মহাপ্রস্থানের পথ

যুগান্তর মিত্র


অবিনাশ আমার প্রাণের বন্ধু। সেই ছোটোবেলা থেকে। দত্ত জ্যেঠুদের বাড়িতে ওরা যখন থেকে ভাড়ায় এলো, তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। দুজনেই ক্লাশ থ্রি-তে পড়ি একই স্কুলে। তাই বন্ধুত্বটা জমে গেল আরও। আর অবিনাশের বাবা সত্যকাকু হয়ে গেলেন আমার প্রিয় কাকু, এবং ওর মা হয়ে গেলেন আমার কাকিমা, যার কাছে নানা আবদার করা যায়।

বছর ছয়েক পরে অবিনাশরা চলে যায় পূর্বপাড়ায়। সেখানে জমি কিনে বাড়ি করেছে ওরা। আমাদের দু-বাড়ির দূরত্ব বেড়েছে শুধু, বন্ধুত্ব কমেনি এতটুকু। অনেক অনেক রাত আমরা একসঙ্গে গল্প করে কাটিয়েছি, কখনো আমাদের বাড়ি, কখনো ওদের বাড়ি। একসঙ্গেই মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিএসসি পাশ করা। প্রায় কাছাকাছি সময়ে দুজনের চাকরি পাওয়াও। এক মাস আগে-পরে আমাদের দুজনের বিয়ে। এমনকি হানিমুনে গেলাম পেলিং, তাও একসাথেই দুই ফ্যামিলি।

বেশ মজাতেই কাটছিল দিনগুলি। আমাদের বিয়ের বছর খানেক পরে আমার বাবা-মা আর অবিনাশের বাবা-মা একটা গাড়ি ভাড়া করে পুরি বেড়াতে গেলেন। অবিনাশেরই প্ল্যান ছিল সেটা। আর ঐ দিনগুলিতে আমাদের বাড়িতেই আমি আর অবিনাশ সস্ত্রীক তুমুল হইহই করে কাটাচ্ছিলাম। একদিন হঠাৎই দুপুরে টেলিফোন বেজে ওঠে ঝনঝন করে, হিন্দিভাষী কোনো এক অচেনা কণ্ঠস্বরে ভেসে আসে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টের খবর। ফেরার পথে টাটা সুমো আর ম্যাটাডোরের মুখোমুখি সংঘর্ষে সব যাত্রীই মারা গেছেন।

ভিনরাজ্যে তড়িঘড়ি মৃতদেহ শনাক্ত করা, পোস্টমর্টেম, শবদেহ নিয়ে ফিরে আসা, দাহকার্য সম্পন্ন করা, পরবর্তী ক্রিয়াকর্ম সবই ঘটল নিয়মমতোই। আর এই ঘটনাটাই আমাদের দুই বন্ধুর মধ্যে একটা বিষণ্ণতার পাঁচিল তুলে দিল যেন। বাবা-মায়ের বেড়ানোর প্রস্তাবটা ছিল অবিনাশের, আমি তাতে সম্মতি জানিয়েছি। অবিনাশ মনে মনে গিলটি ফিল করত সেই কারণে। আর আমি ভাবতাম, অবিনাশের কী দোষ! আমিও তো রাজি হয়েছিলাম। তাছাড়া দুর্ঘটনায় তো কারও হাত ছিল না আমাদের! এসব অবিনাশ বুঝতে চাইত না। নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করে গুটিয়ে যাচ্ছিল ক্রমশ। আমিও কি গুটিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের ভেতর? না-হলে যার সঙ্গে প্রতিদিনই দেখা না-হলে মন আনচান করত, তার সঙ্গে এখন দেখা হওয়ার টান অনুভব করি না কেন? আমাদের দেখাসাক্ষাৎ কমে যেতে থাকল। প্রথম প্রথম সপ্তাহে একদিন, পরে মাসে এক-দুদিন, এর পরে কালেভদ্রে দেখা হয়। আমাদের দু-বাড়িতেই ল্যান্ড আর মোবাইল ফোন থাকলেও ফোনালাপ হয় এখন খুবই কম। এবং তা নিতান্ত প্রয়োজন না-হলে হয়ই না বলতে গেলে। তাও যেটুকু হয়, অমৃতা আর আমার স্ত্রী চৈতালীর সঙ্গে।

ইতিমধ্যে আমার একটা কন্যাসন্তান জন্মেছে। তিন বছর বয়স। নাম দিয়া। অবিনাশের কোনো সন্তান হয়নি এখনো। মাঝে একবার কনসিভ করেছিল অমৃতা, অবিনাশের বউ। কিন্তু সেটা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এ প্রসঙ্গ আর ওঠে না আমাদের মধ্যে। এ বিষয়ে কেমন যেন আড়ষ্ট ভাব ছিল অবিনাশ-অমৃতার।

সেই অবিনাশ এসেছে আমার ঘরে। অনেক অনেক দিন পরে। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। নাকি খানিকটা উদাসীন বুঝতে পারছি না। এসেই বলল, একটা কথা বলতে এলাম। খুব দরকারি আর সত্যি কথা। আমি জানতে চাইলাম, কী কথা?

