ছিনার গোস্ত

উত্তম বিশ্বাস


--‘ মোচলমান হয়ে গোস খাসনে ও কিন্দারা কতা বু’ ! কেস্তেপোড়া পিঠে কোনোদিন গোস্ত দিয়ে খেইচিস ; খেয়ে দেখিস ঝুলাগুড়ির চেয়েও হেব্বি স্বাদ !’ রুকবানু বসে বসে আমেনার দাওয়ায় গল্প করে । কাস্তেপোড়া পিঠে ! আতপ চালের গোলা কুমোরবাড়ির ছাঁচে ঢাকা দিয়ে ভাজতে হয় , টোপর টোপর হয়ে ফুলে উঠলে ঢাকা সরিয়ে কাস্তের ঠোকা দিয়ে তুলতে হয় ; আর তখন ওর বুক চিরে গরম বাষ্প হুস করে বেরিয়ে যায় ! এটা জানে আমেনা !
ঢেঁকিতে পাড় পড়ে দুমদুম ! এ গ্রামে দু’দুটো হাস্কিং মেশিন , আশুর মিলে চালের আটাও ভাঙানো হয় । সস্তা যন্ত্রপাতির যুগেও খুরশিদ মিঞার বাড়িতে ঢেঁকির শব্দ থামেনা চব্বিশ ঘণ্টার একটা মিনিটও । মিঞারা বলে ,--‘ ঢেঁকিছাটা চালের গুড়ি না হলে আবার ঈদ শবেবরাত হয় নাকি ! সামান্য ছুন্নত দিতেও তো সাত ধামা গুড়ো লাগে !’ মুসলমান রন্ধনসংস্কৃতির সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে এই ঢেঁকিছাটা চালের আটা । হাজারো পদ ; তার মধ্যে অন্যতম গোস্ত-রুটি ! আহা কী স্বাদ ! নরম রুমালের মত রুটি হাতের তালুতে নাও আর একবাটি গরম--------! আমেনা আর রুকবানু গাতাকরে গুড়ো কোটে । একধামা একশ টাকা ---পঞ্চাশ পঞ্চাশ দুজনে ! স্বামী পরিত্যক্তা নিরক্ষরা রমণীর জন্য এ গাঁয়ে আর তেমন কোনও আব্রু রক্ষার সম্মানজনক মজুরি নেই !
তবে ভাদ্দরমাসে ঢেঁকির জ্বর ; পোঁদে লাথি মারতে নেই ! এসময় একমাস বন্ধ ঢেঁকিঘর । আমেনার হাতের ক্ষতটা একটু একটু করে শুকিয়ে আসছে ! সামনে রুজার মাস । আবার পাড়ে যাবে সে , আর রুকবানু গড়ে ! অভাবের সংসারে আনাজের চেয়ে আগুনের আধিক্য বেশি ! উপায় থাক আর না থাক---তাতে কিছু ফোটাতেই হবে , নইলে আখার আগুন লতিয়ে উঠবে সংসারের আতায় বাতায় ! রমণের অসুস্থ্য হবার ঘটনার পর থেকে আমেনার হাঁড়িতে আর এককুচিও গোস ওঠেনি । রাসেলও এখন নিরামিষেই সুস্থ্য থাকে বেশি ! কালেভদ্রে কোনও দাওয়াত বাড়িতে গেলেও গোসের গন্ধে গা গুলোয় ওর ! আমেনা মোটেও চায় না তার খোড়া ছেলেডা সামান্য একটুর জন্যে হাসপাতালের মেঝেয় মারা যাক !
বেকার মানুষের রেডিওর ব্যাটারিও ফুরিয়ে যায় তাড়াতাড়ি ! রাসেল শুয়ে শুয়ে রেডিও শোনে । ওর কান সবসময় বাধান থাকে কাঁটাতারে ! আমেনা ঘরে বসা । রাসেল বকাঝকা করে রস্ত করেছে দুদিন,--‘ ঢেঁকিতে উঠলি আমার মাথা খাবা !’ পাকিস্থান সীমান্ত আবারও ক্ষেপে চুর ! সন্তোষের পেছনে দুটো দাবড় না দিলে কথা ক্লিয়ার আসে না ! সন্ধ্যা ছ’টার খবর শোনে মা ছেলে দুজনেই ! আমেনা দেশ ভুঁই অতশত বোঝে না । রাসেল যখন রেডিও ছাড়ে , পাশে এসে চুপ করে কান খাড়া করে বসে থাকে , আর মনে মনে ভাবে ,--‘ ভীতু ছেলেডা আমার কনে কোন ভাগাড়ে গিয়ে পড়ল কে জানে ! আল্লা তুমি তোমার সুরত দিয়ে ওর শিখ্যে পড়গ্যে লিও !
