ট্র্যাজেডি এবং নাটক কথা

তুষ্টি ভট্টাচার্য্য


ট্র্যাজেডি এক পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পিছিয়ে যাচ্ছে। পরিণতি না বলে একে সমাপ্তি বলা যেতে পারে। যতক্ষণ না সব শেষেরও শেষ হয়, একটু খানি আশা কি জেগে থাকল না? এই যে একটু খানি বেঁচে রইল টিমটিম করে, তার দিকে তাকিয়েই কি পেরিয়ে যাওয়া যায় না অনেকটা সময়? আর শেষ হয়ে যাওয়ার পরে নাহয় বলা যাবে – এক ট্র্যাজেডি দেখে এলাম আমরা। সাধারণত মানুষের দুঃখ, কষ্ট নিয়ে যে নাটক মঞ্চস্থ হয়, তাকেই আমরা ট্র্যাজেডি বলে থাকি। আর মানুষের জীবনের থেকে বড় নাটকও তো আর কিছু হয় বলে জানি না। আর এই নাটকের যখন আমরা কুশীলব নই, দূর থেকে চেয়ারে বসে এই নাটক দেখছি, নাটকের সঙ্গে একাত্ম হতে গিয়ে অভিনেতাদের দুঃখে কাঁদছি, সে পর্যন্ত ঠিক আছে। কারণ তখন আমরা সেই অভিনেতাদের দুঃখ থেকে এক তৃপ্তি পাচ্ছি আসলে। যে দুঃখবোধ আমাদের কাঁদাচ্ছে, তা আসলে এক ধরণের সুখ। আর যখন আমরা আমাদের জীবন-নাটকে বিয়োগের স্বাদ পাই, তখনও কাঁদি। সেই নাটকের কুশীলব তখন আমরাই। আর এই কান্না তখন আমাদের তৃপ্তি দেয় না, এক অসীম শূন্যতার মধ্যে আমাদের ঠেলে দেয়।

আড়াই হাজার বছর আগে পুরনো গ্রীসে অ্যাসিলিস, সোফোক্লিস আর ইউরিপিডিস-এর হাত ধরে ট্র্যাজেডির আগমন হল। খ্রীস্টপূর্ব ৩৩৫সালে অ্যারিস্টটলের পোয়েটিক্স-এ ট্র্যাজেডি শব্দের অর্থ ছিল একটি বিশেষ প্রকারের শিল্প-রীতি। কবিতার ক্ষেত্রে ট্র্যাজেডিকে এপিক আর লিরিক – এই দুই ধারায় ভাগ করা হয়। আর নাটকের ক্ষেত্রে কমেডির বিপরীত ধারা হল ট্র্যাজেডি। বিভিন্ন সময়ে ট্র্যাজেডিকে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা গেছে। অ্যারিস্টটলের সূত্র অনুসারে প্রাচীন গ্রীক শব্দ ‘trag(o)-aoidiā ‘ থেকে ট্র্যাজেডি শব্দ এসেছে, যার মানে হল পুরুষ ছাগল। এহেন অর্থ থেকে বর্তমান ট্র্যাজেডির উৎপত্তির কারণ হিসেবে বলা হয়, যেহেতু বলিদানের সময় ছাগল উৎসর্গ করা হত, তাই বিয়োগান্ত অর্থে ট্র্যাজেডি শব্দটি প্রচলিত হয়েছে। পঞ্চম শতকের অ্যাথেনিয়ান স্বর্ণযুগের অনেক পরে অ্যারিস্টটলই প্রথম (খ্রীস্টপূর্ব ৩৩৫ সালে) তাঁর পোয়েটিক্সে বর্তমান ধারার নাট্যরূপ হিসেবে ট্র্যাজেডিকে ব্যবহার করেন।