~ পরে বলছি। একটা সত্যি কথা বলব, যা তোরা কেউ জানিস না।

আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে।

~ মদ আছে? অবিনাশ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়।

~ না নেই, আমি তো ঘরে এনে রাখি না। ইচ্ছে করলে এনে নিই।

~ ভালোই হল। সত্যি কথা বলতে মদ লাগবে কেন?

কেমন যেন হেঁয়ালির মতো শুনতে লাগছে ওর কথা। কিন্তু সম্পর্কের সুরটা কেটে গেছে বলেই বোধহয় খুব বেশি আগ্রহ দেখালাম না ওর প্রতি। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা বাড়িয়ে দিলাম। ও নিল। কিন্তু টেবিলে রেখে দিল।

~ খাব না। সত্যি কথা বলতে কোনো নেশার আশ্রয় করতে হবে কেন? বলছি...

আমি সিগারেট ধরাই। রিং তৈরি করার চেষ্টা করি। হয় না। তাকিয়ে দেখি অবিনাশের মাথা ঘাড়ের নীচে ঝুলছে। চোখ বুজে কী যেন ভাবছে।

~ কী ভাবছিস? জানতে চাইলাম আমি। অপেক্ষা করে করে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই জিজ্ঞাসা না-করে পারলাম না।

~ প্রস্তুতি নিচ্ছি।

~ সত্যি কথার প্রস্তুতি? রসিকতা করে নিজে নিজেই হাসি। আবার এর মধ্যে সামান্য খোঁচাও আছে বুঝতে পারি আমি।

~ হ্যাঁ রে, কখনো-কখনো সত্যি কথারও প্রস্তুতি নিতে হয়। কিন্তু দেখ, মিথ্যের জন্য কোনো প্রস্তুতি নিতে হয় না।

বিস্ময় নিয়ে অবিনাশের দিকে তাকিয়ে থাকি আমি। আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল আমার জন্য। একে একে প্যান্ট, জামা, গেঞ্জি খুলে ফেলল ও। পরে আন্ডারওয়্যারও।

~ কী করছিস এসব?

~ সত্যের প্রস্তুতি। পোশাকই তো মিথ্যে। অপ্রাকৃতিক।

আমার মাথা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। এই অবিনাশকে আমি চিনতে পারছি না। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। তারপর আচমকা নীচু কণ্ঠে বলল, আমার বাচ্চাটাকে আমিই মেরেছি।

~ কী বলছিস এসব? তবে যে শুনেছিলাম...

~ না, মিথ্যে বলেছিলাম। প্রথমে বাথরুমে সাবান জল ঢেলে রেখেছিলাম, কোনোক্রমে সামলেছে অমৃতা। তারপর সিঁড়ি থেকে ধাক্কা মেরে...

~ অমৃতা জানে?

~ আগে জানত না, এখন সব জানে।

~ কিছু বলেনি?

~ না, ওকে বুঝিয়েছি। ও সব বুঝতে পেরেছে। আবার নীরবতা। তারপর ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল, চারিদিকে হিংসা, মারামারি, অবিশ্বাস, দাঙ্গা … এ কোন্‌ পৃথিবী? কোথায় আনব আমাদের বাচ্চা?

বহু দূর থেকে যেন অবিনাশ কথা বলে উঠল। আমার মাথায় ঠিক তখনই একটা বুদ্ধি খেলে গেল। বললাম, দাঁড়া, চা করে আনি। চৈতালী বাড়িতে নেই। মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি গেছে। রান্নাঘরে কোথায় কী রাখে জানি না, তবু চেষ্টা করে দেখি।

আসলে অবিনাশের কথাবার্তা আমার কেমন যেন অসংলগ্ন লাগছিল। তাই অমৃতাকে ফোন করার সুযোগ খুঁজছিলাম। রান্নাঘরে গিয়ে মোবাইলে অমৃতাকে ধরলাম।

~ বন্ধুকে চাইছেন?

~ ও বাড়ি নেই তো? বিজ্ঞের মতো আমি বলার চেষ্টা করি।

~ আছে, এখন ঘুমাচ্ছে।

~ ঘুমাচ্ছে? ইয়ারকি মারছ? ও এখন আমাদের বাড়িতে পাশের ঘরে সম্পূর্ণ উদোম হয়ে... হাসতে হাসতে আমি বলি।

~ ও, বুঝেছি। ওটা ওর ভেতরের অবিনাশ। বাইরেরটা এখানে, বেডরুমে ঘুমাচ্ছে অনেকক্ষণ হল।
ওরা দুজনই কি পাগল হয়ে গেল? বাচ্চাকাচ্চা হচ্ছে না বলে কি মানসিক চাপ নিতে পারছে না ওরা? আমি নিজের মনেই বিশ্লেষণ করি।

~ তুমি ভালো করে দেখো, আমি সত্যি বলছি অবিনাশ আমাদের বাড়িতে...

~ বললাম তো, ওটা ভেতরের অবিনাশ।

~ ওকে একটু দাও তো।

~ না থাক, ঘুমাচ্ছে যখন। কী দরকার আমাকে বলতে পারেন।

~ তুমি কি পাগল হয়ে গেছ অমৃতা?

