঢেউ, বালিয়াড়ি সাদা উড়ন্ত শার্টের দুরন্ত পুরুষটি মুহূর্তে অধিকার করে নেয় নূর নামের প্রজাপতিটিকে। কাঁপন জাগিয়ে শীত করে ওঠে নূরের । এই লাইনগুলো তোমার লেখা?

এডগার অ্যালেন পো'র লেখা, তোমাকে নিয়েই...

নূর হাসে... শুধু আমাকে নিয়েই? কবিতায় তুমি নেই?

উত্তর দেয় না আর্সেনিও... পকেট থেকে ছোট্ট ক্যান্ডির মত লজেন্স বার করে... এই নাও, রাজকুমারীর জন্য এইই আছে আমার কাছে

লাল টকমিষ্টি লজেন্স তুলে নেয় নূর... আর্সেনিও, তুমিও বুঝি রাজকুমার?

আমি রুটিওয়ালার ছেলে রাজকুমারী। আমার বাবা মা মিলে একটা বেকারি চালায়। সারাদিন
ব্রেড পেস্ট্রির ডো বানাই আমি। দেখ আমার হাতে মাখনের গন্ধ তাই…

বলিষ্ঠ হাতে ফুলে ওঠা নীলচে শিরা সাপের মত নিঃসাড়ে সাজানো ... এই পটভূমিতে নূরের ইচ্ছা করে বাড়িয়ে ধরা হাতের পাতায় মুখ রাখতে ...

সমুদ্র ফুলে উঠছে। এখানে বসা আর নিরাপদ নয়। যদিও আমি খুব ভালো সাঁতার জানি, ডুবলে বাঁচাতেও পারব তবু রাজকুমারীকে অনুরোধ এখানে আর বসে থেকো না... এটুকু বলেই আর্সেনিও উঠে পড়ে।

আমার চটি! এখানেই বালির নিচে রেখেছিলাম! নূর পা দিয়ে বালি খুঁড়তে থাকে...

দেবীর মত দেখতে তোমাকে। দেবীকে খালি পায়েই মানায়... তোমার কি হাঁটতে অসুবিধা হচ্ছে?

হ্যাঁ, বালিতে শাড়ি জড়িয়ে যাচ্ছে। ভারি লাগছে নিজেকে...

অদ্ভুত সরল হাসি ভেঙ্গে ভেঙ্গে নেমে আসে আর্সেনিওর চোখ, গাল, ঠোঁট বেয়ে। ঝপ করে দু হাতের ঝটকায় বুকে তুলে নেয় ও নূরকে... রাজকুমারী, তুমি বড় সুন্দর... তোমাকে হেঁটে যেতে দেখতে চাইনা আমি, অন্ততঃ এই মুহূর্তে... সঙ্গে থাকো আমার... ফিসফিস করে বলে আর্সেনিও।

কি অসহ্য মাদকতা মাখানো সব কিছু! চোখ বন্ধ করে সমুদ্রের গন্ধে আর সম্পূর্ণ অপরিচিত কোন এক আর্সেনিওর ওম্‌ এ বুঁদ হয়ে যায় নূর।

বৃষ্টি নামে আচমকা... সদ্য পাওয়া রাজকুমারীকে বুকের আরও কাছে জড়িয়ে নিয়ে লম্বা পা ফেলে দৌড়তে দৌড়তে একটা পরিত্যক্ত ছাউনির নিচে পৌঁছে যায় আর্সেনিও। আলতো করে বালিয়াড়ির মেঝেতে নামিয়ে দেয় তার রাজকুমারীকে।

শরীরের ভারে, দৌড়ের পরিশ্রমে ঘেমে উঠেছে বুকের কাছটা। নোনা ঘামের গন্ধটা জড়িয়ে নেয় নূর ... তুমি কি এখানে বসবে একটু? চোখ বন্ধ রেখেই জিজ্ঞেস করে। যেন প্রবল এই পুরুষটির দিকে তাকালেই চোখ ঝলসে যাবে ওর।

যতক্ষন তুমি চাইবে, ততক্ষনই।

ইট ওয়াজ মেনি এন্ড মেনি ইয়ার্স এগো
ইন অ্যা কিংডম বাই দ্যা সি
দ্যাট অ্যা মেইডেন দেয়ার লিভড হুম ইউ মে নো
বাই দ্যা নেম অফ অ্যানাবেল লী...
অ্যান্ড দিস মেইডেন শি লিভড উইথ নো আদার থট
দ্যান টু লাভ অ্যান্ড বি লাভড বাই মি ...

মিষ্টি শান্ত সুরে প্রায় মন্ত্রোচ্চারণের মত ভাসিয়ে দেয় কবিতাটা আর্সেনিও।

আকাশ ভাঙা বৃষ্টিকে বুক পেতে নিচ্ছে সমুদ্র।
নূর নয়, অ্যানাবেল লী আলতো করে আর্সেনিওর কাঁধে মাথা রাখে...

ফেসবুক মন্তব্য