বম্বেDuck আত্মপ্রকাশ সংখ্যা

অর্ঘ্য দত্ত

বাঙালিদের লইট্যা মাছকে ইংরাজিতে বলে বম্বেডাক। মারাঠীরা যাকে বলে বম্বিল বা বম্ভিল। এখন কথা হল একটা সাহিত্য পত্রিকার নাম হঠাৎ বম্বেডাক কেন ? পত্রিকাটা বম্বে থেকে প্রকাশিত হবে, আর এই মাছের নামে 'বম্বে' শব্দটা আছে, কারণ কি শুধু এই তুচ্ছ মিলটুকুই? পছন্দের একটা কারণ তা হলেও, সেটাই সব বলে আমার মনে হয় না। সত্যি বলতে মাছটিকে একটু ভাল করে খেয়াল করলে কতগুলো বৈশিষ্ট চোখে পড়ে, এই নাম নির্বাচনের সময় নির্ঘাৎ সে সবও গোপনে কলকাঠি নেড়েছে। প্রথম বৈশিষ্টই হল এর মুখশ্রী। হাসবেন না প্লিজ, মুখশ্রীই। নজর করলেই দেখবেন মুখ জুড়ে তার এক আগ্রাসী হাঁ থাকলেও নাসিকাটি অতি বিনীত। মুম্বাইয়ের অন্য জনপ্রিয় মৎস, সুরমাই, পমফ্রেট, রাওয়াসের মতো এ উন্নাসিক নয় এতটুকু। দ্বিতীয় বৈশিষ্টটি হল এর ফ্লেক্সিবিলিটি, নমনীয়তা। তৃতীয় হল মরে ভূত হয়ে যাওয়ার পরেও এর সংরক্ষণযোগ্যতা, যা কমে না, বরং বাড়েই। এবং চতুর্থ ও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্টটি হল এর স্বাদুতা। গায়ে আভিজাত্যের কোনো কৃত্রিম ট্যাগ ছাড়াই দরিদ্র থেকে ধনী সমস্ত ভোজনরসিকেরই রসনাকে অবলীলায় আর্দ্র করে তুলতে পারে বম্বেডাক। একটা সাহিত্য পত্রিকার জন্যও এই বৈশিষ্টগুলোইতো ইংরাজিতে যাকে বলে বিফিটিং, মানে এক্কেবারে খাপেখাপ, তাই না?

কিন্তু নাম ঠিক হয়ে যাওয়ার পরেও, প্রথম প্রথম আমার যেন দ্বন্দ্ব আর যেতেই চায় না। যাবে কি করে! একদিন যদি চোখে পড়ে যায় এক বন্ধুর ফেসবুকে পোস্ট করা বুদ্ধদেব বসুর উদ্ধৃতি, ঠিক আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৬৬ তে উনি যে কথা লিখেছিলেন, "এই মুমূর্ষ মহাদেশে বেশ্যাদের চেয়েও বর্তমানে বোধহয় কবির সংখ্যা বেশি", তো অন্যদিন চোখে পড়ে কোনো নবীন রায়বাহাদুরের স্টেটাস, "পারস্পরিক বিভেদ জন্ম দিয়ে চলেছে তেত্রিশ কোটি লিটল ম্যাগাজিন।" প্রায় প্রতিদিনই কারো না কারো, কোনো না কোনো তির্যক পোস্ট চোখে পড়ে এত কেন 'কোবি' ও 'পোত্রিকা' তাই নিয়ে। খ্যাতনামা পত্রিকার কবি-সম্পাদকদের উষ্মার আঁচ গায়ে এসে লাগে। এসব কথাকে বাকতাল্লা ভেবে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আঠারোশো কিমি দূরে বসে বুঝতে পারি আমার, আমাদের আরো সহস্র সংকটের সঙ্গে যুঝতে হবে। পরে তাই দ্বন্দ্ব কাটতেও সময় লাগে না। কথা বলি পরস্পর, অরিন্দম, সিদ্ধার্থ, তাপস, প্রদীপদা। আঁকড়ে থাকি পরস্পরকে। আরো একটি নতুন পত্রিকার উদ্দেশ্যর সততা নিয়ে নিজেরা নিঃসংশয় হই। সিদ্ধান্ত নিই আমরা কী লিখবো, কী পড়বো, কী ছাপবো তা আমরাই ঠিক করবো। প্রতিষ্ঠানকেও যেমন তা ঠিক করতে দেবো না, তেমনি প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মুখোস আঁটা সামন্ততান্ত্রিক মোড়লদেরও না। অনেকে লিখুক, অনেকে লেখার চেষ্টা করুক, অনেক পত্রিকা হোক, অনেকের লেখা প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ পাক তা এই দুপক্ষের কেউই চায় না। তবে আশার কথা, এই দুয়েরই বাইরে আজো আছেন অসংখ্য ভালো কবি, লেখক, পাঠক। তারাই সংখ্যাগুরু। তারাই আমাদেরও ভরসা।

