ভূতজ্যোৎস্নায়

মৃন্ময় চক্রবর্তী


সুরেন হাঁটতে হাঁটতে গ্রামের বাইরে চাঁদ পুকুরের পাড়ে এলো। বিরাট ফনিমনসা গাছটার নীচে এসে দাঁড়াল খানিকক্ষণ। তারপর সন্ধ্যা নেমে গেল ঝুপ করে। চাঁদ পুকুরের উঁচু পাড় ঘন জঙ্গলে ঢাকা। হিজল, তেঁতুল ছাড়াও অনেক বিচিত্র বুনো গাছ এখানে আছে। কাঁটাঝোপ আর উলুঘাসের ঘন আড়ালে রঙবেরঙের জাতকুলহীন অজস্র ফুল ফুটে থাকতেও দেখেছে সে এখানে। এখন চারদিকে গাঢ় আলকাতরার প্রলেপ। গ্রামের লোক এখানে নিত্য কাজ সারতে আসে, ভোরে-সন্ধ্যায়। আজ বিশেষ তিথি তাই কাউকে সে দেখতে পেল না। দূরে গ্রামের ভেতরে জ্বলে ওঠা আলোর দিকে তাকিয়ে রইল সে। এতক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য শরীরে কেমন একটা অস্বস্তি হতে শুরু হল তার।

আজই সে গ্রামে ফিরেছে। প্রতিবছর সে এসময়ই বাড়িতে আসে। কালীপূজায় গ্রামে ধূমধাম হয়। দূর্গাপুজায় অতটা নেই। তাই সে এইসময়েই ছুটি নেয়। হাওড়ায় একটা মিস্টির দোকানে কাজ করে সুরেন। সামান্য জমি আর মা এই নিয়ে তার সংসার। তার একটা ভাবুক মন আছে। সে পদ্য লেখে, গান গায়। যদিও তার অবকাশ নেই, তবু সে সুযোগ পেলেই সাধুসঙ্গ করে। তার অনন্ত জিজ্ঞাসা। সে অন্ধকারের ভেতর তন্ময় হয়ে যায়। তার মনে হয় এই অন্ধকার বিরাট এক জিজ্ঞাসা, আর গ্রহ তারা নক্ষত্র সেই মহাজিজ্ঞাসার উত্তরের সামান্য প্রচেষ্টা মাত্র।

পিছনে সাইকেলের বেলের শব্দ শুনে চমকে ওঠে সুরেন। জোর হাসির শব্দে বুঝে ফেলে আর কেউ নয় সে যার অপেক্ষায় ছিল সেই।

--ভাইপো তুমি সাইকেল চালাবে তো?

সুরেন ঘাড় নেড়ে সাইকেল হাতে নেয়, চড়ে বসে, প্যাডেলে চাপ দেয়। দুজনকে কাঁধে নিয়ে সাইকেল বর্ষায় ভেঙেচুড়ে এবড়োখেবড়ো হয়ে যাওয়া রাস্তা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলে।

--তুমি অনেকক্ষণ ডাঁরিয়ে ছিলে নাকি? আসলে তিনসন্ধেবেলা তো ঘরে একটু বাতি দিয়ে এলাম। তোমার কাকী গেছে বাপের ঘর।

আজ অনেকে আসবে বুইলে। হরেন বাউলের বুকের দোষ হয়েছিল, একন ভাল আচে, আসবে। নিতাই মাস্টার আসবে। শ্মশান আজ জমজমাট!

সাইকেল চালাতে চালাতে সুরেন দেখছিল অন্ধকার আর কুয়াশা মাখামাখি হয়ে ঝুলে আছে দিকচিহ্নহীন ধানখেতের ওপর। পৃথিবীর এখন কোনো রঙ নেই। কে যেন সমস্ত শুষে নিয়ে শুধু ছাইটুকু রেখে গেছে।


ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক কানের পর্দা ফুঁড়ে মাথার ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল। সে স্তব্ধতা ভেঙে জিজ্ঞাসা করল, এবার পুজো কেমন গেল ষষ্টিকা?

--খুব খারাপ ভাইপো, কাজ পাইনি তেমন, লোকের হাতে পয়সা নেই,কেউ খচ্চা কচ্চে নাকো। মোটে দুটো কাজ পেয়েছিলাম, তাতেই কোনোমতে কাটালুম। তুমি গাঁয়ের লোকেদের দেখে বুঝতে পাচ্চ তো!

