একটি মুর্গার গল্প

অনিরুদ্ধ সেন


মুম্বই উপকণ্ঠে থানা শহর। তার এক প্রান্তে কোলশেট এলাকায় অশোকের এক ছোট্ট ‘কিরানা’ বা মুদিখানা। আশেপাশের জনবসতি ঘন নয়। দোকানটা যে রাস্তায়, সেই কোলশেট রোড বরাবর এলাকার আদি বাসিন্দাদের সারি সারি একতলা চালাঘর। তারা নানা কামধান্দা করে, গরিব না হলেও বাড়াবাড়ি সচ্ছ্বল নয়। বহুতল বাড়ি তখনও সেখানে দেখা দেয়নি। সব মিলিয়ে খানিকটা গ্রাম-গ্রাম গন্ধ। তা, গ্রামের লোকেদের ট্যাঁকে আর কত রেস্ত? অশোকের দোকান তাই টিমটিমিয়ে চলে।
তবু অ্যাদ্দিন দোকানের লাগোয়া এক কারখানা ছিল কিছুটা ভরসা। কারখানা হবার আগে এখানে ছিল ফাঁকা মাঠ, সেখান থেকে রাতের দিকে মাঝে মাঝে জানোয়ারের ডাক ভেসে আসত। কানে গেলে মা চুপি চুপি বলত, “বাঘ”, শুনে ছোটো অশোক ভয় পেত। বাবা কিন্তু হেসে বলত, “দুর, এই শহরে বাঘ কোত্থেকে আসবে! ও হচ্ছে তরস।” মানে, হায়না।
কারখানার পাঁচিল ওঠার পর অবশ্য সেসব উপদ্রব বন্ধ হয়ে গেল। তবে কারখানা শুধু নামেই। মুম্বইয়ে এই কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে উল তৈরি হয়, সেসব এখানে এনে ফাঁকা মাঠে ফেলে ধুয়েমুছে পরিস্কার করা হবে। তাতে আর কত লোক লাগে? তবু সেই সূত্রে বাইরের কিছু মানুষ এল, স্থানীয় কিছু মেয়েমর্দের চাকরি হল। মানে, অশোকের ব্যবসা কিছু বাড়ল।
তাদের বেশির ভাগেরই অবশ্য তেমন ট্যাঁকের জোর ছিল না। তারা বেহদ্দ দরদাম করত, টিপে টিপে পয়সা বের করত। আর যেসব ফ্যাক্টরিওয়ালার কিছু রেস্ত ছিল, তারা অশোকের ‘কিরানা’কে পাত্তা না দিয়ে ভোঁগাড়ি হাঁকিয়ে বেরিয়ে যেত।
তা, সে কারখানাও টিমটিম করে চলতে চলতে এক সময় বন্ধ হয়ে গেল। থানার অনেক কারখানাই নাকি আর লাভ হয় না দেখে তালাবন্ধ করে জমি বেচে চলে যাচ্ছে। আর সেইসব জমি কিনে বিল্ডাররা পেল্লায় সব টাওয়ার বিল্ডিং হাঁকাচ্ছে। উলের কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে দোকানের ভবিষ্যৎ ভেবে অশোকের বয়স্ক বাবা-মা’র খুব দুশ্চিন্তা। নতুন প্রজন্মের ছেলে অশোকের সামনে কিন্তু নতুন স্বপ্ন।
“আরে, আমাদের বরং ভালোই হল! দেখো, এবার এখানে একের পর এক টাওয়ার উঠবে। সেখানকার সাব-মেমসাবদের ক-ত্ত জিনিস লাগবে! আমাদের দোকানের হালই পাল্টে যাবে।”