সহসা আমেনার বুকেও যেন রেডিওর খবরটা কাস্তের মত ঠোকা দিয়ে গেল ! এক নিঃশ্বাসে তার বুক ঠেলে বহুদিনের গরম হাওয়া বেরিয়ে এল ! ঠিক শুনেছে তো সে ! রেডিও ভুল কিছু বলল ? সা----সা---- শব্দে সব ক্লিয়ার হয় না ! মেঘলা হলে ব্যাইরাম চাগায় আরও বেশি ! উঁকি দিয়ে দেখল , কোই মেঘ তো নেই ! আপনজনার আর্তনাদ কালাও শুনতে পায় ! না ঠিকই শুনেছে আমেনা ! তা না হলি রাসেলের মুখখানাই বা ঈশান পানা হবে কেন ! শরীরটা আর ঠ্যাকা দেয় না আমেনার,---‘ তুই বাড়ি যা রুকবানু , আমার কিরাম যেন এট্টা হচ্চে ! গা টা গুলোচ্চে , এট্টু শোব !’
পুড়া বাসনার শরীর ! শীতল কুচির পুকুরে ডুবালিও ডোবে না ! ধুলো হয়ে গেল , ঠ্যাকনা দেওয়া ঘরখান এইবার সত্যি সত্যিই আজ ধুলো হয়ে গেল আমেনার ! জলের নীচে ডুব দিলেও এখন টের পাচ্ছে সেই তাণ্ডব------- হুড়মুড়ে আওয়াজ ! বাতায় বাতায় ব্যাথাটেপা জোনাক ! এত গোনা যায় ! হিসেব মেলে না ; সেদিনও বুঝি এমনই এক ঘুমচোরা রাত ছিল ! লাঠিঠোকা হাতের তালুতে এখনও সে স্পর্শ সুখ লেগে আছে রাসেলের---‘হাত সরা রাসেল ! গরম করিসনে ! ফায়ার হয়ে যাবে কিন্তু !’
---‘ আর একটু ধরে থাক রমণ ! আল্লা কসম , এত আরাম জীবনে কখনো পাইনি ! জড়িয়ে ধর ! ঘুম আসচে না ! মোটেও ঘুম আসচে না !’ ঘুম আসারও কথা নয় ! সাফল্যের চূড়োয় পাশাপাশি শুয়ে আছে দুই উত্তেজিত সৈনিক ! টালির ঘর ; বাংলা চালার ফাঁক দিয়ে বহুদূর আকাশের কিনারে স্থির হয়ে গেঁথে আছে ঘুমহীন দু’জোড়া চোখ ! আকাশ আজ তারায় তারায় নেতুড় ; এ সবই যেন রাসেল আর রমণের বিস্ফারিত বিস্ময় ঠিকরে ফুলঝুরির মত ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র ! আর্মি লাইনে দুজনের চাকরিই পাকা করে ঘরে ফিরেছে ওরা । কিছুদিন আগে রানে পাশ করে মুখিয়ে ছিল ; আর আজ অপ্রত্যাশিত ভাবে মেডিক্যালে দুজনেই একশোয় একশ ! বাসে-ট্রেনে অনেকটা পথ ঠেঙিয়ে এসে গা-ঘোর অন্ধকারে হাঁড়িতে যা রান্না পেয়েছে ---একেবারে বাটি পুছে মেরে দিয়েছে ওরা ! রমণ এখন বাড়ি যাবে না । ওর বাড়ি মোসলমান জোলাপাড়া ছাড়িয়ে খানিকটা দূরে , নদীর ধারে মালোপাড়ায় । এমন একটা খবর তার বাড়ির লোক একসময় না একসময় পাবেই , কিন্তু আমেনা কাকির সাথে দেখা না করতে পারলে তার কিছুতেই স্বস্তি হয় না ; আম্মার আগে বাড়ির কথা ভাবতেই পারে না রমণ ! কাকি ঘরে নেই । পরশু ঈদ , আতপ চালের গুড়ো কুটতে গেছে খুরশিদ মোড়লের ঢেঁকিতে । রাত গভীর হয়ে আসে । মায়ের জন্যে রোমাঞ্চিত প্রতিক্ষা আর বন্ধুত্বের নিবিড় আলিঙ্গনে মুহূর্তের মধ্যে বারুদ হয়ে ওঠে খাট বিছানা বালিশ তোষক----ঘর বাহির সব---সব ! এমন কার্গিল কার্গিল উদ্দিপনায় সত্যিই কি ঘুমনো যায় ; না ঘুম আসে !
