স্ট্রেঞ্জার

রুখসানা কাজল


দড়াম করে খচে গেল মেজাজটা। ঘর ঠান্ডা করে কাম্যুর স্ট্রেঞ্জার পড়ছিল সাহানা। এই নিয়ে হাজার বার পড়েছে বইটা তবু উল্লেখ করার মত তেমন কিছুই ও খুঁজে পায় নি। ওর বন্ধুরা কেউ কেউ একবার পড়েই কত কিছু যে খুঁজে পায় এই বইয়ের ভেতর। আলোচনায় বসলে বিস্ময়ের হাজার রকম দৃশ্য, ঘটনা নিয়ে ওরা গলা ফাটায় আর সাহানা ভেবলির মত বসে হে হে করে যায়। ভেবেই পায় না কি আছে এই ছাতামাতা বইয়ে যে এত অবাকিত হয়ে এত্ত এত্ত আলোচনা করতে হবে! আচ্ছা ও একাই কি কিছু খুঁজে পায়না নাকি ওর মত আরো কেউ কেউ আছে এমন বেভুলা কানা ভোলা আনপড়্‌! আজকে একেবারে খাতা কলম নিয়ে কেত্‌রে বসেছিল সাহানা। কি লিখেছে কাম্যু কি আছে এই বইয়ে বাই হুক অর ক্রুক খুঁজে বের করবেই করবে। মন দিয়ে কিছুটা পড়ে এগিয়েছে এর মধ্যে তানিম দিলো মেজাজ খচিয়ে। কেন যে তানিমের ফোন রিসিভ করে সাহানা!
কেমন আছে তোমার মেয়ে? তানিমের গলায় তিন মন শ্লেষ। সাহানাও চার মণ লিকুইড হেমলক ঢেলে উত্তর দেয়, ভাল আছে। ইনফ্যাক্ট সুখে আছে বলেই মনে হচ্ছে। তানিম আরো ভেনাম ঢেলে দাঁত ঘষে, তাতো থাকবেই। ফ্রী মিক্সিং শিখে গেছে যে। মার মত বিশ্ব ভালবাসায় ফেইথফুল। তা তোমার মেয়ে ত হট্‌ আইটেম। হোটেল টোটেলেও যাচ্ছে নাকি আজকাল? মোবাইলের সুইচ অফ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না এরপর। ইচ্ছে করলে বলা যেত, যে বাপের মেয়ে। উনিশ হলো এই মার্চে। হয়ত থ্রিসাম ও শিখে গেছে ওর ড্যাডার মত!
কথা বলতে মন চাইল না আর। তানিমের এই ধরণের ফালতু কথার জন্যে ঘেন্না লাগে নিজের উপর। কি খেয়ে যে এই ছাগল বিয়ে করেছিল সাহানা। ও নিজে কথাবাজ। কারো কথা মাটি ছুঁতে দেয় না ক্যাচ ধরে ফিরিয়ে দেয় সাথে সাথে। বাউন্সারে সেরা ছিল ভার্সিটিতে। স্যাররা পর্যন্ত সামলে চলত। আর তানিম কথা বলত খুব অল্পস্বল্প সামান্য আওয়াজ বাজত সে সব কথার শব্দসুরে! মনে হত নরম হাতে কেউ যেন ভায়োলিনে ছড় ঘুরাচ্ছে অথবা কবিতার বইয়ের পাতা উড়াচ্ছে প্রিয় কবিতা খুঁজতে খুঁজতে। সাহানা মুগ্ধ হয়ে ভেবেছিল কম কথার তানিম কত সংযত। ওদের মত করে একদম ফালতু বকে না কত ভাল। এখন বোঝে শয়তানটা স্লাইট তোতলা ছিল বলে ওরকম চুপ থাকত! সাহানার সাথে ঝগড়া করতে করতে কোথায় হারিয়ে গেছে তানিমের সেই তোতলামি। তানিমের কথার আঘাতে এখন সাহানা নিজেই বোবা হয়ে থাকে। মেয়েও মহাক্ষাপ্পা। ড্যাডা্র ভালগার কথাবার্তা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না তিশা।
সাহানা গজরায়। একটি সুন্দর তরতাজা দিনের ভেতর কুইনাইন তেতো ঢেলে দিল শুয়োরের বাচ্চাটা। এখন যতবার নিঃশ্বাস নেবে ততবারই গলা বেয়ে কুয়ে কুয়ে উঠবে তিতকুটে দুর্গন্ধটা। বেজন্মা না হলে কেউ নিজের ঔরসে জন্ম দেওয়া মেয়েকে এভাবে বলতে পারে? ভাগ্যিস মেয়েটা বাসায় নেই। নইলে এখুনি বাপকে যা খুশি তাই বলে গালাগাল দিতো। সেই সাথে সাহানাকেও কয়েকবার ঝাঁকিয়ে নিত ফালতু পার্সন বিয়ে করার জন্যে। তিশা বার বার ওয়ার্ন করেছে, মা ফোন ধরবা না। লোকটা তোমাকে ক্ষ্যাপাতে এইসব কথা বলে। তোমাকে জ্বালিয়ে পোড়াতে চায়। আমরা যে শান্তিতে আছি লোকটার ভাল লাগছে না। কিন্তু কেন যেন সাহানা ফোন ধরে! কেন যেন মনে হয় তানিম কি আজ ফোন দেবে? দু তিনদিন পর পর মিস্‌কল চেক্‌ করে। কি হল শয়তানটার! একটা বিশ্রি মাথা ব্যাথা আছে তানিমের। তেল জল মিশিয়ে আস্তে আস্তে টিপে দিলে ঘুমিয়ে যেতো শিশুর মত। আর ঘুম থেকে উঠেই খুশি খুশি গলায় বলে উঠত, ঝাকানাকা চা বানাও ত সানু। একটু চিনি দেবে? দাও না শুধু আজকের জন্যে, প্লিজ প্লিজ! মোবাইলে তানিমের নাম্বার দেখলেই মনে হয় ওদের ছেড়ে দূরে গিয়ে তানিম নিশ্চয় আগের তানিম হয়ে গেছে সেই চেক্‌ শার্ট, ক্ষয়া জিন্স। জোড়া ভুরুতে শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় কিম্বা শরত সকালে অথবা হেমন্তের মন খারাপ বিকেলে তানিম ফোন দিয়ে বলবে, কেমন আছিস কটকটি? দুটো বই পাঠালাম তোকে কাঁদাতে। পড়ে দেখিস কাঁদুনি!