“কবে কী হবে না হবে, তাই ভেবে ছেলের ঘুম নেই।” মা’র মুখে গর্বের হাসি। বাবার কিন্তু চিন্তা যায় না, নতুন কিছু হলেই একটা বিপদ হবে ভেবে তার সব সময় বুক দুরুদুরু। তাকে আশ্বস্ত করতে অশোক বলে, “তোমাদের মুস্কিল কী, জানো? তোমরা তো গোলামির যুগে জন্মেছ, যখন সবকিছু হতো সাদা চামড়াদের ভালোর জন্য। কিন্তু এখন আজাদ ভারতে যা কিছু উন্নতি হবে, তাতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরই ভালো হবে।”
বাবা অনিশ্চিত ঘাড় নাড়েন। আর অশোক মনে মনে পরিকল্পনা করতে থাকে, তার দোকানটাকে ভবিষ্যতে কীভাবে ঢেলে সাজাবে। কিছু পুঁজি জমেছে। বৌয়ের গয়না বাঁধা রেখে আর কিছু পাওয়া যাবে। তারপর ব্যাঙ্ক লোনের কথা ভাবতে হবে।

অশোকের ধারণা সঠিক প্রমাণ করে সত্যিই এক বিল্ডার পরিত্যক্ত কারখানার জমি কিনে নিল। প্রথমে তৈরি হল তাদের অফিস ঘর, অস্থায়ী হলেও তা ঝাঁ-চকচকে। তারপর সারি সারি সাইনবোর্ডে সগর্বে ঘোষিত হল ‘দামোদরণ বিল্ডার্স’-এর নতুন প্রকল্প ‘ড্রিম গার্ডেন’-এর কথা। ধীরে ধীরে কাজও শুরু হল। প্রথমে এল দলে দলে মাটি কাটার লোক, অনেকেই রাজ্যের বাইরে থেকে। তারা মেয়েপুরুষ অস্থায়ী ঝুপড়ি বেঁধে আশেপাশে ডেরা গাড়ল।
তখনও অবশ্য টাওয়ার বা অন্য কোনও বিল্ডিংয়ের চিহ্নমাত্র নেই। কিন্তু ফ্ল্যাট কিনতে ইচ্ছুক মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে গিয়েছে। কোম্পানির লোকজন তাদের যত্ন করে তৈরি করা একতলার মডেল ফ্ল্যাট দেখায়। তারপর হাত-পা নেড়ে, আকাশের দিকে আঙুল তুলে কীসব যেন বোঝায়। অশোকের মা মুখ টিপে হাসেন, “ওরা দেখাচ্ছেটা কী? ওখানে তো শুধু বাতাস!”
“ওরা দেখাচ্ছে স্বপ্নের ঘর। আজ সেসব শুধু কাগজের ছকে, কিন্তু কাল সিমেন্ট-কংক্রিট-লোহার চেহারা নিয়ে দেখা দেবে।”

শেষ অবধি এক ফ্ল্যাট ক্রেতা অশোকের দোকানে পা রাখল – বছর ত্রিশের একটু এলোঝেলো পোশাকের একটি ছেলে আর তার বছর পঁচিশের সালোয়ার কামিজ পরা সাদাসিধে বৌ। তারা ‘দামোদরণ’-এর তল্লাট থেকে বেরিয়ে অশোকের কাছে এসে বিসলেরির খোঁজ করল। গরমে বৌটির মুখ শুকিয়ে গিয়েছে।
অশোক সম্প্রতি একটা ফ্রিজ রেখেছে। সেখান থেকে ঠাণ্ডা জলের বোতল বের করে দিল, খদ্দের দুজন ছিপি খুলে খেতে লাগল। তারপর বৌটির চোখ গেল দোকানে সাজানো টুকটাক মুখ চালানোর প্যাকেটগুলির দিকে। ছেলেমানুষি খুশিতে সে বলে উঠল, “দেখেছ, কতরকমের নমকিন আর চিক্কি আছে?”
“তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না!” বর ছদ্ম বিরক্তির ভাণ করে বলল, “আসার পথে বললাম ‘টিপটপ’-এ নাস্তা করে আসি – না, এখন এসব হাবিজাবি দিয়ে পেট ভরাবে। এখানে এলে রোজ এইসব খেয়ে খিদে মারবে, তাই না?”