সব থেকে পুরনো ধারার ট্র্যাজেডি(যার অস্তিত্ব এখনো আছে) হল অ্যাথেনিয়ান ট্র্যাজেডি, যেটি আসলে একটি নৃত্যনাট্য। আঙুর ও মদের দেবতা ডায়নিসাসের সামনে মার্চ-এপ্রিলে এই ধর্মীয় উৎসব শুরু হত। তিনটি নাট্য দলের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা হত, যা কিনা তিন দিন ধরে চলত। প্রত্যেক দলকে তিনটি ট্র্যাজেডি উপস্থাপন করতে হত, যার শেষে অবশ্যই রাখতে হত একটি কৌতুক, যাকে বলা হত স্যাট্যায়ার। এ যেন মানুষকে কাঁদাবার ব্যবস্থা করে, আবার তাদের চোখের জল মুছে দেওয়ার আয়োজন! এই তিনটি ট্র্যাজেডি ও একটি কৌতুকের যে ট্রিলজি পরিবেশিত হত, তার মধ্যে ঘটনা পরম্পরার যোগসূত্র থাকত এবং সবকটিকে মিলিয়েই একটি ট্র্যাজেডি বলা হত। পাহাড়ের ধারে খোলা মঞ্চে এই নাটক প্রায় সারাদিন ধরেই চলত। স্ত্রী, পুরুষ নির্বিশেষে সবার আমন্ত্রণ থাকত এখানে। প্রায় বারো হাজার মানুষ এই নাটক দেখতে হাজির হত, এমন প্রমাণও পাওয়া গেছে। নাটকের কুশীলবরা সবাই পুরুষ এবং সবারই মুখে থাকত মুখোশ। একজন অভিনেতার প্রশ্নের উত্তরে একদল অভিনেতা সমবেত নৃত্য-গীতে উত্তর দিত। এই গ্রীক কোরাল-সং আবার তিনটে ভাগে বিভক্ত ছিল। স্ট্রোফ ("turning, circling"), অ্যান্টি স্ট্রোফ ("counter-turning, counter-circling") এবং ইপোড ("after-song")।
বহু প্রাচীন গ্রীক অভিনেতারা নাটকে ‘ekkyklema’ নামের এক যন্ত্র ব্যবহার করতেন, যা আসলে স্টেজের পিছনে লুকিয়ে রাখা একটি গোটানো প্ল্যাটফর্ম, সময় বিশেষে পর্দা ফেলে এটিকে সামনে আনা হত। কোন খুনের বা হিংসার দৃশ্য, যে দৃশ্যকে লোকচক্ষুর সামনে অভিনীত করা যেত না, ফলে আড়াল থেকে কিছু এক্সপ্রেশন ও এফেক্টস-এর মাধ্যমে বোঝানো হত। অ্যাসিলাসের অর‍্যাসিয়া নাটকে আগামেননের খুনের দৃশ্যে যেমন রাজার কুপিয়ে খুন হওয়া শরীরকে স্টেজের মধ্যে একটি চাকা লাগিয়ে গড়িয়ে আনা হয়েছিল। এছাড়াও ক্রেনের ব্যবহার হত। যখন কোন দেব-দেবীকে আকাশ থেকে উড়ে আসার দৃশ্য অভিনীত হত, এই মেশিন কাজে লাগত।

এবার গ্রীক ট্র্যাজেডিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে এল রোম। রোমান সম্রাটদের প্রভাবে ইউরোপ এমনকি মধ্য প্রাচ্যেও থিয়েটারের প্রসার হতে শুরু হল। শুরু হল সেনেকা ট্র্যাজেডির যুগ। অ্যাথেনিয়ান ট্র্যাজেডিকে ভেঙেচুরে নতুন ভাবে গড়া শুরু হল। সুদীর্ঘ বিবৃতিমূলক সংলাপ, ঈশ্বরের মহিমা ছাঁটা হতে থাকল। ভূত, প্রেত, ডাইনি, আত্মহত্যা, প্রতিশোধ – এই ধরনের ঘটনা এই ট্র্যাজেডিতে প্রবেশ করল। এমনকি জুলিয়াস সিজার, যিনি নিজে ল্যাটিন এবং রোমান দুই ভাষাই জানতেন, সেনেকা ট্র্যাজেডিকে বেশি পছন্দ করতেন।