গেলো বিকেলেই তিশা হইহই করে বেরিয়ে গেছে বন্ধুদের সাথে। প্রথমে চট্টগ্রাম এরপর কক্সেসবাজার টাচ করে মহেশখালী আরও কোন কোন জায়গায় ঘুরবে। বলে গেছে এবার সাহানার জন্যে ক্র্যাব ফ্রাই আনবেই আনবে। একচুয়ালি ক্রাব ফ্রাইটা কিছুতেই পারে না সাহানা। আর ক্র্যাব আনলেই ফ্রাই খাওয়ার বায়না ধরে তিশা। ক্র্যাব সাপ্লায়ার রিপনের কাছে জানতে চেয়েছিল সাহানা, কি করে ভাজে রে জানিস তুই? রিপন এক গাল হেসে বলেছে, দিদি যে কি কন! আমরা গরীব মানুষ ত্যাল পালি দিই না পালি দিই না। নুন হলুদে ঝাল ঝাল চচ্চড়ি বানায়ে থাল থাল ভাত মারে দিই। অই ফিরাই টিরাই কেম্বে রান্দে কে জানে বাবা! সাহানা রিপনকে তানিমের ফেলে যাওয়া একটি কোট দিয়ে বলে, কখনো খুলনা গেলে অই ঝাল চচ্চড়ি কিন্তু আমাকে খাওয়াবি রিপন! বুকের সাথে সাবধানে কোটটা জড়িয়ে রেখে রিপন হাসে, দিদিরে দিদি কি কাল যে লাগে শীতের সুমায় মাছ ধরতি! হাত পা আর চলতি চায় না! সাহানা ওকে থামায়। আলমারি খুলে একটি সবুজ পশমের শাল এনে ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বলে বউকে দিস। হতভম্ব রিপন কিছু বলতে পারেনা। শুধু প্রণাম করে কাঁকড়ার বাক্স তুলে অন্যদিনের চেয়ে ধীর পায়ে নেমে যায়। সাহানা ভাবে এই যে দান তাতে কি বৈষম্য কেটে যাবে? যায় কখনো?