“এখানে আসতে পারব? সত্যি আমাদের ফ্ল্যাট হবে?” বৌটির মুখে যেন এক চিলতে সংশয়, “আসলে, এখন তো কিছুই নেই। কী মনে হচ্ছে জানো? যেন এক ধু ধু মাঠের বুকে একখণ্ড আকাশ বুক করে এলাম।”
“দুর, পাগলি!” বর হেসে বলল, “এমনটাই তো দস্তুর। প্রথম প্রথম কিছু থাকে না, তারপর কয়েকটা বাড়ি উঠলেই দোকানপাট, রাস্তা, আলো, জমজমাট শহর। নইলে সিটি সেন্টারে ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য আমাদের কোথায়? এই ফ্ল্যাট নিতেই আমার মাইনের বেশির ভাগ এবার থেকে ই-এম-আইতে চলে যাবে, সংসার চালাতে তোমার মাইনেতেও টান পড়বে।”
“চিন্তা করবেন না বহেনজি, দেখবেন এলাকা কী তাড়াতাড়ি উঠে যায়।” অশোক তার খদ্দেরদের আশ্বস্ত করে বলল, “এখানকার নগরসেবক যাদবজি ভীষণ কাজের লোক। ক’বছর পর যখন আপনারা ফ্ল্যাটের দখল পাবেন, দেখবেন জায়গাটা আর চেনা যাচ্ছে না। তা, কী নেবেন? আচ্ছা এই খাড়া বিস্কুটটা নিন, একবার খেলে স্বাদ ভুলতে পারবেন না।”
এরপর অশোক তার সুনিপুণ বাকচাতুর্যে খদ্দেরদের সন্তুষ্ট করে আরও কিছু টুকিটাকি বিক্রি করল আর কথা দিল, তাঁরা আসতে আসতে সে তার দোকানের ভোলই পাল্টে দেবে। স্থানীয় স্পেশালিটিগুলির সাথে আধুনিক জমানার পছন্দসই জিনিসপত্র রেখে এমন করবে যে সাব-মেমসাবদের আর কেনাকাটার জন্য শহরে যেতে হবে না।

সময় গড়িয়ে চলে। তারপর একদিন ভিতের গভীর গাঁথনি ছাড়িয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলল হবু টাওয়ার। ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল তার উচ্চতা আর বেড়ে চলল ইচ্ছুক ক্রেতাদের আনাগোনা। যাত্রাপথে তাদের কেউ কেউ অশোকের দোকানে আসে টুকটাক এটাসেটা কিনতে। অশোক খুব যত্নবান শিক্ষার্থী, খদ্দেরদের সাথে কথাবার্তা বলে সে চটপট বুঝে নেয় তাদের কী কী চাহিদা। ভবিষ্যতে ‘ড্রিম গার্ডেন’-এ লোকজন আসতে শুরু করলে সে ধীরে ধীরে সেসব জিনিস আনিয়ে রেখে আশেপাশের গ্রাম্য দোকানীদের টেক্কা দেবে। এখনকার ফ্ল্যাট কিনতে আসা খদ্দেরদের জন্যও সে মিনারেল ওয়াটার, আইসক্রিম, আরও তাদের পছন্দসই এটাসেটা এনে রাখে। সেসব উঠেও যায়।
টাওয়ারগুলি ক্রমে মাথা তুলতে থাকে – এক, দুই, তিন, চার। কর্মকাণ্ডও বাড়তে থাকে। লোকজন, বিরাট বিরাট ক্রেন, ট্রেইলার, সিমেন্ট মিক্সারের কানফাটা আওয়াজ। কিছু মজুর প্রকল্পের এলাকার এক পাশেই টিনের চালা বেঁধে থাকতে আরম্ভ করল। তাদের অনেকে সপরিবারে থাকে। তাদের ছোট্ট, সাময়িক গৃহস্থালীর জন্যও তো কিছু সরঞ্জাম চাই – যেমন চাল, ডাল, তেল, সাবান, চা, গুঁড়ো দুধ, বাল্ব, মগ, বালতি। অশোকের ব্যবসার পালে হাওয়া লাগল আর অধীর আগ্রহে সে অপেক্ষা করতে লাগল কবে প্রথম টাওয়ারের বাসিন্দারা আসতে শুরু করবে।