কালেদিনে যা হওয়ার তাই হল। ক্রমশ ষোড়শ শতাব্দীর শুরু হতে না হতেই পশ্চিম ইউরোপের সবাই ক্লাসিক গ্রীক ট্র্যাজেডি ভুলতে বসল। রেনেসাঁর দিন এল। ইতালিতে সেনেকার প্রভাবই বেশি পড়েছিল। বিভিন্ন ধারার, এমনকি পুরোপুরি ধর্মীয় প্রভাব মুক্ত ট্র্যাজেডিও লেখা শুরু হল। ১৫৪০সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী ৪০বছর কিছু কবি ও মানবতাবাদীরা সোফোক্লিস, সেনেকা, ইউরিপিডিস এবং অন্যান্য কমেডি রচয়িতাদের ১৫০০মুদ্রিত রচনার অনুবাদ যেমন করলেন, তেমনি এই নাটক গুলি থেকে তাঁরা অনেক উপাদানও সংগ্রহ করেছেন। বিশেষ করে সেনেকার প্রভাব হিউম্যানিস্ট ট্র্যাজেডিতে বেশি পড়েছিল। ফ্রেঞ্চ ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে বাইবেল থেকে গল্পের প্লট নেওয়া হলেও হোরেস, অ্যারিস্টটলের ধারণা ছুঁয়ে সেনেকাকেও অনুসরণ করা হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি আবার গ্রীক ট্র্যাজেডি, বিশেষ করে সোফোক্লিস ও ইউরিপিডিসের কাজ, বিশেষ ভূমিকা নেয় ফ্রেঞ্চ ট্র্যাজেডির লেখকদের কাছে।
বৃটেনের সব থেকে বিখ্যাত, সফল ও অবশ্যই কালজয়ী ট্র্যাজেডি লিখেছেন উইলিয়াম সেক্সপিয়ার। সেক্সপিয়ারের সমসাময়িক ক্রীস্টোফার মারলোও ট্র্যাজেডি লিখেছেন বেশ কিছু। আর এই সময়েই ইতালিতে ট্র্যাজেডির এক অন্য ধারার জন্ম হয়। পুরনো গ্রীক ও রোমান ভাবধারার সূত্র ধরে জ্যাকব পেরি ও তাঁর সমসাময়িকরা স্টেজে ট্র্যাজেডির এক নতুন রূপ উপস্থাপন করেন। এই ঘরানার নাম অপেরা।

১৭র শতকে ফ্রান্সে পিয়ের করনিলি ছিলেন একজন সফল ট্র্যাজেডি লেখক। অদ্ভুত ভাবে তাঁর ট্যাজেডিতে ‘হ্যাপি এন্ডিং’ দেখা যেত, যা কিনা একটা ট্র্যাজেডির সংজ্ঞার উল্টো কথাই বলে। এতদিন জানা ছিল ট্র্যাজেডি মানে প্রেম বা যুদ্ধে পরাজিত বা নিহত হওয়ার গল্প আর কমেডি মানে মিলনাত্মক পরিণতি। কিন্তু এই সময় থেকে ট্র্যাজেডির সঙ্গে কমেডি মিলে যেতে থাকল। বলা হল, একটা ট্র্যাজেডির শেষে যে বিচ্ছেদ থাকবেই, এমন কোন মানে নেই। অ্যারিস্টটল বললেন, এটাই সমসাময়িক ভিত্তিতে একটি ট্র্যাজেডির লক্ষ্য হওয়া উচিৎ।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে জার্মানে শুরু হল বুর্জোয়া ট্র্যাজেডি। বুর্জোয়া শ্রেণী অর্থাৎ উঁচু শিক্ষিত ও ধনী স্তরের মানুষদের নিয়ে, মানুষদের দ্বারা তৈরি এক নাটক। যদিও প্রথম বুর্জোয়া নাটকটি ছিল ইংরেজিতে লেখা। ১৭৩১ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘দ্য হিস্ট্রি অফ জর্জ বার্নওয়েল’। যদিও ১৭৫৫ সালের Gotthold Ephraim Lessing-এর নাটক ‘মিস সারা সাম্পসন’ কেই প্রথম বুর্জোয়া নাটক হিসেবে বলা হয়ে থাকে।