---‘ এই হারামির জাত ! তোর ছোখ ছিল না , কি সব্বনাশ করিচিস তুই এ ! খানে খরাপে ! ভিটেয় পৌছুতি পারনি ; তার আগেই উটকে পাটকে খেয়ে মরেচ ! তোর আজ ঝেটিয়ে সোজা করব ! এট্টা হিন্দুর ছেলে কি বলে খাওয়ালি ওসব ! আমি ওপরআলার কাছে কি জবাব দোব তাই বল !’
বিজয়ের উল্লাস এই মুহূর্তে ঢাকনাখোলা কপ্পুর ! রমণ কেন্ন হয়ে গুটিয়ে আছে কাঁথার নীচে ; সে টেরই পায়নি , কখন তার আমেনা আম্মা এসে ঘাড় ধরে টেনে তুলে নিয়ে গেছে রাসেলকে ! একের পর এক প্রশ্নবাণ , দাঁতে চাপা তিরস্কারে একসময় ঘুম ছুটে যায় রমণের । প্রথমে সন্দেহ করেছিল ,--‘ নতুন কাঁথাখানা তারা গায়ে দিয়ে মদ্দানি করেছে বলে বোধহয় কাকিমার রাগ ! কারণ এমন কাঁথায় বাঁদরামোর দাগছোপ লাগলে সব মায়েদেরই গা জ্বলে ওঠে ! বিশেষত মাজাপিঠ কুজো করে সেলাই করা এমন সরু সুতোর নকশি কাঁথা পেতে ডন-কুস্তি মারলে দুদিনও টেকে নাকি , ছিঁড়ে ফদ্দফাড় হয়ে যাবে না ! আবার এও ভাবল,--‘ হাঁড়ি পুছে তাদের এইভাবে খাওয়াটা ঠিক হয়নি বোধয় ! এতরাত অব্দি ঢেঁকি ঠ্যেঙ্গিয়ে এসে অঙ্গে দুটো দিতে পায়নি বলে নিশ্চই মটকা গরম হয়ে গেছে আম্মার ! টানাটানির সংসার ; একফোঁটা কিরাচিনের অভাবেও অনেকসময় মনমেজাজ ইরাক হয়ে ওঠে ! কিন্তু আম্মা তো এত বদরাগী না ! ফেলে তো আর দিই নি ; অত রেগে গেল কেন কি জানি বাপু ! পরিস্থিতি ক্রমেই যেন ঘুমের কুসুম ছিঁড়ে আনে ! শুকনো আমকাঠের চেলা রাসেলের পিঠেই ভাঙল বুঝি !’ রমণ উঠে বসল ! পা টিপে টিপে রান্নার চালাটার পাশে এসে দাঁড়াল । তারপর যা শুনল ! আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না ----দ্রুত কলপাড়ে গিয়ে হড়হড় করে উঠিয়ে দিল সব !
--‘ অ বাপ ! নে , ওঠ ! একগ্লাস দুধ খা !’ হায় আল্লা ! আজ আর আমেনা আম্মার দুধেও রমণ শক্তি পেল না ! কাফেরের মত কাজ করেছে ছেলে ; ধর্মে সয় ! বমি করতে করতে রমণ একসময় নেতিয়ে পড়ল উঠোনে ! বাতাবি নেবুর ডালের ফাঁকে সবে দুএকটা পাখি জেগে উঠেছে ,এমন সময় আমেনার টালির ঘরখানা ঝনাৎ ঝনাৎ শব্দে উঠোনের সাথে মিশে গেল ! মিঞারা রমণকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে ,---এমন খবর ! দাবানলেরও বুঝি ছড়াতে সময় লাগে ; তারও আগে দ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ল মালোপাড়ার অলিতে গলিতে ! রমণের চাকরি পাওয়ার খবরে মালোপাড়ার লোক যত না বেশি উৎসাহী ছিল ---তারচেয়ে অধিক উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে আজ তাদের রমণের অসুস্থ্য হবার ঘটনায় !