কিন্তু হঠাৎ এক সময় কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। টাওয়ারগুলি তখন আধা তৈরি। কানাঘুষোয় শোনা গেল, দেশে নাকি মন্দা। তার ধাক্কা গৃহনির্মাণ শিল্পেও পড়েছে। বিল্ডারদের হাত শূন্য। ধার জুটছে না। প্রথম ধাক্কায় অনেকগুলি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছিল। তারপর চাহিদার সাথে সাথে ফ্ল্যাটের দামও বেড়েছে হু হু করে। কিন্তু ইদানীং আর তেমন খদ্দের জুটছে না। জুটবেই বা কী করে – মন্দার ফলে মানুষের চাকরির অনিশ্চিতি, তারা অত চড়া দামের ফ্ল্যাট কেনার জন্য ব্যাঙ্ক লোন নিতে দ্বিধা করছে। ফলে বিল্ডাররা কন্ট্রাক্টরদের পয়সা দিতে পারছে না, কাজও তাই বন্ধ হয়ে আসছে।
যারা ইতিমধ্যে ফ্ল্যাট বুক করেছে, তাদের অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে খোঁজখবর করছে। অনেকগুলি টাকা আটকে রয়েছে তো! প্রথম দিনের সেই পাটিল দম্পতি ইদানীং আবার এসে ঘুরে গেছে। অশোকের সাথে তাদের কিছুটা দোস্তিও হয়েছে। বৌটি শুকনো মুখে বলছিল, “কী অশোক, ফ্ল্যাট পাব তো? এদিকে এতগুলি ইএমআই কাটছে, সাথে সাথে যদি বছরের পর বছর ভাড়া গুণতে হয় তো কদ্দিন টানতে পারব?”
“ভাববেন না ভাবি, সব ঠিক হয়ে যাবে।” অশোক ভরসা দিল, “এসব কি চিরকাল থাকে নাকি? এমনটা হয়, আবার ঠিকও হয়ে যায়। আপনারা বরং বারবার অফিস কামাই না করে আমার কাছে একটা ফোন নম্বর রেখে যান, আমি আপনাদের মাঝে মাঝে জানাব।”
কৃতজ্ঞ দম্পতি তাই করেছিল আর কিছুদিনের মধ্যে অশোক তাদের জানিয়েওছিল যে বিল্ডার নিশ্চয়ই কিছু ব্যবস্থা করেছে, কাজ আবার শুরু হয়েছে। তবে অ্যাদ্দিনের প্ল্যান ছিল এলাকায় শুধু দুই আর তিন রুমের ফ্ল্যাট হবে। এবার তার বাইরে গিয়ে বিল্ডার ছোটো, এক রুমের ফ্ল্যাট তৈরির কাজও হাতে নিল। দাম অপেক্ষাকৃত কম, তাই সেগুলো চটপট বুক হয়ে গেল। এলাকায় ছোটো ফ্ল্যাট, মানে ‘নিচু’ স্টেটাসের লোক – এটা বড়ো ফ্ল্যাটের খদ্দেররা চট করে মেনে নেয় না। কিন্তু এখানে তারা রা’টি কাড়ল না – নইলে অন্য কিছু বিল্ডারের মতো দামোদরণও দেউলিয়া হয়ে গেলে তারাও যে পথে বসত।