মডার্নিস্ট লিটারেচার ট্র্যাজেডির প্রাচীন সংজ্ঞাকে অনেক শিথিল করেছে। অ্যারিস্টটলের সূত্র অনুযায়ী ট্র্যাজেডি একমাত্র ক্ষমতাবান ও উচ্চবিত্তদের নিয়েই লেখা যায় – প্রথমেই এই নিয়মের পরিবর্তন হয়। ‘ট্র্যাজেডি অ্যান্ড কমন ম্যান’ (১৯৪৯) নাম দিয়ে আর্থার মিলার একটি রচনাতে যুক্তি দিয়ে বলেন যে সাধারণ মানুষ এবং ঘরোয়া পরিবেশেও ট্র্যাজেডি থাকতে পারে।
আমার মনে হয়, ট্র্যাজেডি সম্বন্ধে অ্যারিস্টটল, নিটসে, হেজেল- এঁদের তত্ত্ব নিয়ে ঘাঁটতে গেলে ট্র্যাজেডির সেই বিয়োগ ব্যথাটাই বোধহয় হারিয়ে যাবে। বরং ভারতীয় উপমহাদেশে ট্র্যাজেডি নিয়ে কী ভাবনা ছিল, সেটা একটু দেখি। খ্রীস্টপূর্ব ২০০ সালে ভারত মুনী তাঁর ‘নাট্য শাস্ত্র’-এ বিভিন্ন রসের কথা লিখেছেন। যেমন দুঃখ, ক্রোধ, হতাশা, ভয় – যা কিনা সাধারণ মানুষের জীবনে অহরহ এসে থাকে। গ্রীক, রোমান ট্র্যাজেডির শুরুর ঠিক পরে পরেই ভারতে সংস্কৃত নাটকের চর্চা শুরু হয়। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ভারতই প্রথম এই চর্চা আরম্ভ করে। সঙ্গীতের এক ধারা যাকে যতি বলা হত সেই সময়ের নাটকে দেখা যেতে থাকে। আর এই যতি থেকেই বিভিন্ন রাগের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন রকম অনুভূতির জন্য বিভিন্ন সুরের ব্যবহার হত। যেমন করুণা রসের জন্য গান্ধার অথবা ঋষভ, যদিও আবার এই ঋষভই বীর রসের প্রতিভূ ছিল। তবে সে অর্থে ট্র্যাজেডির আলাদা ভাবে কোন ভূমিকা ছিল না ভারতীয় নাটকে। কালীদাস, বিদ্যাপতি এবং আরও অনেকের লেখাতে ট্র্যাজেডির সুর এলেও, তা ছিল অল্পসময়ের। পরে অন্য রসের ব্যবহার এসেছে। একমাত্র মহাভারতকেই প্রকৃত ট্র্যাজেডির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। হারম্যান অল্ডেনবার্গের মতে মহাভারতের মূল কাহিনীতে প্রচন্ড এক ট্র্যাজিক ফোর্স কাজ করেছে। আর এই মহাভারতের এক একটি অধ্যায় থেকে বেশ কিছু সংস্কৃত নাটক তৈরি হয়েছে।