তিশার বন্ধু চঞ্চল জানিয়েছে ওদের পূর্বপুরুষ নাকি কুমোর ছিল। ব্রাম্মণ আর কায়স্থ বাড়িতে ওদের পিঠ বাঁকিয়ে মাথা নীচু করে হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে হত। আজকাল যদিও অবস্থার বদল হয়েছে। তবু যতবড় ইঞ্জিনীয়ার হোক সম্বন্ধ করে কোন ব্রাম্মণ বা কায়স্থ পরিবার ওর সাথে মেয়ে বিয়ে দেবে না। আফরিন চঞ্চলের পিঠে কিল মেরে বলে, দোস্তো কেউ যদি তরে বিয়া না করে তুই আমারে জানাছ। আমি তরে লগে লগে বিয়া কইরা ফালামু আনে। বাপরে কমুনে ও বাপ দেহো দেহি কেমুন জাত স্থপতি বিয়া কইরা ফ্যালাইছি, পাইবা এমুন জামাই! চঞ্চল হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খায়, ভাল কইছিস। পালরা হল গিয়ে স্থপতি। তয় কিনা আমার বাপ মা ফিট খাবেনে। নীচু জাতের হলি কি হবে ছেলের বউ মুসলমান নৈব নৈব চ-- সাহানা ভাবে খিটকলের মত এই আরেক জাত পাত। এই জন্যেই কি অনেক হিন্দু স্বেচ্ছায় মুসলিম হয়ে গেছিল? সবার তো ইচ্ছা করে সমানভাবে বাঁচতে! অন্তত এই জায়গায় জিতে গেছে মুহাম্মাদের ইসলাম।

তিশারা দলেবলে প্রায় দশজন ছেলেমেয়ে। সব যখন এক জায়গায় হয় মাঝে মাঝে সাহানাই গুলিয়ে ফেলে কে যে চঞ্চল আর কে যে আফরিন! আফরিনের সোল মেট হচ্ছে চঞ্চল। এক রকম শার্ট প্যান্ট এমনকি চুল পর্যন্ত। পেছন থেকে দুজনকেই এক রকম লাগে। সাহানার উলটো পালটা ডাকে ওরা হেসে উঠলে ক্ষেপে যায় ও, কি রে তোরা! আলাদা বৈশিষ্ট্য বলে কিচ্ছু নাই তোগের। সব এক্কেরে সল্টলেস ধ্যাড়স। যা ভাগ! খুব মজা পেয়ে হইহই করে উঠে সবাই, দ্যখ দ্যাখ আমাগোর মাগুলো কেমন মিড নাইনটি স্পেশাল। এরা নাকি আবার কবে স্বৈরাচারী আন্দোলন করেছিল! ট্রাক তুলে দিয়ে ভার্সিটির ছাত্র পিষে মারা সেই মিছিলেও ছিল। বুদবুদের মত হাসি উড়িয়ে সবগুলো ইবলিশের বাচ্চা করুণা দেখায়, আন্টি ইটস ওকে। উই আর ইউনাইটেড। সাহানা কিছু বলেনা। সবে উনিশ। ভার্সিটি সেকেন্ড সেমিস্টার। টিনএজের সোনা সোনা ইনোসেন্স এখনো সুবাস ছড়াচ্ছে। দিন বাড়ুক বেটা তখন দেখা যাবে। সোভিয়েট রাশিয়াও ইউনাইটেড ছিল। ভাঙ্গল যখন পুর্ব ইউরোপ দুরমুশ হয়ে গেল। ভারত বাংলাদেশ পাকিস্তান আফগানিস্তানে কম্যুনিস্ট বলে কেউ আর রইল না। আমাদের ইউনাইটেড বন্ধুরা যে কে কোথায় হারিয়ে গেল!