ঢেঁকিতে আওয়াজ ওঠে ক্যাঁচক্যাঁচ ; পাড় পড়ে দুমদুম ! আতপচাল ধুলো হয় , খোলাপেতে ভাজা গরম ধান থেঁতো হয়--- আমেনা আড়ার বাঁশে বুক বাধিয়ে তালে তালে পাড় দেয় ! বুকের ভেতর ছিটকে ওঠে হাজার কথা---তারাও গুড়ো হয় , কোনকোনটা থেঁতোও হয় --- হাড়জিরজিরে রমণ ! এই না সেদিনের কথা ! দেখতি দেখতি চোখির পলকে ক্যামন মোটাসোটা সমত্ত পুরুষ হয়ে ওঠলে ! রাসেলের সাথে খেলতে খেলতে মালোপাড়ার পথ ভুলে রমণ প্রথম যেদিন আমেনার উঠোনে এল ; সে দিনই ওর ড্যাবাড্যাবা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়েছিল,-- ‘আহা ! বাছাটা কাদের গা ! কতদিন মনে হয় ভালকরে দুটো খেতে পায় না !’
--‘ আমি বাছুরটা ধরে রাখব কাকি ?’
আমেনা গাই দোয়াতে দোয়াতে রমণের উৎসাহে খানিকটা হাসত ,--‘ না বা’জান ! সর ! আদাড়ে গাই গুঁতিয়ে দেবে! ছেড়ে দে ; বাছুরটাও একটান খাক ---তুই দুধ খাবি এই তো ! যা খ্যাল গিয়ে । ঘোষ যাক , ফুটিয়ে ডাক দেব !’ আজ রমণ রীতিমত জওয়ান ! দেশের জন্যি দু’দুট ছেলে তার লড়াই দিতি যাবে ; এডা কি কম গর্বের কতা ! গোয়ালে একজোড়া এঁড়ে থাকলে গেরস্ত মানষির ঝ্যামন মাটিতে পা পড়ে না ; আমেনাও যেন হাবে ভাবে মেপে নিতে বলে তার দেমাকের বহর ! মালোপাড়ার লোকও বুঝেছে ছেলে শুধু পেটে ধরলি হয় না ---কম্মটাই আসল ! আমেনার অভাবের সংসার হলেও রমণের জন্য হাঁড়ির কানায় একদানা বাধিয়ে রাখতে কোনোদিন ভুল হয়নি তার ! এই অভ্যাস আমেনা তার জীবন থেকে এখনও একবিন্দুও মুছতে পারে নি ! গাই দুইয়েই তাই ওর জন্যে একগ্লাস দুধ তুলে রেখে পা ছড়িয়ে কাঁথা সেলাই করতে বসত উঠোনে । হাতে এখনও কত সুচের খোঁচা ---মায়েদের আকুলিত প্রতিক্ষার কাছে এসব যন্ত্রণা তো তুচ্ছ , কোন ছার ! রমণ হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসত ---‘ কাকি আমি এসে গেছি ! রাসেল কোই ?’ আমেনা ধামার মধ্যে কাঁথা সুতো গুটিয়ে দুধ-গ্লাসটা বাড়িয়ে দিত রমণের দিকে---‘ ভাগ্যিস আমার বাছুরটা একটু ফ্যান-জল খাতি শিখেছে , না হলে আমার সুতোপানা রমণের কি অবিধে হত শুনি !’ আমেনা জানে বেহান রাতে বাছুর বেঁধে ফেলতে না পারলে বাট নিংড়ালিও একফোঁটা পাওয়া যাবে না ! দুয়ে ছেঁচে নিয়ে বাটে যেটুকু থাকে ওটুকুই বাছুরের --- এটাই হল জগৎসংসারের পালিত পোষ্যের জন্য বরাদ্দনীতি ! বাছুর ঘনঘন হাম্বাতে থাকে , আর মা গাভী ছেনোদড়ির ফাঁকে মাঝেমাঝে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফ্যালে আর শিং উচোয় ! দড়ি ছাড়া পেলেই একছুট্টে ক্ষুধার্ত বাছুরটা পৃথিবীর সকল শক্তি দিয়ে গাভীর তলপেটে ঠুলিয়ে ঠূলিয়ে দুধের সন্ধান করতে থাকে ! আমেনার বুকের ভেতরটাতেও আজকাল যেন হঠাত হঠাত কিসের ধাক্কা লাগে ! ক্ষুধার্ত রমণ আজও যেন তার আতায়-বাতায় শিরায় শিরায় কিসব খুঁজে চলেছে !