সংস্কৃত নাটকে প্রথমে যেমন ধর্মীয় আখ্যান এসেছে, পরবর্তী কালে সমাজ, জীবন, এসবও এসেছে। ভারতীয় নাটকের মূল ধারাকে মোটামুটি ভাবে ছয় ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। ক্লাসিকাল ভারতীয় নৃত্য নাট্য, ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার, ভারতীয় ফোক থিয়েটার, ভারতীয় পুতুল নাচ বা পাপেট থিয়েটার, আধুনিক ভারতীয় থিয়েটার এবং ইন্ডিয়ান স্ট্রিট থিয়েটার। বিভাগগুলি নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ধারা গুলি মোটামুটি একই। ক্লাসিকাল নৃত্য নাট্যে প্রধানত ধর্মীয় প্রভাব যুক্ত। ১৫শতকের শুরুতে এই ঘরানার প্রবর্তন হয়। প্রধানত মন্দিরে ঈশ্বর ভজনার জন্য এই নৃত্য প্রদর্শন হত। ভারত নাট্যম, কুচিপুড়ি, ওড়িষি, মোহিনীয়াট্টম আর যক্ষগান-এর বিভিন্ন মুদ্রা, রস এবং তালের মাধ্যমে মুখে কথা না বলেও বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করা হয়ে থাকে। ক্রমে ক্রমে এই ক্লাসিকাল নৃত্য নাটকের মুদ্রা, রসের সঙ্গে বিভিন্ন প্রদেশের ঐতিহ্য মিশতে থাকে। ধর্মীয় রীতি নীতির মৌখিক প্রকাশ হতে থাকে। এভাবেই যাত্রা পালা, সঙ, রাসলীলা, থিয়াম – একে একে ঐতিহ্যের হাত ধরে নাটকের জগতে এসে পড়ে। ১৫শতকের শেষ থেকে ফোক থিয়েটার এসে যায় আর ১৬শতকে এই নাটকের সমৃদ্ধি বাড়ে। বিভিন্ন প্রাদেশিক ঘটনা, ভাষা, লোকাচার, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এসবকে কেন্দ্র করে ফোক থিয়েটার বেড়ে ওঠে। এমনকি ধর্মকে বাদ দিয়ে কোন ঘটনাকে ঘিরেও এই নাটক লেখা হয়েছে। লোকনাটিকার সাফল্যের পর এদেশে পুতুল নাটকের প্রচলন বেড়ে যেতে থাকে। পুতুল নাটকে একজন সূত্রধর থাকতেন, যিনি সুতো বেঁধে বিভিন্ন চরিত্রের পুতুলকে মঞ্চে নাচান আর ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে গান বা সংলাপ চলতে থাকে। এরপরে বৃটিশ আমলে উদয় হয় ভারতীয় আধুনিক থিয়েটারের। সেই সময়ে বৃটিশ থিয়েটারের প্রভাবে ভারতীয় নাটকে ক্রমশ ধর্মীয় প্রভাব কমে আসতে থাকে। সমাজ, রাজনীতি ও সমসাময়িক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আধুনিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটতে থাকে থিয়েটারে। স্বাধীনতার পরে ভারতীয় থিয়েটার সম্পূর্ণতা পায়। এখনকার সময়ে স্ট্রীট থিয়েটারের প্রসার ব্যাপকভাবে দেখা যায়। কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছোট ছোট পরিসরে রাস্তায় সাধারণ মানুষের সামনে এই নাটক অভিনীত হয়। প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে মানুষের ওপর। সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়।