সাহানা উঠে খাটের পাশে বইটা রেখে বারান্দায় এসে বসে। তিনতলার ছেলেটা কবুতর পোষে। ঝুল বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি কবুতর। তিশাও বায়না তুলেছিল, মা মা প্লিজ। দেখো তোমারো ভাল লাগবে। এই যে তোমার লোনলিনেস থাকবে না মোটেও। সাহানা তেড়ে মারতে গেছিল, শয়তান মেয়ে আমি লোনলি কে বল্ল তোকে! ঘর নোংরা করলে ক্লিন করবে কে তা ভেবছিস? তাহলে বিড়াল আনি মা? সাহানার তাতেও ভয়ংকর আপত্তি। বিড়াল হচ্ছে দুনিয়ার অসভ্যতম প্রাণী। কিছুতেই নির্দিস্ট পটে পটি করে না। সোফায়, বিছানায়, খাটের নীচে পটি করে রাখে। তিশা হে হে হে করে হাসে, ইউ আর ইউনিক মাম। যারা বলে তুমি খুব মায়াবতী দে আর ফুল্লি ফুলিস। সাহানাও কোমর বেঁধে মেয়ের সাথে ঝগড়ায় নেমেছিল, ওকে ওকে আমি ক্রুয়েল। নিষ্ঠুর ঠিকাছে। ঘরে আমি জীব জন্তু রাখতে দেবো না। মানুষের বাচ্চা হলে তবু কথা ছিল! এবার তিশা গম্ভীর হয়ে যায়, তুমি ছেলে চেয়েছিলে ইজ ইট নট? মানে? হা হা করে উঠে সাহানা, কি বলছিস তুই? জানি মাম্‌ আমি শুনেছি। তুমি কি মনে কর আমি ছেলে হলে ড্যাডা খুশি হয়ে ভাল মানুষ হয়ে যেত? তোমার সাথে ছাড়াছাড়ি হত না? তিশার অভিমান ভরা মুখের দিকে তাকিয়ে এবার অতিরিক্ত গম্ভীর হয়ে যায় সাহানা। কোন কথা বলে না। ছেলে সন্তানের দোহাই দিলেও যা করার তার থেকে ফিরে আসার লোক তানিম ইসলাম নয়! আর ছেলে বা মেয়ে এসব না ভেবে একটি সুস্থ সন্তান কামনা করেছিল সাহানা। তবে হ্যা সাহানার মেয়ে সন্তানের দিকেই পাল্লা বেশি ছিল।

চলে যাওয়ার আগে তানিম কিশোরী মেয়েটির কাছে প্রচুর আজে বাজে কথা বলে গেছে। সাহানা জানে তিশা সেগুলো বিশ্বাস করে না, তবু মাঝে মাঝে ছুরি মারার মত করে কুঁচিয়ে দেয়। যুদ্ধ যুদ্ধ পরিবেশে থেকে তিশাও শিখে গেছে কিভাবে কাকে কখন কোন কথায় মোক্ষম ঘা মেরে আঘাত করতে হবে। অভিমান ছলছল করে উঠে মন। বুকের কোথায় যেন অহল্যা অটল নীরবতা এঁটে বসে। সাহানা শক্ত মুখে উদাস বসে থাকে। অনির্দিস্ট চোখে চেয়ে থাকে দেয়ালের দিকে। তিশা সরে যায়। এই সময় মাকে নাড়াতে সাহস পায় না। মনের কোথাও অজানা তারে বেজে উঠে শুদ্ধসুর, উহু মা নয় ড্যাডাই ছেলে চেয়েছিল। এটুকু স্বচ্ছ পরিষ্কার, মার কাছে ছেলেমেয়ে সবই সমান। ড্যাডাই মার বিরুদ্ধে তিশাকে ক্ষেপাতে এই কথাটি বানিয়েছে। ঝগড়ার সময় সে নিজে ড্যাডাকে বলতে শুনেছে, শাট আপ! মেয়ের মা তার আবার এত বড় গলা! ড্যাডার অনেক মিথ্যের ভেতর আরেকটি মিথ্যে ধরতে পেরে তিশা ভাবে তার রক্তকণিকায় কে দৌড়াবে? ঘুরে ফিরে সে যে ড্যাডার মতই হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন!