একমাত্র অই চৌধুরীরা ভাল আচে। জমির পর জমি বাড়চে। অভাবি বন্ধকে গোটা মনিতলা গাঁ ওদের ধুতির খোঁটে বাঁধা!

মা দেখচে সব দেখে রাকচে! মা মাগো পাপীর যেন শাস্তি হয়!

সুরেন কিছু না বলে প্যাডেল করতে করতে নতুন লেখা একখানা গান ধরে---


আমার জনম গেল বৃথাই রে মা

গোলায় ফসল উঠল না

সকল দিলি তাদের হাতেই

যেজন তোকে পূজল না!

---আহা কি লিকেচিস ভাইপো আমার, আহারে!

অচেনা গানে গলা মেলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে ষষ্ঠী।

ওরা মই নদীর পুলের উপর উঠে আসে। এখানে নদীর ধারেই পাহাড়তলা শ্মশান। একটু দূরে পাহাড়তলা গ্রাম। আলো দেখা যায়। পুল পেরিয়ে বীজের দোকানের সামনে সাইকেল দাঁড় করাতে বলে ষষ্ঠী। বীজের দোকানটি আসলে একটি শুঁড়িখানাও বটে। সে ওখানথেকে একটা চূল্লুর পাঁইট নেয়। আলুবীজের দরদাম করে। তারপর বাইরে চলে আসে। সুরেন বাইরে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। ষষ্ঠী ইশারায় ওকে ডেকে নিয়ে যায় শ্মশানে।

শ্মশানে খুব মৃদু হয়ে এসেছে প্রদীপের আলো। কেউ শ্মশানকালীকে দেখিয়ে গিয়েছিল সন্ধ্যায়। তা এখন নিভন্ত। একটু দূরে পঞ্চমুন্ডির আসন। বহুকাল আগে কোনো সাধক এখানে শবসাধনা করত হয়ত। তার নাম কেউ জানে না। সুরেন তেঁতুল গাছের তলায় বাঁধানো বেদির উপরে এসে বসে।

সে এখানে প্রতিবছর আসে ষষ্ঠীসাধুর সঙ্গে। ওরা গাঁজা মদ খায় আর আলোচনা করে ধর্ম নিয়ে, আলোচনা করে চাষের বিষয়ে, সেচের বিষয়ে, গ্রাম্য রাজনীতির বিষয়ে। সুরেন এখানে এলেই আকাশ দেখে নীরব শ্রোতার মত। আকাশের নক্ষত্রমণ্ডল তাকে কত কিছু বলে যায়, সে শোনে, লিখে রাখে মনে, তারপর সেই লিখন থেকে বাঁধে গান।

আজকেও মাস্টার এসেছে, এসেছে শ্মশানের ডোম চয়ন, বাউল পদ মন্ডল। পদ গত বছর আসতে পারেনি ব্যামোর যন্ত্রণায়।

ওরা চুক চুক করে দিশি খায় নুন দিয়ে। তারপর গাঁজা সাজে, হাতে হাতে ফেরে। সুরেন কিছুই খায় না, তার নেশা নেই। সে পদ মন্ডলকে বলে, খুড়ো, যমের হাত থেকে তো ফিরে এসেছ, আবার গাঁজা ক্যানে? পদ লজ্জায় মাথা চুলকে বলে, না গো ভাইপো এই একবার নিলুম।

সবাই গল্প শেষে সুরেনকে চেপে ধরে গান গাইবার জন্য। সুরেনের গানে নিস্তব্ধ শ্মশান জেগে ওঠে।

---কী অপূর্ব গলা আহা, কী লিখেছ ভাইপো, মাস্টার উচ্ছসিত হয়।

গান থামিয়ে সুরেন বলে, ষষ্টেকা, এবারে চলো রাত হচ্ছে যে।

ষষ্ঠী অমনি নড়ে ওঠে, হ্যাঁ হ্যাঁ ভাইপো চলো চলো। চলিগো সকল, রাত হলে এই পথটা বড্ড খারাপ হয়ে যায়। যা শিয়ালের উপদ্রব বেড়েছে! বাছুরের মত বড় বড় শেয়াল। ধরলে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। সঙ্গে আবার ভাইপো আছে।

সেবার বাউড়িদের একটা ছেলেকে তো ছিঁড়েই খেয়ে ফেললে। একা পেলে আর রক্ষে নেই। দলবেঁধে আসে সব। রক্তখোরের জাত কিনা!