বিভিন্ন প্রাদেশিক থিয়েটারের ধীরে ধীরে প্রসার হতে থাকল। বাংলা থিয়েটার এই বিষয়ে অগ্রণী ছিল। ১৭৯৫-এর ২৭শে নভেম্বর বাঙালির প্রথম নাট্যাভিনয়। বাংলা থিয়েটার ও বাংলা ভাষায় নাট্যাভিনয়ের সূচনাও এই দিনটিতে। রুশ যুবক লেবেডেফ পর্যটক হিসাবে কলকাতায় এসেছিলেন ১৭৮৫-এ। বেহালা বা ভায়োলিন বাদনে তাঁর পারদর্শিতা ছিল। বাংলা ভাষার প্রতি টানে কলকাতায় থেকে গেলেন দশ বছর। বাংলা ভাষা শিখে একটি প্রহসন ‘দি ডিসগাইস’-এর বাংলা অনুবাদ করলেন ‘কাল্পনিক সঙ বদল’ নামে। মাচা বেঁধে ‘বেঙ্গলি থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করে বাংলা থিয়েটারে নারীর অভিনয়ের সূচনাও হল এই দিনে। গোলকনাথের (লেবেডফের বাংলা শিক্ষক) সহায়তায় তিনজন বারাঙ্গনা কন্যাকে সংগ্রহ করেন লেবেডফ। অভিনয়যোগ্য মৌলিক বাংলা নাটক লেখা হল আরো ৬৩ বছর পরে। রামনারায়ণ তর্করত্ন লিখলেন অভিনয়যোগ্য প্রথম বাংলা নাটক ‘কুলীন কুলসর্বস্ব’- অভিনীত হল ১৮৫৮তে । অভিজাত জমিদারবাবুরা তাদের গৃহপ্রাঙ্গণে নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করলেন। সেইসব অভিনয়ে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকত না। ফলে বাংলা নাটক বন্দী হল জমিদারবাবুদের প্রাঙ্গণে।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে দেবেন্দ্রনাথের ভাই গিরীন্দ্রনাথ দেশীয় যাত্রার অনুসরণে যাত্রাপালা রচনা করে অভিনয় করাতেন। পাশাপাশি যাত্রাদল ভাড়া করে এনে তাঁরা বাড়িতে দেশি যাত্রার অভিনয়ের ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু বাঙালির আধুনিক নাট্যপ্রয়াস চরিতার্থ হয়েছে ইংরেজি নাটক এবং তার আদর্শ, অভিনয়রীতি ইত্যাদি অনুসরণ করে। পেশাদার দলগুলোর দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের নাটকে বাণিজ্য করবার মতো উপাদান ছিলো না। তাই পেশাদারি থিয়েটারের সমান্তরাল বিকল্প ধারার নাট্যরসিক যখন ডাকঘর বা রাজা নাটকের অভিনয়ে নতুন রীতির মুখোমুখি হচ্ছিলো তখনও পেশাদার দলগুলোর কন্ঠহার, মোগল পাঠান, কিন্নরী, দেবলাদেবী এসব নাটক প্রযোজনার মধ্যে সুস্পষ্ট ছিলো অর্থ উপার্জনের চেষ্টা।

১৮৫৮-এ বাংলার নাট্যক্ষেত্রে প্রবল আবির্ভাব হল মধুসূদন দত্তর, ‘শর্মিষ্ঠা’ নাট্য রচনার মধ্য দিয়ে। মহারাজা যতীন্দ্রমোহন সিংহর বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত হ’ল ১৮৫৯-এ। এলেন দীনবন্ধু মিত্র, ১৮৬০-এ লিখলেন ‘নীলদর্পণ’।
১৮৬৮-তে প্রতিষ্ঠিত হল বাগবাজার অ্যামেচার থিয়েটার। বাগবাজারের কিছু উৎসাহী যুবক– অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি, রাধামাধব কর, নগেন্দ্রলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ নাট্যদল গঠন করে অভিনয় করলেন দীনবন্ধু মিত্রর ‘সধবার একাদশী’। ১৮৭২-এর ১১ই মে তাদের দ্বিতীয় নাটক ‘লীলাবতী’ অভিনীত হয় এবং আশাতীত সাফল্য লাভ করে। অর্ধেন্দুশেখর, অমৃতলাল বসুদের কল্পনা বাস্তবায়িত হল - প্রতিষ্ঠিত হল সাধারণ রঙ্গালয়। চিৎপুরে মধুসূদন সান্যালের গৃহপ্রাঙ্গণ ৩০টাকায় ভাড়া নিয়ে মঞ্চ নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠিত হল ‘ন্যাশানাল থিয়েটার’। ১৮৭২ সালের ৭ই ডিসেম্বর দীনবন্ধু মিত্রর নাটক ‘নীলদর্পণ’ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে এই থিয়েটার শুরু হল।