তানিম সংসার ছেড়ে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। শেষদিকে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছিল না। সম্ভবত অতিরিক্ত যৌন স্বাধীনতা একটি অসুখ। আর অসুখটা বেশ ছোঁয়াচেও বটে। অফিসে দু দুটি ডিভোর্স হয়ে গেল। বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় তনুজার আর তিন বছর শেষে রাব্বির। অথচ দুজনেরই পাক্কা প্রেমের বিয়ে ছিল। তনুজার একটা বাচ্চা হতেই কেমন জানাজানি হয়ে গেল স্বামীর পরকীয়া আছে তার বড় বোনের ননদের সাথে। বেশ জোরদার সেই সম্পর্ক। মহিলা বিবাহিতা বয়স্কা। দুজনের কেউ নিজেদের সংসার ভেঙ্গে বিয়ে করবে না কিন্তু বর্তমান বিয়ের পাশে এই সম্পর্ককে জারি রাখতে অটল, বদ্ধপরিকর। মহিলার স্বামি মেনে নিয়েছে। তনুজার বরও বলেছিল, তোমার কিসের অভাব রেখেছি যে এমন খেউখেউ কর! জাস্ট বন্ধুত্বের একটু বেশি রিলেশন এই ত। আমি ত রোজ রোজ বা রাতে যাই না। তুমি তো জানতেই আমি কত নির্ভর করি ওর উপর। কিন্তু তনুজা মেনে নিতে পারেনি। স্রেফ বলে দিয়েছিল, আমি স্বামিকে ভাগ করে নিতে পারব না। শেষ সমাধান হিসেবে তনুজার স্বামি তাস ফেলেছিল, তুমি করলেও আমার নো অবজেকশন। সংসারটা থাক তনু। তনুজা ছেলে নিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। খাওয়া পরার কষ্ট নেই ত কেন এই বারোয়ারি কুত্তা পোষা!