আবার ঠক-ঠক, দুমদাম, আবার সিমেন্ট মিক্সারের ঘর্ঘর। বাড়ি উঠছে, একের পর এক। ধীরে ধীরে আকাশ ছুঁচ্ছে। আর অশোকের বুকের আশার আলো ধীরে ধীরে উজ্জ্বল হচ্ছে। এরপর ধীরে ধীরে লোকজন আসতে শুরু করবে। বাড়ির কাঠামো উঠে গেলেও ভেতর-বাইরের কাজের ফিনিশিং সময় নেয়। তারপর আছে পুরসভার অনুমোদন। অনেকের অত তর সয় না, তার আগেই তারা নানা কলেকৌশলে ঢুকে পড়ে। ওই যে, একসাথে ইএমআই আর ভাড়া টানা – সবাই তো পারে না।
তবে অন্তত জল আর বিজলি তো আসা চাই। সেটা এলেই – অশোক মাঝে মাঝে গিয়ে খোঁজ নেয়। ইতিমধ্যে সে একটু একটু করে কিছু টাকা জমিয়েছে। ঠিক সময়ে সেটুকু ঢালবে। তারপর বিক্রিবাটা একটু বাড়লে সেসব উশুল হতে আর ক’দিন! অশোকের চোখে নানা স্বপ্ন ভিড় করে। সে বাবা, মা, বৌকেও স্বপ্ন দেখাতে চেষ্টা করে, উজ্জ্বল আগামী দিনের স্বপ্ন। ঘরটার ছাউনি পাকা করা, একটা বাথরুম। ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুল। ওরা কতক বিশ্বাস করে, কতক করে না। কিন্তু সবার মনেই ধাক্কা লাগে, আশার ধাক্কা। আশা বড্ড সংক্রামক!
রাজ্যে ভোটের সময় এল। স্থানীয় নগরসেবক যাদবজী এবার বিধানসভায় দাঁড়াচ্ছেন। উনি জোড়হাতে ঘরে ঘরে ভোট চাইতে এলেন।
“আরে, তোকে তো আমি জন্মাতে দেখলাম, তুই এত বড় হয়ে গেছিস!” সস্নেহে অশোকের পিঠে হাত রেখে বললেন তিনি। অশোকের বাবা সসম্ভ্রমে বললেন, “হ্যাঁ জী, আপনি তো কবে থেকেই আমাদের দেখভাল করে আসছেন। এখন আপনি বিধানসভায় যাবেন, এ আমাদের গর্ব। আমাদের ভোটটা তো আপনারই, তার জন্য কষ্ট করে আসারও দরকার ছিল না। কিন্তু আমাদের মতো গরিবদের একটু দেখবেন।”
“আরে, তোমরা আর গরিব থাকবে নাকি? দেখতে দেখতে এই জায়গা উঠে যাবে। কত দাম হবে এই বাড়ির! তখন তো তোমরা কত লাখ টাকার সম্পত্তির মালিক – চাও তো বিক্রি করে মৌজে পায়ের ওপর পা তুলে বাকি জীবন কাটাবে।”
অশোক সবিনয়ে বলল, “না যাদবজী, আমার ইচ্ছে এই দোকানটাকে বড় করে তুলব। এটা হবে এই এলাকার সবচেয়ে বড় কিরানা শপ। কিন্তু সত্যিই এলাকাটা উঠবে? উন্নয়ন হবে?”
“হবে না আবার! জানিস, ‘ড্রীম গার্ডেন’ কমপ্লেক্সে কতগুলি ফ্ল্যাট? কম সে কম সাতশো। এতগুলো লোকের বাস মানে তো একটা ছোটোখাটো শহর। তার জন্য কত কী লাগবে বল তো! জল আর বিজলির নতুন লাইন বসবে, ঝাঁ চকচক চওড়া রাস্তা হবে, বাগান, সুইমিং পুল, বাস, ট্যাক্সি, কার, স্কুলবাস – একেবারে হৈহল্লার ব্যাপার। তারপর তোকে একটা ভেতরের খবর দিচ্ছি – মুম্বই ইউনিভার্সিটিও কাছেপিঠে তাদের থানে কমপ্লেক্স খুলবে। কী বিরাট কাণ্ড, বুঝতে পারছিস?”