~ না, আমি ঠিকই আছি। কবিতা লেখেন, আর জানেন না বাইরের আমি ভেতরের আমি কী?
আমি থমকে যাই। খড়কুটোর মতো ভেসে যেতে থাকি। ও বলছিল, মানে কথাটা সত্যি কিনা ...

~ হ্যাঁ, সত্যি, আমি সব জানি। ও ঠিকই বলেছে।

~ বাচ্চাটাকে... তোমাকে ধাক্কা দিয়ে...

~ বললাম তো, সব জানি। কবে, কীভাবে, কেন ...

“রাখছি” বলেই লাইন কেটে দিই। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে আমার। চোখেমুখে জল দিয়ে ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করি। এঘরে এসে দেখি অবিনাশ একইরকম বসে আছে। চা না-করে আনার অজুহাত দেওয়ার আগেই অবিনাশ কথা বলে ওঠে মাথা নীচে রেখেই।

~ কথা হল অমৃতার সঙ্গে?

অবিনাশ কী করে জানল ভেবে আমি একটুও চমকাই না, আজ সবই কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আজকের জন্য যেন এটাই স্বাভাবিক।

~ আমি এবার আসি রে। অবিনাশ কথাটা বলেই দরজা খুলতে যায়। আমি বাধা দিই।

~ আর একটু বস। কিছু কথা বলি।

~ না, চলি।

~ তাহলে জামাকাপড় পরে নে। এইভাবে বাড়ি ফিরবি কী করে?

~ বাড়ি তো যাব না! আমি এখন খুঁজতে যাব।

~ কী?

~ একটা অন্যরকম সমাজ। একদম নতুন। যদি পাই, দেখি... কথা বলতে বলতে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় অবিনাশ। আমি জানি আজ সবই আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তাই বাধা দিতে পারি না। খানিক বাদেই ল্যান্ডফোন বেজে ওঠে।

~ হ্যালো।

~ অবিনাশ চলে গেছে? অমৃতার গলা।

~ হ্যাঁ, এইমাত্র।

~ যাক গেছে তাহলে!

~ ও বলছিল বাড়ি ফিরবে না।

~ না ফেরারই কথা। ভেতরেরটা যাক। বাইরেরটা আমার কাছে থাকবে। জানেন, আমার ভেতরেরটাকেও এইমাত্র খুন করলাম। সত্যি বলছি, আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। বলতে বলতেই ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।

~ অমৃতা, অমৃতা!

~ এখন আমরা মিলিত হব। বাইরের অবিনাশের সঙ্গে বাইরের আমার। ফোনটা চালু থাকুক। শুনতে চাইলে আপনি শব্দ শুনতেই পারেন।

এসব কী হচ্ছে? আমি কি স্বপ্ন দেখছি, নাকি সব সত্যি? কৌতূহলে ফোনে কান পেতে রাখলাম। কিছুক্ষণ দুজনের কথা ভেসে আসছিল মৃদু। তারপর শীৎকারের শব্দ। আমার সামনে সমস্ত পৃথিবীটা দুলতে থাকল অবিরাম। ফোনের রিসিভার নামিয়ে রাখলাম পাশে। ঘরের আলো বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলাম। অন্ধকার চিরে আমার নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে যেতে থাকল এদিক-ওদিক।

মোবাইল ফোন বেজে উঠল হঠাৎ। তাকিয়ে দেখি কোনো নম্বর নেই, কিন্তু ইনকামিং কল দেখা যাচ্ছে। “হ্যালো” বলতেই ওপার থেকে অবিনাশের গলা ভেসে এলো। “তুই আমাকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করিস না। আমি ভালো আছি।”

অবিনাশের কথা শুনতে শুনতেই আমি ল্যান্ডফোনের দিকে এগিয়ে গেলাম। ডান কানে অবিনাশের ফোন-কলটা রেখে বাঁ কানে ল্যান্ডফোন ঠেকাতেই শুনতে পেলাম শীৎকারধ্বনি।

~ অবিনাশ, তুই এখন কোথায়? তোর নম্বর শো করছে না কেন?

~ আমি এখন অনেক দূরে আছি রে, এখানকার কোনো নম্বর নেই, থাকতেও নেই নম্বর।

ল্যান্ডফোনের অবিনাশ আচমকা কথা বলে উঠল, শুনলি তো আমাদের মিলনসংগীত? বাইরের আমি আর বাইরের অমৃতার? বলেই হা-হা করে হেসে ফোন কেটে দিল। মোবাইলের অবিনাশ বলল আমি এখন মহাপ্রস্থানের পথে। এরপর হা-হা হেসেই ফোন কেটে দিল।

ঘরের নিকষ অন্ধকার আমার শরীরের উপর ভারি হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কোনোক্রমে দরজা খুলে বাইরে ছুটে বেরিয়ে এলাম। তারপর থেকে ছুটেই চলেছি, মহাপ্রস্থানটা কোন্‌ দিকে আমাকে খুঁজে নিতেই হবে...

ফেসবুক মন্তব্য