রাব্বির আবার অন্য কেস। বিয়ের পর ওর বউ সাব্রিনা কিছুতেই বাবার বাড়ি ছাড়বে না। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থাকতে পারলে রাব্বি কেন থাকতে পারবে না! বাবা মার এক সন্তান সাব্রিনা। তাদের দেখভালের দায়িত্ব ত তার। সহায় সম্পত্তি সব পাবে সাব্রিনা। কেবল তার জন্যে এত কষ্ট করে বাবা মা এতসব করেছে। সে কি করে ছেড়ে আসে তাদের! রাব্বির তো আরও একটা ভাই আছে। দরকারে মাসে মাসে টাকা দিলেই তো হয়। মাঝে মাঝে দেখে আসবে, না হয় থেকে আসবে দুচারদিন। এদিকে রাব্বি মরতে রাজি কিন্তু শ্বশুরবাড়ি থাকবে না। সাব্রিনাকে ফ্রড, লায়ার, চিটার, প্রেম করার সময় বলিসনি কেন ঘরজামাই রাখবি, আমাকে তুই সম্পত্তি দেখাস, আমি কি ফকিন্নির পুত ইত্যাদি বলে বেরিয়ে এসেছে। মেয়েরা এখন স্বাবলম্বী। কেন মানবে! ফলে হাসতে হাসতেই ডিভোর্স হয়ে গেল। রাব্বি মহা আনন্দে মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছে। আবার বিয়ে করবে। আর এবার একেবারে সবকিছু বলে কয়ে বিয়ে করবে। সাব্রিনার জন্যেও ছেলে দেখছে ওর বাবা মা। তনুজা কিছুদিন ঘোরে ছিল। ভুল হল না তো বরকে ছেড়ে এসে! এখন দিব্যি ভাল আছে। নিজেই বলে, বুঝলে আপু। লাভের লাভ বাচ্চা ত পেলাম একটা।
সাহানাও পরিস্থিতি বিবেচনা করে খসড়া হিসেব করে বুঝে গেছিল তানিমকে ছাড়াও জীবন চালানো যাবে। শুধু শুধু স্ট্রেস নিয়ে কি লাভ! নিজেকে পরীক্ষা করে দেখেছে না শরীর না মন না এই সমাজ সংসার কিছুতেই তানিমকে ওর দরকার হয় না। এক ছাদের ঘরে ওরা আলাদা ঘুমায়। মাঝে মাঝে তানিম এলে উতকট গন্ধে ওর গা গুলায়। স্বাভাবিক যৌনতার সুখ স্পৃহা মূহূর্তে হাওয়া হয়ে যায়। ঘেন্না ঘেন্না করে ছিটকে যায় দুজনেই। তানিম গালি দেয় ফাউল মহিলা। খালি মাকাল শরীর, কোনো ইয়ে নেই, তোর সাথে থাকে কে রে! সাহানাও ভাল করে বোঝে নিজেকে। বয়েস উনচল্লিশ হলে কি হবে সাহানার লিবিডো জিরো লেবেলের। তানিম কেন অন্য কোন পুরুষের প্রতিও ওর ফিজিক্যাল কোন পাগলামো আসে না। তানিমের কাছে টাকা পয়সাও চাইতে হয় না। তানিম নিয়মিত টাকা দেওয়ার লোক যেমন নয় তেমনি টাকা রাখতেও পারে না। মেয়েবাজি, মদ আর বন্ধুতায় চলে যায় সব। সাহানার ভাল বেতন। তাই দিয়েই টেনে নিচ্ছে সংসার। তো কি দরকার অনর্থক মানুষটাকে আটকে রাখার! নিজেকে ভাল করে ঝাড়াই বাছাই করে সে সিদ্ধান্ত নেয় আলাদা হয়ে যাবে।

তাছাড়া এক ছাদের নীচে থেকে যতই কুল কুলিস্ট থাকতে চেষ্টা করুক না কেন টুকটাক স্বার্থ ঠিক এসে দাঁড়ায়। অফিসে আজ একটু কাজ আছে তুমি তিশাকে ইশকুল ছুটির পর নিয়ে এসো প্লিজ! তানিম উ আহ হুম করলেও কিছুতেই সাহানার মন বসত না অফিসে। তানিম যদি ভুলে যায়! বা যদি ঠিক সময়ে ইশকুলে না যেতে পারে! কোন রকমে এক ঘন্টার ছুটি ম্যানেজ করে কোনো দিন এসে দেখত তিশা একা বসে আছে ইশকুলে । আয়ারা ক্ষেপে আগুন। আবার কোন দিন এসে দেখত তানিম নিয়ে গেছে অথবা কোনোদিন এক সাথে তানিম আর সে ইশকুলে পৌঁছাচ্ছে। যেদিন এরকম হত তানিম আয়া দারোয়ান ড্রাইভারদের সামনে যা তা গালাগাল শুরু করত। বলেই দিত, এটা সাহানার বাহানা। তানিমকে পেইন দিয়ে সুখ নিচ্ছে। কখনো আবার বলত বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘোরে বলে মেয়ে আনার সময় পায় না। সে এক মহা বাজে ব্যাপার। শেষে তিশাই বলে দিল, মা দেরি হলেও তুমি যাবা। আমি একা থাকতে পারব। ড্যাডি গেলেও আমি আসবো না। এটা শুনে আরো ক্ষেপে গেল তানিম। এই এই তুই আমার মেয়ে না। তোর মা কোথা থেকে বাঁধিয়ে এনে আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। তিশাও চেঁচাত, হ্যা হ্যা আমি তোমার মেয়ে নই। ইউ গাইজ গেট আউট ফ্রম আওয়ার হাউস। দ্যা ড্রাংক, জিগোলো, বাস্টার্ড।