অশোকের বুক উত্তেজনায় ধুকপুক করতে থাকে। সা-তশো ফ্ল্যাট? তার ওপর ইউনিভার্সিটির ছাত্রছাত্রী? সে ঠিক করে ফেলে, হোম ডেলিভারি দেবে। একটা ছোঁড়াকে রাখতে হবে। না না, একটায় হবে না, দুটো। আর একটা জেরক্স মেশিনও রাখবে। না, আজকালকার দিনে শুধু জেরক্সে হয় না – একটা ছোটোখাটো কম্পিউটার, সাথে কালার প্রিন্টার। অশোক মনে মনে হিসেব কষতে বসে। অনেক টাকা লাগাতে হবে, তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। ক’দিন একটু টানাটানি করে চলতে হবে। তবে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সব সুদে আসলে উশুল হয়ে যাবে। অশোকের চোখের স্বপ্ন নিবিড়তর হয়।
# # #
বছর পাঁচ-সাত কেটে গেছে। ‘ড্রিম গার্ডেন’কে ঘিরে সত্যিই গড়ে উঠেছে এক ছোটোখাটো উপনগরী। সেখানে রয়েছে জিম, সুইমিং পুল। কার পার্কিংয়ের ওপরকার বাগানে ছোটোরা খেলাধুলো করে। রোজ সকালে বিকেলে ঝাঁক ঝাঁক স্কুলবাস আসে কচিকাঁচাদের জন্য। উপনগরীর দু-তিন হাজার বাসিন্দা, তাদের পরিষেবায় নিযুক্ত আরও হাজারখানেক মানুষ। সেখানে আসার রাস্তা আগে ছিল সঙ্কীর্ণ, ভাঙাচোরা, এখন হয়েছে চওড়া, ঝকঝকে শান বাঁধানো। রোজ তার ওপর দিয়ে ছুটে চলে প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, অফিস বাস, পুল কার, এমনকি মিউনিসিপ্যালিটির বাস। রাত হলে কমপ্লেক্সের ভেতর-বাইর ঝকঝক করতে থাকে সারি সারি এল-ই-ডি ল্যাম্পের স্নিগ্ধ ছটায়। কাছাকাছি মুম্বই ইউনিভার্সিটির এক কমপ্লেক্সও চালু হয়েছে। তার শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী আর কর্মচারীদের ভিড় প্রতি বছর নতুন নতুন কোর্স খোলার সাথে সাথে বাড়ছে। সব মিলিয়ে এক জমজমাট ব্যাপার, অর্থাৎ যাদবজি যেমনটা বলেছিলেন। হ্যাঁ, যাদবজী এখন নগরসেবক নন, বিধায়ক। এলাকার উন্নয়ন আগের মতোই তাঁর ধ্যানজ্ঞান।
চওড়া রাস্তা বানাতে গিয়ে অবশ্য অশোক ও আরও অনেকের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ভাঙা পড়েছে। তা, সার্বিক উন্নয়নের জন্য এসব একটু-আধটু তো হবেই। বিপদের আভাষটা কানাঘুষোয় পেয়ে অশোক আর ওর কিছু সঙ্গীসাথী ছুটে গিয়েছিল যাদবজীর কাছে। তিনি ওদের কথা শুনে সহানুভূতির সঙ্গে বলেছিলেন, “আরে, তোরা কোথায় যাবি? তোদের তো আমি এখানে পয়দা হতে দেখেছি। তোদের জন্য আমি জান লড়িয়ে দেব।” তা, দিয়েওছিলেন তিনি। মিটিং, মিছিল, মিউনিসিপ্যালিটির সামনে অবস্থান কিছুই বাকি থাকেনি। কিন্তু শেষ অবধি কোনও ফল হয়নি।
“দ্যাখ, আমি অনেক কিছুই করতে পারি। কিন্তু বুঝিস তো, হাইকোর্টের নির্দেশের বিরুদ্ধে আমার হাত বাঁধা। অমান্য করলে আমাকেই জেলে পচতে হবে। আর তোরাও অ্যাদ্দিন আছিস, যদি কিছু পড়চা করে রাখতিস!” তিনি হতাশার সঙ্গে বলেছিলেন।
“আমাদের তো রেশন কার্ড, ভোটের কার্ড ছিল।” বলেছিল ক্ষুব্ধ অশোক।
“তাকিয়ে দেখেছিস, ওতে কী ঠিকানা লেখা আছে – সাঁইনগর ঝোপরপট্টি! মিউনিসিপ্যালিটির দেওয়া ব্লক নম্বর, খোলির নম্বর না থাকলে কোর্ট মানবে?”