মালোপাড়ার কৌতূহলী মানুষকে হতাশ করে রমণ একসময় সুস্থ্য হয়ে উঠল ; আর তার কিছুদিনের মধ্যেই রাসেল এবং রমণের একজোড়া জয়েন লেটার এল ! রমণ হরিতলায় বাতাসা ছড়াল । ওর মা শৈল মনসার থানে দুধকলা দিল । আড়াই পোয়া দুধ দিয়ে মনসার থান ধুয়ে হরিতলার পুকুরে তিন ডুব দিলেই সব দোষ খণ্ডন হয় ! রমণও মেনে নেয় শুধু তার মা না ,----মালোপাড়ার সব মানুষই চায় তার ভালো হোক ! তাছাড়া শুভ কাজ্জি , বেজাতের এঁটো মেখে বেরতে আছে নাকি ! ভানুর ঘরে নেমন্তন্য খেয়ে চাকরিতে জয়েন করতে গেল রমণ !
অপর দিকে মুসলমান জোলাপাড়ায় একহাঁটু অন্ধকার ! লেটারখানা বুকের ওপর নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে রাসেল ! উঠে বসার একদম শক্তি নেই , কোমরের হাড়গুলো ভাগে ভাগে ভেঙে আছে তার ! রাসেল নির্বিকার ! আল্লার কাছেও আজ তার কোন নালিশ নেই---অপরাধ করেছে সে ; হিন্দুর দেশে শাস্তিস্বরুপ এটুকু তার কাছে কিছুই নয় ! শুয়ে শুয়ে লাঠিখানা হাতড়ে খুঁজবার চেষ্টা করে সে ! মালোপাড়া অনেকদূর ! একবার সিপাহীসুন্দর রমণের মুখখানা দেখতে ইচ্ছে করে রাসেলের !—‘ পাকসীমান্ত এখন বারুদের পাহাড় , রমণ ভয় পাবে না তো ! ইস একটু ঝদি উঠতি পারতাম !’ শুয়ে শুয়ে একসাথে ফায়ার করতে থাকে দুজনে ; রাসেল আগে , রমণ পেছনে ----‘দেশের মাটি ! জান থাকতি এক চিমটিও উঠোতি দিলি হবে না ! নিরিখ ঝেন মিস হয় না রমণ ! এগো আমি আছি না !’ নীরবে হাবুডুবু খায় দুটো চোখ ! চিঠিটা রোজ ভিজতে থাকে --- ভিজতেই থাকে !---- লড়াইয়ের দলিল , স্বপ্নের বর্ণমালা ছিঁড়েও ছেঁড়ে না !
---‘ কিডা রে ! রমণ না ! ভানুর ঘর থে’ মুখ মুছতি মুছতি বেরুল বুঝি ! হ্যাঁ রমনই তো , দাওয়াত খেয়ে চাকরিতে জয়েন যাচ্ছে ! এট্টু তাকালি নে এই পুড়া কপালীর দিকে ! অ বাপ রমণ এত পাষাণ কি করে হলি !’ ঢেঁকির পাড় থেমে যায় । আমেনা ঢেঁকি থেকে নেমে থপ করে বসে পড়ে মাটিতে ! রুকবানু জানে এ যাবতকাল আমেনা কোনোদিন গড় ক্লিয়ার না হওয়া না পর্যন্ত পিছে থেকে নামে না ! বয়সকালে যখন মাসে মাসে মেন্স হত , তলপ্যাট মোচড় দিয়ে উঠত ; আর থান থান রক্তের হড়পা ধারানীর মত পা বেয়ে গড়িয়ে পড়ত , একমাত্র সেই দিনকটা ছাড়া আমেনাকে ঢেঁকি থেকে নামতে দেখেনি রুকবানু !
---‘ আঃ ! হাতখানা ছেঁচে দিলি রুকবানু !’