তানিম যেন এরজন্যেই অপেক্ষা করছিল। সোজা ব্যাগ গুছিয়ে চলে গেল। সাহানা তানিমকে ভাল করেই চেনে। এই যাওয়া মানে যে মুক্তি তা সে বুঝে নেয়। আর খুব স্বাভাবিকভাবেই মা মেয়ে মেনেও নেয়। আশ্চর্য হচ্ছে দুই তরফের আত্মীয় স্বজনরাও স্বচ্ছন্দে মেনে নিয়ে সবাই স্বাভাবিক আসা যাওয়া করছে। আজকাল ডিভোর্সএর ধার কমে গেছে। বাঙালি মধ্যবিত্তরা ডিভোর্স মেনে নিতে শিখে গেছে। যদিও প্রথম প্রথম সাহানার একটু ভয় ছিল।

ইন্টারকমে ফোন বেজে উঠল। তিশা! কি আশ্চর্য তুই হঠাত? তোর না কাল সকালে আসার কথা? উহু পরে বলব। তোমার মোবাইল কোথায় মা? দরকারের সময় পাই না তোমাকে! তাই তো মোবাইল ত বিছানায় রেখে এসেছে। সাহানা বিব্রত হয়ে বলে, তুই উপরে আয় না। কি নীচে থেকে বকে যাচ্ছিস! তিশা তাড়া গলায় বলে, মা শোনো হান্নার ড্যাডি স্ট্রোক করেছে। উপরে উঠব না। স্কয়ারে যাচ্ছি। ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছে আমজাদভাই। ক্র্যাবগুলো বের করে নিও। বাইই-- সাহানার বুক কেঁপে উঠে। হান্নার ড্যাডি তানিমের এক সময়ের বেশ কাছের এবং ভাল বন্ধু ছিল। এক গ্লাসের পার্টনার। দু পরিবারেই যাতায়াত, আড্ডা ঘুরাঘুরি হত। আজকাল কিছুটা দূরত্ব বেড়ে গেছে। তানিম কি জানে!

আমজাদ ব্যাগগুলো রেখে যায়। কান্ড দেখো মেয়ের! ব্যাগের চেন আধা খোলা। শার্টের হাতা ঝুলে আছে। চেন খুলে জামাকাপড়ের সাথে ক্র্যাবের প্যাকেট বের করতে গিয়ে ছোট একটি রঙ্গিন প্যাকেট গড়িয়ে পড়ে ফ্লোরে। হাতে নিয়ে চমকে উঠে। একটা গরম স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে মাথায় উঠে যায়। খোলা ব্যাগের সামনে পাথরের মত বসে থাকে সাহানা। তিশা বড় হয়েছে কিন্তু কখন যে এতবড় হয়ে গেছে মেয়ে সে বুঝতেই পারেনি। একটি পুরানো দৃশ্য ফিরে আসে। সেই পুরানো ধ্বক। তানিমের ভিআইপি স্যুটকেসের কালো কঠিন বুকের ভেতর সুরক্ষা প্যাকেটের গোলাপি হাসি। বুক ভেঙ্গে যায় পরাজয়ের গ্লানিতে। প্রাণের গভির থেকে উঠে আসে দীর্ঘশ্বাস। তার সাথে যেন কিছু পচাগলা শুচিতাও বেরিয়ে যায়।

যেভাবে ছিল সেইভাবে স্যুটকেস রেখে দেয় সাহানা। তিশা ত প্রায়ই বলে শরীর আমার। আমার অধিকার আমি কিভাবে আমার শরীর ইউজ করব। কথাটা তানিমও শতবার উচ্চারণ করেছে। তবু রক্ষে সুরক্ষা পদ্ধতিটা শিখে নিয়ে নিয়েছে। বাপের বুদ্ধির ধার পুরোটাই পেয়েছে তিশা।

কেবল সাহানাই অদ্ভুত। সময়ের কাছে অনুপোযুক্ত, বাতিল। তিশাদের ভাষায় অল্ড ফার্নিচার। বইটা তুলে রাখতে রাখতে মনে হলো ঘরের বিভিন্ন জায়গা থেকে হেসে উঠছে তানিম। চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে, কি রে কি করবি এখন পুরানো ফার্নিচার?

ফেসবুক মন্তব্য