১৮৬৮ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথ যখন বাল্মীকি প্রতিভায় অভিনয় করছেন গিরীশচন্দ্র তখন বাংলার প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা ও পরিচালক, কিছু কিছু পেশাদার মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের নাটকের অভিনয় হলেও তখনকার নটসূর্য গিরীশচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের নাটকে কোনো অভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। বিখ্যাত নাট্য পরিচালক ও অভিনেতা অমরেন্দ্রনাথ দত্ত একবার গিরীশচন্দ্রকে ‘চোখের বালি’র নাট্যরূপ দিতে বলেছিলেন কিন্তু তিনি রাজি হননি বা উৎসাহ বোধ করেননি। ‘বউ ঠাকুরাণীর হাট’ এর নাট্যরূপ দিয়েছিলেন গিরীশচন্দ্রের অন্যতম সহযোগী কেদার চৌধুরী। নাট্যরূপে ঐ নাটকের নাম হয়েছিলো রাজা বসন্ত রায়। ঐ নাটক ১৮৮৬-র ৩ জুলাই গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হয়। নাটকটি ১৮৯৫ এর ২৩ জুন পর্যন্ত গ্রেট ন্যাশনাল ও এমারেন্ড থিয়েটারে ৪৩ বার অভিনীত হয়েছিলো। অর্ধেন্দু শেখর নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন।

১৯২০ সালে উপেন্দ্রনাথ মিত্র মিনার্ভা থিয়েটারের দায়িত্ব নিলে হেমেন্দ্র কুমার রায় তাকে রবীন্দ্রনাথের বিসর্জন নাটকে অভিনয়ের অনুরোধ করেন কিন্তু উপেন্দ্রনাথ মিত্র রাজি হননি। এর অনেক পরে শিশিরকুমার ভাদুড়ী পেশাদার মঞ্চে বিসর্জন নাটকটি মঞ্চস্থ করেন ১৯২৬ সালে। এই ঘটনার পূর্বে ১৯২৫ এ রবীন্দ্রনাথ নিজে চিরকুমার সভা নাট্যরূপ দিয়ে প্রযোজনার দায়িত্ব দিলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ীর উপর। কিন্তু শিশিরকুমার ভাদুড়ী নাটকটি নিয়ে দ্বিধান্বিত থাকায় অতীন্দ্র চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে নাটকটি অভিনয় করার সম্মতি নিয়ে আর্ট থিয়েটারের প্রযোজনায় ১৯২৫ সালের ১৮ জুলাই গানে, অভিনয়ে, কৌতুকে জমজমাট চিরকুমার সভা মঞ্চে আনলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে প্রথম দিনের অভিনয়ে উপস্থিত ছিলেন। এরপর মিনার্ভা, স্টার, নাট্যনিকেতন, নাট্যভারতী সহ বিভিন্ন মঞ্চে প্রায় নিয়মিত অভিনয় হয়েছে চিরকুমার সভা। বলা যায় পেশাদার মঞ্চে রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে সফল বা দর্শকপ্রিয় নাটক চিরকুমার সভা।