--‘ তুমার কি হয়েচে বু’ ! গড়ে বসে অমন আনমুনা হলি হয় ! এট্টু সাবধানে এলে দুবা তো !’ গড়ে বসেও ছন্দে ভুল হচ্ছে আমেনার ! ঢেঁকি পড়েছে হাতে ! হাতের চেটো বেয়ে তলপেট বেয়ে যন্ত্রণা তার লাউডগা সাপের মত লতিয়ে লতিয়ে উঠছে বুকে ! রাক্ষুসি ঢেঁকিতে পাড় পড়ে দুমদুম ! আওয়াজ ওঠে ক্যাঁচক্যাঁচ ----যাতনার গতরটুকুনি এলিয়ে দিলেও ধুলো করে দেবে নিমেষে !----‘ শুকনো বাবলা কাঠের শরীল , তায় পারে না ! আর কত ধকল সয় বল ! ওঠ অ বু’ !---- বুকি এট্টু পান’দে !’
মালোপাড়ায় কারও ঘরে আজ হাঁড়ি চড়েনি ! সবাই তাকিয়ে আছে বড়রাস্তার দিকে ! ভাঙা বেড়ার ফাঁক দিয়ে মালোপাড়া দ্যাখা যায় না ! মাটির রাস্তাটাও আজ যেন কেমন নীরব , ধুলোর মাঝে নেতিয়ে পড়েছে ! রাসেল এক আছাড়ে রেডিওটা গুড়ো করে , চিৎকার করে একদম সোজা উঠে দাঁড়াবার মরিয়া চেষ্টায় মাটিতে সগর্বে লাথি মারতে মারতে বলে উঠল,---‘ একাই আস্ত আটটা জঙ্গি খতম করে শহীদ হয়েছিস তুই ! শাবাস দোস্ত ! খানকির ব্যাটাদের এভাবেই নিকেশ করতে হবে ! মা---! ও মা----! আমি যেডা পারিনি তোমার রমণ সেডা করে দেখিয়েছে !------------- আজ এট্টু গোস্ত খাওয়াতি পারবা ! খুব খাতি ইচ্ছা করছে------একদম গরম গরম !’ রমণকে আর একটিবার সেদিনের মত জড়িয়ে ধরতে খুব ইচ্ছে করছে রাসেলের !
এমন যাত্রায় হরিধ্বনি দেওয়াই হিন্দুদের রীতি ! কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে গ্রামের পাকপক্ষির মুখেও যেন রা নেই ! থমথমে গ্রামখানির বুক ফুঁড়ে মিলিটারিদের বুটের শব্দ যেন ঢেঁকির পাড়ের মত ঢুপঢুপ করে উঠছে আর মিলিয়ে যাচ্ছে ! কাঠঘুটের আখা । আমেনা গোস্ত চাপিয়েছে উঠোনে । শরীল মোটে সায় দেয় না ! রাসেল খাবে ! ছেলে তার ধনুক ফেলেছে এতোদিনে ! উঠোন ছুঁয়ে আধমরা এক শুকনো নদী শ্মশান পেরিয়ে চলে গেছে বহুদূর ! আজ হঠাত ওতে এত জোয়ার কোত্থেকে এল কে জানে ! নদীটার পাড় ভাঙছে ভীষণ ! দুড়ুম দুড়ুম শব্দে আছড়ে পড়ছে তট ! গ্রামের সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে মালোদের ঘর ভাঙার দৃশ্য ! মালোরা এসব দেখে বিচলিত হয় না মোটেও ! শুধু এক ঘাটের পাড় ভাঙলে অন্য ঘাটে তাদের নৌকোর ছড় বাঁধে ! বেউলোর ভাসান,--- ওদের জীবন-মরনের নিত্য মহাকাব্য ! ঘোলাজলে আমেনার স্বল্পবুদ্ধি সব এলোমেলো হয়ে ঘুরপাক খেয়ে ওঠে ! হায় আল্লা ! উঠোনে গোস্ত’র হাঁড়ি পুড়ে খাক হয়ে গেল কি করে ! তবে কি রান্নায় মন নেই আমেনার ! আখার আগুন যেন ঝাঁপিয়ে উঠতেছে গায় ! বুকের ভেতর এত ফোসকাপড়া যন্ত্রণা কন’থে এল ! হুঁশ নেই আমেনার ! চারপাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী অলক্ষ্যে বেষ্টন করে ফেলেছে তাকে ! ব্লাউজের বোতামগুলো সে ফটাফট সব ছিঁড়ে ফেলল ! খাঁচার মদ্দি এত জ্বালাপুড়া কেন ! তার ছিনাতেও কি আগুন ধরে গেল নাকিন, তা না হলি গোস্তর হাঁড়ি ঠেলে চিতার গন্ধ’ই বা উঠে আসবে কেন !

ফেসবুক মন্তব্য