ওরা রাস্তায় উঠে আসে। বীজের দোকানের মাটির দেওয়ালের গায়ে হেলান দেওয়া সাইকেল তুলে আনে সুরেন। লক খুলেই সাইকেলে উঠে পড়ে। প্যাডেলে চাপ দেয়।

----ও ভাইপো ডাঁরাও গো। আমি যে নেশা করে আছি চলতি গাড়িতে কি উঠতে পারি, ষষ্ঠির কথায় দাঁড়িয়ে পড়ে সুরেন। ও ওঠার পর আবার প্যাডেল শুরু করে!

ষষ্ঠী গান ধরে রামপ্রসাদী। নেশাগ্রস্ত গলায় সুর তাল থাকে না। সুরেন আকাশের দিকে তাকায়, মাথার উপর ভূতচতুর্দশীর আকাশে কোটি প্রেতের চোখ জ্বলছে। একটু ভয় লাগে তার। কেমন একটা ভয়, ঠিক বোঝানো যায় না। দিকচিহ্নহীন অন্ধকারে পথ বলে আলাদা কিছুই যেন নেই। শুধু অনুমানে চলে সাইকেল, সে চালায় গল্প করাতে করতে।

--ষষ্টিকা, থালে আলুতে লাভ আছে বলো!

---লাভ? লাভ কিছুতেই আর নেই ভাইপো। তুমি শহরে চাকরি করো, ওটেই ভাল। কম পাও যা পাও সেই ভাল। চাষা বীজ ছড়িয়ে, ক্ষেত পাহারা দিয়ে ফলন ভালই করে, কিন্তু ফসল উঠলে তার আর দাম নেইকো! তার গলায় দড়ি। রামপদ মরল শোনোনি?

---তুমি যে নিলে?

---হা হা আমি তো বুনব না গো, চাষীকে বেচব। পাঁচ টাকায় কিনে সাড়ে পাঁচে ছেড়ে দেব। আমার জমি কোথায়। আমি তো শ্মশানবাসী!

---হ্যাঁ গো কা, চাষ বাস যদি বন্ধ হয়ে যায় মানুষ খাবে কি? সব যে বাড়বে দামে! দেশের চাষি ফলায় বলেই না এট্টু সস্তায় মেলে সব!

----তা যা বলেছ ভাইপো!

সাইকেল ঝড়ের মত চলে। নদী পেরিয়ে গড়ান, কষ্ট কম হয় সুরেনের। হেমন্তের হিমেল হাওয়া গায়ে এসে লাগে।

---খুড়ো তোমার প্রেতসাধনা কেমন হচ্ছে!

----হা হা হা হা খুব মনে রেকেচ দেখছি ভাইপো। ভালই চলছে। অনেকগুলোই এখন আমার বশ। গত বছর একটা সুলক্ষণা দেহ পেয়েছিলাম মই নদীর ধারে বুইলে। খুব সুন্দর এক নারীর দেহ। সুইসাইট কেস বুইলে না!

চোরকাঁটার ঝোপে পড়ে ছিল। লুকিয়ে রেখেছিলাম। গাঁয়ের লোককে জানতে দিইনি সেই রাতে।

--সেকি?

---হ্যাঁ, সাধনা করে আমি প্রেতসিদ্ধ হবার পর, পরেরদিন যেখানকার লাশ সেখানে রেখে এসেছি। আমার শরীরে এখন সেই প্রেত খেলা করছে ভাইপো, হা হা হা হা হা....

একটা প্রবল অট্টহাসি মাঠের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। আপাদমস্তক চমকে ওঠে সুরেন। তার সমস্ত রোমকূপ ফুঁড়ে যেন ঢুকে পড়ে মাঘের হাওয়া। সে স্তব্ধ হয়ে দেখে চারপাশ কৃষ্ণপক্ষের প্রবল জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে। ফনিমনসার পাতাগুলো সহস্র প্রেতের মুখ হয়ে ঝুলে আছে ওর দিকে। কোথাও সাইকেল নেই, ষষ্ঠীসাধু নেই!

সে গ্রামে এসেই তো শুনেছিল তিনমাস আগে ষষ্ঠী মারা গেছে। সে তাহলে এখানে এলো কেন? কে তাকে ডাকল? এতক্ষণ সে কোথায় ছিল তবে? এসব ভাবতে ভাবতে জ্ঞান হারাল সুরেন। শিশিরে ভেজা ঘাসের উপর পড়ে রইল ওর দেহ। আর প্রেতের মত ওর মাথার উপর নেমে এলো ভুতুড়ে চাঁদ!

ফেসবুক মন্তব্য