দুঃখিতভাবে ঘাড় নেড়ে চলে গিয়েছিলেন যাদবজী। ওদের জন্য কষ্ট হয়। কিন্তু কী করা যাবে, কয়েকজনের কথা ভেবে তো উন্নয়ন আটকে থাকতে পারে না। উন্নয়ন মানে সমাজের লাভ, উন্নয়নের কন্ট্রাক্টরদের লাভ, সমাজসেবীদেরও লাভ। তাই একটা এনজিওকে বেনামিতে তথ্যসাবুদ জুটিয়ে পিআইএল করার মতলবটা তাঁকেই বাধ্য হয়ে দিতে হয়েছিল।
অবশ্য বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কলকাঠি নেড়ে মানবিকতার দোহাই দেখিয়ে তিনি গৃহহারাদের জন্য ঘরপ্রতি লাখখানেক টাকার বন্দোবস্তও করে দিয়েছিলেন। অশোক ওর অনেক সঙ্গীসাথীর মতো সেই টাকার সাথে কিছু যোগ করে একটা ছোট্ট খোলি নিয়ে চলে গেছে শহরের আরও দূর প্রান্তে। অশোকের মা মারা গেছে, বাবা প্রায় অথর্ব। এই ক’বছরে অশোক শরীরে-মনে অনেকটা বুড়িয়ে গেছে। একটু নুয়ে হাঁটে, আস্তে আস্তে কথা বলে। দোকানের শখ আর নেই। একটা হাতগাড়িতে এটাসেটা নিয়ে বিভিন্ন হাউসিং সোসাইটিতে ফিরি করে। বিক্রি মোটামুটি হয়। ওর বৌ ‘ড্রিম গার্ডেন’-এ কয়েক বাড়ি বাইয়ের কাজ করে। দুইয়ে মিলে একরকম চলে যায়।
তবে অশোকের ছেলে ধবল বড় হয়ে উঠছে। অল্প বয়সেই তার চলনে বলনে বেশ জোয়ান জোয়ান ভাব। লেখাপড়ায় তেমন সরেস না হলেও কথায়, কাজে চৌখস। এখনই কাকভোরে টাওয়ার বিল্ডিংয়ে বাড়ি বাড়ি দুধ দিয়ে কিছু রোজগার করে। যাদবজী নয়, তার মতো নতুন প্রজন্মের ছেলেদের আদর্শ এখন উঠতি নেতা কেলকার। ধবল বাবাকে ভরসা দিয়ে বলে, “তুমি ভেবো না। কেলকারজী বলেছেন এখানে এখন ম্যাকডোনাল্ড, পিজ্জা হাট চালু হবে। টু-হুইলার চালাতে শিখে নিলেই একটা চাকরি বাঁধা। তারপর কিছু টাকা জমলেই নিজের একটা দোকান।”
“কিরানা?” অশোক ছেলের মুখের দিকে তাকায়।
“পাগল হয়েছ! আজকাল ওতে না পয়সা, না সম্মান। দ্যাখোনি, চাল-ডাল সওদা করতেও সব গাড়ি হাঁকিয়ে ছোটে ভিভিয়ানা, ডি-মার্টে। আমি একটা টিভি-কম্পিউটার-স্মার্ ফোন রিপেয়ার শপ খুলব। পরে বিক্রিও করব। এখন ওতে খুব প্রেস্টিজ।”
অশোক ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে থাকে, কিছু বলে না।

ফেসবুক মন্তব্য