প্রাক-স্বাধীনতা কালে আমাদের নাট্য ঐতিহ্যে আর একটি যুগান্তকারী বাঁক এসেছিল ১৯৪৪-এ। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে মাঝামাঝি পেশাদারী মঞ্চে শুরু হয় অবক্ষয়ের কাল। অর্ধেন্দুশেখর-গিরিশ-*অ মরেন্দ্র যুগের শেষ প্রতিনিধি শিশিরকুমার ভাদুড়ি তখন পেশাদারী মঞ্চের ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’। ১৯৪০এর দশকটা ছিল এক উত্তাল সময়। যুদ্ধ, মন্বন্তরের প্রভাবে (দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের) সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যকারণে গড়ে উঠেছিল গণনাট্য সঙ্ঘ। লক্ষ লক্ষ মৃত্যু আর সামাজিক অবক্ষয়ের যন্ত্রণার গভীর থেকে জন্ম নিল এক এক সৃজনশীল সাংস্কৃতিক সংগ্রাম আর সেই সংগ্রামের অভিঘাতে জন্ম নিল এক নতুনতর নাট্যধারা, বলা ভালো নাট্য আন্দোলন – গণনাট্য আন্দোলন, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের নেতৃত্বে। এই নতুনতর নাট্যধারার প্রথম পুরোহিত বিজন ভট্টাচার্য এলেন তাঁর ‘নবান্ন’ নাটকের মধ্য দিয়ে। বাংলা থিয়েটারে সে এক ক্রান্তিলগ্ন। গণনাট্য সঙ্ঘের প্রযোজনায় বিজন ভট্টাচার্য ও শম্ভু মিত্রর যৌথ পরিচালনায় নাটকটি শ্রীরঙ্গম মঞ্চে অভিনীত হয় ১৯৪৪এর ২৪শে সেপ্টেম্বর। পূর্ববর্তী একশ’ বছরের সনাতনী নাট্য ও মঞ্চের প্রয়োগভাবনার ওলট পালট ঘটিয়ে ‘নবান্ন’ হয়ে গেল বাংলা নাটক ও মঞ্চের এক মাইলফলক। আজও অসংখ্য গ্রুপ থিয়েটার সেই ধারারই উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।
স্বাধীনতা-উত্তর সময়কালে পঞ্চাশের দশকে শম্ভূ মিত্র-র বহুরূপী আমাদের নাটকের রবীন্দ্রনাথকে চেনালেন, পঞ্চাশের দশকে উৎপল দত্তর প্রবল উপস্থিতি তাঁর লিটল থিয়েটার গ্রুপের ‘অঙ্গার’ নাটকের মধ্য দিয়ে, ষাটে এলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। পঞ্চাশের দশক থেকে উঠে এল অসংখ্য গ্রুপ থিয়েটার। বাংলা থিয়েটারে যেন বিস্ফোরন ঘটে গেল! অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হল ১৯৩৩ সালে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন লেডি রানু মুখোপাধ্যায়। প্রথম দিকে অ্যাকাদেমির কাজকর্ম হত ভারতীয় সংগ্রহালয়ের একটি ভাড়া করা ঘরে। পাশের বারান্দায় এর প্রদর্শনীগুলি আয়োজিত হত। ১৯৫০-এর দশকে লেডি রানু মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর পৃষ্ঠপোষকতায় অ্যাকাদেমি উঠে আসে ক্যাথিড্রাল রোডের বর্তমান ঠিকানায়।

এখন আর বিশুদ্ধ ট্র্যাজেডি বলে কোন ধারার স্পষ্ট উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় না। বর্তমানে আধুনিক জীবনে যেমন ট্র্যাজেডি, কমেডির মিলন দেখা যায়, নাটকেও তার অন্যথা হয় নি। আর এর অন্যথা হলে তা আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়াও সম্ভব ছিল না। মোটের ওপর বলতে গেলে ট্র্যাজেডি তাই বিচ্ছেদ মাত্র নয় শুধু, আরও এক মিলনের প্রারম্ভ মাত্র। ট্র্যাজেডিকে একটা প্ল্যাটফর্মের মত দেখি আমি। যেখানে দাঁড়িয়ে আমরা অপেক্ষা করি ট্রেন আসার যা আমাদের নতুন গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারে। ট্র্যাজেডি এমন এক বিষয়, শেষ হইয়াও হইল না যে শেষ। এক নতুন শুরুর কিনারা ধরে যার যাত্রা শুরু, আর এই জার্নিটা আপনি কেমন ভাবে উপভোগ করবেন, তার পূর্বাভাষ আপনি পাবেন না। 'আপনার যাত্রা শুভ হোক’ বলা ছাড়া আমার এখানে আর কোন ভূমিকা নেই।

*অমরেন্দ্র
‘ঋণ স্বীকার - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় ও শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ'


ফেসবুক মন্তব্য