আমরা সত্যিই বিশ্বাস করি লেখা, সে কবিতা, গল্প বা অন্য যা কিছু হোক, খারাপ হলে সবই এক ব্র্যাকেটে ফেলা গেলেও ভালো লেখা নানান রকমের হয়। এবং মনে মনে আমরা ঠিক করে নিই বম্বে-Duck -এ আমরা সেই সব রকমের রসই তারিয়ে তারিয়ে নেওয়ার ও বিলি করার চেষ্টা করবো। চেষ্টা করবো এই পত্রিকাকে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর সমাজে উল্লেখযোগ্য করে তুলতে। একে ঘিরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার এমন একটা সজীব পরিসর তৈরী করতে যা এই বাণিজ্য নগরীর সাহিত্যপ্রেমী বাঙালির ভাষা-দরদ উজ্জীবিত করবে। সুখের কথা সেই চেষ্টায়
শুধু যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে দূরে (আজকাল বহুদূরে বলতে মুখে আটকায়), সালমান-শাহরুখদের এই শহরের, যেখানে বাঙালিদেরও বেঁচে থাকার জন্য চব্বিশ ঘন্টার দিনে আঠাশ ঘন্টার দিনলিপিকে ঠেসেঠুসে ঢোকাতে হয়, সাহিত্যপ্রেমী প্রিয় মানুষদেরই পাশে পেয়েছি তা নয়, আমার মতো নবিশ সম্পাদকের পে-ডিগ্রিহীন নতুন ওয়েব-পত্রিকার আত্মপ্রকাশ সংখ্যার জন্য আমন্ত্রিত প্রত্যেক কবি লেখকও লেখা পাঠিয়েছেন কোনোরকম দ্বিধা না দেখিয়ে। তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকলাম। যাঁরা, নিজে থেকেই লেখা পাঠিয়ে সহযোগিতা করলেন, তাঁদের প্রতিও সমান কৃতজ্ঞ থাকলাম। যে দুজনের সাহায্য ছাড়া এই পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভবই হতো না তারা হলেন সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায় এবং অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়। সম্পাদকের নামটা আমার একার থাকলেও কাজটা আসলে আমরা তিনজনে মিলেই করেছি। আর হাত বাড়ালেই পাশে পেয়েছি প্রদীপ রায়চৌধুরীদা, উদয়ন ভট্টাচার্যদা, সূর্য ভট্টাচার্য, তাপস মাইতি, শবরী রায়, ও সঙ্ঘমিত্রা পরিবারের পার্থ রায়। এবং অবশ্যই রোহণ কুদ্দুস। এঁরা প্রত্যেকেই আমার ভালোবাসার মানুষ, বম্বেডাক পরিবারের সদস্য, কাজেই ধন্যবাদ জ্ঞাপনের সৌজন্য উচ্চারণ থেকে তাই বিরত থাকলাম।

এখন পাঠকরা একটু ভালোবেসে চেখে দেখলেই বম্বেDuck সার্থক।

হ্যাঁ, আরেকটা কথা। প্রকাশিত সমস্ত লেখার বিষয়, বক্তব্য এবং মৌলিকত্বের দায় শুধুমাত্র লেখকের।

ফেসবুক মন্তব্য